“ঠিক আছে। আমি আপনাকে খাঁটি ভারতীয় চা ‘টাটা টি গোল্ড’ দিচ্ছি। ১৯৬২ সাল থেকে টাটা কসজুমার্স প্রডাক্টস লিঃ ‘টাটা টি গোল্ড’ প্রস্তুত ও বাজারজাত করে আসছে। আসামের কিছু বিখ্যাত চা বাগান থেকে এই সব চা পাতা সংগ্রহ করা হয়। আমি দুধ-চা খাই, আপনাকে কি ভাবে দেব।”
“আমি মনে করি চায়ে দুধ দিলে চায়ের আসল স্বাদটা মরে যায়। আমাকে রং চা দেন আর সাথে আধা শ্যাশে সুইটনার দেবেন।”
“তার মানে আপনি ডায়াবেটিক রোগী। খুব সাবধানে থাকবেন। নিয়ম মেনে চললে, কোন অসুবিধা নেই বরঞ্চ আরো ভাল থাকবেন।”
চা খেতে খেতে আমরা আরো অনেকক্ষণ আড্ডা মারলাম। আমরা উইকএন্ড বাদে প্রতিদিনই আড্ডা মারতাম। আমরা আস্তে আস্তে ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে চলে এসেছিলাম।
শনি, রবিবার ছেলে ছেলের বৌ আর নাতিটা বাসায় থাকে। তাই আমি ঐ দুই দিন বাদে প্রায় প্রতিদিনই ‘ইন্ডিয়ান শপে’ যেয়ে রমার সাথে আড্ডা মারতাম। আমি খেয়াল করলাম যে প্রায় প্রতি উইকএন্ডে হয় ছেলের বাসায় ওর বন্ধুর অথবা ওর বন্ধুর বাসায় আমাদের সপরিবারে দাওয়াত থাকত। প্রতি দাওয়াতে আমি আর ছেলের বন্ধুর মা, নাশিদ থাকতাম। আমরা দুজন বয়স্ক হওয়াতে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের দুজনের ভেতরেই বেশি কথা হত। নাশিদের চালচলন পোশাক আশাক ছিল একটু বেশি আধুনিক, একেবার যুবতীদের মত। উনি সব সময়ে সালোয়ার কামিজ পরতেন। উনার কামিজটা ছিল একদম বডি ফিটিং। শরীরের সমস্ত ভাঁজ, বুক আর নিতম্ব, প্রকটভাবে দেখা যেত। অথচ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা পড়ত লুজ ফিটিং কামিজ, ওদের বডি প্রোফাইল কিছুতেই বোঝা যেত না। আবার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের মত শুধু বাঁ কাঁধে ওড়না পরতেন ফলে ডান দিকের বুকটা সব সময়ে খোলা থাকত। যেহেতু যুবতীরা ফ্রি ফিটিং কামিজ পরত, তাই এইভাবে ওদের ওড়না পরাতে কোন রকমের খারাপ কিছু মনে হত না। মধ্য বয়সী মহিলাদের সালোয়ার কামিজ পরা বা এক কাঁধে ওড়না পরা আমি পছন্দ করতাম না। আর আমি পছন্দ করতাম না বলে প্রীতিও বিয়ের পর আর কোনদিন সালোয়ার কামিজ পরে নাই। উনি ঠোঁটে গাঢ় করে লিপস্টিক লাগাতেন, আইব্রো, মাশকারা, আই শ্যাডো সবই ব্যবহার করতেন। উনি নিজেকে প্রদর্শন করতে খুব পছন্দ করতেন। উনাকে আমি পছন্দ করতাম না।
কানাডার গ্রীষ্মকালে আমি কানাডায় থাকতাম। কানাডায় আসবার সময়ে আমি নঈমার জন্য প্রচুর ঢাকাইয়া বিটি শাড়ি, পাবনার সুতি শাড়ি, টাঙ্গাইলের সুতি ও হাফ সিল্ক শাড়ি, মিরপুরের বেনারসি ও ঢাকার জামদানি শাড়ি নিয়ে যেতাম। কিছু শাড়ি নঈমা রেখে বাকিগুলো ওর পরিচিতাদের উপহার দিত। তাই ভ্যাঙ্কুভারে নঈমার খুব কদর ছিল। একবার অনেক শাড়ির সাথে রাজশাহির দোয়েল সিল্ক মিলসের একটা সোনালি কাজ করা লাল চওড়া পাড়ের ক্রীম কালার শাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম। এই রকমের একটা শাড়ি প্রীতির ছিল। শাড়িটা প্রীতির খুব পছন্দের ছিল। শাড়িটা নঈমাও খুব পছন্দ করেছিল।
“আব্বু এই সুন্দর শাড়িটা আমি আমাদের সবার প্রিয় মিমি আন্টিকে প্রেজেন্ট করব।”
“মা, আমি তো এটা তোমার জন্য এনেছিলাম। আর তোমারও পছন্দ হয়েছে বলে মনে হল। তা হঠাৎ আন্টিকে প্রেজেন্ট করতে হবে কেন?”
“তোমাকে নিয়ে যাব। তখন বুঝবে কেন আমি এটা উনাকে দিতে চাচ্ছি। আমরা কাল বিকেলে উনার বাসায় যাব।”
“তা তোমার আঙ্কেল কি করেন।”
“আঙ্কেল এখানে একটু খুব ভাল জব করতেন। উত্তর আমেরিকায়, ইউরোপ, রাশিয়াসহ সবখানে শীতকালে রাস্তার তুষার জমে করফ হয়ে যায়। রাস্তাঘাট তখন খুবই পিচ্ছিল হয়ে থাকে। এক রাতে উনি গাড়ি চালিয়ে আসছিলেন, তখন একটা গাড়ি বরফে স্লিপ করে দুর্ঘটনা ঘটায়। পনের বিশটা গাড়ি ঐ দুর্ঘটনায় পড়ে। দুর্ঘটনায় আঙ্কেলসহ আরো তিনজন মারা যায়। এখানে যত বাংলাদেশি ছাত্র আছে আন্টি সবার গার্জিয়ান। সবার খোঁজখবর রাখেন, দেখভাল করেন। উনি এখানে সমানভাবে আলোচিত আর সমালোচিত। ছাত্রদের এবং আমাদের মত কয়েকটা ফ্যামিলির কাছে তিনি ভীষণভাবে পরোপকারী হিসাবে আলোচিত। আর কিছু হিংশুটেদের কাছে তিনি দুশ্চরিত্রা। ছাত্রদের মাথা খাচ্ছে। নিজের স্বার্থে ওদের ব্যবহার করছে।”
পরের দিন বিকেলে আমরা নঈমাদের মিমি আন্টির বাসায় গেলাম। উনাকে দেখে আমি বুঝতে পরলাম কেন নঈমা এত সুন্দর শাড়িটা উনাকে প্রেজেন্ট করতে চাচ্ছে। আমরা উনার ঘরে ঢুকে দেখি যে উনি এ্যাকুরিয়ামে মাছের খাবার দিচ্ছিলেন। উনি আমাদের দিকে পেছন ফিরে ছিলেন। পেছন থেকে উনার অবয়বটা একদম প্রীতির মত। প্রীতির মতই উনিও শাড়ি পড়েছিলেন। নঈমা ডাকতেই উনি আমাদের দিকে ঘুরে দঁড়ালেন। চেহারাটা অনেকটা প্রীতির মতই। আমি বোধ হয় একটু বেশিক্ষণ উনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। উনি একটু লজ্জা পেয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন আর বোধ হয় একটু অসন্তুষ্টও হয়েছিলেন। আমার সাথে খুব একটা কথা বলেন নাই। পরে নঈমা আমার অবস্থানটা উনাকে বুঝিয়ে বলাতে উনি আমার সাথে সহজ হয়েছিলেন। আমি নঈমার সাথে আরো কয়েকবার উনার বাসায় গিয়েছিলাম। উনি কেন যেন আমাকে খুব টানতেন। একবার সাহস করে একাই উনার বাসায় গেলাম। উনি হেসে বললেন,
“নাসিম সাহেব, আপনি কি প্রীতির কাছে এসেছেন?”
“যদি বলি তাই।”
“স্ত্রীর প্রতি আপনার ভালবাসাকে আমি শ্রদ্ধা জানাই। এত বছর পরও আপনার স্ত্রীর মত একজনকে দেখতে আপনি বারে বারে আমার কাছে আসছেন। আমি এটাকে ভাল ভাবেই নিচ্ছি। কিন্তু অনেকে এটা অন্যভাবেও নিতে পারে। আমার মনে হয় আমার কাছে আপনার আসাটা একটু কমিয়ে দিলে ভাল হয়।”
“আমি আপনাকে কোন অবস্থাতেই কোন বিব্রতকর অবস্থায় ফেলব না। আমি এরপর থেকে মেয়ের সাথেই আসব। আপনাকে দেখলেই আমি একটু ভাবালু হয়ে যাই, আশা করি আপনি আমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারছেন। আমার এই ভাবালুতা আপনি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।”
“ঠিক আছে আপনি আসবেন। তবে আপনার কথা মত আমাকে কোন বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেন না।”
উনাকে দেখে আমার ভাবালুতা বোধ হয় উনার মনে একটু দাগ কেটেছিল। উনার কথার ধরণ আর মুখের ভঙ্গিমা দেখে মনে হচ্ছিল যে আমার প্রতি বোধ হয় উনার একটু দুর্বলতাও জন্মেছিল।
এরপর আমি যতবারই ভ্যাঙ্কুভার গিয়েছিলাম, ততবারই মিমির জন্য সব চাইতে ভাল ভাল বেনারসি, কাতান, জামদানি শাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম। মিমি খুবই খুশি হতেন। আমি দেশে থাকলে মাঝে মাঝে নঈমার কাছে আমার কথা জিজ্ঞাসা করতেন। একবার প্রীতির মৃত্যু বার্ষিকীতে মিমি আমাকে ফোন করেছিলেন,
“হ্যালো, আমি আপনার প্রীতি বলছি।”
আমার হাত থেকে ফোনটা ছিটকে পড়ে গিয়েছিল।
“মিমি, আমাকে এইভাবে ভড়কে দিয়ে আহত করা বোধ হয় আপনার ঠিক হয় নাই। আপনি ফোন করেছেন, আমি ভীষণ খুশি হয়েছি।”
“নাসিম সাহেব আপনাকে আহত করার জন্য আমি দুঃখিত। আমি মনে করেছিলাম যে আপনার এই দুঃখের দিনে আপনার সাথে কথা বলে আপনার দুঃখটা একটু শেয়ার করি। আপনার হয়ত একটু ভাল লাগবে। আমি আর ফোন করব না।”
উনার গলাটা শুনে মনে হল যে উনিও একটু ব্যথিত হয়েছেন।
“মিমি আপনি ফোন করবেন, আমি সত্যিই খুশি হব। আসলে আমি আপনার ফোন আশা করি নাই, তাই একটু ভড়কে গিয়েছিলাম। আমি ফোন করলে আপনি কি কিছু মনে করবেন?”
