আমি নাসিম আহমেদ’

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর 20, 2026
40 জন পড়ছেন

দুইপক্ষের মুরুব্বীগণ মিলে বসে বিয়ের তারিখ, হলুদের তারিখ ঠিক করলেন। কোন এক মুরুব্বি চলতি রেওয়াজ অনুযায়ী দুই পক্ষের হলুদ অনুষ্ঠান একটু বড় আঙ্গিকে একসাথে করার একটা প্রস্তাব করেছিলেন। তবে দুই পক্ষে মহিলাদের আপত্তিতে সেই প্রস্তাব আর গ্রহণ করা হল না। হলুদ অনুষ্ঠান যার যার বাসায় বা নির্ধারিত জায়গায় হবে। প্রীতিদের বাসাটা বেশ বড়সড় আর সামনে কিছুটা খোলা জায়াগা আছে, তাই ওদের তরফ থেকে জানিয়ে দেওয়া হল যে প্রীতির গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান ওদের বাসাতেই হবে। তবে বিয়ের অনুষ্ঠান কোথায় হবে তা ঠিক করে পরে জানিয়ে দেবেন। আমাদের কোন অনুষ্ঠান কোথায় হবে তা আমরা তৎক্ষণাৎ জানাতে পারি নাই। আরো আলোচনার পর কোন রকম উসুল ছাড়াই বিশ লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য হল। পাত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়া হবে। কোন কারণে ছাড়াছাড়ি হলে খোরপোশ হিসাবে মাসিক পঁচিশ হাজার টাকা দিতে হবে। গেট মানিটা দুই পক্ষের ভাই বোন আর কাজিনরা মিলে ঠিক করবে। আমার মা আর প্রীতির মা খালারা বসে ঠিক করবেন কাকে কাকে শাড়ি আর কাপড় দিতে হবে। মাকে আমি আগেই জানিয়ে রেখেছিলাম যে যেহেতু জীবনে একবারই শেরওয়ানি পরা হবে, তাই শেরওয়ানিটা বাদ দিয়ে স্যুট পরে বিয়ে হবে। আমার দাবিটা সম্পূর্ণভাবে নাকচ হয়ে গেল। প্রীতির বাবা বললেন যে উনি শেরওয়ানি আর স্যুট দুটাই দেবেন। আলোচনা শেষে আমাদের আপ্যায়ন করা হল। প্রীতির বাবা ইকবাল ক্যাটারারকে দিয়ে খানা আনিয়েছিলেন। প্লেন পোলাও, খাসির রেজালা, বিরাট বিরাট চিংড়ির দোপেঁয়াজা, জালি কাবাব আর শব্জি দিয়ে খানাটা অপূর্ব হয়েছিল।

বিয়ের আগ পর্যন্ত রাতে আমরা অনেকক্ষণ ধরে ফোনে কথা বলতাম। এক সময়ে আমি নাসিমার কাছে ধরা পড়ে গেলাম। নাসিমাও আগ্রহ নিয়ে প্রীতির সাথে কথা বলত। প্রথমবারেই নাসিমা প্রীতিকে ভাবী বলে সম্বোধন করা শুরু করেছিল। প্রীতি অবশ্য একটু লোক দেখান আপত্তি করেছিল। 

“ভাবী, আমি কিন্তু তোমাকে ভাবী বলতে পারব না। আমি তোমাকে প্রীতি বলেই ডাকব আর ‘আপনি’ ‘আপনি’ করে কথা বলতে পারব না । আমি ‘তুমি’ করেই বলব।”

“নাসিমা, তুমি আমাকে এখনই ভাবী বলছ কেন? যখন হব তখন বলো। ওহো তুমি তো আর আমাকে ভাবী বলবে না প্রীতিই বলবে। তাতে আমার আপত্তি নেই। তা আমার ননদ কি রায়বাঘিনী? তার কথামত চলতে হবে? আর ননদকে কিন্তু আমি ‘তুমি’ করে বলব না, একেবার ‘তুই’ করেই বলব।

“প্রীতি তুমি আগে বাসায় এসো। তারপর দেখা যাকে কে কার কথায় চলে। আর তুমি আমাকে ‘তুই’ করে বললে আমারও কোন আপত্তি থাকবে না। আর ভাবীরা ননদকে তুই করে বললে সম্পর্কটা খুব মধুর হয়। নাও এখন তোমার ভাবী জামাইয়ের সাথে প্রেম কর। দেখ আবার বেশি রাত করো না।”

আমাদের কথাবার্তার কোন মাথামুণ্ডু ঠিক ছিল না। প্রীতিই বেশি কথা বলত। আমি কখন ঘুমাতে গেলাম, সকালে কখন উঠলাম, কি নাস্তা খেলাম এই সব নানান বিষয়ে তার জানার শেষ ছিল না। তার বেশি আগ্রহ ছিল আমি কটা মেয়ের কাছে শাড়ি বিক্রি করলাম, কটা মেয়ের ফোন নম্বর নিয়েছিলাম, কজনাকে আমার ফোন নম্বর দিয়েছিলাম ইত্যাদিতে। দূর থেকে আমার উপর প্রীতির এই খবরদারি আমি খুব উপভোগ করতাম। তবে আমি কোন সময়েই প্রীতিকে আমার বৌ হিসাবে, ভালবাসার একটি মেয়ে হিসাবে দেখি নাই। বিকৃত মনের অধিকারী আমি সব সময়েই উদ্দাম যৌবনের প্রীতিকে একটা ভোগের বস্তু হিসাবে লালসার দৃষ্টিতে দেখতাম। একটা মেয়েকে ভালবাসা যায় বা ভালবাসা কি জিনিষ তা আমি এ পর্যন্ত বুঝতে পারি নাই। প্রীতি যে আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে আমি তা বুঝতে পারতাম। বুঝতে পারতাম যে বোধ হয় আমাকে একটু খ্যাপাবার জন্য ও আজ কটা ছেলের সাথে চা খেয়েছে, কটা ছেলে ওকে প্রোপোজ করেছে, কোন নতুন ছেলে সাথে বন্ধুত্ব হল এই সব জানাত।

আমাদের বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে গেল। আমি সর্বকালীনের জন্য, আমার নিজস্ব একটা ভোগের বস্তু পেয়ে যাব এই চিন্তাতেই আমি বিভোর ছিলাম। আমি দিন গুনতে থাকছিলাম। ওদিকে প্রীতিও একটা অপরিচিত বা স্বল্পপরিচিত ছেলের সাথে তার জীবন কাটাবে বলে নিজেকে প্রস্তুত করছিল। বাসর রাত ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের জন্যই একটা বিশেষ আগ্রহের রাত। ছেলেরা একটা নরম তুলতুলে শরীরের বৌ পাবে এই চিন্তাতেই বিভোর থাকে। আর ওদিকে জীবনে প্রথমবারের মত একটা পরিচিত বা স্বল্প পরিচিত বা একবারে অপরিচিত ছেলের সাথে সবার সামনে, সবার উৎসাহে ঘরের দরজা বন্ধ করে রাত কাটাবে এই চিন্তায় মোহাচ্ছন্ন থাকে। তার উপরে থাকে একটা অজানা আশঙ্কা, প্রথম রাতেই বর কি রকম ব্যবহার করবে। সব মেয়েদেরই মনে মনে বোধ হয় কুমারীত্ব হারাবার একটা ভয় মিশ্রিত আকাঙ্ক্ষা আর আশঙ্কা থাকে। প্রীতি ওর বান্ধবীর কাছ থেকে বাসর রাতের একটা ধরণা পেয়েছিল। তাই সে নিজেকে মোটামুটিভাবে প্রস্তুত করে রেখেছিল। আমিও প্রস্তুত ছিলাম।   

যথারীতি সমস্ত রকমের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে প্রীতি আর আমার বিয়ে হয়ে গেল। আমি তখন মাত্র বাইশ বছরের এক যুবক আর প্রীতি ছিল মাত্র একুশ বছরের এক যুবতী। আমরা এক সপ্তাহের হানিমুনে নেপাল ও ভুটান ঘুরে এলাম। 

আমি প্রথম রাতেই বিড়াল মেরেছিলাম। আমি প্রীতিকে একটা ভোগের বস্তু ছাড়া আর কিছুই মনে করি নাই। লম্পট আমি প্রথম থেকেই প্রীতিকে যথেচ্ছভাবে ভোগ করে আসছিলাম। আমি প্রতিদিনই ওকে ভোগ করবার জন্য চালাকি করে ওর সাথে একটা বোঝাপড়া করে নিয়েছিলাম যে আমরা কোন অবস্থাতেই আমাদের বিছানা আলাদা করব না। আমি কোনদিনই ওকে আমার বৌয়ের মর্যাদা দেই নাই। আমার মনে প্রীতির প্রতি কোন রকমের ভালবাসা বা ভাললাগার জন্ম হয় নাই। আমার প্রতি প্রীতির প্রথম থেকেই একটু করে দুর্বলতার জন্ম হয়েছিল। বিয়ের পরপরই প্রীতির এক রাতেই আমার প্রতি অর্থাৎ তার স্বামীর প্রতি ভালবাসার জন্ম হয়ে গিয়েছিল। প্রথম দুই সপ্তাহ ঘোরের ভেতর কেটে গেল বলে প্রীতি কিছুই বুঝতে পারে নাই। প্রীতি সুযোগ পেলেই আমাকে জড়িয়ে ধরত, চুমু খেত, গায়ে গা লাগিয়ে ঘন হয়ে বসত। আমি কাজে বের হবার সময়ে প্রীতি দরজা পর্যন্ত এসে মিষ্টি করে হেসে আমাকে বিদায় জানাত। যাবার আগে আমি আমার মোবাইল নিয়েছি কিনা বা আমার ওয়ালেট নিয়েছি কিনা সব জিজ্ঞাসা করত। আমি প্রতিদিনই সদ্য ধোয়া এবং ইস্ত্রী করা শার্ট আর প্যান্ট বিছানায় যত্ন করে রাখা পেতাম। অমানুষ আমি প্রীতির এই ভালবাসা কিছুই বুঝতাম না। এগুলো আমার এক রকম পাওনা বলে ধরে নিয়েছিলাম। প্রতিদিন আমি রেস্টুরেন্টে দুপুরের লাঞ্চ করতাম শুনে প্রীতি একদিন দোকানে যেয়ে তিন বাটির একটা হট টিফিন কেরিয়ার কিনে আনল। পরদিন থেকে বাসা থেকে বের হবার সময়ে হাতে টিফিন কেরিয়ারটা ধরিয়ে দিত। এতেও আমার কোন রকম ভাবান্তর হল না।  

একদিন রাতে বিছানায় আমাদের দুজনার ভেতরে খুনশুটি হচ্ছিল। প্রীতি হেসে বলেছিল,

“তুমি একটা আস্ত শয়তান। তুমি তো প্রথম রাতেই আমাকে খেয়েছিলে।”

“হ্যাঁ, খেয়েছিলাম। আর আমার মনে হয় তুমিও সেই জন্য প্রস্তুত ছিলে আর সেটা উপভোগও করেছিলে। আমি প্রথম রাতেই বিড়াল মেরেছিলাম।”

“তুমি ঠিকই বলেছ। আমি কেন, বোধ হয় সব মেয়েরাই বাসর রাতে এই রকম কিছু একটার আশঙ্কা করে আর আশাও করে। আবার এটাও সত্য যে অনেক মেয়ে প্রথম রাতেই ধর্ষিতা হয়। আমি আমার এক বিবাহিতা বান্ধবীর কাছ থেকে বাসর রাত সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়েছিলাম। তাই আমি একটা ভয় মিশ্রিত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তোমার আক্রমণের আশায় ছিলাম। স্বীকার করতে আমার আর লজ্জা নেই, হ্যাঁ, আমি সেটা উপভোগ করেছিলাম। এরপর থেকে আমি প্রতি রাতেই সেটা আশা করতাম আর তুমিও আমাকে নিরাশ কর নাই। 

কোন রকম সতর্কতা ছাড়াই প্রীতিকে যথেচ্ছভাবে ভোগ করবার ফলে প্রথম বছরেই প্রীতি গর্ভবতী হয়ে পড়ে। প্রীতি, আমার বাবা, মা প্রীতির বাবা মা সবাই খুশি। শুধু আমিই খুশি হতে পারলাম না, তবে সবার সামনে আমি নিজেকে খুব খুশি বলে জাহির করতাম। আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিতান্ত ভাল স্বামী হিসাবে প্রীতিকে সময়মত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতাম। আমরা ডাক্তারের পরামর্শ মতেই চলতাম। যথা সময়ে প্রীতি একটা ফুটফুটে ছেলে সন্তানের জন্ম দিল। আমি যতই অমানুষ হই না কেন, নিজের ছেলে, নিজের রক্তকে আমি কোনভাইে উপেক্ষা করতে পারলাম না। আমি আমার ছেলের প্রতি খুবই আকৃষ্ট হয়ে পড়লাম। প্রীতি আমার ছেলেকে যেভাবে যত্ন, আদর, স্নেহ করছিল আমি অভিভূত হয়ে ওর মা প্রীতির প্রতি একটু হলেও দুর্বল হয়ে পড়লাম। পৃথিবীতে মানুষ বা প্রাণী যাই হোক না কেন, সব মা’ই তার নাড়িছেড়া বাচ্চার প্রতি সব সময়েই অতিরিক্ত সংরক্ষণোক্ষমুখ হয়। সহজাত ও সর্বজনীন প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী প্রীতি তার বাচ্চাকে আদর, যত্ন ও স্নেহ করত। আমি এতই গাধা ছিলাম যে আমি বাচ্চার প্রতি প্রীতির আচরণ সহজাত বা স্বাভাবিক মনে না করে মনে করতাম যে প্রীতি এগুলো মায়ের কর্তব্য বলেই করছে। আমার প্রতি ভালবাসার জন্য প্রীতি আমার নামের সাথে মিলিয়ে আমাদের ছেলের নাম রেখেছিল ‘নঈম’। 

এর পরের আমার জীবনের দুটা ঘটনা প্রীতির প্রতি আমার মনোভাবটা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। 

নঈমের জন্মের পররপই প্রীতিকে নিয়ে আমি দুদিনের জন্য ওদের বাড়ি গিয়েছিলাম। প্রথম দিন জামাই আদরে খুব ভালই কাটল। ঘটনাটা ঘটলো দ্বিতীয় দিনে। দুপুরে আমি গোছল করতে যেয়ে বাথরুমের ভেজা ফ্লোরে পা পিছলে পড়ে গেলাম। আমি বাথরুমের ওয়ালের পানির ট্যাপে মাথায় আঘাত পেলাম, ডান হাতে আর ডান পায়ের পাতায় আঘাত পেলাম। অসহ্য ব্যথায় আমি কাতরাতে থাকলাম। শ্বশুর শাশুড়ি রীতিমত নিজেদের অপরাধী ভাবতে শুরু করলেন। উদ্বিগ্ন প্রীতিকে দেখে মনে হল যে আমি যত না ব্যথা পেয়েছি তার চেয়ে বেশি ব্যথা পেয়েছে সে। তাড়াতাড়ি এ্যাম্বুলেন্স ডেকে আমাকে এ্যাপোলো হাসপাতালে নেওয়া হল। আব্বু আর আম্মুকে খবর দিলে উনারা দুজনেই হাসপাতালে চলে আসলেন। আমার মা হাসতে হাসতে তার বান্ধবীকে বললেন, 

“কিরে জামাইকে মেরে ঠ্যাং ভেঙ্গে দিয়েছিস নাকি।” 

