আমি নাসিম আহমেদ’

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর 20, 2026
39 জন পড়ছেন

আমি নাসিম আহমেদ। আমার বাবার নাম শামীম আহমেদ। আমার বয়স পঞ্চান্ন। আমি বিপত্নীক। আমার পরলোকগত স্ত্রীর সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল সম্বন্ধ করে। বিয়ের আগে আমি প্রীতিকে একবারই দেখেছিলাম। কাকতালীয় ভিাবে আমার জীবনের প্রথম সত্যিকারের প্রেমিকার নামও ছিল মিমি।    

মোতালেব সাহেব আমার দাদা। বাবা দাদার একমাত্র সন্তান হওয়াতে তিনি দাদার সম্পত্তি ও ব্যবসার মালিক হয়েছিলেন। আমার এক বোন আছে, আমার দুই বছরের ছোট। আমার নামের সাথে মিলিয়ে ওর নাম রাখা হয়য়েছিল নাসিমা। আমি নিয়মিতভাবে যোগাসন করতাম। তাতে আমার শরীরটা হয়ে ওঠেছিল ঋজু আর মেদহীন। আমার ঈর্ষণীয় বাইসেপ, ট্রাইসেপ আর বুকের ছাতি সবই ছিল খোদা প্রদত্ত। অনেকেই সন্দেহ করত যে আমি বোধ হয় আর্মির কমান্ডো বাহিনীর সদস্য অথবা কোন আর্মি ইন্টেলিজেন্সের সদস্য। লোকজনের সন্দেহটা আরো পাকাপোক্ত করবার জন্য আমি সব সময়েই আর্মি ছাঁটে অর্থাৎ বেশ ছোট করে চুল কাটাতাম। এই জন্য আমি অনেক জায়গাতেই একটু বাড়তি সুবিধা পেতাম। তবে আমি কোথাও ভূয়া পরিচয় দিতাম না। প্রশ্ন করলে আমি সব সময়েই একজন সিভিলিয়ান বলেই পরিচয় দিতাম। আমার চেহারাটা ছিল গড়পড়তার একটু উপরের দিকে। আমি ছিলাম পাঁচ ফিট আট ইঞ্চি অর্থাৎ সাধারণ বাঙালীদের চেয়ে একটু লম্বা। বাবার মত আমারও গায়ের রং ফর্সা বলা যাবে না, একটু শ্যামলার দিকে। আমার হাত পা সবই একটু লম্বাটে ছিল। আমার হাতের পাঞ্জা ছিল মোটা আর বিশাল আর আনুপাতিক হারে সেই সাথে আঙ্গুলগুলোও ছিল মোটামোটা আর লম্বা। আমার শারীরিক গঠন বোধ হয় সবাইকে আকর্ষিত করত। আমি দেখেছি অনেক বিবাহিতা মহিলারাও, সাথে তাদের স্বামী থাকা সত্ত্বেও আমার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন। আমি মনে মনে খুব গর্ব বোধ করতাম। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময়ে আমার আকর্ষণীয় শারীরিক গঠনের জন্য আমার সহপাঠী বান্ধবীদের কাছ থেকে বেশ সুযোগ নিয়েছিলাম।  

আমার বাবা ছিলেন বেশ লম্বা আর দেখতে বেশ সুন্দর। তাঁর গায়ের রং ফর্সা বলা যাবে না, একটু শ্যামলার দিকে।  তিনি সেনাবাহিনিতে মেজর পদে কর্মরত ছিলেন। সেনাবাহিনির কঠোর পরিশ্রমে আর অনুশীলনে আব্বুর শরীরটা হয়ে উঠেছিল মেদহীন আর পেটা। আমি আমার শারীরিক গঠন, উচ্চতা আর গায়ের রং বোধ হয় আব্বুর কাছ থেকেই পেয়েছিলাম। আম্মু দেখতে ছিলেন সাধারণ বাঙালি মহিলাদের মতই, তবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ফর্সা। তাঁর উচ্চতা ছিল সাধারণ বাঙালি মহিলাদের মতই অর্থাৎ পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি। আম্মুর মুখটা ছিল গোলাকার, গালগুলো ছিল ফোলা ফোলা। তাঁর ঠোঁট ছিল পাতলা আর গোলাপি, নাকটা ছিল বেশ খাড়া। আম্মুর চুল ছিল শর্ট, ঘাড়ের একটু নিচ পর্যন্ত। তাঁর শারীরিক গঠন ছিল বেশ আবেদনময়ী, ভারী বুক আর ভারী নিতম্ব। আম্মু সব সময়েই খুব শালীন ভবে পোশাক পরতেন। আম্মুর সব কিছুই আব্বুর পছন্দ ছিল। মহিলাদের চুল নিতম্ব পর্যন্ত না হলেও নিদেনপক্ষে কোমর পর্যন্ত লম্বা, সোজা, ঘন, আর সিল্কি চুল আব্বুর খুব পছন্দ ছিল। তাই আম্মুর একমাত্র চুল নিয়ে আব্বুর একটু খুতখুতানি ছিল। 