শুরু হল আমাদের দুজনের মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলা। কথার সময় আস্তে আস্তে লম্বা হতে থাকল। এখন আমরা প্রায়ই অনেকক্ষণ ধরে কথা বলি। আমি ভ্যাঙ্কুভারে আসলে অবধারিতভাবে মিমির বাসায় শুধু মাত্র আমাদের দাওয়াত থাকত। অনুরূপভাবে নঈমাও মিমিকে দাওয়াত করত। মিমি বোধ হয় একটু সেজে আসত, যেটা মুরাদের চোখেও ধরা পড়ত। নঈমা খুশি হত। ওর ভাইয়ের সাথে আলাপ করত। নঈমও ওর বোনকে জানিয়েছিল যে ও প্রথমে নাশিদের সাথে আমাকে ফিট করতে চেয়েছিল তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে এখন রুমার সাথে আমাকে ফিট করবার চেষ্টা করছে। ওদের কথা হল যে যেভাবেই হোক আমাকে অস্ট্রেলিয়ায় বা কানাডায় এক জায়গায় ফিট করতে হবে।
আমি অস্ট্রেলিয়ায় পাঁচ ছয়বার গিয়েছিলাম। ইতিমধ্যে মুরাদ আর নঈমার ঘর আলো করে ওদের প্রথম পুত্র সন্তান, হীরার জন্ম লাভ করে। এই সময়ে নঈম আমাকে সিডনির বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গা, বিশেষ করে সিডনির আইকনিক হারবার ব্রিজ ও সিডনি অপেরা হাউস দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। এছাড়া আমাকে ক্যানবেরা ও মেলবোর্নে নিয়ে গিয়েছিল। ওখানকার কয়েকটি স্থানে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। সিডনি, ক্যানবেরা ও মেলবোর্নের যে সব জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল সেগুলো খুবই আকর্ষণীয় ছিল। আমার কানাডা আর অস্ট্রেলিয়া পাঁচ বছরের মাল্টি-এন্ট্রি ভিসা আছে। যতবার আমি অস্ট্রেলিয়া এসেছিলাম, আসবার সময়ে দেশ থেকে বেশ কয়েকটা করে হয় ঢাকাই বিটি শাড়ি, না হয় পাবনার সুতি শাড়ি, না হয় টাঙ্গাইলের সুতি ও হাফ সিল্ক শাড়ি, মিরপুরের বেনারসি ও ঢাকার জামদানি শাড়ি আনতাম। ছেলে আর বৌ মনে করেছিল যে আমি ও সব নাশিদের জন্য আনতাম। ওরা খুশি হত। কিন্তু যখন দেখল যে আমি ওগুলো রুমাকে উপহার দিলাম, ওরা বুঝে ফেলেছিল যে আমি নাশিদের চেয়ে রুমাকেই বেশি পছন্দ করতাম। রুমা আর ছেলের বৌ শাড়িগুলো পেয়ে ভীষণ খুশি হত। রুমা এত খুশি হয়েছিল যে একবার ছেলে ঋষি আর বৌ জারিনার সামনেই আমাকে হাগ করেছিল। পরে বুঝতে পেরে তার সে কি ভীষণ লজ্জা। রুমার ছেলে ঋষি আর ঋষির বৌ দুজনে মিলে দুই এ দুই চার বানিয়ে ফেলল। মায়ের একটু গতি হতে পারে মনে করে ওরা খুশি হয়েছিল।
কোনদিন যা হয় নাই, তাই হল। এক রবিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ ঋষি আর জারিনা বাসায় এসে হাজির। দাদা আর নাতি মিলে টিভি দেখছিলাম। ওরা চারজনে আলাদা বসে কথাবার্তা বলছিল। কথাটা ঋষিই উঠাল। ছেলে আর বৌ দুজনই খুব আগ্রহ নিয়ে ঋষিদের সাথে কথা বললো। ঠিক হল যে ঋষি ওর মার সাথে আর নঈম আমার সাথে কথা বলবে। রুমার সাথে ঋষির কি কথা হয়েছিল তা আমি জানি না। নঈম কথাটা উঠাল,
“আব্বু তুমি তো এখন একাই থাকছ। তোমাকে নিয়ে আমরা চিন্তিত আছি। একা একা কিভাবে থাকছ, কি খাচ্ছ, অসুখ বিসুখ হলে কে তোমাকে দেখবে। আমি আর নঈমা এই ব্যাপারে প্রায়ই কথা বলি। আমরা তোমার জন্য একজন উপযুক্ত সঙ্গিনী ঠিক করব। তোমরা দুজন পরস্পরের দেখাশোনা করতে পারবে।”
“আমি তো ভালই আছি বাবা। তোমাদের মা মারা যাবার পর থেকেই তো আমি একা। আমার তো কোন অসুবিধা হয় নাই আর আশা করি হবেও না।”
“মানলাম যে এখন পর্যন্ত তোমার কোন অসুবিধা হয় নাই, তুমি কোন গুরুতরভাবে অসুস্থ হও নাই। তোমার এখন বয়স হয়েছে, এখন তুমি যে কোন সময়েই অসুস্থ হয়ে পড়তে পার। তুমি আমাদের সাথে থাকলে আমরা দেখাশোনা করতে পারতাম। আমি কেন দেশে ফিরব না তা তো তোমাকে বলেছি। নঈমাকে তো মুরাদের সাথে থাকতে হবে। তুমি তোমার সব স্বাদ, আহ্লাদ আমাদের জন্য ত্যাগ করেছ, তোমার সব চাইতে উৎকৃষ্ট সময়টাকে, জীবনটাকে সব চাইতে ভাল ভাবে উপভোগ করবার সময়টা আমাদের জন্য ত্যাগ করেছ। নাদিমটা যে কেন একরম করল, তা আমি বা নঈমা কেউই ঠিক বুঝতে পারছি না। আমরা দুজনেই নাদিমের উপর ভীষণ অসন্তুষ্ট। আমাদের জন্য তোমার ত্যাগের কোন মূল্যই ওর কাছে নেই। আশ্চর্য।”
“নাদিম কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেছে তা কি তোমরা জান?”
“নাফিসা একদিন পপিকে ফোন করে কেঁদে কেঁদে তোমার নামে ভয়ঙ্কর সব অপবাদ দিচ্ছিল। নঈমাকেও জানিয়েছিল। আমি বা নঈমা কেউই ওর কথা বিশ্বাস করি নাই। আমরা তোমাকে খুব ভাল করে জানি।”
“নাদিম যখন আমার বিরুদ্ধে ঐ সব অভিযোগ এনেছিল, তখন আমি শুধু আমার মৃত্যু কামনা করতাম। তা বাবা তোমরা এখন কি করতে চাও।”
“আমার বন্ধুর মা নাশিদ আন্টিকে তোমার সাথে ফিট করে দিতে চেয়েছিলাম। পরে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে তুমি উনাকে বিশেষ পছন্দ কর না। আর তোমার পছন্দ রুমা আন্টি। আমরা রুমা আন্টির কথা চিন্তা করছি। তুমি কি বল।”
“এটা ঠিক যে আমি নাশিদকে পছন্দ করি না। তবে আমি রুমাকে আমার একজন ভাল বন্ধু হিসাবেই দেখতাম আর এখনও দেখি। রুমাকে ঘিরে সেই রকমের কোন চিন্তা কোন দিনই আমার মনে আসে নাই। আমি রুমার সাথে কথা বলে ওর মনোভাব জেনে তোমাদের জানাব।”
কয়েকদিন আগে নঈম আর পপি সিডনির লাকাম্বায় আরব পাড়ার পাশেই বাংলাদেশি এলাকার বাংলাদেশি দোকান থেকে আমার পছন্দের রুচির ‘বার বি কিউ’ ৫০০ গ্রামের দুই প্যাকেট চানাচুর এনেছিল। আমি এক প্যাকেট চানাচুর নিয়ে রুমার দোকানে গেলাম। আমি চানাচুর প্যাকেটটা রুমাকে দিলাম। যথারীতি রুমা আমার জন্য আমার পছন্দমত দুধ ছাড়া ‘ল্যাপচ’ চা বানিয়ে আনল। চায়ের সাথে রুচির চানাচুর আর হলদিরামের সোনপাপড়ি দিল। রুমা জানে আমি ভারতীয় চানাচুর পছন্দ করি না। ওদের সব কিছুতেই চিনি দেওয়া থাকে। রুচির চানাচুর খেয়ে রুমা খুবই খুশি হল। এতো দারুন স্বাদের চানাচুর অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায় নাকি জিজ্ঞাসা করলে আমি ওকে বলে দিলাম কোথায় পাওয়া যাবে। চা খেতে খেতে আমরা নানান গল্প করছিলাম। আমাদের বিষয়টা কি ভাবে উঠাব চিন্তা করছিলাম। অবশেষে রুমাই কথাটা উঠাল।
“নাসিম, শুনলাম ঋষি আর জারিনা তোমাদের বাসায় গিয়েছিল।”
“হ্যাঁ ওরা দুজন বাসায় গিয়েছিল। আর একটা প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল। তুমি নিশ্চয়ই জান প্রস্তাবটা কি?”