আমার শাশুড়ি রীতিমত বিব্রত বোধ করে আমতা আমতা করে বলতে চেষ্টা করলেন,

“আরে আমি তো কিছুই করি নাই। নাসিমই তো গোসলে গিয়ে পিছলে পড়ে গিয়েছিল। এখন বাথরুম ভেজা আর পিচ্ছিল থাকার কারণে আমাকে দোষ দিতে পারিস। আমি সেই জন্য খুবই লজ্জিত ও দুঃখিত।”

আম্মু আমার শাশুড়িকে অর্থৎ উনার বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে বললেন,

“আরে দোস্ত, আমার বিয়াইন আমি কি তোর সাথে একটু ঠাট্টাও করতে পারব না। আমি জানি তোদের কোন দোষ নেই। নাসিম আমাকে সব বলেছে। আর তোর মত প্রীতিও দেখি খুব অস্বস্তিতে আছে, লজ্জিত হয়ে আছে। আমি বুঝতে পারছি না তোরা কেন এত উদ্বিগ্ন হচ্ছিস। এটা তো নিছক একটা দুর্ঘটনা, প্রীতিও তো আমার বাসায়ও এই দুর্ঘটনার শিকার হতে পারত।”   

ইমার্জেন্সি ডাক্তার এসে আমাকে দেখলেন। আপাত দৃষ্টিতে মাথার আঘাতটা সামান্যই মনে হচ্ছিল। ডাক্তার সাহেব নিশ্চিন্ত হবার জন্য আমার মাথার সিটিস্ক্যান করালেন। স্ক্যান করে জানা গেল যে মাথার অভ্যন্তরে কোন ক্ষতি হয় নাই। হাতের আর পায়ের এক্সরে করান হল। আমি আমার ডান হাতে দিয়ে আমার পড়ে যাওয়া ঠেকাতে চেষ্টা করেছিলাম। আমার ডান হাতে প্রচণ্ড ঝাঁকি লাগার ফলে আমার কাঁধের বলটা জায়গা থেকে সামান্য সরে গিয়েছিল। ওটা টেনে ঠিক জায়গামত বসিয়ে প্লাস্টার করে একটা স্লিং দিয়ে হাতটা আমার ঘাড়ে ঝুলিয়ে দেয়া হল। পায়ের পাতার এক্সরে করে দেখা গেল যে আমার পায়ের পাতার তিনটা মোটাটারসেল হাড় ভেঙ্গে গিয়েছে। ডাক্তার সাহেবের মতে আমার চিকিৎসা দুই ভাবে হতে পারে। প্রথমত অস্ত্রোপচারের মাধ্যম চিকিৎসা করলে, দুই মাসের ভেতরে আমার ভাঙ্গা হাড় জোড়া লেগে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চিকিৎসায় আমার বারো থেকে আঠেরো মাস সময় লাগতে পারে। আমাকে সর্বোচ্চ ছয় মাস ক্রাচে ভর দিয়ে চলতে হবে। তবে কোন অবস্থাতেই আমার পায়ের কার্যকারিতা বা দক্ষতা পুরা ফিরে পাব না। দশ থেকে বিশ শতাংশ কমে যাবে। আমি কোন অবস্থাতেই বারো মাস অচল থাকতে রাজি না, তাই আমার পায়ের চিকিৎসা হল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।  

চিকিৎসা শেষে আমি হাতে প্লাস্টার, পায়ে প্লাস্টার নিয়ে বাসায় আসলাম। প্রথমে আমি চামিচ দিয়ে বাঁ হাতে খেতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সুবিধা করতে পারছিলাম না। এরপর থেকে প্রীতি আমাকে খাইয়ে দিত। বৌ-এর হাতে খেতে পেরে আমিও ভীষণ আনন্দিত হতাম। মাঝে মাঝে ভালবেসে আলতো করে ওর হাত কামড়িয়ে দিতাম। প্রীতিও মজা পেয়ে, হেসে হেসে আমার পিঠে দুমদুম করে ভালবাসার কয়েকটা কিল দিত। আমরা দুজনাই এই খুনশুটি উপভোগ করতাম। মজা পেয়ে আমি আস্তে আস্তে আমার সমস্ত কাজ প্রীতির উপর ছেড়ে দিলাম। প্রতিদিন সকালে আমার দাঁত ব্রাশ করে মুখ ধুইয়ে দেওয়া, শেভ করা, গোসল করে কাপড় বদলি করা সবই প্রীতি করতে থাকল। প্রথমবার শেভ করতে যেয়ে প্রীতি আমার গাল কেটে দিয়েছিল। আমি আমার রক্তমাখা গাল ওর গালে ঘষে দিয়ে ওকে চুমু খেয়েছিলাম। প্রীতির স্পর্শ আরো বেশি করে পাবার জন্য আমি ইচ্ছা করে ক্রাচ ছেড়ে প্রীতির কাঁধে ভর দিয়ে চলাফেরা করতে থাকলাম। প্রীতিও খুব যত্ন করে ওর কাঁধে রাখা আমার হাতটা ধরে আর একহাত দিয়ে আমার কোমর ধরে আমাকে নিয়ে চলাফেরা করত। আমি দৈনন্দিন কাজে সম্পূর্ণভাবে প্রীতির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লাম। প্রীতির উপর আমার এই নির্ভরশীলতা আমার খুব ভাল লাগতে শুরু করল। আমার প্লাস্টার ছাড়া, ক্রাচ ছাড়া চলাফেরা করতে তিন মাস সময় লাগল। আমি আবার আমার দৈনন্দিন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে করতে শুরু করলাম। এই তিন মাস আমার সেবা শুশ্রƒষা করতে প্রীতিকে কোন রকম বিরক্ত হতে দেখি নাই, উপরন্তু আমার সেবা করতে পেরে ওকে খুব খুশি মনে হত। প্রীতির প্রতি আমারও একটু একটু করে ভাললাগা শুরু হল। কথায় বলে কুত্তার লেজ সোজা হয় না। আমারও হল না। কিছুদিন পরই আমি আবার প্রীতিকে অবহেলা শুরু করলাম। আমি আবার ওকে একটা ভোগের বস্তু আর একটা ফার্নিচারের মত দেখতে শুরু করলাম।

এর পর মাস দুয়েক যেতেই প্রীতির প্রতি আমার এই উদাসীনতা বা উপেক্ষা ওর নজরে এলো। প্রীতি একটু হলেও মনঃক্ষুণ্ন হল। একদিন আমি কাজে যাবার আগে প্রীতির একটু মাথা ব্যথা হয়েছে বলে আমাকে জানাল। প্রীতি আশা করেছিল যে আমি নিজে ওষুধ এনে ওর হাতে দিয়ে এক গ্লাস পানি এনে ওকে ওষুধটা খেয়ে নিতে বলবো। এই সব ছোট জিনিষ আমার খেয়ালেই এলো না। আমি বাসার কাজের ছেলেটাকে দিয়ে ওষুধ আনিয়ে কাজের ছেলেটাকে দিয়ে প্রীতির ওষুধটা পাঠিয়ে দিলাম। ওষুধ খাবার ব্যাপারে আমি খোঁজ খবরও করলাম না, আমি আমার কাজে বেরিয়ে গেলাম। রাতে কাজ থেকে ফিরে এসে দেখি যে ওষুধ ওষুধের জায়গায় আছে আর যেটা প্রীতি কোন দিনই করে নাই, আজ আমি আসবার আগেই নঈমকে ঘুম পাড়িয়ে নিজেও ঘুমিয়ে গেছে। মনে হল গালে শুকানো চোখের পানির ছাপ। আমি আগে কোন দিন প্রীতির চোখে পানি দেখি নাই, মনে করতাম প্রীতি ভালই আছে, সুখে আছে। অমানুষ আমার মনে কোনদিনই প্রেম, প্রীতি, ভালবাসার জন্ম হয় নাই। তাই আমি কোনদিনই বুঝতে পারি নাই যে আমার বৌও আমার কাছ থেকে প্রেম, প্রীতি ভালবাসার আশা করে। দুনিয়াতে শারীরিক ভালবাসা ছাড়া যে স্বর্গীয়, নিস্বার্থ ভালবাসা আছে তা আমি আগে বুঝতে পারি নাই বা বুঝতাম না। এই রকম পরিস্থিতিতে কোন সময়ে পড়ি নাই, তাই কি করতে হবে বুঝতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে আমি অবশেষে প্রীতির গায়ে হাত দিলাম। প্রীতির শরীরটা বেশ গরম, তবে জ্বর খুব বেশি হবে বলে মনে হচ্ছিল না। এখন আমার করণীয় হল আগে ওর জ্বর মাপা তারপর প্রয়োজনে মাথায় পানি দেওয়া আর একটা নাপা জাতীয় ওষুধ খাওয়ান। তবে জ্বর বেশি না থাকাতে আমি এ সব কিছুই করলাম না। এতদিন প্রীতিকে উপেক্ষা করবার জন্য নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হতে লাগল। তাই আমি কিছুই করলাম না। আমি আস্তে করে প্রীতির পাশে শুয়ে ওকে বুকে টেনে নিয়ে জড়িয়ে রাখলাম। কিছক্ষণ পর আমি ওর দুই চোখে হালকা করে চুমু খেলাম। প্রীতি নড়ে উঠে চোখ মেলে তাকাল। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছি দেখে প্রীতি একদম অবাক হয়ে গেল আর সেই সাথে খুশিও হল। একটা লাখ টাকা দামের মিষ্টি হাসি দিয়ে জিজ্ঞাসা করল,

“তুমি কখন এলে। আমাকে আগে ডাক নাই কেন?”

আমি আগে যা কখনও করি নাই আজ তাই করলাম, আমি প্রীতির ঠোঁটে আমার ঠোঁট লাগিয়ে অনেকক্ষণ ধরে গভীরভাবে চুমু খেলাম। প্রীতিকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে আমার ভীষণ ভাল লাগল। আমার মনে একটা অভূতপূর্ব অনুভূতি জাগল। এই অনুভূতিটা আগে কোনদিনই আসে নাই, এখন কেন এলো, কি ভাবে এলো আমি কিছুই জানি না। মনে হল এটাকেই বোধ ভালবাসা বলে। এই ভালবাসার উপলব্ধিটাকে ভালবাসতে আমার খুব ভাল লাগছিল।  

“প্রীতি আমি বেশ অনেকক্ষণ আগে এসে তোমাকে ঘুমন্ত পেলাম। তোমার গায়ে হাত দিয়ে বুঝলাম তোমার জ্বর এসেছে। বেশি জ্বর বলে মনে হল না। প্রীতি তোমার স্পর্শটা আমি আগে কোন সময় উপলব্ধি করি নাই, উপভোগ করি নাই। শরীরের স্পর্শ, গন্ধও যে উপলব্ধি করা যায়, অনুভব করা যায়, উপভোগ করা যায় তা আমি আগে কোন সময়েই জানতে পারি নাই। কিন্তু তোমার স্পর্শ, তোমার শরীরের গন্ধ, তোমার মাখনের মত নরম শরীর আজকে আমার মনে কোন রকমের যৌন অনুভূতি জাগায় নাই। তোমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকতে আমার খুব ভাল লাগছে। প্রীতি কোন কথা নয়, আমি যতক্ষণ পারি চুপ করে আমার ভাললাগার এই অনুভবটা উপভোগ করতে চাই।”

প্রীতি কোন কথা না বলে, আমার বুকের ভেতর আরো বেশি করে ঢুকে ওর দুই হাত দিয়ে আমার পিঠটা বেড় দিয়ে রাখল। আধা ঘণ্টার মত এই ভাবে আমার পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে থাকলাম। এবারে আমিই আরম্ভ করলাম –

“প্রীতি আমি এতদিন একটা অমানুষ ছিলাম। আমি কোন সময়েই তোমাকে আমার স্ত্রীর অধিকার দেই নাই। আমি সব সময়েই শুধু আমার অধিকারটুকুই খাটিয়েছি। আমি সব সময়েই তোমাকে একটা ভোগের বস্তু বলে বিবেচনা করতাম আর সেইভাবেই তোমার সাথে ব্যবহার করতাম। আজকে আমি বুঝতে পারলাম যে স্বামী-স্ত্রীর ভেতর শারীরিক সম্পর্কটা আসল না। এই যে আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে আছি বা তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে আছ, আজ কিন্তু আমার ভেতরে কোন যৌন অনুভূতি জাগছে না, কিন্তু আমার খুব ভাল লাগছে। এটাই বোধ হয় ভালবাসা। প্রীতি তুমি আমাকে ভালবাসতে শিখিয়েছ। তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করবার জন্য আমি দুঃখিত, আমাকে ক্ষমা করে দিও।”

প্রীতি সাথে সাথে ওর একটা হাত দিয়ে আমার মুখ চেপে ধরে বললো,

“নাসিম তুমি ক্ষমার কথা কখনও মুখেও আনবে না। তুমি আমাকে ভালবাসতে শুরু করেছ এতেই আমি খুশি। সত্যি কথা বলতে কি প্রথম প্রথম আমি তোমার এই মনোভাব একদম বুঝতে পারি নাই। তখন তোমার মত আমিও আমাদের যৌন জীবন উপভোগ করতাম তবে প্রথম থেকেই আমি তোমাকে ভালবাসতে শুরু করেছিলাম। আমার দৃঢ বিশ্বাস ছিল তুমি তোমার ভুল বুঝতে পারবে, তুমি আমাকে ভালবাসবে।”

আমি প্রীতির ঠোঁটে চুমু দিয়ে ওর দুই চোখে চুমু দিয়ে বললাম,

“প্রীতি আমি এখন থেকে তোমাকে আমার ভালবাসা দেব, তোমাকে আমার স্ত্রীর মর্যাদা দেব, তোমাকে স্ত্রীর অধিকার দেব। এবারে এই নাপাটা খেয়ে নিয়ে চল রাতের খাবার খেয়ে নেই। আমার দুজনা এই সময়ে এতক্ষণ ঘরে আছি দেখে আম্মু হয়ত উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে পারেন।”

আমি ১৮০ ডিগ্রি বদলে গেলাম। আমি একজন আদর্শ স্বামী হয়ে গেলাম। প্রীতিকে একটা ভোগের বস্তু মনে না করে আমার স্ত্রী হিসাবে দেখতে শুরু করলাম। নঈমের জন্মের দুই বছর পর আমাদের দ্বিতীয় সন্তান, কন্যা নঈমার জন্ম হল।  

আমি কোন দিনই প্রীতির জন্য দশ টাকার বাদামও আনি নাই, কোনদিন একটা গোলাপ ফুলও আনি নাই। অথচ আমি ছোট বেলায় দেখেছিলাম আব্বু প্রতিদিনই আম্মুর জন্য কিছু না কিছু আনতেন। বাসায় আসবার সময়ে কারো বাগান থেকে একটা হলেও গোলাপ বা এক গুচ্ছ হাস্নাহেনা বা একগুচ্ছ রজনীগন্ধা চুরি করে নিয়ে আসতেন, অথবা দশ টাকার বাদাম অথবা পাঁচ টাকা দামের আম্মুর পছন্দের দুটা চিতই পিঠা নিয়ে আসতেন। আব্বু এসেই আম্মুর হাতে এইসব স্বল্পমূল্যের বা বিনামূল্যের উপহার তুলে দিতেন। আব্বুর এই সব ছোট ছোট ভালবাসার উপহার পেয়ে আম্মুর মুখে একটা স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠত। আম্মুর সামান্যতম শরীর খারাপ হলে, এমনকি একটু মাথা ব্যথা হলেও আব্বু অস্থির হয়ে যেতেন। আব্বু নিজে থেকেই ওষুধ এনে নিজ হাতে আম্মুকে খাইয়ে দিতেন। তখন আব্বু আর আম্মুর এই গভীর ভালবাসা আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিত। বড় হতে থাকলাম আর আব্বু আর আম্মুর ভালবাসা আমার আর নজরে আসতো না। স্বামী-স্ত্রীর ভালবাসা যে স্বর্গীয় ভালবাসা এই উপলব্ধিটা আমার মন থেকে একদম উবে গিয়েছিল। 