আমার বোন নাসিমা আব্বুর উচ্চতা আর আম্মুর শারীরিক গঠন আর রং পেয়েছিল। মুখটা ছিল আম্মুর মুখের মতই গোলাকার তবে থুতনিটা ছিল একটু চোখা। আম্মুর মতই ওর ঠোঁট ছিল পাতলা আর গোলাপি, নাকটা ছিল খাড়া। বাঁদিকের ঠোঁটের ওপরে একটা ছোট্ট কালো তিল ছিল, যেটা ওর সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল। নাসিমার দাঁতগুলো ছিল মুক্তারমত সাদা ধবধবে। কথা বলার সময়ে বা হাসলে ওর দাঁতগুলো একটু বেরিয়ে পড়ত আর বাঁদিকে একটা গজদন্ত দেখা যেত। ওর চোখ দুটা ছিল টানা টানা, বড় বড়. ঘন কালো, যাকে বলে হরিণ চোখ। চোখের পাপড়ি ছিল লম্বা, ঘন আর মোটা মোটা। চোখের ভ্রূ ছিল মোটা। ভ্রূর লোমগুলো ছিল পাতলা, ঘন কালো আর লম্বা। নাসিমার দুই গালেই টোল পড়ত। জন্মের সময় থেকেই নাসিমার মাথা ভর্তি ঘন কালো সিল্কি চুল ছিল। আব্বু কোন সময়েই নাসিমার চুল কাটতে দিতেন না, আব্বু নিজেই মাঝে মাঝে চুলের আগাগুলো কেটে ইউ শেপ করে দিতেন। নাসিমার চুল হয়েছিল, আব্বুর পছন্দমত, একম সোজা, সিল্কি আর কোমর পর্যন্ত লম্বা। মেয়েদের চুলের যত্নের জন্য যত রকমের টয়লেট্রিজ পাওয়া যায় আব্বু সবই কিনে আনতেন। এই নিয়ে আম্মুর সাথে আব্বুর মধুর খুনশুটি চলত।

“কি ব্যাপার তুমি দেখি মেয়ের প্রয়োজনের দিকে খুব খেয়াল রাখ। ছেলের প্রয়োজনের দিকে সে রকমের খেয়াল করতে দেখলাম না।”

“অস্বীকার করব না যে মেয়ের প্রতি আমার একটু দুর্বলতা আছে, ঠিক যেমন ছেলের প্রতি তোমার বিশেষ দুর্বলতা আছে। এই বাবা-মায়ের বিপরীত লিঙ্গের সন্তানদের দুর্বলতা সর্বজনীন। দুনিয়ার সব দেশেই এটা আছে।” 

“মেয়ের জন্য তো কত রকমের টয়লেট্রিজ আন, সব তো আমি চিনিও না। তোমার কি কোন গার্লফ্রেন্ড আছে? সে কি তোমাকে সব বলে দেয়। আমার জন্য তো জীবনেও কিছুই আনলে না।” 

“হু, আমার একটা গার্লফ্রেন্ড আছে। তার চুল ঘোড়ার লেজের মত। সে চুলের যত্নের কিছুই জানে না। সে বিনা বেতনে আমার বান্দিগিরি করে। অবশ্য রাতে আমার সাথে আমার বিছানা শেয়ার করে।” 

“তোমার গার্লফ্রেন্ডকে তো চিনলাম। সে কি বানের জলে ভেসে এসেছে?”