“হ্যাঁ আমি জানি প্রস্তাবটা কি? তোমার মত কি?
“দেখ রুমা আমি সব সময়েই তোমাকে আমার একজন খুব ভাল বন্ধু হিসাবেই দেখতাম, এখনও দেখি। আমি কোনদিনই এর চেয়ে বেশি কিছু চিন্তা করি নাই। আমি কোনদিনই তোমাকে আমার বন্ধুর চেয়ে ওপরে স্থান দেই নাই।”
মনে হল যে রুমার চোখ দুটা একটু ভিজে উঠল। ধরা গলায় বললো,
”নাসিম, আমি কিন্তু একটু ভিন্ন রকম চিন্তা করেছিলাম। তোমার দ্বিধা কোথায়? আমি ভিন্ন ধর্মী বলে? আমি ভিন্ন দেশি বলে? আমি কিন্তু অনেক দিন ধরে একা, আমি ভীষণ একা।”
”রুমা, তুমি আমাকে ভুল বুঝো না। ধর্ম বা দেশ আজকাল কোন ব্যাপারই না। আমাদের দেশে বা তোমাদের দেশে ভিন্ন ধর্মী বা ভিন্ন ভাষীদের ভেতর বিয়ে হচ্ছে। তুমি ও তোমার ছেলে তো ভিন্ন ধর্মী বা ভিন্ন ভাষীকে বিয়ে করেছিলে। আর আমিও তো তোমার চেয়ে অনেক বেশি দিন ধরে একা। এটা ঠিক যে মাঝে মাঝে আমার মনের ভাবগুলো কারো সাথে শেয়ার করতে ভীষণ ইচ্ছা করে। আমিও আমার মনের ভারটা লাঘব করতে পারতাম।”
“আমি ভিন্ন ধর্মী ও ভিন্ন ভাষী বিয়ে করেছিলাম বলে আমার বা তার পরিবারে আমাদের জায়গা হয় নাই। নাসিম, আমি তোমার মনের যত রকম চিন্তা ভাবনা, যে সমস্ত ছেলে মেয়েদের সাথে শেয়ার করা যায় না, সব আমি শেয়ার করতে রাজি আছি। হোক সেটা ভদ্র, অভদ্র, শ্লীল, অশ্লীল, ফ্যান্টাসি বা ভালগার সবই তুমি আমার সাথে শেয়ার করে তোমার মনের ভার লাঘব করতে পারবে। একই ভাবে আমিও আমার মনের ভাব তোমার সাথে শেয়ার করতে পারব।”
“রুমা, আমি তোমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। তোমাকে আঘাত দিতে আমার ভাল লাগছে না। আমি কি তোমাকে কোনদিন সেই রকমের কোন রকমের আভাষ বা ইঙ্গিত দিয়েছিলাম?”
“আমি স্বীকার করছি যে তুমি কোনদিন সেই রকমের আভাষ বা ইঙ্গিত দাও নাই। তুমি কি তোমার মনে ভাব শেয়ার করবার জন্য কাউকে পেয়ে গিয়েছ?”
মিমির কথা আমার মনে এসে গিয়েছিল। কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত আমার নিজের মনের ভাব বা মিমির মনের ভাব বুঝতে পারি নাই। আমি যেমন রুমাকে শুধু বন্ধু মনে করি মিমিও হয়ত আমার সম্বন্ধে একই ধারণা রাখে। যেহেতু আমি নিজেই নিশ্চিত নই, তাই বললাম,
“রুমা, সত্যি বলছি আমি এখন পর্যন্ত সে রকম কাউকেই পাই নাই। তবে পেলে তোমাকে ঠিক জানাব। রুমা আমার একটা অনুরোধ, আমরা আমাদের বন্ধুত্ব যেন সব সময়ে একই থাকে। আমরা শুধু বন্ধু। তোমার আপত্তি না থাকলে আমি আমার মনের সব রকমের ভাব আমি আমার বন্ধুর সাথে শেয়ার করতে রাজি।”
“নাসিম, তুমি যদি ভদ্রতার সীমা ছাড়িয়ে না যাও তবে আমার আপত্তি নেই। ছেলেদের কি ভাবে জানাবে বা কি বলবে।”
“নঈম জানে যে আমরা দুজন শুধুই বন্ধু, তার চেয়ে বেশি কিছু না। তুমিও ঋষিকে সেইভাবেই বোঝাবে। রুমা আমার সম্বন্ধে তোমার এক রকম ভাবনা ছিল, আশা করি আজ সেটা কেটে গেছে। আমরা স্বাভাবিকভাবে আবার আড্ডা মারতে পারব। আজ আমি আসি।”
“নাসিম তোমাকে নিয়ে আমার একটা ফ্যান্টাসি ছিল। আজ আমি সেটা বাস্তবায়িত করতে চাই। এসো।”
বলেই রুমা আমাকে জড়িয়ে ধরে গভীরভাবে অনেকক্ষণ ধরে আমার ঠোঁটে চুমু খেল।
“নাসিম এটাই প্রথম এবং শেষ।”
আমিও একটা হাসি দিয়ে বললাম,
“এটাই প্রথম আর শেষ হবে কেন? বন্ধু কি বন্ধুকে চুমু খেতে পারে না।”
“নাসিম তুমি তো হরদম ঢাকা, ভ্যাঙ্কুভার ও সিডনি ঘুরে বেড়াচ্ছ। তোমার তো জানার কথা যে কারা ঠোঁটে আর কারা গালে চুমু খায়। তুমি আমার গালে চুমু খেও আমি আপত্তি করব না। তবে নাসিম ঠোঁটে এটাই প্রথম এবং শেষ।”
আমরা পরস্পর আমাদের ছেলেদের আমাদের অবস্থান জানিয়ে দিলাম। আমাদের বন্ধুত্ব ঠিকই থাকল। আমরা আবার মুক্ত মনে আগের মত আড্ডা মারতে থাকলাম। নঈম অস্ট্রেলিয়াতে আমাকে কারো সাথে ফিট করে দিতে না পেরে নঈমাকে ওর মিমি আন্টির সাথে ভাল করে লেগে থাকতে বললো। নঈমা বিপুল উৎসাহ নিয়ে তার কাজে লেগে পড়ল। এবারে আমার ভ্যাঙ্কুভার ভ্রমণটা একটু আলাদা বলে মনে হল। নঈমা পরপর দুই সপ্তাহান্তে দুটা লম্বা ট্যুরের ব্যবস্থা করল। এই সব ট্যুরেই মিমিকে সাথে নিয়ে নিত। মিমিও দেখি খুব আগ্রহ নিয়ে আমাদের সাথে ভ্রমণে আসত। আমি একটা জিনিষ লক্ষ্য করলাম যে প্রতিবারইে নঈমা আর মুরাদ আমাদের দুজন থেকে আলাদা হয়ে যেত অর্থাৎ আমাদের দুজনাকে একান্তে সময় করে দিত।
পরে কানাডার সামার টাইমে আমি আবার ভ্যাঙ্কুভারে এলাম। দুদিন পর এক সোমবার, সন্ধ্যা সাতটায়, ডিনারের পর পরই নঈম মিমিকে ফোন দিল।
”আন্টি আপনি কখনও হোয়েল (তিমি) মাছ দেখেছেন।”
”আমি এ্যাকুইরিয়ামে দেখেছি। বিশাল বিশাল সাদা-কালো তিমি মাছ। বিশাল ট্যাঙ্কে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
”আন্টি আমরা এই রবিবার আব্বুকে নিয়ে সমুদ্রে পাঁচ ঘণ্টা ব্যাপী তিমি মাছ দেখার এক ট্যুরে যাবার প্ল্যান করছি। আন্টি আপনিও আমাদের সাথে চলেন।”
”সত্যি সত্যি প্রকৃতিতে বন্য তিমি মাছ দেখতে পাওয়া যাবে। আমি খুবই আগ্রহী। আমাকেও তোমাদের সাথে নিও। হীরাও আমাদের সাথে যাবে নাকি?”