আমি সন্ধ্যার সময়ে দোকান থেকে বেরিয়ে আধা ঘণ্টার মত হাঁটতাম। বরাবরের মত আমি সেদিন হাঁটতে বের হয়েছিলাম। রাস্তার মোড়ে এক কিশোরীকে ফুল বিক্রি করতে দেখলাম। কিশোরীটি প্রতিদিনই ফুল বিক্রি করত, কিন্তু আমি কোন দিনই তাকে খেয়াল করি নাই। হঠাৎ আমার মনে ছোট বেলায় দেখা আব্বু আর আম্মুর ভালবাসার সেই উপলব্ধিটা আবার আমার মনে জেগে উঠল। আমারও প্রীতির প্রতি ভালবাসা উথলে উঠল। আমি কোন চিন্তা না করেই ঐ কিশোরীর কাছ থেকে সব চাইতে বড়, সব চাইতে লাল আর সব চাইতে টাটকা দেখে দশটা গোলাপ ফুল কিনলাম। আমি কোন দামাদামি করি নাই। হয়ত কিশোরীটি আমার কাছ থেকে দ্বিগুণ দাম নিয়েছিল কিন্তু আমি সেটা ধর্তব্যের ভেতর নিলাম না। গোলাপ ফুল নিয়ে দোকানে ঢুকবার সময়ে দেখলাম যে কর্মচারীরা একটু অবাক হয়ে গেছে। 

রাতে আমি আমার ফুল ধরা হাতটা পেছনে রেখে ঘরে ঢুকলাম। প্রীতিকে সামনে পেয়ে একটা হাসি দিয়ে ওকে ফুলগুলো দিলাম। প্রীতির মুখে একটা স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠল। এই রকম হাসি আমি আম্মুর মুখেও দেখতাম। এই লাখ টাকার হাসি দেখে আমি ভাবলাম আমি এতদিন কি মিস করেছিলাম। প্রীতি একটা ফুলদানি এনে ওতে অর্ধেকটা পানি ভরে ফুলগুলো ফুলদানিতে রেখে দিল। এরপর ঘুরে একটা দুষ্টু হাসি দিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে থাকল। আমিও ওর প্রতিউত্তর দিতে থাকলাম। রাতে প্রীতি আমার উপর অত্যাচার করল আর আমিও ওর উপর অত্যাচার করলাম। সকালে প্রীতিকে বাসর রাতের পর দিন সকালের মত, গলা, ঘাড় আর বুক ভাল করে ঢেকে নাস্তার টেবিলে আসতে হয়েছিল। এরপর থেকে প্রতিদিনই আমি প্রীতির জন্য কিছু না কিছু আনতে শুরু করলাম। দাম কম হোক বা বেশি হোক, উপহার পেয়ে প্রীতি ছোট্ট খুকির মত উচ্ছ্বসিত হত। আমি আগে যা করি নাই তাই করা শুরু করলাম। আমি প্রীতিকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে শুরু করলাম। প্রীতিকে আশুলিয়া নিয়ে যেয়ে ওর সাথে আমি ফুচকা, চটপটি খেতাম। একবার আশুলিয়া থেকে ফিরে আসবার সময়ে প্রীতি আদুরে কন্ঠে বললো,

“নাসিম, তোমার সাথে আমার এই ভাবে ঘুরতে ভাল লাগে না।”  

“প্রীতি তুমি ঠিক কি বলতে চাচ্ছ খোলাসা করে বল। তুমি কি আমার সাথে বাইরে যেতে চাও না।”

“নাসিম তুমি আমাকে ভুল বুঝেছ। আসলে তোমার সাথে গাড়িতে ঘুরতে আমার ভাল লাগে না। দূরে কোথাও গেলে গাড়িতে যাওয়া যায়। তবে কাছাকছি হলে আমি তোমার সাথে রিক্সায় ঘুরতে চাই।”

“প্রীতি তোমার এই অদ্ভুত ইচ্ছার কারণটা খুলে বলবে?”

“গাড়িতে গেলে আমি প্যাসেঞ্জার সিটে আর তুমি থাক ড্রাইভিং সিটে। আমি তোমার স্পর্শ পাই না। অথচ রিক্সায় গেলে আমি তোমার গায়ে গা লাগিয়ে ঘন হয়ে বসতে পারব আর তুমিও আদর করে আমার কোমরে হাত দিয়ে তোমার কাছে টেনে ধরতে পারবে। সন্ধ্যার সময়ে নির্জন রাস্তায় আমি তোমাকে চুমু খেতে পারব, তুমিও আমার বুকে হাত দিতে পারবে।”

“আমার তো সব সময়েই প্রতিদিনই এইসব করি। এখানে নতুনত্বের কি আছে? আলাদা করে ভাল লাগার কি আছে?”

“ঠিকই, আমরা প্রতিদিনই এইসব করি বা এর চেয়ে বেশি করি। কিন্তু এখানে আমি নতুন প্রেমিকার মত চুরি করে তোমাকে চুমু খাব আর তুমিও নতুন প্রেমিকের মত চুরি করে আমার বুকে হাত দেবে। আমাদের ভেতরের বৈধ জিনিসটা অবৈধ ভাবে করার একটা আলাদা ফিলিংস আছে, আলাদা উত্তেজনা আছে।   

এর পর থেকে স্বল্প দূরত্বে আমরা রিক্সায় যাতায়াত করতাম। প্রীতি কলেজে পড়ুয়া মেয়ের মত উচ্ছ্বসিত হত। ওকে নিয়ে আমার বন্ধুর বাসায় বা ওর বান্ধবীর বাসায় যাওয়া শুরু করলাম। অন্যান্য আর দশটা দম্পতির মত আমদেরও ঝগড়া হত, মনোমালিন্য হত। তবে আমাদের বোঝাপড়া অনুযায়ী আমরা কোনদিনই আলাদা বিছানায় শুই নাই। নঈমের জন্মের এক বছর পর থেকেই প্রীতি আবার মা হবার বায়না শুরু করল। আমিও আপত্তি করলাম না। দ্বিতীয় বছরের মাথায় প্রীতি, ওর আশামত আমাকে একটা ফুটফুটে মেয়ে সন্তান উপহার দিল। দুজনে মিলে, আমার আর ছেলের নামের সাথে মিলিয়ে মেয়ের দিলাম নঈমা। ছেলে মেয়ে দুজনে আস্তে আস্তে বড় হতে থাকল। আমাদের ভেতরে ঝগড়াও বাড়তে থাকল। ঝগড়ার পর আমাদের মাঝে কথা বন্ধ থাকত। তবে আমরা বেশি দিন কথা বন্ধ করে থাকতে পারতাম না। বেশির ভাগ সময়েই প্রীতিই আগ বাড়িয়ে সন্ধি করত। ওর সন্ধিটা ছিল খুব মজার। সন্ধি করবে ঠিক করলে, সেদিন রাতে প্রীতি মনে মাধূরী মিশিয়ে ভাল ভাল রান্না করত। বিশেষভাবে তার স্পেশাল ফ্রুট সালাদ। একটু সাজুগুজুও করত। আমিও হাসি মুখে কথা শুরু করে দিতাম। রাতে দুজন দুজনাকে খুব বেশি করে আদর করতাম। প্রীতি যেদিন বেশি রেগে যেত, সেদিন ও রাগ করে মতিঝিলে বা কমলাপুরের ওর বান্ধবীর বাসায় চলে যেত। তবে সব সময়েই আমি কাজ থেকে ফিরে আসবার আগেই ও বাসায় চলে আসত, অথবা আমি যেয়ে নিয়ে আসতাম।

নঈমের তখন আট বছর আর নঈমার ছয় বছর। এই সময়ে আমাদের অসতর্কতার ফলে প্রীতি আবার গর্ভবতী হয়ে পড়ে। আমি আর কোন সন্তান নিতে চাচ্ছিলাম না। আমার না চাওয়ার কারণে প্রীতি অনিচ্ছা সত্ত্বেও গর্ভপাত করতে রাজি হল। আমরা দুজনে একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ মহিলা ডাক্তারের কাছে গেলাম। উনি প্রথমেই আমাদের বিয়ে, ছেলে, মেয়ে আর আমাদের পেশা ইত্যাদি জেনে নিলেন। এরপর উনি আমাদের ইচ্ছার কারণ জানতে চাইলেন।

“আপনারা কেন একটা অনাগত বাচ্চার জীবন নষ্ট করতে চাইছেন।”

“দেখুন ডাক্তার সাহেব, আমাদের এক ছেলে আর এক মেয়ে আছে। আমাদের সরকারও বলেন ‘ছেলে হউক বা মেয়ে হউক দুটি সন্তানই যথেষ্ট’। আমরাও তাই মনে করি। আমাদের একটা আদর্শ পরিবার আছে। তাই আমরা আর একটা সন্তান নিতে চাচ্ছি না।”

“দেখুন প্রীতি আর নাসিম সাহেব আমি আপনাদের কাছ থেকে জানলাম যে আপনাদের বাড়ি আছে, গাড়ি আছে, বেশ বড় ব্যবসাও আছে। তার মানে আয় রোজগারও ভালই। আমি তো মনে করি যে আপনারা আর একটা কেন আরো দুটা বাচ্চা খুব সহজেই খুব ভাল ভাবেই লালন পালন করতে পারবেন। আপনাদের মত সচ্ছল ব্যক্তিরা তাদের পরিবার ছোট রাখতে চান, অথচ দেখেন ‘দুটি সন্তানই যথেষ্ট’ এই কথাটা যাদের বেলায় বেশি প্রযোজ্য তারাই বেশি বেশি সন্তান নিচ্ছে। মাতৃগর্ভে প্রথমে একটু রক্ত জমাট বাঁধে, তারপর এটা একটা মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়, এটা বৃদ্ধি পেতে থাকে। যেটার বৃদ্ধি পায় সেটার প্রাণ আছে। ইট পাথরের প্রাণ নেই, এগুলোর বৃদ্ধি পায় না। আপনারা কি একটা প্রাণকে মেরে ফেলতে চান। আল্লাহ আপনাদের সামর্থ্য দিয়েছেন, কেন আপনারা এই অনাগত বাচ্চাটাকে রাখতে চাচ্ছেন না। আমি বলি যে আপনারা দুদিন সময় নিন আরো ভাল করে চিন্তা করুন। আমি আজকে আর আপনাদের দেখব না। দুদিন পর আসুন, আপনারা যা সিদ্ধান্ত নেবেন আমি সেইভাবে অগ্রসর হব। আপনাদের ধন্যবাদ।”

অর্থাৎ ডাক্তার সাহেব আমাদের বিদায় করে দিলেন।

প্রীতির গর্ভপাতের ইচ্ছা ছিল না। ডাক্তারের কথা শুনে প্রীতি বিপুলভাবে বাচ্চা রাখার পক্ষে ওকালতি করতে থাকল। প্রীতির ওকালতিতে আমিও রাজি হয়ে গেলাম। দুদিন পর আমরা একটা মাদ্রাজ সিল্কের আর একটা রাজশাহী সিল্কের সব সময়ে পরবার উপযুক্ত সুন্দর প্রিন্টের দুটা শাড়ি নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলাম। আমাদের দেখে উনি যে খুব সন্তুষ্ট হলেন তা মনে হল না।

“আমি কিন্তু আপনাদের আবার দেখবার আশা করি নাই। যাক সিদ্ধান্ত আপনাদের, আমি আপনাদের সিদ্ধান্তমত কাজ করব।”

প্রীতি হেসে বললো,

“আপা, আমরা এই দুদিন ধরে আপনার কথাগুলো খুব ভাল করে ভাবলাম, বিশ্লেষণ করলাম। আপা আমরা আপনার সাথে একমত হয়ে আমাদের এই অনাগত বাচ্চাটা রেখে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আপনার মূল্যবান উপদেশ আমরা খুশি মনে মেনে নিয়েছি। আপা কিছু মনে করবেন না আমরা খুশি হয়ে আপানর জন্য ছোট্ট একটা উপহার এনেছি। আপনি গ্রহণ করলে আমার খুশি হব।” 

“আপনারা বাচ্চাটা রেখে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জেনে আমি সত্যি ভীষণ খুশি হয়েছি। আমি আপনাদের উপহার খুশি মনে গ্রহণ করলাম। আপনাদের শুভ কামনা করি।”

প্রীতি যথা সময়ে আর একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিল। ছেলের নাম রাখলাম নাদিম। ইতিমধ্যে নঈম ও নঈমা দুজনেই ধানমন্ডির ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যশনাল স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। ছেলে মেয়েকে স্কুলে আনা নেওয়া আর স্কুলের মায়েদের সাথে আড্ডা মেরে প্রীতির সময় ভাল কাটছিল। নাঈম আর নঈমা দুজনে ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যশনাল স্কুলে ভর্তি হওয়াতে সব চেয়ে খুশি হয়েছিল প্রীতি। সকালে ছেলে মেয়েদের স্কুলে দিয়ে কিছুক্ষণ অন্যান্য মায়েদের সাথে আড্ডা মেরে প্রীতি বাপের বাড়ি চলে যেত। ঐ সময়ে বাবা ভাই বোন সবাই যার যার কাজে বাইরে থাকে। বাড়িতে মা’র সাথে আড্ডা মেরে ছুটির আগেই স্কুলে যেয়ে ছেলেকে নিয়ে বাসায় আসত। প্রীতি কোনদিনই ওর শ্বশুরবাড়ির কারো সম্বন্ধে কোন রকম খারাপ কিছু বলে নাই। প্রীতি যতক্ষণ স্কুলে থাকত ততক্ষণ আমার মা নাদিমের দেখাশোনা করতেন। ছেলে নাদিম তখন মাত্র এক বছরের। এই সময়ে এক শনিবার, স্কুল ছুটির দিনে আমার জীবনের সব চাইতে বড় ট্রাজেডি ঘটে গেল। আমার সাথে রাগারাগি করে প্রীতি ছেলে মেয়েদের ওদের দাদির কাছে রেখে. সারা দিনের জন্য ওর বান্ধবীর বাসায় গেল। কে জানত ওটাই হবে আমার সাথে ওর শেষ রাগারাগি, শেষ বাইরে যাওয়া।

ইতিমধ্যে আমি আব্বার সাথে আলোচনা করে আমাদের মেরাদিয়ার জায়গাটা নিয়ে এক আবাসন প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করে ফেললাম। চুক্তি মোতাবেক আবাসন প্রতিষ্ঠান সিগনেচার মানি হিসাবে আমাদের পঁচাত্তর লক্ষ টাকা দিল। চুক্তি মোতাবেক আমাদের ঐ জায়গায় এগারতলার একটি বিল্ডিং হবে। নীচে থাকবে গাড়ির গ্যারেজ আর এর উপরে দুই ইউনিট করে বাকি দশ তলায় মোট বিশটি ফ্ল্যাট হবে। আমরা পাব অর্ধেক অর্থাৎ দশটি ফ্ল্যাট।  