“সে বানের জলে ভেসে আসবে কেন? আমি তার সমস্ত ভাল মন্দ, সুখ দুঃখ, ভালবাসা শেয়ার করবার কথা দিয়ে রীতিমতো দাসখত লিখে ঘরে এনেছি। তার প্রয়োজনীয় সবই দেবার চেষ্টা করেছি। আর আমি নিশ্চিন্ত যে আমাকে সারা জীবনই এই ‘না পাবার’ বা ‘না দেবার’ খোঁটাটা শুনতে হবে। আর সব চেয়ে বড় কথা সে তো পরের মেয়ে।”

“পরের মেয়েকে বিদায় করে দিলেই পার।”

“ঐ পরের মেয়েটা এতদিন ধরে আমার সাথে আছে, তাই একটু মায়া বা ভালবাসা জন্মেছে। তাই বিদায় করবার কোন প্রশ্নই আসে না।

“মানুষ তো কুকুর বিড়াল পোষে। ওদের প্রতি তো মায়া জন্মে।”

“ঠিক তাই। তবে কুকুর বা বিড়াল যে ভালবাসা পায় সেটা অন্য রকম। স্ত্রীরা তাদের স্বামীর উপরে অধিকার পায়, সেই অধিকার বলে তারা তাদের কর্তৃত্ব ফলায়। স্বামী-স্ত্রীর ভালবাসা স্বর্গীয়। যাক অনেক খুনশুটি হয়েছে, এখন বল তোমাকে আমি কি কি দেই নাই, আর তুমি এখন আমার কাছে কি চাও।”  

“আমার বয়ফ্রেন্ডটা কি রাগ করেছে? সত্যি বলছি তুমি আমার চাওয়ার কিছুই অপূর্ণ রাখ নাই। আমাকে ভালবাসা দিয়ে, আদর দিয়ে ভরিয়ে রেখেছ। এখন আমি তোমার উলঙ্গ শরীরের স্পর্শ পেতে চাই, তোমার শরীরের পুরুষালি গন্ধ পেতে চাই, তোমার ঘামের গন্ধ পেতে চাই, তোমার কাছে নিষ্পেষিত হতে চাই, তোমার প্রচণ্ড রকমের আদর চাই।” 

“তুমিই তো বলেছে, আমি তোমার কোন চাওয়াই অপূর্ণ রাখি নাই। আজকের চাওয়াটাও অপূর্ণ রাখব না। এসো।”

দাদা হার্ট এ্যাটাকে ইন্তেকাল করলে, আব্বু স্বেচ্ছা অবসর গ্রহণ করে দাদার ব্যবসার হাল ধরেন। আমরা থাকি বনশ্রীর মেরাদিয়ায়। বাড়িটা আমাদের নিজেদের। আমার দাদা এইখানে ছয় কাঠার একখণ্ড জমি কিনে একটা একতলা বাড়ি বানিয়েছিলে। কালক্রমে আমাদের এলাকাটা একটি ব্যস্ত আবাসিক এলাকায় পরিণত হয়। আব্বু একজন সফল ব্যবসায়ী। সফল এই জন্যই যে তিনি আমার দাদার রেখে যাওয়া মৌচাক মার্কেটের একটি শাড়ির দোকান থেকে এখন চারটি দোকানের মালিক। তার সব চাইতে বড় শাড়ির দোকানটা শাড়ির জন্য বিখ্যাত বেইলী রোডের সব চাইতে বড় দোকান, গাউসিয়া মার্কেটে একটা বিশাল দোকান আর এলিফ্যান্ট রোডের ইস্টার্ন প্লাজায় একটা দোকান। আমরা এখন প্রাচুর্যের ভেতরে আছি। 