”না, আন্টি ওকে এক বেবিসিটারের কাছে রেখে যাব। ওর কোন অসুবিধা হবে না।”
রবিবার সকাল সকাল আমরা এগারটার ভেতরেই ডুরানলিউ এ্যাভেনিউ পৌঁছে গেলাম। ঠিক বারোটার সময়ে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। ‘প্রিন্স অফ ওয়েলস’ নামের হোয়েল ওয়াচিং বোটের ধারণ ক্ষমতা ৯৫ জন। এই বোটে খোলা ডেক ও অভ্যন্তরীণ ডেক পুরাটাই হিটেড। তাই আমরা বেশ আরামে যেতে পেরেছিলাম। প্রকৃতিতে বন্য তিমি মাছ, বিশেষ করে দাঁতওয়ালা ‘অরকা’ তিমি, যাকে কিলার হোয়েল বলে, দেখবার সম্ভাবনা আছে বলে আমরা সবাই বেশ উত্তেজিত ছিলাম। মুরাদ আর নঈমা আমাদের দুজনকে একত্রে সামনের ডেকে রেখে ওরা পেছনের ডেকে চলে গেল।
আমাদের ভাগ্য সত্যি ভাল। ন্যাশনাল জিওগ্রাফির ‘ওয়াইল্ড লাইফ’ সিরিজে আমরা আফ্রিকার সাফারি পার্কে চিতা বা সিংহের শিকার দেখতাম, ঠিক তেমনি আমাদের চোখের সামনে দেখলাম একদল কিলার হোয়েল শিকার করছে। এই দেখে আমরা সবাই বেশ উত্তেজিত ছিলাম। উত্তেজনায় মিমি আমার বাহু পেঁচিয়ে ধরে আমার গায়ে লেপ্টে থেকে বললো,
”নাসিম, দেখ দেখ তিমি মাছ শিকার করছে।”
আমি বুঝলাম যে মিমি ওর অবচেতন মনে আমার প্রতি ওর নিজের আসল ফিলিংসটা প্রকাশ করে ফেলেছে। মিমি ওর অবচেতন মনে আমাকে ওর খুবই কাছে নিয়ে গিয়েছিল। এটাও সত্যি যে আমিও ওকে মনে মনে কামনা করতাম। আমি একটু হেসে ওর দিকে তাকাতেই মিমি লজ্জা পেয়ে আমাকে ছেড়ে দিল।
”নাসিম সাহেব আমি একটু উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলাম। আমাকে মাফ করবেন।”
”মিমি, ছাড়লে কেন? আমার তো ভালই লাগছিল। আর ‘তুমি’ করে বলাটাও ভাল লাগছিল। এখন থেকে ‘তুমি’ ‘তুমি’ করেই বলবে।”
বলেই আমি মিমির কোমর জড়িয়ে ধরলাম। মিমি আরো একটু ঘন হয়ে আমার বাহু ধরে আমার গায়ে গা লাগিয়ে রইল। দূর থেকে নঈমা আর মুরাদ আমাদের ধরাধরি দেখে খুশি হল।
”আমি সবার সামনে বলতে পারব না। আমার লজ্জা করবে।”
”ঠিক আছে, যখন শুধু আমার দুজন থাকব, তখন বোলো।”
আমার দুজনে বাকিটা সময়ে এইভাবেই ধরাধরি করে থাকলাম। আমাদের বাকি জার্নিতে আমরা আরো হাম্পব্যাক তিমি দেখলাম। তিনটা আমাদের বেশ কাছাকাছি বেশ অনেকক্ষণ ধরে ছিল। আমরা সীল মাছ ও সি লায়নও দেখেছিলাম। বোটের লোকেরা এই সব সামুদ্রিক প্রাণীর বিশদ বিবরণ দিচ্ছিল যেমন তিমি মাছ, সি লায়ন বা সিল মাছ কত লম্বা হয়, ওজন কত হয়, কত দিন বাঁচে ইত্যাদি। ওরা অনেক স্থির চিত্র ও ভিডিও করেছিল এবং আমাদের সবাইকে ওগুলো মেইল করে পাঠিয়েছিল। বোটে ফ্রি চা, কফি বা চকোলেট ড্রিংক্স-এর ব্যবস্থা ছিল। এই পাঁচ ঘণ্টার বোট ট্রিপে আমরা এত অভিভূত হয়ে ছিলাম যে ফিরে আসবার সময়ে আমরা কেউই কোন কথা বলতে পারি নাই। মিমি নেমে যাবার সময়ে বলেছিল,
”নাসিম সাহেব আরো কিছুদিন আছেন তো নিশ্চয়ই। আবার দেখা হবে। মুরাদ আর নঈমা এত সুন্দর একটা প্রোগ্রাম করবার জন্য তোমাদের ধন্যবাদ। আমি তোমাদের চেয়ে বেশি দিন এখানে আছি অথচ আমি এই ট্রিপ সম্বন্ধে কিছুই জানতাম না। নাসিম সাহেব থাকতে থাকতে আরো দুই একটা প্রোগ্রাম করো।”
নঈমা মনে মনে ভাবলো ‘সেটা আপনাকে বলতে হবে না। আমি তোমাদের দুজনাকে এ্যারালডাইট সুপার গ্লু আঠা দিয়ে জোড়া লাগিয়ে ছাড়ব’।
পরের রবিবার নঈমা আর মুরাদ মিলে গ্রানাইট ফলস দেখার প্রোগ্রাম করল। আগের বারের মত আমরা সাড়ে এগারটার ভেতরেই গ্রানভিলের ১৮১২ নং বোটলিফ্ট লেনে পৌঁছে গেলাম। এই প্রোগ্রামটা ছিল তিন ঘণ্টার। একটা ১২ জন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন রাবার বোটে আমার রওয়ানা দিলাম। এখানেও আমাদের দুজনাকে সামনে দুজনার সিটে বসতে দিয়ে নঈমা আর মুরাদ একদম পেছনের সিটে বসল। আমাদের সবাইকে এক সেট করে ইনসুলেটেড স্যুট দিয়েছিল, যেটা সমুদ্রের ভেতরে আমাদের গরম রাখতে সাহায্য করেছিল। আমরা প্রথমে ভ্যাঙ্কুভার ওয়াটার এ্যাডভেঞ্চার পার্কে পনের মিনিটের জন্য একটা ট্যুর দিলাম। এরপর আমরা গেলাম স্ট্যানলি পার্কের ‘সিওয়াশ রক’ দেখতে। প্রায় তিন কোটি বছর আগে এই গ্রানভিল পার্কটা স্যান্ড স্টোন বা নরম পাথর দিয়ে তৈরি হয়েছিল। কালের আবর্তে একটা আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভা এই নরম পাথর ফুঁড়ে এই ‘সিওয়াস রক’-এর জন্ম দেয়। এটা ক্ষয় প্রতিরোধক ব্যাসাল্ট দিয়ে প্রস্তুত বলে এটার আর কোন ক্ষয় হয় নাই। এই রকটা একটা বিশাল স্তম্ভের মত দেখতে বলে এটা পর্যটকদের ছবি তোলার একটা প্রিয় জায়গা। রকটাকে স্পর্শ করে অনুভূতি নেবার জন্য ও ছবি তোলার জন্য এখানে আমাদের পাঁচ মিনিটের একটা ব্রেক দেওয়া হয়েছিল। এরপর আমাদের নিয়ে যাওয়া হল গ্রানাইট ফলস দেখতে। এই ট্রিপে মিমি ওর দুই হাত দিয়ে আমার একটা বাহু আঁকড়িয়ে ধরে ওর মাথাটা আমার কাঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিল। মিমির শ্যাম্পু করা সিল্কি নরম চুল আমার মুখে বাড়ি মারছিল। ওর কাপড়ের মৃদু আর মিষ্টি পারফিউমের গন্ধ আর তার সাথে মিমির গায়ের মেয়েলি গন্ধ আমাকে মোহিত করে রেখেছিল। আমিও আমার একটা হাত দিয়ে মিমির বাহু ধরে ওকে আমার কাছে টেনে নিয়েছিলাম। মিমি ঘুরে ওর মুখটা আমার বাহুতে ঘষতে থাকছিল। কখন যে আমরা গ্রানাইট ফল্সে এসে পৌঁছালাম তা আমাদের খেয়াল ছিল না। গাইডের কথায় আমার সম্বিৎ ফিরে পেয়ে আমাদের সামনে একটা বিরাট ফল্স দেখতে পেলাম। এটা আসলে তিনটা ফল্সের সংমিশ্রণে একটা ফল্স। এই প্রপাতটা খাড়াখাড়ি প্রায় পঞ্চাশ ফিটের আর এটার মোট দৈর্ঘ তিন শ ফিটের উপরে। পনের মিনিটের একটা ব্রেক দেওয়া হয়েছিল। ছোট বোট হওয়াতে আমার প্রপাতের খুব কাছে যেতে পেরেছিলাম। ফিরে আসবার পথে আমরা সমুদ্র থেকে ভ্যাঙ্কুভার শহরটা দেখতে পেরেছিলাম।
অস্ট্রেলিয়ান সামারে আমি আবার সিডনি এলাম। সপ্তাহের বকি সময়টা আমি রুমার সাথে আড্ডা মেরে কাটিয়ে দিলাম। রবিবার নঈম আমাদের অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল মেরিটাইম মিউজিয়ামে নিয়ে গেল। আমার সারা দিন লাগিয়ে মিউজিয়ামটা দেখলাম। নঈম এক রবিবার আমাকে নিয়ে সিডনি থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে ম্যানালি সমুদ্রতীরে ‘অস্ট্রেলিয়ান মেমোরিয়াল ওয়াক’ নামক একটি স্মৃতিস্মারক পথ দেখতে নিয়ে গিয়েছিল। লাল পোড়া ইটে বাঁধান এই পথটা আমার কাছে খুবই ভাল লেগেছিল। যে কেউই কিছু অনুদানের বিনিময়ে, এই পথের পোড়া মাটির ইটে, যুদ্ধে নিহত তাদের প্রিয়জনের নাম এবং পরিচয় খোদাই করে রাখতে পারেন।