সরকারে ক্ষমতাসীন দলের মতিঝিল থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলাম ওরফে তাজ। তাজের বাসা খিলগাঁওয়ের বাগিচা এলাকায়। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, আরামবাগ, ফকিরাপুল, রাজারবাগ হয়ে খিলগাও রেলক্রসিং পর্যন্ত এলাকা তাজের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। এই বিস্তীর্ণ এলাকায় হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কয়েক হাজার ছোট বড় নানান প্রকারের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, কাঁচা বাজার, ফার্নিচারের মার্কেট ইত্যাদি নানান প্রকারের স্থায়ী প্রতিষ্ঠান আছে। এছাড়াও প্রতিদিন ফুটপাতে কয়েক হাজার হকার তাদের নানান প্রকারের পসরা নিয়ে অস্থায়ী দোকান বসায়। সব স্থায়ী প্রতিষ্ঠান তাজকে মাসিক ভিত্তিতে মসোহারা দিয়ে নির্বিঘ্নে ব্যবসা করে আসছে। অস্থায়ী দোকানদারদের দৈনিক ভিত্তিতে তাজকে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতে হয়। এই এলাকা থেকে দৈনিক ও মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা হিসাবে তাজ প্রতিমাসে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা আয় করে থাকেন। জায়গায় জায়গায় প্রয়োজনীয় টাকা দিতে তার মাসিক প্রায় এক কোটি টাকা খরচ হয়। চতুর তাজ নিজের জন্য কিছু টাকা রেখে বাকিটা বিদেশে পাচার করে দিতেন। এই পাচারকৃত টাকা দিয়ে তাজ কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে উচ্চবিত্ত এলাকায় একটি বাড়ি কেনেন। এছাড়াও কানাডার ব্যাঙ্কে তার কয়েক মিলিয়ন ডলার জমা হয়। তাজ সহজেই তার স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ের কানাডার নাগরিকত্ব পেয়ে যান। তার স্ত্রী ও মেয়ে স্থায়ীভাবে কানাডায় থাকেন। তাজুল পাঁচ বছরের মাল্টিএন্ট্রি ভিসা নিয়ে প্রতি বছরেই একাধিকবার করে কানাডায় স্ত্রী ও মেয়ের কাছে থেকে আসেন। মতিঝিল এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি করা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের অন্য একটি পক্ষের সঙ্গে তার বিরোধ চলছিল বলে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের কাছ থেকে জানা গেছে। পুলিশ জানায় তাজুল ইসলাম ক্ষমতাসীন দলের আর একটি অঙ্গ সংগঠনের নেতা হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি ছিলেন। তিনি এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে অনেক দিন কারাগারে ছিলেন। গুলশান দুই-এ শপার্স ওয়ার্ল্ড নামে একটি বিপনিবিতানের সামনে ঐ নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

দুপুর থেকেই মতিঝিল, শাহজাহানপুর, মালিবাগ ও মৌচাক এলাকাতে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। কিছুক্ষণ আগে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে শাহজাহানপুরের ইসলামী ব্যাঙ্ক হাসপাতালের সামনে দিনে দুপুরে এলোপাতাড়ি গুলিতে দুজন খুন হয়েছেন। এদের ভেতর সরকারে ক্ষমতাসীন দলের মতিঝিল থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলাম ওরফে তাজ ও সড়কে যানজটে আটকা পড়ে রিক্সায় বসে থাকা এক গৃহবধূ। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তাজুলকে বহন করা মাইক্রোবাসের চালকও। নিহত তাজুলের স্ত্রী অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের নামে একটি খুনের মামলা করেন।  

প্রত্যক্ষদর্শী, আশেপাশের দোকানি ও পুলিশ সূত্রে জানা যায় যে, ঘটনার সময়ে শাহাজাহানপুর এলাকায় যানজটে আটকে ছিল তাজুলকে বহন করা মাইক্রোবাসটি। হঠাৎ সড়কের উল্টো দিক থেকে, সড়ক বিভাজকের ফাঁকা অংশ দিয়ে মুখোশধারী দুই দুর্বৃত্ত এসে তাজুলকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। মাইক্রোবাসের কাঁচ ভেঙ্গে তাজুলের শরীরে একাধিক গুলি লাগে। সেইসাথে চালকও গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনার আকস্মিকতায় সড়কে থাকা লোকজন এদিক-ওদিক ছোটাছুটি শুরু করে। ভয়ে দোকানিরা ঝাঁপ ফেলে দোকান বন্ধ করে দেন। তখনও দুর্বৃত্তরা গুলি ছোড়া বন্ধ করে নাই। একপর্যায়ে তারা সড়ক বিভাজকের ফাঁকা অংশ দিয়ে অন্য পাশে চলে যায়। দুর্বৃত্তরা চলে যাবার পর অনেকে খেয়াল করেন যে, মাথার খুলি উড়ে যাওয়া এক গৃহবধূ ও রক্তাক্ত ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় এক তরুণীও রিক্সায় পড়ে আছেন। মাত্র একত্রিশ বৎসর বয়সে প্রীতি দশ বছরের একটা ছেলে, আট বছরের একটা মেয়ে ও মাত্র এক বছরের এক শিশু সন্তান রেখে নিহত হন। এই সময়ে কয়েকজন এসে তাজুল, চালক ও ঐ তরুণীদের হাসপাতালে পাঠান। তাজুলকে খুন করার পেছনে দলীয় বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব নাকি অন্য কোনো বিষয় কাজ করছে সে বিষয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিক কিছু বলতে পারে নাই। তবে তাঁরা মনে করছেন যে ঘটনাটি পরিকল্পিত। 

নিহত গৃহবধূর হিস্টিরিয়াগ্রস্ত বান্ধবী, বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক কলোনি বাসিন্দা কাঁদতে কাঁদতে সাংবাদিকদের জানান যে সকালে স্বামীর সাথে তার বান্ধবীর দাম্পত্য কলহ হয়। ছেলে মেয়েদের তাদের দাদির কাছে রেখে সারাদিন থাকবেন বলে তিনি বান্ধবীর বাসায় আসেন। তবে সন্ধ্যার আগেই তার স্বামী, নাসিম ভাই এসে বাসায় নিয়ে যাবার কথা ছিল। তাদের এই দাম্পত্য কলহটা ছিল অদ্ভুত। কলহ হলে প্রীতি আমার বা অন্য কোন বান্ধবীর বাসায় চলে আসত। কিছুক্ষণ পরই প্রীতি নাসিম ভাইকে জানিয়ে দেবে ও কোথায় আছে। সন্ধ্যার সময়ে নাসিম ভাই কিছু স্যাক্স নিয়ে চলে আসতেন। দুজনে এমনভাবে হেসে হেসে গল্প করবে যেন তাদের ভেতরে কোন রকম ঝগড়া হয় নাই। চা নাস্তা খেয়ে দুজনে হেসে বিদায় নিয়ে বাসায় ফিরে যেত। আমরা বুঝতাম না যে কোনটা আসল ঝগড়া বা কোনটা নকল ঝগড়। যেটাই হোক আমরা খুব মজা পেতাম। প্রীতিরা দুজনে তাদের আর এক বান্ধবীর খিলগাঁ-এর বাসায় যাবার জন্য রিক্সায় যাচ্ছিলেন। সরকারে ক্ষমতাসীন দলের মতিঝিল থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলাম ওরফে তাজকে দুর্বৃত্তরা এলোপাতাড়ি গুলি করলে, একটি গুলি গাড়ির খোলা জানালা দিয়ে বের হয়ে পাশে থাকা রিক্সা আরোহী বান্ধবীর মাথায় লাগে। গুলিতে বান্ধবীর মাথার খুলি, মাথার মগজ আর রক্ত তার গায়ে এসে পড়ে। তার বান্ধবী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। বান্ধবী প্রীতির স্বামী একজন ব্যবসায়ী আর তার এক ছেলে আর এক মেয়ে স্কুলে পড়ে আর একটি ছেলের বয়স মাত্র এক বছর।   

ঘটনাস্থলে পুলিশের সাথে কিছু বাদানুবাদ হল। ওরা পোস্টমর্টেম করবার জন্য মৃতদেহটা ওদের হেফাজতে নিতে চাইছিল। আমরা পোস্টমর্টেম ছাড়াই মৃতদেহ সমাহিত করতে চাইছিলাম। অবশেষে পুলিশ আমাদের কথা মতই পোস্টমর্টেম ছাড়াই প্রীতির মৃতদেহটা আমাদের কাছে হস্তান্তর করে। মৃতদেহ বাসায় আনলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। মেয়ে নঈমা কাফনের কাপড়ে ঢাকা মায়ের মৃতদেহের উপর আছড়ে পড়ে সঙ্গাহীন হয়ে পড়ে। ছোটটা কিছুই বোঝে না, ও ওর দাদির কোলে থেকে বিস্ময়ে সবার প্রতিক্রিয়া দেখছিল। ছেলে নঈম যে কি রকমের শক্ত মনের অধিকারী সেটা আমি আগে বুঝি নাই। মা নৃশংসভাবে নিহত হবার পর ছেলে একবারের জন্যও প্রকাশ্যে চোখের পানি ফেলে নাই। মায়ের জন্য কোন দরদ নেই মনে করে আমরা সবাই একটু হলেও ওর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলাম। এমন সময়ে কোথা থেকে খবর পেয়ে আমার আগের ড্রাইভার আশরাফ উপস্থিত হল। একটু সময় নিয়ে সবাই একটু শান্ত হলে নঈম আর আশরাফ মিলে প্রীতির গোসল করাবার ব্যবস্থা করল, জানাজা নামাজের ব্যবস্থা করে মৃতদেহটা বনানি কবরস্থানে নিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করল। সারাদিন দৌড়াদৌড়ি করে মায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে পরিশ্রান্ত নঈম ঘরে এসে বিছানায় পড়ার পরই ঘুমিয়ে গেল। আমি যেয়ে দেখি নঈমের ধুলা বালিতে মাখা মুখটাতে চোখের পানির ধারা শুকিয়ে আছে।

প্রীতির বান্ধবী সুমাইয়া সেই বীভৎস ঘটনায় ট্রমাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। চোখ বন্ধ করলেই সেই দৃশ্য মনে আসে বলে প্রায় দুই মাস সুমাইয়া ঘুমাতে পারে নাই, ভাল করে খেতে পারে নাই। এক বছরের উপর লেগেছিল তার সেই ট্রমা কাটতে। 

বাসায় রান্নার কোন দরকার হয় নাই। আশে পাশের বাড়ি থেকে, আত্মীয়স্বজনের বাসা থেকে প্রচুর পরিমাণে দুই বেলার খাবার ও সকাল বিকেলের নাস্তা আসছিল। মায়ের মৃত্যু নঈমকে কতটা আহত করেছিল তা প্রকটভাবে ধরা পড়ল রাতে খাবার পর। খাবার টেবিলে ওকে খুব একটা খেতে দেখলাম না। কোনমতে একলোকমা খাবার পরই ও উঠে যেয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলে আমরা একটু উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলাম। উঠে যেয়ে দরজার সামনে দাঁড়াতেই ঘরের ভেতর থেকে উচ্চ স্বরে হাউমাউ করে ছেলের কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। ওকে কেঁদে হালকা হবার সুযোগ দেবার জন্য আমি আর কিছু না বলে ওখান থেকে চলে এলাম। পরপর কয়েক রাতে একই অবস্থার সৃষ্টি হল। নঈম সব সময়ে বলতো যে দেশে মানুষের কোন নিরাপত্তা নেই, সে দেশে সে থাকবে না। বিদেশে যেতে হলে লেখাপড়ায় ভাল হতে হবে। তাই নঈম পড়াশোনায় ভীষণ মনযোগী আর সিরিয়াস ছিল।  

                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 দুদিন পর কয়েকজন সাংবাদিক আমার অবস্থা এবং করণীয় দেখবার জন্য আমার বসায় এসেছিলেন। নানাবিধ কথাবার্তা বলার পর তাদের একজন জিজ্ঞাসা করলেন,

“নাসিম সাহেব আপনি এখন পর্যন্ত মামলা করেন নাই। মামলা না করার পেছনে আপনার কি কোন নির্দিষ্ট কারণ আছে?”

“কিসের মামলা? কেন মামলা করব? কার বিরুদ্ধে মামলা করব?”

“নাসিম সাহেব আপনি তো ক্ষতিগ্রস্ত তাই মামলা আপনাকেই করতে হবে। অজ্ঞাতনামা দুস্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করবেন।”

“একজন নিরাপরাধ গৃহিণী, জানামতে যার কোন শত্রু ছিল না, কোনদিন কারো ক্ষতি করে নাই, দিনে দুপুরে প্রকাশ্যে যিনি খুন হলেন রাষ্ট্র তার কোন নিরাপত্তা দিতে পারে নাই। দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এখানে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করতে পারে নাই। তাই রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব দুস্কৃতকারীকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা। মামলা রাষ্ট্রকেই করতে হবে। আগে কয়েকবার পুলিশকে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে মামলা করতে দেখা গিয়েছে, তাই এবারেও তারাই করুক। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরের চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) নির্মাণাধীন এম এ মান্নান উড়ালসড়কের ১২ ও ১৩ নম্বর গার্ডার ধসে ১৩ জনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার দুই দিন পর পুলিশ বাদি হয়ে মামলা করে। এতে সিডিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম ও প্রকল্প পরিচালক এম এ হাবিবুর রহমানকে আসামি করা হয়েছিল। তখন তো কোন ভুক্তভোগী মামলা করে নাই, এখন আমাকে মামলা করতে হবে কেন, পুলিশই বাদি হয়ে করুক।”

আমার আরো অনেক কিছু জানার ছিল। প্রীতির মৃত্যুর পর বেশ কয়েকদিন আশরাফ এসেছিল। আগেও দেখেছি, বাসার যে কোন ছোটখাট কাজ, বিশেষ করে ইলেক্ট্রিক বা ইলেক্ট্রনিক্সের কাজ হলে প্রীতি আশরাফকে খবর দিত। আশরাফ এই সব কাজ ভাল জানত। এছাড়াও বাইরে থেকে কিছু খুঁজে বের করে কিনতে হলে আশরাফকেই খবর দিত। আশরাফের কাছে আরো অনেক কিছু জেনেছিলাম। আশরাফ বছর ছয়েক আমার গাড়ি চালাবার পর হঠাৎ করে চাকরি ছেড়ে দেয়। পুরাতন আর বিশ্বস্ত ড্রাইভার বলে প্রীতি ওকে বেশ পছন্দ করত। ছেলে মেয়েদের ওর সাথে স্কুলে পাঠিয়ে প্রীতি নিশ্চিন্ত থাকত। তাই প্রীতি ওকে ডেকে পাঠিয়ে চাকরি ছাড়ার কারণ জিজ্ঞাসা করেছিল।

“খালাম্মা, আমার নাকে একটু অসুবিধা আছে। ঠাণ্ডা আমার সহ্য হয় না। গাড়িতে এসি চালালে আমার নাকের সমস্যা হয়। তাই আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। আমি এখন আর কারো গাড়ি চালাই না।”

“তোমার নাকের চিকিৎসা করাও না কেন?”

“আমি ডাক্তার দেখিয়ে ছিলাম। আমার বলে নাকে একটা অপারেশন করাতে হবে। প্রায় চৌদ্দ পনের হাজার টাকা লাগবে। অত টাকা জোগাড় করতে পারি নাই। তাই চিকিৎসাও করাতে পারছি না।”

“ডাক্তার পনের হাজার টাকার কথা বলেছেন। অপারেশন আরম্ভ হলে দেখবে যে আরো নানান খাতে চিকিৎসার খরচ বেড়ে গিয়ে উনিশ বিশ হাজারে দাঁড়াবে। আমি তোমাকে কুড়ি হাজার টাকা ধার দিচ্ছি। তুমি যখন পার এক বছর, দুই বছর বা দশ বছর, যখন পার আমার টাকা শোধ করে দিও। স্যার, উনি আমার যে উপকার করেছেন সেটা আমার বাপেও করতে পারে নাই।”

“আশরাফ আমি তো এসবের কিছুই জানতাম না। তুমি কি নাকের অপারেশন করিয়েছিলে? এখন তোমার নাকের অবস্থা কেমন?”