আমরা দুই ভাই বোনই ভাল ভাবে এইচএসসি ও এসএসসি পাশ করলাম। আমি ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে এখন নিকটবর্তী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছিলাম আর বোন নাসিমা ভিকারুন্নেসা স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি পাশ করে ঐ কলেজে পড়ছিল। স্কুলে পড়া অবস্থাতেই নাসিমার রূপ আর শারীরিক গঠন সবাইকে আকৃষ্ট করতে থাকল। স্থানীয় উঠতি বয়সের কিশোর আর যুবকেরা আমাদের বাসার আশেপাশে আর নাসিমার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে লাগল। কিছুদিন যেতেই স্থানীয় মাস্তানরা নাসিমার পেছনে লেগে গেল। নাসিমা কলেজে ভর্তি হবার পর থেকে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠল। পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য আমরা মেরাদিয়ার বাসা ভাড়া দিয়ে ইস্কাটনে, দিলু রোডে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে চলে আসলাম। এতে আমাদের দুটা সুবিধা  হল। আব্বুর সব কটা দোকানই কাছাকাছি হল, নাসিমার কলেজও একদম কাছে হল। নাসিমাসহ আমরাও মেরাদিয়ার মাস্তান বাহিনির নজর থেকে বেরিয়ে আসতে পারলাম।    

দেশের সব প্রথম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত উচ্চবিত্ত ঘরের ছেলে মেয়েরাই পড়ে। অবশ্য নিম্নবিত্ত ঘরের বেশ কিছু মেধাবী ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি নিয়ে এখানে পড়াশোনা করতে পারছে। আমিও সহজেই এইসব উচ্চবিত্ত ঘরের ছেলে মেয়েদের সাথে মিশে গেলাম। কিছু কিছু পোশাক আমার আকর্ষণীয় শারীরিক গঠনকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলত। বঙ্গবাজার থেকে কেনা লিভাইসের ফেডেড জিন্স, বিভিন্ন জায়গা থেকে কেনা দুই নম্বরের নর্থ ফেসের ক্যাপ, রে ব্যানের এভিয়েটার্সের সান গ্লাস পরলে আমাকে দারুন স্মার্ট আর আকর্ষণীয় লাগত। আমি দেখেছিলাম যে আমার স্বল্প পরিচিত মহিলারা বিশেষ দৃষ্টি নিয়ে আমাকে দেখতেন। আমি নিশ্চিত নই যে উনারা আমার প্রতি শারীরিক আকর্ষণ বোধ করতেন নাকি তাদের বয়ফ্রেন্ডের বা স্বামীর আমার মত শারীরিক গঠন নাই সেই আপসোস করতেন। আমরা ক্লাসফ্রেন্ডরা খুবই ফ্রি ছিলাম। ছেলে মেয়ে সবাই একসাথে আড্ডা মারতাম, চা খেতাম, সিগারেট খেতাম। আমাদের বেশ কিছু মেয়ে ক্লাসফ্রেন্ড, যারা উচ্চবিত্ত বা অতিধনী পরিবার থেকে এসেছিল, আমাদের সাথে সিগারেট খেত। আবার এদের ভেতর কিছু মেয়ে ডিস্কো ক্লাবে যেত, ড্রিঙ্ক করত। আমার ডিস্কো ক্লাবে যাবার সামর্থ্য ছিল না, তাই ওদের নিয়ে অনেক রকম শ্লীল অশ্লীল চিন্তা করতাম। 