মেমোরিয়াল ওয়াক দেখে আমরা গেলাম এর পাশেই অবস্থিত নর্থ ফোর্ট দেখতে। এটি বর্তমানে ‘ন্যাশনাল আর্টিলারি মিউজিয়াম’ হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৯৩৮ সালে এই ফোর্ট নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্র পথে বা আকাশ পথে শত্রু আক্রমণ থেকে অস্ট্রেলিয়াকে রক্ষা করা। এখানকার দুটা বিশাল কামান দেখে আমার ১৯৬১ সালে নির্মিত জে লি থমসন পরিচালিত এবং কার্ল ফোরম্যান প্রযোজিত, গ্রেগরি পেক, ডেভিড নিভেন, এ্যানথনি কুইন এদের মত হলিউডের প্রথম সারির অভিনেতা কর্তৃক অভিনীত আমেরিকার সিনেমা ‘গানস অফ নাভারন’-এর কথা মনে এসেছিল। সিনেমার মতই এখানেও দুটা বিশাল কামান সমুদ্রের দিকে তাক করা ছিল। এর সাড়ে নয় ইঞ্চি বিশাল কামানের শেল ট্রলিতে করে এনে কয়েকজন মিলে কামানে লোড করতে হত। এই কামান দুটা দুই জায়গায় গোলাকার টারেটে ফিট করা ছিল তাতে এই দুটাকে যে কোন সময়ে যে কোন দিকে ঘোরানো যেত। মাটির তল দিয়ে এই কামান দুটা সংযোগ করা ছিল। এই কামান দুটাকে আকাশ পথে আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য চারটা সাড়ে তিন ইঞ্চি এন্টি এয়ারক্রাফ্ট গান এবং প্রচুর সার্চ লাইট দিয়ে সজ্জিত ছিল। এই কামান দুটার রেঞ্জ ছিল ২৮ কিলোমিটারের উপরে এবং প্রতি মিনিটে দুই রাউন্ড গোলা ছোড়া যেত। এই কামান দুটা পরিচালনা করবার জন্য পাঁচ শত জনবলের প্রয়োজন হত, এবং তাদের থাকার জন্য একটা ব্যারাকও ছিল। এই কামান দুটা নিয়মিতভাবে প্র্যাকটিস করা হত। এই কামান দুটার জীবদ্দশায় ১৯৪৩ সালে শুধু মাত্র একবারই সম্ভাব্য শত্রুপক্ষের জাহাজের প্রতি গোলা বর্ষণ করা হয়েছিল। সেই সময়ে একটি পোলিশ বাণিজ্যিক জাহাজ যথাযথভাবে জানান না দিয়ে সিডনি বন্দর অভিমুখে আসলে, দুটি সতর্ককরণ গোলা ছোড়া হয়েছিল। জাহাজের ক্যাপ্টেনকে তৎকালীন সময়ে ৬০০ পাউন্ড (বর্তমানে যা দুই মিলিয়ন ডলারের সমান) জরিমানা করা হয়েছিল।
পরেরবার আমি যখন ভ্যাঙ্কুভারে এলাম, নঈমা আর মুরাদ আমাদের আরো সুযোগ করে দেবার জন্য আরো কয়েকটা প্রোগ্রাম করেছিল। এর ভেতরে উল্লেখযোগ্য ছিল ভ্যাঙ্কুবার সাইট সিইং প্যাকেজ ট্যুর। এই প্যাকেজের ভেতর ছিল স্ট্যানলি পার্ক, চায়না টাউন, গ্যাসটাউন, গ্রানভিল আইল্যান্ড ও লায়ন গেট ব্রিজ, ক্যাপিলানো ক্লিফ ওয়াক ও সাসপেনশন ব্রিজ। ট্যুর শেষে মিমি সন্ধ্যার সময়ে আমাদের সাথে ডিনার করে ওর বাসায় চলে গেল। এতদিন ধরে ছেলে আর মেয়ে আমাকে একজন সঙ্গী নেবার জন্য অব্যাহত ভাবে বলে আসছিল। আমি আস্তে আস্তে ওদের কথাটা সিরিয়াসলি ভাবতে শুরু করলাম। আমি মনে মনে ঠিক করলাম যে কাউকে আমার বাকি জীবনটার জন্য সঙ্গী করলে মিমিকেই করব। আমি আবশ্য মিমির মনের ভাব জানি না। মিমির কথাবার্তা, হাসি ঠাট্টা বা খুনশুটি, সুযোগ পেলে আমাকে জড়িয়ে ধরা ইত্যাদি দেখে আমার কাছে মনে হচ্ছিল যে ওরও আগ্রহ আছে। মিমিও অনেক দিন একা।
এবারে অস্ট্রেলিয়া আসার পরের শুক্রবার বিকেলে নঈম, স্ত্রী পপি, ছেলে রাসেল ও আমাকে নিয়ে বিকেল পাঁচটায় ওর গাড়িতে ক্যানবেরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল। সুন্দর পাকা রাস্তা, কোথাও কোন খানাখন্দ বা ভাঙ্গাচোরা নেই। সন্ধ্যার পর আমরা মাঝখানে একটা ভেড়ার ফার্মে একটা কটেজে রাত্রি যাপন করলাম। কটেজটিতে আধুনিক সমস্ত সুযাগ সুবিধাদি আছে। ইউরোপ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় বি এন্ড বি (বেড ও ব্রেকফাস্ট) সুবিধা আছে। তবে এই ফার্মে শুধু বেড দেওয়া হয়। ড্রইং রুমে একটা ছোট ফ্রিজে ড্রিঙ্কস ও স্ন্যাক্স রাখা আছে, দামও লেখা আছে। সেন্টার টেবিলে একটা নোট রাখা আছে। ওতে লেখা আছে তুমি যা খাবে তার মূল্য ও কটেজ ভাড়া যা হয়, তা টেবিলে রেখে চলে যেত পার। সকালে উঠে আমাদের বিলটা টেবিলে রেখে আমরা ফার্মটা ঘুরে দেখলাম। কয়েক শ একর জুড়ে একটা বিশাল ফার্ম। মালিকের সাথে আমাদের দেখাও হল না। সন্ধ্যা নাগাদ আমরা সিডনি থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে ক্যানবেরা পৌঁছে গেলাম। সিডনি থেকে ক্যানবেরা যাবার সময়ে পথে কোন টোল স্টেশন চোখে পড়ে নাই। পর দিন আমরা অস্ট্রেলিয়র পার্লামেন্ট, ওয়ার মোরিয়াল, সিডনি মিউজিয়াম (তখন সংস্কারের জন্য বেশির ভাগ জায়গায় বন্ধ ছিল) ও অন্যন্য দর্শনীয় স্থানসমূহও ঘুরে দেখলাম। ক্যানবেরা থেকে ঘুরে আসবার পর দুই সপ্তাহ আমরা আর সিডনির বাইরে যাই নাই। আমার সম্মানে নঈমের দুই বন্ধু দুই সপ্তাহান্তে ওদের বাসায় আমাদের রাতের ডিনারে নিমন্ত্রণ করেছিল। এর ভেতরে আমরা বাঙালি পাড়ায় বাঙালি রেস্টুরেন্টে, ইন্ডিয়ান পাড়ায় ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে, ভিয়েৎনামী পাড়ায় ভিয়েৎনামী রেস্টুরেন্টে, লেবানীজ রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেয়েছিলাম। ভিয়েৎনামী পাড়াটা আমার কাছে সবচেয়ে ভাল লেগেছিল। পাড়াটা ছিল আলোকজ্জ্বল, ঝকঝকে পরিষ্কার, সুন্দর করে সাজান, অনেকটা ব্যাঙ্ককের মত।
পরেরবার আমি ভ্যাঙ্কুভারে ভ্রমণে এলে আমরা বাইরে কোথাও যাই নাই। প্রতি সপ্তাহান্তে নঈমার বাসায় আথবা মিমির বাসায় ডিনার আর আড্ডা চলত। আমার ফিরে যাবার সময় হয়ে এলো। আমার ফিরে আসবার ঠিক আগের মঙ্গলবার মিমি আমাকে একটা ট্যুরে নিয়ে গিয়েছিল। সপ্তাহান্তে না হয়ে মঙ্গলবার কেন ট্যুর প্রোগ্রামটা করল সেটা নিয়ে আমার একটু কৌতূহল ছিল। মিমি বলেছিল যে সেই ট্যুরে শুধু মিমি আর আমি থাকব, মুরাদ বা নঈমার থাকার দরকার নেই, তাই সে মঙ্গলবার প্রোগ্রামটা করেছিল। সেটার অভিজ্ঞতা আমি জীবনেও ভুলব না। ঐ ট্যুরে যাবার আগে মিমি আমাকে একটা শর্ত দিয়েছিল। শর্তটা ছিল যে আমি এই ট্যুরের কথা কাউকে বলতে পারব না। শর্ত শুনেই আমার মনে একটা ইরোটিক ভাব এসে গিয়েছিল।
মিমি আমাকে আমাদের পূর্ব নির্ধারিত শপিং সেন্টার থেকে সকাল দশটায় উঠিয়ে নিল। মিমি ওর ঢাউস কালো নিশান কোয়ালিস এসইউভি গাড়িটি নিজেই চালিয়ে এসেছিল। আমরা কোথায় যাচ্ছি মিমি তার সামান্যতম আভাষও আমাকে দেয় নাই। প্রায় ঘণ্টাখানেক চলার পর মিমি ভ্যাঙ্কুভার শহর ছাড়িয়ে একটা বিচে এলো। বিচটা সিটি করপোরেশনের আওতার বাইরে, শহর থেকে অনেক দূরে তাই মোটামুটি নির্জন। এখানে পোষা প্রাণী আনা যায়, বার বি কিউ করে খাওয়া যায়। বিচের সাইন বোর্ডটা দেখে আমি একটু ভিরমি খেলাম। বোর্ডে লেখা আছে ‘ক্লদিং অপশনাল’। এর মানে কি জিজ্ঞাসা করলে মিমি বলেছিল বিচে গেলেই এর মানে বুঝতে পারবে। বিরাট খোলমেলা বিচ। কোথাও কোন স্থাপনা নেই। ছোটছোট ঝোপঝাড় আছে। একটু যেতেই দেখলাম যে কয়েক জোড়া যুবক যুবতী সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে রোদ পোহাচ্ছে। আবার অনেকে আমাদের মত কাপড়চোপড় পরে আছে। আবার কোন কোন মহিলা টু পিস বিকিনি পরে আর যুবকরা সুইমিং স্যুট পরে। এখন বুঝলাম ক্লদিং অপশনাল মানে কি। এটা আসলে নুড বিচ।
“মিমি তুমি এই জায়গা চিনলে কি ভাবে? এখানে আগে এসেছিলে?”