“স্যার খালাম্মা টাকা দেওয়াতেই আমি নাকের অপারেশন করাতে পেরেছিলাম। আল্লাহ দিলে এখন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি। স্যার এটা সম্ভব হয়েছে খালাম্মার জন্যই। স্যার আরো আছে। একবার আমার মেয়ের কঠিন এক অসুখ হয়। চিকিৎসার জন্য প্রচুর টাকার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আমি আমার মেয়ের কানের দুল বিক্রি করে চিকিৎসা করাব বলে ঠিক করেছিলাম। আমি জানি না উনি খবরটা কোথা থেকে পেয়েছিলেন। আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করে জেনে বলেছিলেন,

‘আশরাফ সোনা বিক্রি করা খুব সহজ। কিন্তু কিনতে খুব কঠিন। আমি তোমাকে দশ হাজার টাকা দিচ্ছি, মেয়ের চিকিৎসা করাও। আগের কুড়ি হাজার আর এখনকার দশ হাজার মোট তিরিশ হাজার টাকা যখন পার শোধ করে দিও।‘ 

স্যার আমি আজ পর্যন্ত একটা টাকাও শোধ করতে পারি নাই। উনিও কোন দিন জিজ্ঞাসা করেন নাই যে আমি কবে টাকা শোধ করব। মনে হয় উনি এই টাকার আশা করেন না। উনি ঠিকই বুঝেছিলেন যে আমি হয়ত দান গ্রহণ করব না, তাই উনি ধারের কথা বলে আমাকে টাকাটা দিয়েছিলেন। স্যার কোন বিয়ের দাওয়াতে গেলে ফেরার সময়ে গাড়িতে ওঠার আগে উনি জিজ্ঞাসা করতেন আমি খেয়েছি কিনা। স্যার আগেও অন্যের গাড়ি চালিয়েছি। কিন্তু কোনদিনই কেউ আমি খেয়েছি কিনা জিজ্ঞাসা করে নাই। স্যার উনি সব সময়েই হেসে হেসে আস্তে আস্তে স্পষ্ট করে কথা বলতেন। আমার বৌ বাচ্চার খোঁজ খবর করতেন। স্যার উনার মত মানুষ হয় না। আল্লাহ কেন যেন সব ভাল মানুষদের আগে আগে উঠিয়ে নেন। আল্লাহ উনার বেহেস্ত নাজিল করুন।” 

প্রীতি নিহত হবার পর থেকে আমার জীবন অসহায়ভাবে কাটতে থাকলো। আমি কাজে বের হবার আগে এখন আর কেউ জিজ্ঞাসা করে না আমি ওয়ালেট নিয়েছি কিনা, আমি মোবাইল নিয়েছি কিনা। আগের মত কেউই এখন আর আমার হাতে টিফিন কেরিয়ার ধরিয়ে দেয় না। এসব ছোটখাট জিনিষ আমি খুব মিস করি। আজকাল আমি দুপুরে, শুধু মাত্র বাবা মাকে সময় দেবার জন্য, লাঞ্চ টাইমে বাসায় এসে লাঞ্চ করি। আগে সব সময়েই প্রীতি আমার হাতে টিফিন কেরিয়ার ধরিয়ে দিত। সময় কারো জন্য আটকে থাকে না, আমার জন্যও আটকে থাকল না। ছেলে মেয়েরা আস্তে আস্তে বড় হতে থাকল। সংসারটা এখন আমার মা’ই সামলান। দাদি উনার নাতি নাতনিদের যত্নের কোন ত্রটি করেন না। দাদাও ওদের সময় দেন। দাদি তার নাতি নাতনিদের পেছনে এত সময় দেন যে উনি উনার স্বামীর, অর্থাৎ আমার আব্বার বেশি যত্ন নিতে পারেন না। এতে অবশ্য আব্বারও কোন আপত্তি নেই, তবে এতে দিন দিন উনার স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকল। উনার কথা হল যে আমি আর কত দিন আছি, আগে আমার ভাইয়া আর আপুর যত্ন নেয়ার প্রয়োজন। নঈমের ‘ও’ লেভেল পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়েছে। পরীক্ষায় নঈম সব বিষয়ে ‘এ’ পেয়ে প্রথমেই দাদার সাথে দেখা করে। দাদা যারপর নেই খুশি হয়ে অনেক দোয়া করলেন। ভঙ্গ স্বাস্থ্যের কারণে আব্বা দিন দিন ভুগতে ভুগতে একরাতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করলেন। রাতে আব্বার সাথে ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে কথা বলতাম, এখন রাতে কথা বলার আর কেউই রইল না। আব্বার মৃত্যুতে আম্মাও ভেঙ্গে পড়লেন, স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ল। নাতি নাতনিকে দেখে রাখা দূরের কথা উনি নিজেকেই সামলে রাখতে পারছিলেন না।

নাদিম ছোট বেলা থেকেই দেখতে সুন্দর ছিল, বড় হলে আরো সুন্দর হয়ে উঠেছিল। নাদিম যখন ছোট ছিল তখন আমার ইচ্ছা ছিল নাদিমকে ভাই বোনের মত ম্যাপল লিফে ভর্তি করে দেবার। কিন্তু ধানমন্ডির ঐ এলাকাতে আরো অনেক ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ও ক্লিনিক থাকতে স্কুল টাইমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যাম লেগে থাকত। তাই নঈম আর নঈমার আপত্তির মুখে নাদিমকে মোহাম্মদপুরের আসাদ এ্যাভেনিউ-এ ক্রিশ্চিয়ান মিশনারিদের পরিচালিত সেন্ট জোসেফ স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি করে দিয়েছিলাম। এই স্কুলটি শুধু মাত্র ছেলেদের জন্য। এখানে সকালের শিফ্টে তৃতীয় শ্রেণী থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পর্যন্ত পড়ান হয়। নাদিম এসএসসি ও এইচএসসি দুটা পরীক্ষাতেই এ প্লাস পেয়েছিল।

প্রীতির মৃত্যুতে আমি কয়েকদিন শোকে একদম মুহ্যমান ছিলাম। খাওয়া দাওয়ার কোন ঠিক ছিল না। বাচ্চাদের দিকেও নজর দিতাম না। আমার মা বাচ্চাদের আর সংসার সামলে আমাকে একটু ধাতস্থ হতে সময় দিলেন। মায়ের সেবা আর সান্ত্বনায় সেই সাথে বাচ্চাদের কথা চিন্তা করে আমি একটু একটু করে আবার স্বাভাবিক হতে থাকলাম। সব সময়েই প্রীতির কথা মনে আসতে লাগল। 

বৌ থাকতে, বৌ কি জিনিষ বুঝি নাই,

এখন বৌ নাই এখন ঠিকই বুঝতে পারছি বৌ কি জিনিষ।

প্রীতির কথা মনে আসলেই মনটা একদম ভারাক্রান্ত হয়ে উঠত। মনের এই বিষাদময় অবস্থা থেকে মুক্তি পাবার জন্য আমি কাজে ডুবে গেলাম। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য সারাদিন নিজেকে ব্যস্ত রাখতাম। ব্যবসার ধরণ বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলাম। ঠিক করলাম যে গ্রাহকগণ আমার কাছে আসবে না যতদূর সম্ভব আমিই গ্রাহকদের কাছে যাব। সারা ঢাকা ঘুরে গ্রাহকদের সুবিধার্থে আমি গুলশান এক-এ ও গুলশান দুই-এ, ওয়ারি এলাকার গ্রাহকদের জন্য র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটে, পুরাণ ঢাকার গ্রাহকদের জন্য লালবাগের ভজহরিসাহা স্ট্রিটে, ধানমন্ডি এলাকার গ্রাহকদের জন্য চন্দ্রিমা মার্কেটে আর বসুন্ধরা সিটিতে, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা এই সবদিকের গ্রাহকদের জন্য যমুনা ফিউচার পার্কে, উত্তরার দিকের গ্রাহকদের জন্য মাস্কাট প্লাজায় দোকান দেবার সিদ্ধান্ত নিলাম। ব্যাঙ্কের সহায়তায় আমি এইসব এলাকায় নতুন নতুন আর আধুনিক সাজে বেশ বড়সড় আরো আটটা শাড়ির দোকান খুললাম। সর্বমোট বারোটা দোকান আমার একার পক্ষে দেখাশোনা করা সম্ভব নয় দেখে আমি প্রতিটি দোকানে একজন করে ম্যানেজার নিয়োগ দিলাম। তারা সবাই আমার কাছে প্রতিদিনের বেচাকেনার হিসাব দিত। আমি প্রতিটি দোকানকে ইন্টানেটের আওতায় নিয়ে একেক দিন একেক দোকানে বসে সবার ওপরে নজরদারি করতে পারতাম। আমার দোকানের লোকেশনগুলো খুবই উপযুক্ত জায়গায় হয়েছিল। এক বছরের ভেতরে সবকটা দোকানই ভীষণভাবে চালু হয়ে গেল। এখন আমি একটু নিজের জন্য সময় করতে পারলাম। আমি ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া দেখতে যেয়ে বেকায়দায় পড়ে গেলাম। আমি বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করেছিলাম, তাই ওদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়ান আমার পক্ষে কঠিন হয়ে গেল। এছাড়া পড়ার সিলেবাসও অনেক বদলে গিয়েছিল। আমাদের সময় অনেক বিষয় পড়ানো হত না কিন্তু ওগুলো এখন পড়ান হচ্ছিল, আর বেশ কয়েকটি বিষয় আমরা কলেজে পড়তাম এখন তা স্কুলে পড়ানো হচ্ছে। আমি ওদের জন্য হোম টিউটরের ব্যবস্থা করে দিলাম।

আমার অসহায়ত্ব দেখে মা আগে কয়েকবার আমাকে আবার বিয়ের জন্য বলেছিলেন। আমার একটা কথায় মা আর কোন দিনই আমাকে বিয়ের কথা বলতে পারেন নাই। আমি মাকে বলেছিলাম যে আমি কোন মতেই, আমার যত কষ্ট বা অসুবিধা হোক আমি আমার ছেলে মেয়েদের সৎ মায়ের হাতে তুলে দেব না। আমার জানা বা শোনা সব ক্ষেত্রেই দেখেছি যে সৎ মা তার সৎ ছেলে মেয়েদের সহ্য করতে পারেন না। উপেক্ষা করে, অত্যাচার করে আবার কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা গেছে সৎ মা সৎ ছেলে মেয়েদের খুন করতেও দ্বিধা করেন না।  

দাদি আর তার নাতি নাতনিদের দেখাশোনা করতে পারেন না। স্কুলে পড়ুয়া মেয়ে নঈমা আস্তে আস্তে সংসার দেখাশোনা শুরু করল। নঈম এ লেভেল আর নঈমা ও লেভেল পরীক্ষা দিল। নঈম আশানুরূপ ব্রিলিয়েন্ট রেজাল্ট করল। দাদার ইন্তেকাল ও দাদিও ভেঙ্গে পড়া সত্ত্বেও নঈমা সংসার সামলিয়েও খুব ভাল রেজাল্ট করেছিল। নঈম লেখালেখি করে আমেরিকার নিউ ইয়র্ক স্টেটের ক্লার্কসন ইউনিভার্সিটিতে পঞ্চাশ শতাংশ স্কলারশিপ পেয়ে আমেরিকায় চলে গেল। নঈম ভাল রেজাল্ট করে প্রতি বছরই পঞ্চাশ শতাংশ স্কলারশিপ পেত আর সামার জব করে চার বছরের ভেতরেই অত্যন্ত ভাল ভাবেই কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং-এ গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে,  অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে মাস্টার্স ও পিএইচডি সম্পন্ন করে। ওখানে গ্র্যাজুয়েশন পড়বার সময়ে অস্ট্রেলিয়ার তাসমেনিয়া দ্বীপ থেকে আগত তার এক সহপাঠী অস্ট্রেলিয়ান মেয়ে প্যামেলা স্যান্ডার্সের প্রেমে পড়ে। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন পড়া চলাকালীন সময়েই তারা বিয়ে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যারিড গ্র্যাজুয়েট এ্যাপার্টমেন্টে থাকত। স্ত্রীর পরামর্শে নঈমের অস্ট্রেলিয়ার ইমিগ্রেশনের জন্য আবেদন করে। খুব তাড়াতাড়ি নঈমের ইমিগ্রেশন হয়ে গিয়েছিল। নঈমের স্পেসিয়ালাইজেশন ছিল সাইবার সিকিউরিটির উপর। নঈম খুব সহজেই এক অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি কোম্পানির সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্টে উচ্চ পদে নিয়োগ পায়। নঈমের কর্মক্ষমতা ও দক্ষতায় কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হয়ে ওকে কোম্পানির উপপ্রধান হিসাবে পদোন্নতি দেয়। নঈম আর দেশে ফিরে আসে নাই।

নঈমা এ লেভেল পড়াকালীন সময়ে ওর দাদি ইন্তেকাল করেন। পাশ করার পর আমি নঈমাকেও বিদেশে পাঠাবার প্রস্তাব করেছিলাম কিন্তু ও রাজি হয় নাই। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে নঈমা চলে গেলে আমার চরম অসুবিধা হবে চিন্তা করেই ও দেশে থেকে যায়। নঈমা ভর্তি হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অফ ফাইন আর্টসের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগে। প্রথম বর্ষে থাকতেই নঈমা বুয়েটের মুরাদ হাসানের সাথে প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। তখন মুরাদ হাসান ছিল শুধু ক্লাসেই নয় সারা ডিপার্টমেন্টের সব চাইতে ভাল ছাত্র। মুরাদ প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক হয় এবং নিজ বিভাগে লেকচারার হিসাবে যোগদান করে। নঈমাও প্রথম শ্রেণি পেয়ে স্নাতক হয়। মুরাদ নঈমাকে বিয়ে করে বুয়েটের পলাশীর লাল টিচারস কোয়ার্টারে উঠে যায়। দুই বছর পর মুরাদ এ্যাসিসটেন্সশিপ নিয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কানাডায় চলে যায়। মুরাদ কানাডা যাবার আগ পর্যন্ত নঈমা দুই দিন পর পর বাসায় এসে আমার উপর খবরদারী করত। আমি শেভ করি নাই কেন ? আমি দুই দিন ধরে একই শার্ট পরে আছি কেন? ইত্যাদির কৈফিয়ত আমাকে দিতে হত। এছাড়াও প্রতিদিন ফোন করে বুয়াকে রান্নার, ঘর গোছানসহ সংসারের সব রকম কাজের নির্দেশ দিত। বিকেলে আমি হাঁটতে গিয়েছি কিনা, আমার ওষুধ ঠিক মত খাচ্ছি কিনা ইত্যাদি সবই দূর থেকে খেয়াল রাখত।

নাদিম সেন্ট জোসেফ স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় এ প্লাস পেয়েছিল। কিন্তু নাদিমের ভবিষ্যতে ব্যবসা করবার ইচ্ছা ছিল বলে, কমার্সে ঢাকার সব চাইতে নামকরা কলেজ, ধানমন্ডিতে সিটি কলেজে ভর্তি হল। এইচএসসিতে ফিজিক্সে নাদিমের নম্বর ছিল ৮৩র ওপরে। নঈমার ইচ্ছা ছিল নাদিম যেন ফিজিক্সে অনার্স করে। নাদিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্সে ভর্তি না হয়ে সিটি কলেজেই তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকল। নাদিম ভালভাবেই কমার্সে স্নাতক হল। ওর আর স্নাতকোত্তর করবার ইচ্ছা হল না। নাদিম বাপের সাথে ব্যবসায় নেমে গেল। 