আমি আমার আকর্ষণীয় শারীরিক গঠন ও আকর্ষণীয় চেহারা দেখিয়ে মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করা শুরু করলাম। আমার মেলামেশা করবার সহজাত গুণের বলে আমি সহজেই অনেক মেয়ে বন্ধু জুটিয়ে ফেললাম। আমি দেখতে পেলাম যে বেশির ভাগ মেয়েই অত্যন্ত শালীন। বন্ধুর খালি বাসায় যাবার প্রস্তাব শুনে বেশির ভাগ বান্ধবী ঘৃণাসহ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিত। জানি না কেন যেন এতে আমি খুশি হতাম। আমি আর কোন দিনই ওদের বিরক্ত করতাম না। তবে দৈহিক মিলনের আনন্দ আমার এক রকম নেশায় পরিণত হয়েছিল। তবে আমি কোনদিনই কোন পতিতালয়ে যাই নাই। তবে তৃতীয়পক্ষের মাধ্যমে অভাবী গৃহিণীদের অথবা ছাত্রীদের সঙ্গ উপভোগ করতাম। যে সব ছাত্রীরা এই লাইনে আসত তারা সবাই হয় গ্রাম থেকে অথবা মফস্সল শহর থেকে আসত। ওরা সবাই ঢাকায় আসবার আগে ঢাকার জীবন যাত্রার খরচ সম্বন্ধে একটা ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে আসত। ঢাকায় এসে আর খরচে কুলাতে না পেরে অনেকে ফিরে যেত আবার অনেকে এই লাইনে এসে তাদের পড়াশোনা আর মাসিক খরচ মেটায়। এদের ভেতরে আবার অনেককে দেশে টাকা পাঠাতে হত। মেয়েদের টিউশনি করে প্রয়োজনীয় টাকা আয় করা সম্ভব হয় না। কিছু মেয়ে শুধু প্রয়োজনীয় টাকা পেলে আর কাজ করত না। আমি কয়েকজন মেয়েকে জানি যারা সহজেই কাঁচা টাকা পাওয়া যায় বলে এটাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেছিল। এদের চলাফেরা অতিধনী পরিবারের মেয়েদের মত ছিল। আমার এই অধঃপতিত জীবনে আমার অনেক রকমের অভিজ্ঞতা হয়েছিল। এর ভেতরে বেশ কয়েকটি আমার মনে গভীর দাগ কেটেছিল। তবে বেশির ভাগ মেয়েই তাদের এই পথে আসবার কারণ সম্বন্ধে কোন রকমের আলোচনা করতে চাইত না। তাদের কথা ছিল ‘আপনি টাকা দিয়ে ফুর্তি করতে এসেছেন, ফুর্তি করে চলে যান। আমাদের সুখ দুঃখতো শুনতে আসেন নাই।’  তবে একটা ঘটনা আমি উল্লেখ না করে পারছি না। 

একবার আমি এক তৃতীয়পক্ষের বাসায় এক নারী সঙ্গ উপভোগ করছিলাম। ঐ তৃতীয়পক্ষ আমাকে আগেই আভাষ দিয়ে রেখেছিল যে, যে মহিলা আসবেন তিনি একজন গৃহিণী। উনি নিতান্ত না ঠেকলে আসেন না। যে মহিলাটি আসলেন তিনি দেখতে বেশ সুন্দরী আর ফর্সা। মহিলাটি একদম স্লিম ফিগারের, কোথাও কোন রকম চর্বি নেই। পরনে একটা বহুল ব্যবহৃত নীল পাতলা সিল্কের শাড়ি। লম্বাটে চেহারা, থুতনীটা একটু চোখা। কোমর পর্যন্ত লম্বা চুল। চুল একদম সোজা, পাতলা আর সিল্কি। মাথায় একটা বিরাট খোপা করা। উনার চালচলনে বোঝা যাচ্ছিল যে উনি বেশ তাড়াহুড়ার ভেতরে আছেন। এসেই সোজা কাজে লেগে গেলেন। কাজের মাঝে একটা ফোন আসলে ঐ মহিলা ফোনের স্ক্রীন দেখে ‘আমার হাজবেন্ড’ বলে আমাকে চুপ থাকতে ইশারা দিলেন। আমি শুধু ঐ মহিলার কথাই শুনতে পারছিলাম। তবে তার কথা শুনে আমি যা ধারণা করতে পেরেছিলাম, সেটা আমাকে বেশ ব্যথিত করেছিল। 

“তুমি হঠাৎ না বলে কোথায় গেলে?”