“আমি জাহিদের সাথে এই বিচে কয়েকবার এসেছিলাম।”
“মিমি, তোমরা কি…?”
“না, প্রথমবার আমরা সম্পূর্ণ না, আধা হয়েছিলাম।”
“মিমি তোমরা প্রথমবার আধা নগ্ন হয়েছিলে, আধা নগ্নটা কতদূর? আর পরের বারগুলোতে কি সম্পূর্ণভাবে নগ্ন হয়েছিলে?”
“আধা নগ্ন মানে আমার পরনে ছিল শুধু ব্রা আর প্যান্টি আর জাহিদের পরনে ছিল শুধু একটা জাঙ্গিয়া। হ্যাঁ, পরের বারগুলোতে আমরা দুজনাই আর সবার মতই সম্পূর্ণ নগ্ন ছিলাম।”
“নগ্ন হতে তোমাদের সঙ্কোচ হয় নাই? কতক্ষণ নগ্ন ছিলে?”
“নাসিম, সব জানতে দেখছি তুমি খুব আগ্রহী হয়ে উঠেছ। তুমি যখন জানতে চাইছ তখন বলছি, হ্যাঁ প্রথমবার আমাদের দুজনারই সঙ্কোচ হয়েছিল। কিন্তু দেখলাম বিচের সবাই সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে আছে কারো কোন রকমের প্রতিক্রিয়া বা ভাবান্তর নেই। ছেলে মেয়ে সবাই সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে বসে গল্প করছে বা হাত ধরাধরি করে হাঁটছে, বা সবাই মিলে বিচ ফুটবল খেলছে বা বার বি কিউ করছে। সবাই সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই করছে। নগ্নতা কারো কাছে কোন বিষয়ই না। ওদের দেখে কিছুক্ষণের ভেতরে আমদের সঙ্কোচও চলে গেল। আমরাও আর সবার মতই স্বাভাবিকভাবেই চলাফেরা করতে থাকলাম।”
“মিমি আমি কি আমার মনের ভাবটা একদম খোলাসা করে বলতে পারি?”
“নাসিম তুমি নিশ্চিন্তে বলতে পার। তুমি প্রীতির সাথে ঠিক যে ভাবে কথা বলতে সেই ভাবেই বলতে পার।”
“মিমি তুমি যখন অভয় দিলে তখন বলছি, তোমার এই বয়সেও তুমি তোমার অবয়বটা একদম যুবতীর মত করে ধরে রেখেছ। তোমার শরীরের চামড়ার টান এখনও অটুট আছে, কোথাও কোন ভাঁজ পড়ে নাই। আমি নিশ্চিত যে তোমার বুক আর নিতম্ব দেখে আর তোমাকে আধা উলঙ্গ বা সম্পূর্ণভাবে দেখে অনেকেই তোমার প্রতি আকৃষ্ট হত।”
“নাসিম তুমি যা মনে করছ আসলে ঠিক তা নয়। এখানে সবাই মনে করে যে মানুষের প্রতিটি অঙ্গ একটা স্বাভাবিক জিনিষ। আমাদের স্তন বা নিতম্ব আর তোমাদের পুরুষাঙ্গ সবই স্বাভাবিক। এখানে কারো কোন প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিৎ না, আর হয়ও না। তুমি দেখ ঐ সমস্ত সম্পূর্ণ উলঙ্গরা কারো কোন প্রতিক্রিয়া নেই। সবাই স্বাভাবিকভাবেই কথাবার্তা বলছে, চলাফেরা করছে।”
”ঠিক তাই। আমাদের দেশে এসব কল্পনাই করা যায় না। মিমি তুমি প্রথম যখন আমাকে ফোন করেছিলে, বলেছিলে ‘আমি আপনার প্রীতি বলছি’। তাই আমি আর একটু সাহস নিয়ে আমার সেই প্রীতিকে বলছি ‘তোমাকে দেখতে ইচ্ছা করছে’।
“কেন আমাকে তো অনেক দেখছ। নতুন করে দেখার কি আছে?”
“মিমি আমি জানি তুমি ঠিক বুঝতে পারছ আমি কি বলতে চাইছি।”
“নাসিম সুযোগ হলে আর সময় হলে তোমার মনের আশা হয়ত পূরণ হতে পারে।”
মিমি ওর আঙ্গুলগুলো দিয়ে আমার আঙ্গুলগুলো পেঁচিয়ে ধরল। আমিও মিমির কোমর জড়িয়ে ধরলাম। এইভাবেই আমরা বাকি সময়টা বিচে ঘুরে ফিরে দেখলাম। বিচ ভ্রমণ শেষে মিমি আমাকে নিয়ে সোজা ওর বাসায় এলো। আমার দুজনা একান্তে লাঞ্চ করলাম। আমি সাহস করে আমার মনের ভাবটা প্রকাশ করলাম।
“মিমি, একটা প্রশ্ন আমার মনকে ভীষণভাবে নাড়া দিচ্ছে। মিমি সত্যি বলোতো তুমি আমাকে ওখানে কেন নিয়ে গিয়েছিলে?”
“নাসিম, তোমাকে আমি সত্যি বলছি। উত্তরটা আমারও জানা নেই। এখন এই প্রশ্নটা আমার মনেও জাগছে। আমি ঠিক জানি না কেন আমি তোমাকে ওখানে নিয়ে গিয়েছিলাম। যাই হোক আজকের ট্যুরটা কি তুমি উপভোগ করেছ?”
“মিমি আমি আগে নুড বিচের কথা শুনেছিলাম। আর আজ আমি স্বচক্ষে দেখলাম। আমি এই ট্যুরটা সত্যিই উপভোগ করেছি। আরো উপভোগ করতে পারতাম যদি..”
“থাক আর বলতে হবে না। তোমার আর কিছু কথা থাকলে আমাকে বলতে পার।”
“মিমি আমি একা, ভীষণভাবে একা। আমি আমার এই একাকিত্বটা টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। মিমি তুমি কি আমার এই একাকিত্বটা ঘুচাবে?”
“নাসিম তোমার মত আমিও একা, আমিও ক্লান্ত। তুমি যা বলছ, ভেবে বলছ তো। নাকি এটা আমাদের আজকের নুড বিচ ভ্রমণের ফলশ্রতি, একটা শারীরিক আকর্ষণ।”
“মিমি তুমি কি একটা বিষয় খেয়াল করেছ? তুমি আমাকে স্পর্শ করবার আগে আমি তোমাকে স্পর্শ করি নাই। আমি শারীরিক আকর্ষণের কোন রকম আভাষ বা ইঙ্গিতও তোমাকে দেই নাই, তাই শারীরিক আকর্ষণের কোন প্রশ্নই আসে না। এক সময় ছিল শারীরিক সম্পর্কটাই মুখ্য বলে মনে হত। কিন্তু সময়কালে সেটা গৌণ হয়ে যায়। আর এই বয়সে শারীরিক সম্পর্কটা কোন বিষয়ই না। মিমি তুমি এইভাবে কথাটা বললে বলে আমি একটু হলেও মনোঃকষ্ট পেয়েছি। যাক আমি আমার কথাটা ফিরিয়ে নিচ্ছি। আমার সাথে তোমাকে জড়াবার কোন দরকার নেই। তবে আমার তরফ থেকে আমাদের বন্ধুত্বটা ঠিকই থাকবে। আমরা শুধুই বন্ধু থাকব।”
“নাসিম তোমাকে আমি আঘাত দিতে চাই নাই। আমি আবার বলছি তুমি ভাল করে চিন্তা করে দেখ।”
সিরিয়াস কথায় পরিবেশটা একটু ভারি হয়ে এলো। আমাদের আড্ডাটা আর বেশি জমল না। আমি একটা ট্যাক্সি নিয়ে বাসায় চলে এলাম।
আমি মিমির কথায় ভীষণভাবে দুঃখ পেয়েছিলাম। আমি আমার ফিরতি ফ্লাইট এগিয়ে এনে দেশে চলে এলাম। আমি বিমানবন্দর থেকে মিমিকে ফোন করেছিলাম।
“মিমি ঢাকায় আমাদের ব্যবসায় হঠাৎ একটা ঝামেলা হয়েছে। ছেলে সামাল দিতে পারছে না। তাই আমাকে দেশে চলে যেতে হচ্ছে।”
“নাসিম আমি আসছি। তোমার সাথে কিছু কথা আছে।”
“মিমি আমি দুঃখিত। আমি এখন বিমানবন্দরে। আমাকে এখন প্লেনে উঠতে হবে। পরে কথা হবে।”
আমার ফ্লাইট যদিও আরো দেড় ঘণ্টা বাদে, আমি মিমিকে কোন কথা বলার সুযোগ দিলাম না।
আমি ঢাকায় পৌঁছে নঈমাকে ফোন করে আমি ভালমত ঢাকায় পৌঁছেছি সেটা জানিয়ে দিয়েছিলাম। দুদিন পর মিমির ফোন পেলাম।
“আমি তোমার প্রীতি বলছি।”
“মিমি, কেন তুমি আমার দুর্বল জায়গায় আঘাত কর। আমার প্রীতি অনেক আগেই মারা গিয়েছে।”
“ইস সাহেবের দেখি নাকের আগায় রাগ। নাসিম আমাকে তুমি আমার কথাটার ব্যাখ্যা করবার সময় দিলে না। তোমার তো আরো এক মাস পর ফিরে যাবার কথা ছিল। আমি নঈমার কাছ থেকে জেনেছি যে তোমাদের ব্যবসায় সে রকম কোন সমস্যা হয় নাই। তুমি আমার কথায় দুঃখ পেয়ে চলে গেলে। আমি কানাডায় আসার পর এ পর্যন্ত দেশে যাই নাই। আমার বাবা মা দুজনেই মারা গিয়েছেন। বোনদের সাথেও যোগাযোগ নেই। তুমি তোমার বাসার কাছে একটা ভালমানের গেস্ট হাউজে বা হোটেলে আমার জন্য একটা রুম বুক করে রাখবে। আমি ঢাকায় আসার সময় ও তারিখ তোমাকে জানিয়ে দেব।”
“মিমি আমি অভিভূত। তোমার আসবার দরকার নেই। আমি শীঘ্রই আবার আসছি।”
“নাসিম তাড়াতাড়ি এসো। আমি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকব। আর একটা কথা, আমার আগের সেই কথাটা তুমি প্লিজ ভুলে যাও। তুমি আমাকে তোমার জীবনে জড়াতে না করেছিলে। আমি মনেপ্রাণে তোমার জীবনে জড়াতে চাই। আমাকে সুযোগ দাও। প্লিজ।”
“মিমি আমাদের ভেতর সে রকমের কোন কথাই হয় নাই, তাই ভুলে যাবার কোন প্রশ্নই আসে না। মিমি তোমাকে অপেক্ষায় রাখতে আমার ভাল লাগছে না। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমার কাছে আসছি।”
“নাসিম তুমি বলেছ যে আমার কাছে আসছ। তাই যেন হয়। নঈমাকে জানাবার দরকার নেই। তুমি আমার এখানে উঠবে।”
“মিমি তোমার ওখানে উঠবার মানে বুঝতে পারছ? আমি অনেক বছর যাবৎ নারীসঙ্গ বিবর্জিত। আমি হয়ত, আবার বলছি হয়ত কোন এক দুর্বল মুহূর্তে তোমার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করতে চাইব। সেটা কি ঠিক হবে?”