নঈমা চোখের জলে কানাডা চলে গেল। অসহায় আমি আরো অসহায় হয়ে পড়লাম। ছেলে মেয়েদের অব্যাহত অনুরোধে আমি প্রতি বছর এক মাস করে অস্ট্রেলিয়া আর কানাডা থেকে আসতাম। 

রুমা মজুমদার বাবা মা আর এক বড় ভাই, এই চারজন মিলে কোলকাতার টালিগঞ্জে থাকেন। রুমারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী। বাবা, তরুণ মজুমদার আইআইটি খড়গপুর থেকে কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করে একটা মাল্টিন্যাশনাল আইটি ফার্মের কোলকাতা অফিসে কর্মরত ছিলেন। সম্প্রতি তিনি বদলি হয়ে তার কোম্পানির ব্যাঙ্গালোর অফিসে উপ প্রধান হিসাবে যোগদান করেন। তরুণ বাবু তাঁর ছেলে ও মেয়েকে স্থানীয় উচ্চ বেতনের এক নামকরা স্কুলে ভর্তি করে দেন। এই স্কুলে সহশিক্ষা চালু আছে। উচ্চ বেতনের এই স্কুলে প্রতি ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা বেশি না। রুমা ভর্তি হল ক্লাস ফাইবে। ক্লাসে মোট ত্রিশজন ছাত্র-ছাত্রী, এর মধ্যে বারোজন ছাত্রী। রুমার বড় ভাই বরুণ মজুমদার পড়াশোনায় ভাল আর রুমা পড়াশোনায় মধ্যমানের। তবে রুমা নিয়মিতভাবে পাশ করে এখন ক্লাস নাইনে পড়ছে।  

ছাত্রীদের ভেতরে রুমা সব চাইতে সুন্দরী, সব চাইতে ফর্সা। লম্বায় প্রায় পাঁচ ফিট পাঁচ ইঞ্চি বা আরো লম্বা হতে পারে। রুমা মোটা না তবে একটু চিকনের দিকে, মানে স্লিম ফিগার। স্বাস্থ্য ভাল। গোলগাল মুখ, থুতনিটা একটু চোখা। ঠোঁটটা পাতলা আর গোলাপি। মুখে সব সময়েই এক ফালি হাসি লেগেই থাকে। হাসলে ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ছোট ছোট মুক্তার মত ঝক ঝকে দাঁতগুলো দেখা যায়। চোখ দুটা ঘন কালো, বড় বড় আর গোল। চোখের পাপড়িগুলো ঘন কালো, একটু পাতলা আর লম্বা। ভ্রূ দুটাও চোখের পাপড়ির মত ঘন কালো। ক্লাসের অন্যান্য মেয়েদের চেয়ে তার বুকটা একটু ভরাট আর নিতম্বটাও একটু ভারী। রুমা স্কুলে বা ঘরে সব সময়েই শালীনভাবে পোশাক পরে। স্কুলে ছেলেদের পোশাক ডিপ এ্যাস কালারের ফুল প্যান্ট, সাদা হাফ শার্ট আর সাথে স্কুলের লোগো লাগান টাই। মেয়েদের পোশাক ডিপ এ্যাস কালারের স্কার্ট, সাদা হাফ শার্ট আর সাথে স্কুলের লোগো লাগান টাই। স্কুলের বেশির ভাগ মেয়েদের স্কার্টের ঝুল হাঁটুর দুই থেকে চার ইঞ্চি ওপরে। আর রুমার স্কার্টের ঝুল সব সময়েই হাঁটুর নীচে। শার্টটা বেশি লুজ, তাতে বুকের ভাঁজ বোঝা যায় না। অন্যদিকে বেশিরভাগ মেয়েদের শার্ট বডি ফিটিং, তাতে ব্রার আভাষ স্পষ্ট বোঝা যায়। কেউ কেউ আবার ওপরের দুই একটা বোতাম সব সময়ে খোলা রেখে ক্লীভেজ দেখিয়ে বেড়ায়।

বিশ্বনাথ গুন্ডাপ্পা, সবাই বিশ্ব বলে ডাকে, কেরালার ছেলে। বিশ্বরা জৈন ধর্মাবলম্বী। পড়াশোনা করছে স্থানীয় এক নামকরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। বিশ্ব খুবই ভাল ভাবে ‘ও’ লেভেল পাশ করে এখন ইলেভেনথ ক্লাসে পড়ছে। দক্ষিণ ভারতীয়দের মত বিশ্বনাথও অঙ্কে খুবই ভাল। কেরালার লোকজন সাধারণত বেশ কালা হয় তবে বিশ্বও ফর্সার দিকেই। বিশ্ব লম্বায় প্রায় পাঁচ ফিট আট ইঞ্চি ও আনুপাতিক হারে চওড়া। স্বাস্থ্যটা বেশ ভাল। বুকের ছাতিটা ইর্ষণীয়। পেটটা ফ্ল্যাট। শরীরে কোথাও কোন চর্বি নেই। হাত পা সবই একটু লম্বা মনে হয়। লম্বাটে মুখ, পাতলা ঠোঁট, একটু খাড়া নাক। তবে বড় বড় দাঁতগুলো একদম ঝকঝক করে। চেহারাতে একটু রুক্ষতা আর পুরুষাল ভাব আছে। কালো চুলগুলো সব সময়েই ভদ্রভাবে ছাঁটা থাকে আর পরিপাটি করে আঁচড়ান থাকে। লম্বা বিশ্ব বেশ আকর্ষণীয় চেহারার অধিকারী। বিশ্বরা আর রুমারা একই মহল্লায় পাশাপাশি বাসায় থাকত।

সুন্দরী রুমা আর আকর্ষণীয় চেহারার বিশ্ব পরস্পরের সঙ্গ পছন্দ করত, ভাল লাগত। অভিভাবকদের চোখের আড়ালে তাদের দুজনাকে এক সঙ্গে দেখা যেত। রুমা ক্লাস নাইনে উঠলে তাদের এই পরস্পরের ভাললাগাটা ভালবাসায় পরিণত হল। বিশ্ব ‘ও’ লেভেল আর ‘এ’ লেভেল খুব ভাল ভাবেই পাশ করলো। কিন্তু রুমা ক্লাস পরীক্ষায় খুব একটা ভাল করতে পারলো না। রুমা ভর্তি হল স্থানীয় মহিলা কলেজে ‘আচার্য পাঠশালা কলেজ অফ আর্টস এন্ড সাইন্স, ব্যাঙ্গালোর’। রুমা ভর্তি হল ঠিকই তবে এখানে রুমা তার কোর্স শেষ করতে পারল না।

বিশ্ব ভর্তি হল ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট আফ টেকনোলজি-তে (আইআইটি) দিল্লীতে।  

বিশ্ব দিল্লী যাবার আগে রুমা আর বিশ্ব একটা রেস্টুরেন্টে বসে আলাপ করছিল,

“বিশ্ব, তুমি তো সব চাইতে নামি ইন্সটিটিউটে ভর্তি হলে। পাশ করলেই তো ভাল চাকরি পাবে। তোমার পিছে তো বড় লোক মেয়ের বাপেরা লাইন লাগবে। তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করে দিতে চাইবে। তখন তো আমাকে আর তোমার মনে পড়বে না।”

“রুমা, ঠিক এই কথাটা তো আমিও বলতে পারি। আমি তোমার আউট অফ সাইট আউট অফ মাইন্ড হয়ে যাব। তোমার মত সুন্দরীদের পেছনে বড়লোক ছেলের বাপেরা লাইন লাগাবে। বিয়ে করেই তুমি বাড়ি গাড়ির মালিক হয়ে যাতে পারবে। তখন হয়ত আর আমাকে তোমার মনে পড়বে না।”     

“আমাদের সামনে তো অনেক পথ যেতে হবে। এই সময়ের ভেতরে অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে। হয়ত আমাদের দুজনার পথ দুদিকে যাবে। আমাদের কিছুই করার থাকবে না।”

“রুমা, আমি তোমাকে হারাতে চাই না। আমি প্রস্তুত হয়েই এসেছি।”

বলেই বিশ্ব রুমার বাঁ হাতের অনামিকাতে একটি ছোট্ট আংটি পরিয়ে দিল। আনন্দে আর বিস্ময়ে রুমার চোখ দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়তে থাকল। কোন মতে বলতে পারলো,

“বিশ্ব তুমি আমাকে এত ভালবাস। কিন্তু আমি তো তোমার দেওয়া এই আংটি পরে থাকতে পারব না। বাসায় এই আংটির কি ব্যাখ্যা দেব আমি? তবে তোমার দেওয়া এই আংটি আমি ফিরিয়ে দেব না। সব সময়েই আমি আমার সাথে রাখব।”

বলে রুমা আংটিটা খুলে ওর ব্রার ভেতরে চালান করে দিল।

“আমাদের মিলন না হওয়া পর্যন্ত তোমার এই আংটি সব সময়েই আমার হৃদয়ের কাছে থাকবে। চব্বিশ ঘণ্টাই আমার সাথে থাকবে। রাতে আমি তোমার এই আংটিটা পরে থাকব। বিশ্ব, আমার বাসা থেকে কিন্তু আমার বিয়ের ব্যাপারে এখনই চিন্তা ভাবনা শুরু করে দিয়েছে, অবশ্য সে রকম সিরিয়াসলি না।”

“সেটা তো একটা চিন্তার বিষয়। হঠাৎ কোন ভাল সম্বন্ধ আসলে তোমার বাবা মা হয়ত ফেলতে পারবেন না। সেটার একটা সমাধান আমি পেয়েছি। চল আমার সাথে।” 

বলেই রুমাকে নিয়ে সোজা ম্যারিজ রেজিস্ট্রারের কাছে চলে আসল।

“বিশ্ব, তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে এলে ?”

“কেন বুঝতে পারছ না। তোমার আপত্তি আছে নাকি?”

“না। তবে যতদিন সম্ভব আমরা এটা গোপন রাখব। আমি স্নাতকোত্তর করব বলে আমার বিয়ে ঠেকিয়ে রাখব। ততদিনে তুমি বিটেক আর এমটেক করে ফেলতে পারবে।”

বিশ্ব আর রুমার বিয়ে হয়ে গেল। ওরা ওদের বিয়েটা রুমার স্নাতকোত্তর করা পর্যন্ত গোপন রাখতে পারে নাই। 

রুমা স্নাতক হবার আগে থেকেই ওর বাড়ি থেকে ওর বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া শুরু করলো। ইতিমধ্যে বিশ্ব এমটেক করে দিল্লীতেই একটা স্থানীয় মধ্যমানের আইটি ফার্মে প্রোগ্রামার হিসাবে যোগদান করে। কিছুদিনের ভেতরেই বিশ্ব সাইবার সিকিউরিটিতে একজন দক্ষ হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল। বাড়ি থেকে বিয়ের চাপ দিতেই রুমা বললো,

“আমি বিয়ে করব ঠিকই। আমি আমার পছন্দমত বিয়ে করব। তোমাদের ওর জন্য চিন্তা করতে হবে না।”

“খুব ভাল কথা। তোমার কোন পছন্দ থাকলে আমাদের জানাও। আমরা প্রস্তুতি আরম্ভ করতে পারি।”

“আমার পছন্দকে তোমরা ভাল করেই চেন। ও হচ্ছে বিশ্ব।”

“তোমার পছন্দ আমাদের পছন্দ না। আমরা রাজি না।”

“কেন? ও কোন দিকে দিয়ে তোমাদের জামাই হবার অযোগ্য?”

“ও সব দিক দিয়েই অযোগ্য। প্রথমত সে ভিন্ন ভাষী তার উপরে সে ভিন্ন জাতির, ভিন্ন কৃষ্টির, ভিন্ন ধর্মী। তেলে জলে কোন দিনই মিল হয় না। বিশ্বকে ভুলে যাও।”

“সেটা আমার দ্বারা সম্ভব হবে না।” 

বলে রুমা ওর ঘর থেকে ওদের বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের কাগজটা বাবা মাকে দেখাল।

“তোমরা দেখি আগেই বিয়ে করে ফেলেছ। বিয়ে যখন করেই ফেলেছ, তখন তো আমাদের করবার কিছু নেই। তবে আমরা বিশ্বকে মেনে নেব না। তুমি আমাদের মেয়ে। আমাদের মেয়ে হিসাবে তুমি যতদিন ইচ্ছা আমাদের সাথে থাকতে পর। বিশ্বের স্ত্রী হিসাবে আমাদের এখানে তোমার বা তোমাদের কোন জায়গা হবে না। তবে ভবিষ্যতে কোন সমস্যায় পড়লে তুমি আমাদের কাছে ফিরে আসতে পারবে। এটাই আমাদের শেষ কথা।”

বিশ্বের পরামর্শক্রমে ঠিক এক সপ্তাহ বাদে রুমা এক কাপড়ে বাসা থেকে বেরিয়ে সোজা দিল্লীতে বিশ্বের বাসায় উঠল। রুমা ট্রান্সফার নিয়ে দিল্লীর শ্যামনাথ মার্গে অবস্থিত ইন্দ্রপ্রসাদ মহিলা কলেজে ভর্তি হয়ে ওর স্নাতক পর্ব শেষ করল। এই পর্যায়ে রুমা দুটা ধাপ আতিক্রম করল। রুমা স্নাতক হল আর সেই সাথে এক পুত্র সন্তানের মা হল। ছেলের নাম রাখল ঋষি গুন্ডাপ্পা। ওরা একজনের বেতনে একটু গরিবি হালে সংসার শুরু করল। ঋষি আস্তে আস্তে বড় হতে থাকল। স্কুল ও কলেজে ঋষি তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পেরেছিল।

ঋষি বাপের মতই মেধাবী ছিল। খুব ভাল ভাবেই স্কুল কলেজের গণ্ডি পার হয়ে ঋষি তার মেধার জোরে খুব সহজেই এনইইটি-ইউজি পরীক্ষায় উচ্চ নম্বর পেয়ে বিশ্ববিখ্যাত দিল্লীর এআইআইএসএস-এ এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হল। মেডিকাল পড়বার সময়ে ঋষির সাথে পড়াশোনায় পাল্লা দেবার একজনই ছিল, কাশ্মীরের জারিনা। পড়াশোনায় রেষারেষি করতে যেয়ে দুজনার ভেতরে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠল, যেটা শেষ পর্যন্ত ভাললাগা ও ভালবাসায় পরিণত হল। ডেন্টাল সার্জারির এমবিবিএস পরীক্ষায় জারিনা হল প্রথম আর ঋষি হল দ্বিতীয়। দুজনেই দিল্লীর স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালে যোগদান করল।   