“আমি রাস্তায়। আজ আমাদের বাবুর জন্মদিন। তাই ওর জন্য কেক আনতে বের হয়েছি।”

“আমি তো তোমাকে আমাদের বাবুর জন্মদিনর কেকের টাকা দিতে পারি নাই।”

“তাতে কি হয়েছে। আমার বাবুর মুখে একটু হাসির জন্য আমি দৈনিক খরচ থেকে টাকা বাঁচিয়েছি। আমি শীঘ্রই কেক নিয়ে আসছি।”

স্বামী স্ত্রীর কথা শুনে বুঝতে পেরেছিলাম যে আজ উনাদের বাচ্চার জন্মদিন। উনাদের কেক কেনবার টাকা নেই। তাই একজন মা তার ছেলের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য, তার স্বামীকে না জানিয়ে নিজের ইজ্জত বেচে কেক কিনবার জন্য আমার সামনে তার নিজের দেহ তুলে ধরেছেন। এই মাতৃস্নেহ দেখে আমি আর ফুর্তি করতে পারলাম না। আমি কাপড় পরে নিয়ে উনাকেও কাপড় পরে নিতে বললাম। আমি এতক্ষণ ঐ মহিলার সাথে ‘তুমি’ ‘তুমি’ করে কথা বলছিলাম। আমি আমার চুক্তিমত টাকা তৃতীয় পক্ষের হাতে দিয়ে দিলাম। এখন আর আমার মুখে ‘তুমি’ এলো না বললাম, 

“কিছু মনে করবেন না। আপনি বাড়িওয়ালার সাথে দেখা করে আসুন। আমি অপেক্ষা করব।”

“আপনি তো কাজ শেষ করলেন না। আগে তাড়াতাড়ি আপনার কাজ শেষ করেন তার পর আমি চলে যাব। বুঝতেই পারছেন যে আমার তাড়া আছে।”

“আমার আর কাজ করবার মুড নেই। আপনি আমার সাথে বা আমার পেছন পেছন আসতে পারেন। আমরা সামনের ঐ ‘কুপার্সে’ যাব।”

“আমার অত বড় দোকানে যাবার সামর্থ্য নেই। আমি আমাদের পাড়ার দোকান থেকে একটা কেক নিয়ে নেব।”

আমি মিথ্যা করে বললাম,

“আপনার ভালর জন্যই বলছি, আমার সাথে আসুন। আমার মোবাইলে আমাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের বেশ কিছু ছবি আছে।”

“আপনি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছেন।”

“হ্যাঁ করছি। আর কোন কথা নাই। আসুন আমার সাথে।”

কুপার্সে যেয়ে উনাকে একটা এক কেজির চিজকেক নিতে বললাম।

“আমার কাছে এত টাকা নেই।”

“আপনাকে টাকা দিতে হবে না। এটা আপনার ছেলের জন্মদিনে আমার উপহার।”

“আপনি কেন উপহার দিতে যাবেন। আপনি আমাকে চেনেন না। আমি অভাবী হতে পারি কিন্তু কারো দান গ্রহণ করবার মানসিকতা আমার নেই। আমি দুঃখিত।”

“ঠিকই আমি আপনাকে চিনি না, আর আপনিও আমাকে চেনেন না। তবে আজ আমি একজন স্নেহময়ী মা’কে দেখলাম, যিনি ছেলের মুখে একটু হাসি দেখবার জন্য নিজের ইজ্জত বেচলেন।”

“আমার মত হাজার হাজার মেয়ে অভাবের তাড়নায় তাদের ইজ্জত বিক্রি করছে। অবশ্য তাদের ভেতর বেশিরভাগই গ্রাম থেকে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। আপনি কজনকে আপনার এ রকম মহত্ত্ব দেখাবেন। আমি দুঃখিত, আমি বিনা পরিশ্রমে কিছু নিতে রাজি না।”

“উপহার নেওয় বা না নেওয়া আপনার বিবেচনা। তবে আমি আবার আপনাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি যে আমার মোবাইলে আমাদের অনেক ছবি আছে।”

“ঠিক আছে, আমি নিচ্ছি। তবে আপনাকে কথা দিতে হবে যে আপনি ছবিগুলো ডিলিট করে দেবেন। আর ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আমাকে ফোন দেবেন। আপনার ফোনটা বের করেন আমি একটা কল দিচ্ছি তাতে আমার ফোন নম্বরটা উঠে যাবে।”  

ঐ মহিলা আমার নম্বরে কল দিলেন।   

“কি নামে আপনার নম্বরটা সেভ করব?”