“নাসিম, তুমি এত বছর যাবৎ নিজেকে সংযত রাখতে পেরেছ, তাই আমার বিশ্বাস তুমি সংযত থাকবে। আর এইসব দেশে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারী পরস্পরের সম্মতিক্রমে একত্রে থাকলে সেটা সামাজিকভাবে বা আইনগতভাবে কোন দোষের নয়। আর যদি বা হয় তবে সেটা হবে আমি তোমাকে যে দুঃখ দিয়েছিলাম তার ক্ষতিপূরণ।”
“মিমি আমার পক্ষে নঈমাকে না জানিয়ে আসা সম্ভব না। আমি আসব আর নঈমার ওখানেই উঠব। আর তুমি তো আমাকে কোন দুঃখ দাও নাই তাই ক্ষতিপূরণের কোন প্রশ্নই আসে না। আমি পাঁচ ছয় মাস গ্যাপ দিয়ে আসছি। এর ভেতরে আমাদের কথা হবে।”
আমি চার মাসের মাথায় আবার ভ্যাঙ্কুভারে আসলাম। এত তাড়তাড়ি আমাকে আবার আসতে দেখে নঈমা একটু অবাক হয়েছিল আর একটা সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে খুশিও হয়েছিল। নঈমা ওর ভাইয়ের সাথে কথা বললো। আমার এত তাড়াতাড়ি আবার কানাডায় আসবার কারণ সম্বন্ধে নঈম একদম নিশ্চিন্ত। খুশি হয়ে বোনকে বললো যে সম্ভব হলে এবারেই যেন আমার আর মিমির বিয়ে ঠিক করে ফেলে। বিয়েতে নঈম সপরিবারে উপস্থিত থাকবে। নঈমা এক সপ্তাহান্তে মিমিকে ডিনারে দাওয়াত দিল। ওখানকার রেওয়াজ অনুযায়ী সন্ধ্যার সাথে সাথে আমরা ডিনার করলাম। ডিনারের পর আড্ডাতে নঈমাই কথাটা ওঠাল।
“আব্বু আর আন্টি আমরা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক। এই কয়েক মাসে তোমাদের দুজনার ভেতরে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, পরস্পরকে পছন্দ কর সেটা আমি আর মুরাদ ভালভাবেই টের পেয়েছি এবং খুশিও হয়েছি। তোমরা দুজনাই একা, একাকিত্বে ভুগছ। আমরা বলি যে তোমরা দুজনে বিয়ে কর, তোমাদের একাকিত্বটা দূর হবে। তোমরা দুজনে পরস্পরের আনন্দ, বেদনা, সুখ দুঃখ, মনের কথা সব শেয়ার করতে পারবে। প্রয়োজনে একজন আর একজনের পাশে দাঁড়াতে পারবে। এই বিষয়ে ভাইয়ার সাথে কথা হয়েছে। বিয়েতে ভাইয়াও আসবে।”
“মা নঈমা, আমি মিমির সাথে আলোচনা করে তোমাদের পরে জানাব।”
“পরে আবার কেন। উত্তরটা আমরা যা আশা করছি, আশা করি তাই হবে। আমরা ওদিকে যাচ্ছি। তোমরা আলাপ কর। আমরা আধা ঘণ্টা পর আসছি।”
নঈমা আর মুরাদ ওদের বেডরুমে গেলে আমি মিমিকে বললাম,
“মিমি তুমি কি বল?”
“নাসিম আমার মত কি সেটা তো তোমার অজানা নয়। আমরা রাজি ওদের জানিয়ে দাও।”
“দাঁড়াও মিমি এত তাড়াতাড়ি নয়। আগে আমরা পরস্পরকে আরো ভাল করে জেনে নেই তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। মিমি তুমি আমাকে কতটুকু জান?”
“কেন আমি তো জানি যে তুমি একজন আদর্শ স্বামী ছিলে, একজন আদর্শ পিতা আর সর্বোপরি তুমি একজন ভাল লোক। তোমার স্ত্রী প্রীতি মারা যাবার পর তুমি ছেলে মেয়েদের সৎ মায়ের হাতে তুলে দেবে না বলে, নিজের সব সাধ, আহ্লাদ, কামনা বাসনা সব বিসর্জন দিয়ে আর বিয়েই করলে না। যে স্ত্রী আর ছেলে মেয়েকে এত ভালবাসে তার সম্বন্ধে আমার আর কিছু না জানলেও চলবে। হয়ত আগে তুমি একজন সন্ত্রাসী ছিলে, এজন দুশ্চরিত্রের লোক ছিলে, একজন লম্পট ছিলে, একজন মদ্যপ ছিলে ওগুলো এখন আর ধর্ত্যব্যের বিষয় নয়। হয়ত বিয়ের আগে আমারও একটা কলঙ্কময় জীবন ছিল। এগুলো কি এখন আমাদের বিবেচ্য বিষয়? আমরা যখন থেকে পরস্পরকে জানি, আমি ঠিক ততটুকু সময়ের মূল্যায়ন করব। আমার কোন সংশয় নেই। নাসিম তুমি যদি আগে আমার অতীত জীবন জেনে সিদ্ধান্ত নিতে চাও, তোমার যদি সংশয় থাকে তবে ভিন্ন কথা। আমি অকপটে আমার অতীত তোমাকে জানাব।”
“মিমি তুমি আমাকে সত্যি সত্যি লজ্জা দিলে। আমারও এখন আর কোন সংশয় নেই। তবে আমার একটা বিষয় জানবার খুব আগ্রহ আছে। এটা অবশ্যই আমার এই সিদ্ধান্তে কোন প্রভাব ফেলবে না। মিমি তোমার ছেলে মেয়ে সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না। জানতে ইচ্ছা করছে। অবশ্য তুমি জানাতে না চাইলে, জানাবার দরকার নেই।”
“নাসিম এটা খুবই স্বাভাবিক প্রশ্ন। আমাদের একটা ছেলে আছে। ওর জন্ম এই দেশেই। ও মনে প্রাণে স্বভাবে সবদিক দিয়েই কানাডিয়ান। এদেশের ছেলে মেয়েদের মত সেও বিশ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে যায়। ও পাল্প এন্ড পেপার টেকনলজিতে ডিপ্লোমা করে, কানাডার সব চাইতে বড় কাগজের কোম্পানি ‘এবিটিবি মিশন’-এ যোগ দিয়ে কানাডা এবং কানাডার বাইরে ওদের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিতে চাকরি করছে। ও ঠিক এই মুহূর্তে কোথায় আছে জানি না। ও আমার সাথে কোন যোগাযোগ রাখে না। মা বেঁচে আছে না মরে গেছে মনে হয় তাতে তার কিছুই আসে যায় না।”
“মিমি আমি দুঃখিত। ছেলে মেয়ের দিক থেকে আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান। এসো আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত ওদের জানিয়ে দেই।”
দুই সপ্তাহ পর, দুই সপ্তাহের ছুটি নিয়ে নঈম সপরিবারে অস্ট্রেলিয়া থেকে এলে আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের পর আমরা একটা হোটেলে যেয়ে লাঞ্চ করলাম। লাঞ্চ টেবিলে নঈম বললো,
“আমি আর নঈমা দুজনেই প্রবাসী। আমাদের ছোট ভাই জানি না কি কারণে আব্বুকে ছেড়ে আলাদা থাকছে। আমি আর নঈমা দুজনেই আব্বুকে আমাদের সাথে থাকতে বলেছিলাম। কিন্তু আব্বু কিছুতেই দেশ ছেড়ে আসবেন না। আব্বুর বয়স হয়েছে, একা থাকছেন। বুড়ো বয়সে একা থাকার যন্ত্রণা আমরা বুঝতে না পারলেও অনুধাবন করতে পারছিলাম। তাই আমরা মনে প্রাণে আব্বুর জন্য একজন উপযুক্ত সঙ্গিনী, যিনি নিজেও একাকিত্বে ভুগছেন, সেই রকম একজনকে খুঁজছিলাম। আমি অস্ট্রেলিয়ায় চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কৃতকার্য হতে পারি নাই। নঈমা এখানে সাফল্য লাভ করেছে। আমরা একাকিত্বে ভোগা দুজনকে একত্র করতে পেরে খুব আনন্দিত। আব্বার স্ত্রীকে ‘আম্মা’ বা ‘মা’ বলে, কিন্তু আমি বা নঈমা কেউই আমাদের মায়ের জায়গায় আর একজনকে বসাতে পারব না। তাই আমরা আপনাকে ‘মা’ বা ‘আম্মু’ ডাকতে পারব না, আমরা আপনাকে আন্টিই বলব। আন্টি আপনাকে আমাদের মায়ের জায়গায় বসাতে না পারলেও আমরা খুশি মনে আপনাকে ঠিক আমাদের মায়ের পাশে রাখব। অবশ্য আব্বুর আর আপনার আপত্তি থাকলে আমরা আম্মুই বলব।”