বাবা মা’র আশীর্বাদ নিয়ে ঋষি আর জারিনা দুজনে বিয়ে করল। বিশ্বের পরিবার হয়ে উঠল একটা আদর্শ সর্বভারতীয় পরিবার। স্ত্রী বাঙালি হিন্দু, নিজে কেরালার জৈন, ছেলে ঋষি দিল্লীর (তার জন্ম দিল্লীতে বলে নিজেকে দিল্লীর ছেলে বলে) আর তার পুত্রবধূ কাশ্মীরের মুসলমান। বাবা বা মা’র কার ধর্ম পালন করবে ঠিক করতে না পেরে ঋষি কোন ধর্মই পালন করে না। তবে ঋষি স্ত্রীর ধর্ম পালন করতে বাধা দেয় না। স্ত্রীর নামাজের জায়গাকে সম্মান করে ঋষি ওখানে যায় না। বিশ্বের সর্বভারতীয় পরিবার একটি আদর্শ সুখি পরিবার হিসাবে গড়ে উঠল। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা অন্য রকমের, তাদের সুখি পরিবারের সুখ বেশিদিন টিকল না। এক রাতে বিশ্ব ঘুমের ভেতরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করলেন। রুমা বাঙালি বিধবা হিন্দু মহিলাদের মত সাদা সুতির শাড়ি পরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ছেলে আর ছেলের বৌয়ের আপত্তির মুখে তার ঐ ইচ্ছা পূরণ করতে পারলেন না।  

ঋষির সহপাঠী বন্ধুদের অনেকই অনেক বেশি বেতনে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডে অভিবাসী হয়ে চলে যাচ্ছিল। বন্ধুদের সাথে হুজুগে পড়ে ঋষিও অভিবাসী হয়ে সপরিবারে অস্ট্রেলিয়া চলে এলো। অস্ট্রেলিয়াতে ডেন্টিস্টদের পশার অনেক। ওরা দুজনেই খুব সহজেই সিডনির এক ক্লিনিকে যোগদান করল। বছর দুয়েক পর, ওরা ব্যাংকের সহায়তায় সিডনির তারামুড়াতে নিজম্ব একটা ক্লিনিক খুলতে সক্ষম হল। তারামুড়াতে ওদের ক্লিনিকটাই একমাত্র ডেন্টাল ক্লিনিক হওয়াতে খুব তাড়তাড়ি ওদের পশার বিস্তার হল। ঋষি আর জারিনা দুজনেই সকাল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত ক্লিনিকে ব্যস্ত থাকে। রুমা সারাদিন একা একা থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে উঠতে থাকল। ঋষি আর জারিনা খেয়াল করে দেখেছে যে তারামুড়া আর এর আশে পাশে বেশ অনেক ভারতীয়, বাংলাদেশী, পাকিস্তানি ও শ্রীলঙ্কান অভিবাসী বাস করে। তবে এখানে কোন ভারত উপমহাদেশীয় খাদ্যদ্রব্যাদির কোন দোকান নেই। ঋষি আর জরিনা মিলে রুমাকে একটা ভারতীয় খাদ্যদ্রব্যাদির দোকান খুলে দিল। এখন আর রুমার সময় কাটাতে কোন অসুবিধা হয় না। ছুটির দিনে ঋষি আর জারিনাও রুমাকে দোকানে একটু সময় দেয়।   

বড় ছেলে নঈমকে দেশে ফিরে আসবার কথা বলাতে, ও ঘোষণা দিয়ে আমাকে জানিয়ে দিলো যে,

“যে দেশে নিরপরাধ নিরীহ সুস্থ সবল মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে লাশ হয়ে ফিরে আসে সেই দেশে আমি আর ফিরে আসব না।”

স্পষ্টতঃ সে প্রকাশ্য দিবালোকে লোকচক্ষুর সামনে তার মায়ের নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথাই বোঝাচ্ছিল। আমি তাকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছিলাম, 

“এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও তো মানুষ দেশে বাস করছে। ঐ খুন খারাপি তো তোমাদের ওখানেও হচ্ছে।”

“হ্যাঁ এটা ঠিক যে এখানেও খুন খারাপি হচ্ছে। এখানে আরো ভয়াবহভাবে হচ্ছে। মানুষ স্যান্ডউইচ খেতে খেতে এম ১৬ রাইফেল দিয়ে পনের বিশ জন নিরীহ মানুষ মারছে। পার্থক্যটা হচ্ছে যে এই দেশে খুনিরা ধরা পড়ছে, বিচার হচ্ছে আর শাস্তিও পাচ্ছে। এদেশে শাস্তি মওকুফ হয় না। আর আমাদের দেশে খুনিরা রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে ধরা ছোওয়ার বাইরে থাকছে। কখনও কখনও ধরা পড়লে বিচার হয়। রাষ্ট্রপতি ফাঁসির আসামীকে একবার ফাঁসির শাস্তি কমিয়ে জাবৎজীবন কারাদণ্ড দেন আবার সেই আসামীর সেই শাস্তিও সম্পূর্ণভাবে মওকুফ করে দেন। সবই হয় রাজনৈতিক বিবেচনা আর সর্বোচ্চ মহলের সাথে ভাল সম্পর্ক থাকার কারণে। অন্যদিকে এদেশে রাজনৈতিক পরিচয়ে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। আইন সবার জন্যই সমান। আমার মা, আমার জন্মদাত্রী নিরীহ মা, যার দুধ খেয়ে আমি বেঁচে আছি, দিনে দুপুরে জনসমক্ষে তার মাথার খুলি উড়ে যাওয়া আমি কোনদিনই ভুলতে পারব না। আব্বু তুমি আমাকে একটা নিরাপত্তাহীন দেশে ফিরে আসতে অনুরোধ কোরো না।”

“দেখ বাবা তোমার মাকে আমি তোমার চেয়ে বেশি দিন চিনি, বেশি ভালভাবে চিনি। সে ছিল আমার জীবন সঙ্গিনী, আমার সব কিছুরই ভাগিদার। আমরা দুজন দুজনার সুখ দুঃখ একসাথে শেয়ার করতাম। অসুখবিসুখে দুজন দুজনার পাশে থাকতাম। আমার বা তার সব রকমের ভাল বা মন্দ চিন্তা ভাবনা বা ফ্যান্টাসি সবই শেয়ার করতাম। আমাদের ভেতর কোন রকম লুকোচুরি ছিল না, কারো কোন কিছুই গোপন ছিল না। আমরা পরস্পরের কাছে একদম স্বচ্ছ ছিলাম। তোমার ছোট ভাই নাদিমের সাথে আমি সারাদিনই ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকি। রাতে ঘরে ফিরে দুজন দুজনার মত থাকি। অবশ্য খাবার টেবিলে আবার কথা হয়। এরপর থেকেই আমি একা, ভীষণভাবে একা, অসহনীয়ভাবে একা। কথা বলার সঙ্গী নেই, চিন্তা ভাবনা শেয়ার করার লোক নেই। আমি আগে ভালবাসা কাকে বলে জানতাম না, তোমার মা’ই আমাকে ভালবাসতে শিখিয়েছে। এখন আমাকে অনেক কষ্ট করে ঘুমাতে হয়। আমি তবুও বেঁচে আছি, দেশে আছি।”

“আব্বু দেশ আমাকে কি দিয়েছে। দিয়েছে নিরাপত্তাহীনতা। তাই ভরা দুপুরে লোকজনের সামনে আমার মা’র মাথার খুলি উড়ে গিয়েছিল। আমার নিরাপরাধ মা’র সেই বীভৎস দেহের কথা আমি জীবনেও ভুলতে পারব না।”

“বাবা, এই দেশ তোমাকে আমাকে অনেক কিছুই দিয়েছে। বাংলাদেশ না হলে আমরা আজও পাকিস্তানীদের দ্বারা নিপীড়িত নিষ্পেষিত হতাম। আমি হয়ত একটা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হতাম, দিন আনতাম দিন খেতাম। পাঞ্জাবি শাসকদের সহযোগিতায় পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীদের জন্য আমরা ব্যবসার ধারে কাছেও যেতে পারতাম না। দেশের সরকারের ভর্তুকির টাকায় তোমরা সবাই পড়াশোনা করতে পেরেছ। তাই তোমরা আজ মাস্টার্স ডিগ্রি করছ, পিএইচডি করছ। দেশের সবারই জন্মের পর থেকেই তাদের প্রতিটি দৈনন্দিন কাজে সরকারের ভর্তুকি আছে। দেশ আমাকে, তোমাকে, সাবইকেই অনেক কিছু দিয়েছে। এখন দেশে আসা না আসা তোমার ব্যাপার।” 

নইম তবুও আর দেশে আসে নাই। 

নঈমা ও লেভেল পড়া চলাকালীন সময়ে আমার মা অর্থাৎ ওর দাদি ইন্তেকাল করেছিলেন। তখন আমার ঐ অবস্থায় আত্মীয় স্বজনেরা আমাকে বিয়ে করে আমার সংসারটায় স্বাচ্ছন্দ্য আনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমি সবাইকে আগেও বলেছিলাম আবার তখনও বলেছিলাম যে আমাদের যত কষ্টই হোক না কেন আমি কোনদিনই আমার ছেলে মেয়েদেরকে একজন সৎমার কাছে দেব না। নঈমা নিজ থেকেই সংসারের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছিল। নঈমা একটুকু মেয়ে যে কিভাবে সব সামলাত আমি এখনও বুঝি না। আমার প্রতি ওর বিশেষ নজর ছিল। আমার যাতে কোন অসুবিধা না হয় সেদিকে তার প্রখর দৃষ্টি ছিল। ভাই দুজনেও বোনকে সব রকম সহযোগিতা করত। আমাদের দিন চলে যেতে থাকল। আমাদের কারো কোন রকম অসন্তুষ্টি ছিল না।     

আমার একমাত্র মেয়ে নঈমা ছিল একটু শিল্পী মনস্ক। এইচএসসি পাশ করে ভর্তি হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ ফাইন আর্টসের (আইএফএ) গ্রাফিক্স ডিপার্টমেন্টে। নঈমার আবার কম্পিউটারে বিশেষ আগ্রহ ছিল। ছোট ভাই রুবেল একটু টেকনিকাল মাইন্ডেড। স্কুলে পড়বার সময় থেকেই সে কম্পিউটারে বিশেষ দক্ষ হয়ে ওঠে। রুবেল নিজেই কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ কিনে নিজেই একটি কম্পিউটার বানিয়ে নিয়েছিল। সেটাতে নানান কারসাজি, বিশেষ করে ফটোশপের কারসাজি করে বাসার সবাইকে তাক লাগিয়ে দেওয়া ছিল তার একটা নেশা। এই দেখে নঈমাও কম্পিউটার পরিচালনায় আগ্রহী হয়ে উঠল। পুরান ছেঁড়া ফাটা ফটো আবার ঠিকঠাক করা যায় সেটা নঈমা আগেই জেনেছিল এবং দেখেও ছিল। নঈমা ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে ওয়ার্ড, পাওয়ার পয়েন্ট, এক্সেস প্রোগ্রামগুলো ভাল ভাবেই শিখেছিল। বোন নঈমা যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ ফাইন আর্টসে গ্রাফিক্স ডিজাইনে ভর্তি হবে বলে মনস্থ করল সেদিন থেকেই ছোটভাই বোনকে এডবি ফটোশপ ও এডবি ইলাস্ট্রেটার সফ্ট ওয়ার দুটা খুব ভাল ভাবে শিখিয়ে দিল। ফটোশপে ফটো সুপারইম্পোজ করবার সময়ে রেশিও (যেমন একজনের শরীরে আর একজনের মাথা জোড়া লাগাবার সময়ে মাথা আর শরীরের অনুপাত যেন ঠিক থাকে), টাইম (যেমন একটা ছবি যদি সকালের আর একটা ছবি যদি দুপুরের হয় তখন ছবি দুটার ভেতরের আলো বা উজ্জ্বলতা যেন ঠিক থাকে), ডিরেকশন (যেমন একটা ছবিতে ছায়া যদি পেছনের দিকে থাকে আর একটা ছবিতে ছায়া যদি সামনের দিকে থাকে তবে ছায়া দুটাকে একই দিকে আনতে হবে) ইত্যাদি নানান ট্রিক্স শিখিয়ে দিল। ক্লাস আরম্ভ হবার আগ পর্যন্ত  নঈমা খুব মনোযোগ দিয়ে সফ্ট ওয়ার দুটার অনুশীলন করেছিল। ছোটভাই, টিচারের মত মাঝে মাঝে সকালে বাসা থেকে বের হবার আগে বোনকে ফটোশপের দুই একটা অনুশীলনী দিয়ে যেত। রাতে রুবেল বোন নঈমার কাজগুলো দেখত। নঈমা কোথায় ভুল করল বা কোথায় আরো উন্নতি করা যেত এইসব ভাল করে বোনকে বুঝিয়ে দিত। ক্লাস শুরু হবার আগেই নঈমা গ্রাফিক্স ডিজাইনের ভিত্তি ফটোশপে মোটামুটি পারদর্শী হয়ে উঠল। পাশ করবার আগেই নঈমা একজন প্রসিদ্ধ গ্রাফিক ডিজাইনার হয়ে উঠল। হু হু করে তার হাতে কাজ আসতে থাকল। নঈমা খুব সহজেই তার আশামত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইএফএ-তে গ্রাফিক্স ডিজাইনে ভর্তি হতে পেরেছিল।  

নঈমা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের, মেকানিকাল ডিপার্টমেন্টর (বুয়েটের) ছাত্র মুরাদের সাথে প্রেমে জড়িয়ে পরে। মুরাদ ও নাঈমার প্রেম বাধাহীন ভাবে চলতে থাকল। মুরাদ ফাইনাল পরীক্ষায় দ্বিতীয় হল। সেবারে ডিপার্টমেন্টে তিনটি পদ খালি থাকায় ওরা প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারী তিনজন প্রভাষক হিসাবে যোগদান করল। নঈমাও ভাল ভাবেই স্নাতক হল। 

“মুরাদ এখন তো তুমি ইঞ্জিনিয়ার হলে আবার বুয়েটের লেকচারার হলে। তুমি তো এ্যাসিসটেন্সির জন্য আমেরিকা আর কানাডায় লেখালিখি করছ। কোথায় যাবার আগ্রহ বেশি? এর আগ পর্যন্ত তুমি কি করবে?”

“অনেক তো হাত পুড়িয়ে রান্নাবান্না করে খেয়েছি। এবারে দেখেশুনে একটা বিয়ে করে, আরাম করে বৌ-এর হাতের রান্না খাব। আমার ইচ্ছা কানাডার টরোন্টো অথবা ম্যাকগিল অথবা ভ্যাঙ্কুভার বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করবার। তবে আমি যেখানেই এ্যাসিসটেন্সি পাই সেখানেই চলে যাব। আশা করি সেখান ভাল রেজাল্ট করে আমার পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রান্সফার নিয়ে যেতে পারব। আর তুমি কি করবে ?”

“আমিও তো অনেক দিন বাপের হোটেলে খেলাম। এবার আমিও তোমার মত দেখেশুনে একটা বিয়ে করে স্বামীর হোটেলে খাব।”

“মুরাদ তোমার কি পছন্দ আছে? সে কি রান্না করতে পারে?”

“হ্যাঁ, আমি একজনকে পছন্দ করি। জানি না সে রান্না জানে কি না ? নঈমা তুমি কি রান্না করতে পার?”

“আমাকে জিজ্ঞাসা করছ কেন? তোমার পছন্দের মেয়েকে জিজ্ঞাসা কর।”

“ফাজিল, জান না তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি কেন?”