“’অপরিচিতা’ নামে সেভ করবেন।”

“তার মানে আপনি আপনার নামটা বলবেন না।”

“ঠিক তাই। না হয় অপরিচিতা হিসাবেই আপনার কাছে পরিচিত হয়ে থাকলাম।” 

“আপনি কিন্তু বুদ্ধি করে আমার ফোন নম্বরটা নিয়ে নিয়েছেন। আমার নম্বরটা কি নামে সেভ করবেন?” 

“আপনার নাম্বারটা ‘চিজকেক’ নামে সেভ করে রাখব।”

“বোঝাই যাচ্ছে যে নামটা একটা ছদ্মনাম। আপনার স্বামী জিজ্ঞাসা করলে কি বলবেন।”

“আপনার চিন্তা করবার কোন কারণ নেই। উনি কোন সময়ে আমার কোন কল ধরেন না বা আমার ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন না। ছবিগুলো ডিলিট করবার কথা ছিল, আমার সামনেই ডিলিট করেন।”

“আপনি ডিলিট করেন।”

বলে আমার ফোনটা উনার হাতে দিলাম। ফোনের গ্যালারিতে যেয়ে উনি থমকে গেলেন। ওখানে আমাদের কোন ছবি নেই।

“আপনি মিথা কথা বলে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে কেকটা নিতে বাধ্য করলেন। আপনি এটা ঠিক করলেন না।”

“ঠিক আছে একটা না হয় বেঠিক কাজ করলাম। আপনি এখন তাড়াতাড়ি বাসায় যান। আপনার স্বামী আর ছেলে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। আপনার শুভকামনা করি, ভাল থাকবেন।”

বলেই আমি উনার দিকে আর না তাকিয়ে সোজা হেঁটে চলে আসলাম। আমি আর কোনদিনই উনাকে ফোন করি নাই। যদিও মাঝে মাঝে উনার খোঁজখবর নিতে ফোন করতে ইচ্ছা করত। উনিও আর ফোন করেন নাই। আমাদের আর কোন দিন কথা হয় নাই বা দেখা হয় নাই। 

এই ঘটনাটা কিছুদিনের জন্য আমাকে একটু বিবেক দংশনে ফেলে দিয়েছিল। আমার দুষ্কর্মের সাথী বন্ধুদের অব্যাহত প্ররোচনায়, সপ্তাহ দুয়েক পর আমি আবার আমার আগের জীবনে ফিরে গেলাম। তখন আমি স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করছিলাম। এই সময়ে আমার জীবনে একটা ঘটনা আমার জীবনকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিল। ইস্কাটনের মাস্তান বাহিনীর নেতা আদিলের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে, তবে আমি কোনদিনই ওদের সাথে ওদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়াই নাই। এর ভেতরেই আমি খুবই সাধারণভাবে স্নাতক হলাম। স্নাতকোত্তর পড়ার আগ পর্যন্ত আমি আমার উশৃঙ্খল জীবনে কোন রকমের বিপদে পড়ি নাই। এক সন্ধ্যায় আমি আমার এক সোর্সের মাধ্যমে এক সরকারি গাড়ির ড্রাইভার, কাইয়ুমের বাসায় গেলাম। ওরা ওদের নিজেদের নিরাপত্তার খাতিরে, ছুটির দিনে যে কোন সময়ে আর অন্যদিনে সন্ধ্যার পর গেস্ট গ্রহণ করে। অর্থাৎ কাইয়ুম সাহেবের উপস্থিতিতেই রাবেয়া তার গেস্টদের মনোরঞ্জন করে। কাইয়ুমের স্ত্রী, রাবেয়া ছিল খুবই আকর্ষণীয় ও আবেদনময়ী শরীরের অধিকারী, ফর্সা আর মোটামুটি সুন্দরী। আমি রাবেয়ার শরীরের প্রেমে পড়ে গেলাম। সোর্স ছাড়াই আমি ঐ ড্রাইভারের বাসায় যাওয়া আসা শুরু করলাম। তৃতীয়বারেই অঘটনাটা ঘটে গেল। আমি অবশ্য আমার বিপদে বনশ্রীর মাস্তান বাহিনীর সাহায্য নিয়ে নিজেকে বিপদমুক্ত করতে পেরেছিলাম। 