আব্বু মিমিকে কিছু বলার জন্য আনুরোধ করলেন।
“নঈম আর নঈমা, তোমরা দুজন আমাকে মেনে নিয়েছ, তাতেই আমি খুশি। আমি জানি তোমাদের প্রয়াত মা প্রীতি তোমাদের আব্বুর মনে কতখানি জায়গা দখল করে ছিলেন আর এখনও আছেন। আমি জানি আমি কোনদিনই উনার জায়গায় আসতে পারব না। তোমাদের কথামত আমি উনার পাশে থাকতে পারব তাতেই আমি খুশি। তোমরা ঠিকই বলেছ, তোমাদের আব্বুর মত আমিও একাকিত্বে ভুগছিলাম। আমাদের মিলিয়ে দেবার জন্য তোমাদের ধন্যবাদ। তোমরা আমাকে আন্টি বললে আমাদের কোন আপত্তি নেই, তোমরা যে ভাবে সন্তুষ্ট থাকো সেইভাবেই হবে।”
লাঞ্চ শেষে দুই ভাই বোন আর মুরাদ মিলে আমাকে মিমির ফ্ল্যাটে উঠিয়ে দিল। নাদিম আসতে পারে নাই, খুশি হয়ে আমাকে আর মিমিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিল। তবে নাফিসা ‘বুড়ো বয়সে ভীমরতি’ বলে একটু বাঁকা মন্তব্য করেছিল বলে শুনতে পেরেছিলাম।
আমরা সাজেকে এক সপ্তাহের প্রোগ্রাম করে এসেছিলাম। আমরা ধীরে ধীরে পাঁচ দিন লাগিয়ে আমাদের জীবনী শুনলাম। আমাদের ফিরে যাবার সময়ে মিমি বেঁকে বসল। এত সুন্দর জায়গা ছেড়ে, আবার ঢাকার সেই হৈচৈ হট্টগোল, ব্যস্ততা আর দুষিত পরিবেশের মধ্যে এত তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে তার মন চাইছে না। সাজেকের অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য, নান্দনিক ও দূষণমুক্ত পরিবেশ, ভেজালমুক্ত খাবার তাঁকে কানাডার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল। আমরা আরো এক সপ্তাহ সাজেকে থেকে গিয়েছিলাম। সাজেকে নিয়ে আসবার জন্য মিমি আমাকে বারেবারে ধন্যবাদ জানাচ্ছিল।
আমরা প্রায় চার মাস হল সাজেক থেকে ঢাকায় ফিরে এসেছি। প্রতিদিনের মত আমরা ধীরে সুস্থে সকালের নাস্তা করে টিভি দেখছিলাম আর গল্প করছিলাম। সিকিউরিটি থেকে ফোনে আমাকে জানাল যে আশরাফ আর মাসুম বলে দুজন এসেছে, আমাদের সাথে দেখা করতে চায়। মিমিকে বললাম,
“আশরাফকে তো চিনলাম কিন্তু মাসুমটা আবার কে?”
“আশরাফের সাথে যখন এসেছে, তখন নিশ্চয়ই তোমার পরিচিত কেউ হবে। ওদের উপরে আসতে বলে দাও।”
“আশরাফ তুমি এখন কি করছ? কারো গাড়ি চালাচ্ছ নাকি? তোমার বৌ বাচ্চা ভাল আছে? তোমার ছেলে এখন কি পড়ছে?”
“স্যার, আমি বেশ কষ্ট করে, ধার দেনা করে একটা পুরতন গাড়ি কিনেছিলাম। ওটা আমি উবারে চালিয়ে আস্তে আস্তে করে আর একটা পুরাতন গাড়ি কিনেছি। আগের গাড়িটা আমি নিজে চালাই আর অন্য গাড়িটা এক ড্রাইভার আমার কাছ থেকে চুক্তিভিত্তিক ভাড়া নিয়ে উবারে চালাচ্ছে। স্যার দুটা গাড়ির আয় দিয়ে আমার প্রাচুর্য না থাকলেও ভাল ভাবেই চলছে। স্যার আমার ছেলেটা এখন মোহাম্মাদপুরের সেন্ট জোসেফ স্কুলে ইংলিশ মিডিয়ামে ক্লাস এইটে পড়ছে। স্যার, গাড়ি কেনার আগে খালাম্মাকে উনার টাকার কথা বলেছিলাম। উনি বলেছিলেন যে ‘তুমি আগে স্বাবলম্বী হও, তার পর টাকা শোধ করো’। স্যার, আমি এবং আমার পরিবার উনার কাছে ঋণী হয়ে আছি।”
“আশরাফ, তুমিই তো বলেছিলে যে উনি হয়ত এই টাকাটা ফেরৎ নেবার জন্য তোমাকে দেন নাই। তাই আমি উনার হয়ে তোমাকে ঋণমুক্ত করে দিলাম। তুমি ঐ টাকা নিয়ে কোন চিন্তা করো না। আর বাবা মাসুম তোমাকে তো চিনলাম না। তুমি কি তোমাদের খালাম্মার কাছে ঋণী? তুমি কি ভাবে খবর পেলে?”
“স্যার আমি উনার কাছে আকন্ঠ ঋণী। আমাকে আপনার মনে না থাকারই কথা। অনেক দিন আগের কথা, আমি তখন বোধ হয় বারো কি চোদ্দ বছরের হব। আপনাদের বাসার কাজের জন্য এসেছিলাম। আমি ছিলাম খুব চটপটে আর স্মার্ট। টুকটাক টেকনিকাল কাজ খুব ভালভাবে ধরতে পারতাম আর করতেও পারতাম। আমি ক্লাস টু পর্যন্ত পড়েছিলাম। খালাম্মা আমাকে এক মিশনারিদের স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। ওখান থেকে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করেছিলাম। ইউসেপের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উনার পরিচিত ছিলেন তাঁকে ধরে উনি আমাকে মিরপুর টেকনিকাল ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। ওখানকার প্রশিক্ষণ শেষে আমি তেজগাও, বিটাকে ছয় সপ্তাহের মধ্য মেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের আওতায় প্লাস্টিক টেকনোলজির উপর প্রশিক্ষণ নেই। আমি এখন খুব ব্যস্ত একজন প্লাস্টিক মোল্ডিং মেশিন মেরামতের দক্ষ কারিগর। আমার কাজের অভাব নেই। স্যার আমাকে সারা দিনই বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। কাজের সুবিধার্থে আমি একটা ১৬০ সিসির হোন্ডা এক্স-ব্লেড মটারসাইকেল কিনেছি। স্যার খালাম্মা আমাকে ধরে বেন্ধে পড়াশোনা ও টেকনিকাল কাজ না শেখালে আমি আজ হয়ত দিন মজুরি করে খেতাম।”
“দেখ তোমাদের খালাম্মা কতজনের যে কত রকমের উপকার করেছিলেন তা আমি জানিও না। তোমরা না জানালে আমি তো কোন দিনই জানতে পারতাম না। মাসুম, আশরাফের সাথে তোমার যোগাযোগ হল কি ভাবে?”
“স্যার সেটা একটা মজার ঘটনা। আমি একবার বেশ তাড়াহুড়ার ভেতরে বাইক চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ভিড়ের ভেতরে একটা গাড়ি আমার বাইকে আস্তে করে ধাক্কা লাগায়। আমি রেগে গিয়ে আমার বাইকটা গাড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে গাড়িটাকে আটকালাম। পরে আমি জেনেছিলাম যে গাড়িটা একটা বাচ্চাকে বাঁচাতে যেয়ে আমার বাইকে ধাক্কা লাগিয়েছিল। ড্রাইভরকে বকাবকি করবার জন্য গাড়ির দরজা খুলতেই আশরাফ ভাইয়ের দেখা পাই। উনি আমাকে খালাম্মার খবরটা দিলেন। আমি আপনার ঠিকানা জানতাম না, তাই অশরাফ ভাই-য়ের সাথে আমি আপনার কাছে এলাম। স্যার উনাকে কোথায় কবর দিয়েছেন। আমি একবার হলেও উনার কবরটা জিয়ারত করতে চাই।”
“উনাকে বনানিতে উনার মায়ের কবরের উপর কবর দিয়েছি। বনানিতে রবিউল বলে একটা ছেলে আছে কবরটা দেখাশোনা করে, যত্ন করে। রবিউলকে প্রীতির কবর বললেই দেখিয়ে দেবে।”
মিমি ওদের চা নাস্তা খাইয়ে বিদায় দিল। ওরা চলে গেলে মিমি ধরা গলায় বললো,
“প্রীতি একজন মহিয়সী মহিলা ছিলেন। আমি কেন কেউই উনার জায়গা নিতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। আল্লাহ উনার বেহেস্ত নাসিব করুন। এই দুনিয়াতে ভাল লোকেরা বেশিদিন বাঁচে না।”
লেখক ~ ‘শিহোম’