“খুব জানি। মুরাদ তুমি কি আমাদের বিষয়ে তোমার বাবা বা ভাইয়াকে বলেছ।”

“না, এখনও বলি নাই। তবে আমার বিশ্বাস আমার পছন্দকে উনারা মেনে নেবেন। আর তোমাকে অপছন্দ করবার তো কিছু নেই। তোমার বাসায় খবর কি? উনারা জানেন।”

“আমার বাসায় কোন অসুবিধা নেই। ভাইয়া তো বিদেশে থাকে, আর একটা ভাই তো ছোট ওর মতামত আমলে নেবার দরকার আছে বলে মনে হয় না, আব্বুর ঘাড়ে কয়টা মাথা আছে যে তার মেয়ের পছন্দকে দাম দেবে না। তাই করো আপিত্ত নেই। আর তোমাকেও তো অপছন্দ করার কিছু নেই।

মুরাদের বাবা খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। ছেলে তো আর হলে থাকতে পারবে না। এতদিনতো ওরা মেস বানিয়ে থাকত, খেত। এখন সবাই যার যার চাকরিক্ষেত্রে। বুয়েটে ব্যাচেলার কোয়ার্টার নেই, সবই ফ্যামিলি কোয়ার্টার। মুরাদ কোয়ার্টার পাবার যোগ্যতা অর্জন করে নাই। তাই ছেলে কোথায় থাকবে কোথায় খাবে ইত্যাদি নিয়ে তিনি খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। আত্মীয় স্বজনেরা এটার সমাধান দিলেন। মুরাদের বিয়ে দিলেই তো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। পরামর্শটা মুরাদের বাবার মনে ধরল। মুরাদের বাবা একটা পশ্চাৎপদ এলাকার এবং অল্পশিক্ষিত মানুষ হলেও, বর্তমানে প্রচলিতধারা অনুযায়ী বিয়ের আগে ছেলের পছন্দের খোঁজ নিলেন। মুরাদ নির্দ্বিধায় নঈমার কথা বলে দিল। মুরাদের বাবা লোক মারফত মুরাদ আর নঈমার বিয়ের জন্য আমার কাছে প্রস্তাব পাঠালেন। আমি একটু দ্বিধায় ছিলাম। এক অজপাড়াগাঁয়ের মাঝির ছেলের সাথে আমার মেয়ে, যে কিনা সারা জীবন ঢাকায় থেকে, প্রাচুর্য্যরে ভেতরে থেকেছে তার সাথে মেয়ের বিয়ে দিলে মেয়ের ভবিষ্যৎ কি হবে কে জানে। তবে দুটা বিষয় আমাকে সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে সহায়তা করেছিল। আমি জানতাম নঈমা সব জেনেশুনেই মুরাদকে ভালবেসেছিল। নঈমার আপত্তি না থাকলে আমি আপত্তি করবার কে? তার উপরে আছে মুরাদের সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। আমি আর আপত্তি করলাম না। মুরাদ আর নঈমার বিয়ে হয়ে গেল। প্রীতি নিহত হবার পর থেকে আমার মা আমার সংসার ছেলেমেয়ের দেখভাল করছিলেন। মা’র অসুস্থতা আর মৃত্যুর পর থেকে মেয়ে নঈমাই সংসারের কর্ত্রী হয়েছিল। বিদেশে যাবার আগে যতদিন দেশে ছিল রিমোট কট্রোলে আর আমার সাথে থেকে আমার সংসার দেখত। 

আমি আর আমার ছোট ছেলে নাদিম দেশে রয়ে গেলাম। নাদিমের অস্ট্রেলিয়া বা কানাডা যাবার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। আমাদের বিশাল ব্যবসার দেখভাল করবার জন্য আমি নাদিমকে দেশেই থেকে যেতে বলেছিলাম। আর নাদিমও দেশে আমাকে একলা ফেলে বিদেশ যেতে রাজি ছিল না। শুরু হল নারী-বিবর্জিত আমাদের বাপ বেটার সংসার। নাদিম স্নাতক হবার পর পরই আমার সাথে ব্যবসায় নেমে পড়ল। ব্যবসায়ীর ছেলের ব্যবসা ধরতে বেশি সময় লাগল না। নঈমা বিদেশ চলে যাবার পর থেকে নারী বিবর্জিত বাড়িটা একেবারে ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছিল। আমি ভাবলাম ছেলে নাদিমের বিয়ে দিয়ে ঘরে একটা বৌ আনলে হয়ত আমাদের সংসারটার একটু গতি হবে। ছেলে নাদিমের  ভালবাসার মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দিয়েছিলাম।

আমি আস্তে আস্তে নিজেকে ব্যবসা থেকে গুটিয়ে আনতে থাকলাম। নাদিম স্ত্রীর প্ররোচনায় আমাকে ছেড়ে আলাদা হয়ে গেল। নঈম আমাকে অব্যাহতভাবে তার সাথে অস্ট্রেলিয়ায় থাকবার জন্য অনুরোধ বা চাপ দিচ্ছিল। নঈমাও একই ভাবে ওর সাথে থাকবার জন্য আমাকে চাপ দিচ্ছিল। আমি একটা সমাধান বের করলাম। আমি প্রতি বছরই একবার অস্ট্রেলিয়া আর একবার কানাডা যেতে শুরু করলাম। প্রথম প্রথম ওরা কেউই আমাকে তিন মাস আগে দেশে ফিরতে দিতে চাইত না। ওরা স্বামী স্ত্রী দুজনই সারাদিন অফিসে, বাচ্চা স্কুলে। আমি সারাদিন ঘরে বসে আঙ্গুল চুষি। বাইরে যাব তারও উপায় নেই। ঐ সব দেশে গাড়ি ছাড়া কোথাও যাওয়া যায় না। আমার দুরবস্থা দেখে ওদের মায়া হল। এরপর থেকে শুধু গ্রীষ্মকালেই আমি ওদের ওখানে যেতাম। সব চাইতে সুবিধা হল যে যখন কানাডায় গ্রীষ্মকাল তখন অস্ট্রেলিয়ায় শীতকাল অনুরূপভাবে যখন অস্ট্রেলিয়ায় গ্রীষ্মকাল তখন কানাডায় শীতকাল। অবশ্য পরে আমি অস্ট্রেলিয়াতে এক ভারতীয় বাঙালি মহিলার সাথে আড্ডা মরার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে নিয়েছিলাম।

আমি প্রথমবার অস্ট্রেলিয়া আসি শনিবার। আমাকে বিমানবন্দর থেকে নিয়ে আসার সুবিধার্থে আমি শনিবার এসেছিলাম। অস্ট্রেলিয়া বিরাট একটা দ্বীপ মহাদেশ। এর সমস্ত লোকালয়গুলো সমুদ্রের ধারে। অস্ট্রেলিয়ার বিরাট মাঝখানটায় কোন লোকালয় নেই, আছে বনাঞ্চল, মরুভূমি আর পাহাড়। নঈম সিডনির পিয়ম্বলে, একটা টিলার পাদদেশে চার বেডরুমের একটা বিশাল বাড়ি কিনেছে। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে একটা পাহাড়ি খাঁড়ি বা নালা। বর্ষাকালে এই নালাটি একটি ছোট্ট খরস্রোতা নদী হয়ে যায়। এই অঞ্চলে বাড়িঘর কম। সবই একতলা তবে দুই একটা ডুপলেক্স বাড়িও আছে। নঈমের গাড়িটা নীল রংয়ের মার্সিডিজবেঞ্জ এসইউভি। ছেলে বৌ দুজনাই খুব ভাল চাকরি করে। নাতিটা হাই স্কুলে পড়ে। পরের দিন রবিবার, আমি দীর্ঘ ভ্রমণে একটু ক্লান্ত ছিলাম বলে আমাকে গাড়ি করে সিডনি ঘুরেফিরে দেখাল। 

আমি সিডনি আসার দুদিন পর থেকে শুরু হল কয়েকদিন ধরে মুষলধারে বৃষ্টি। এই রকম বৃষ্টি আমি ঢাকাতেও দেখি নাই। সিডনিবাসীদের মতে এই রকম বৃষ্টি বিগত পঞ্চাশ বছরেও হয় নাই। পাহাড়ি এলাকা বলে পানি জমে না। তবে সমতলের মহাসড়কগুলো তলিয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টিতে সৃষ্ট স্রোতে অনেক গাড়ি ভেসে গিয়েছিল। নঈম বৃষ্টির ফাঁকে ফাঁকে আমাকে সিডনির আইকনিক অপেরা হাউস, হারবার ব্রিজ, সিডনি রিভার ক্রুজ, বড় বড় শপিং মল ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল। আমার কয়েকবার অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণে নঈম আমাকে সিডনি, ক্যানবেরা ও মেলবোর্নের বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। বিরাট দেশ আর তার বিরাট সিডনি শহর। এর এক মহল্লা থেকে আর এক মহল্লায় যেতে প্রায় এক ঘণ্টা লাগে। ইউরোপ আমেরিকার মত অস্ট্রেলিয়াতেও শনি ও রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকে। সারা সপ্তাহের কাজ যেমন ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধুয়ে বাইরের লন্ড্রোম্যাটে যেয়ে ড্রায়ারে কাপড় শুকিয়ে আনতে, সারা সপ্তাহের গ্রোসারি বাজার করতে, সারা বাড়ি সাফসুতোর করতে, নাতিকে ড্রাম বাজান শেখার স্কুলে আনা নেওয়া করতেই শনিবারটা চলে যায়। একমাত্র রবিবারটাই ওরা একটু ফ্রি পায়।

অস্ট্রেলিয়ার সব চাইতে বড় গ্রোসারি সুপার স্টোর ‘কোলস’। ছোট বড় সব লোকালয়ে ওদের দোকান আছে। ছেলের বাসা পিয়াম্বলে। পিয়াম্বল থেকে তারামুরা হেঁটে যেতে পনের মিনিট লাগে। আমার কাজ নেই তাই আমি কোলস-এ যেয়ে ওদের গ্রোসারি বাজার করতাম। স্থানীয় সব বাংলাদেশি, ভারতীয়, পাকিস্তানি ও শ্রীলঙ্কান সবাই কোলসে বাজার করতে আসে। একবার কোলসের পাশেই একটা দোকানের সাইনবোর্ড আমার নজরে এলো। ইংরেজিতে বড় করে লেখা ‘ইন্ডিয়ান শপ’ আর পাশেই ছোট করে হিন্দি, বাংলা, উর্দু ও তামিল ভাষায় ‘ইন্ডিয়ান শপ’ লেখা। আগ্রহ নিয়ে দোকানে ঢুকলাম। ক্যাসে এক মধ্যবয়স্ক মহিলা বসে ছিলেন। আমি দোকানে ঘুরে ঘুরে দেখলাম ওখানে যত খাদ্যদ্রব্য রাখা আছে সবই ভারতীয়। আমি যেয়ে ঐ মহিলাকে, অবশ্যই ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করলাম 

“বাংলাদেশি কোন খাদ্যদ্রব্য আছে কিনা।”

আমি বাংলাদেশি খাবার খুজছি শুনেই উনি বুঝে ফেলেছেন যে আমি বাংলাদেশি।  

ঐ মহিলা স্পষ্টভাবে আমাকে বাংলায় বললেন,

“এখানে বাংলাদেশি আর শ্রীলঙ্কান কমিউনিটি খুবই ছোট। তাই ঐ দেশি দ্রব্যাদি রাখা পড়তায় পড়ে না। পাকিস্তানী কমিউনিটিটা একটু বড় হলেও পাকিস্তানিও দ্রব্যাদি রাখা পোষায় না। আর ভারতীয় খাদ্যদ্রবাদি তো সবাই খায়। আপনাকে তো আগে দেখি নাই। এখানে কবে এসেছেন।”

“আমি এখানে আমার ছেলের কাছে এসেছি। এই গ্রীষ্মকালটাই থাকবো। বাসার বাইরে বাংলা কথা বলতে পেরে ভালই লাগছে। সারা দিন তো আমার কোন কাজ নেই। এখানে এসে আপনার সাথে গল্প করলে আপনি কি কিছু করবেন? আমার নাম নাসিম।”

“কিছু মনে করবার প্রশ্নই আসে না। আমারও সারাদিন কোন কাজ ছিল না বলেই ছেলে আর বৌমা মিলে আমাকে এই দোকান করে দিয়েছে। আমি সারাদিনই দোকানেই থাকি। আপনি আসলে খুশি মনে বাংলায় আড্ডা দেওয়া যাবে। আমার নাম রমা।” 

“ঠিক আছে আমি চলে আসব। চা খাওয়াতে হবে কিন্তু।”

আমি পরের দিন চলে আসলাম।

“আসলে এই সব দেশ আমাদের মত বয়স্ক লোকদের জন্য নয়। ছেলে বৌ নাতি সবাই সারাদিনই অফিস আর স্কুলে থাকে। সারাদিন আমার কিছুই করবার নেই, আমি সারাদিনই ভ্যারান্ডা ভাজি। আমি নিতান্ত অনিচ্ছায় এখানে আসি। না আসলে ছেলে দুঃখ পায়।”

“কেন আপনার স্ত্রী কোথায়। উনি আসেন নাই। আপনার আর ছেলে মেয়ে আছে নাকি?”

“আজ প্রায় পঁচিশ বছর যাবৎ আমার স্ত্রী ইন্তেকাল করেছেন। আমার আর এক মেয়ে আর এক ছেলে আছে। মেয়ে কানাডায় থাকে। ওখানকার গ্রীষ্মকালে আমি কানাডায় যাই। আমার ছোট ছেলে দেশে আমার সাথেই আছে অথবা বলতে পারেন যে আমি ওর সাথে আছি।”

“আপনি তো দেখছি খুব লাকি। আপনি সারা বছর তিন মহাদেশে এশিয়া, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। ”

“হ্যাঁ, তা বলতে পারেন। আপনিও তো বোধ হয় দুই মহাদেশে থাকেন। আপনার সাহেব আর ছেলে মেয়ে কি?”

“না, দাদা আমি আপনার মত লাকি না। আমি শুধু মাত্র অস্ট্রেলিয়াতেই থাকি। আর আমি শেষ কবে ভারতে গিয়েছিলাম তা আমি মনে করতে পারছি না। বিগত দশ বছর যাবৎ আমি স্বামীহারা। আমার একটাই ছেলে। ছেলে আর বৌমা দুজনেই দাঁতের ডাক্তার। এখানে ওদের ক্লিনিক আছে।”

“আমরা দুজনেই দেখি সমব্যথায় সমব্যথি। আপনি দেশে যান না কেন? ভারতে আপনার বাবা-মা বা শ্বশুর শাশুড়ি নেই।”

“ভারতে আমার বাবা, মা, শ্বশুর, শাশুড়ি সবাই আছেন । আমি বিয়ে করেছিলাম দক্ষিণ ভারতীয় ভিন্ন ভাষী, ভিন্ন ধর্মী এক ছেলেকে। কোন বাড়িতেই আমাদের গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। আমরা দিল্লীর বাসিন্দা হয়ে যাই। আমার ছেলে বিয়ে করে ওর সহপাঠী কাশ্মিরের মুসলমান মেয়েকে। শ্বশুর বাড়িতে ছেলের গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। আমরা অস্ট্রেলিয়া চলে আসলাম। তাই আমার আর দেশে যাওয়া হয় না।”

“আপনি দেখি এক আদর্শ সর্বভারতীয় পরিবার গড়তে যেয়ে সব হারালেন। যাক আমাকে চা খাওয়াবার কথা ছিল, এখন চা খাওয়ান।”

“আমার কাছে ভারতীয় সব চাইতে ভাল ব্র্যান্ড টাটা টি গোল্ড আর ভারতীয় চায়না কোয়ালিটি দার্জিলিং-এর ‘ল্যাপচ’ চা আছে। আর আছে শ্রীলঙ্কার সব চাইতে ভাল ‘দিলমা’ চা। কোনটা খাবেন?”

“আমি আগে দিলমা’র চা খেয়েছি। অন্য দুটার ভেতরে আপনার পছন্দ মাফিক একটা দিন।”

মন্তব্য করুন