এক ছুটির দিনে আমি বেলা এগারটার দিকে রাবেয়াদের বাসায় গেলাম। আমাকে সাদরে বসবার ঘরে বসিয়ে চা বিস্কিট দিয়ে আপ্যায়ন করল। রাবেয়া আর আমি ওদের শোবার ঘরে গেলাম। আমি দেখলাম যে রাবেয়া ঘরের দরজা বন্ধ করল ঠিকই তবে ছিটকানি লাগাল না আর দিনে বেলাতেও ঘরের টিউব লাইট জালিয়ে রেখে ঘরটাকে উজ্জ্বল করে রাখল। আমি কিছুই মনে করলাম না তবে লাইট জ্বালিয়ে রাখবার জন্য মনে মনে খুশিই হয়েছিলাম। আমরা তখন অন্তরঙ্গতার মধ্য গগনে ছিলাম, রাবেয়ার স্বামী, কাইয়ুম হঠাৎ করে ঘরে ঢুকে ঐ অবস্থায় মোবাইলে ফটাফট আমাদের কয়েকটা ছবি তুললো আর ভিডিও করে ফেললো। আমি আমার বিপদ বুঝতে পারলাম। রাবেয়া ঐ অবস্থাতেই আমাকে জড়িয়ে ধরে রেখে হাসি মুখে বললো,

“নাসিম সাহেব আপনার মোবাইল আর মানিব্যাগটা দেন।”

আমি মনে মনে আশা করছিলাম যে আমার মোবাইল ও মানিব্যাগের উপর দিয়ে ঝামেলাটা মিটবে। আমি কোন কথা না বলে আমার আইফোন মোবাইলটা আর প্রায় হাজার আটেক টাকা সমেত মানিব্যাগটা রাবেয়াকে দিলাম। আইফোন পেয়ে রাবেয়া যার পর নাই খুশি হল। এবারে শুরু করল রাবেয়ার স্বামী। 

“নাসিম সাহেব আপনি বুঝতে পেরেছেন যে আমার স্ত্রীর সাথে আপনার আপত্তিকর অবস্থার ছবি ও ভিডিও আমার হাতে আছে। এই সব ছবি ও ভিডিও আমি ডিলিট করে দিতে পারি যদি আপনি আমাকে পাঁচ লক্ষ টাকা দেন। একবারে দিতে না পারলে আপনি আমাকে মাসিক পঞ্চাশ হাজার টাকা করে এক বছরে ধরে টাকা দিতে থাকবেন।”

“আমি মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে পারব না। তবে আমি আপনাকে মাসে পঁচিশ হাজার টাকা করে দুই বছর ধরে দেব। আমার টাকা দেবার নিশ্চয়তা তো আপনার কাছে থাকছে। আপনি যে আমার ছবি কপি করে রাখবেন না বা ডিলিট করবেন না তার নিশ্চয়তা কি?”

“আমার কথা আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে, আপনার কোন উপায় নেই। আমরf যতই খারাপ লোক হই না কেন আমাদের কথার দাম আছে। আমরা কথা দিলে সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করি। এখন সিদ্ধান্ত আপনার।”

আমার কোন উপায় ছিল না। আমি ওদের কথায় রাজি হয়ে চলে আসলাম। কয়েকদিন ধরে আমার খুব মন খারাপ থাকল। আমার এই অবস্থা বাসায় মা খেয়াল করে আমাকে অনবরত জিজ্ঞাসা করতে থাকলেন আমি সত্যি কথা বলতে পারলাম না। আদিলও আমার অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। আমি আদিলকে সব খুলে বললাম। আদিল আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করার আশ্বাস দিলে আমার মনটা একটু হালকা হল। 

এইসব আকাম কুকাম করেও আমি ভালভাবেই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করতে পেরেছিলাম। 

নাসিমা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোবায়োলজি অনার্সের শেষ বর্ষে আছে। গত তিন বছর ধরে ও প্রেম করছে। ওর বয়ফ্রেন্ড, সারওয়ার আলমও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্স অনার্সের শেষ বর্ষে আছে। দুজনেরই সাবসিডিয়ারি অঙ্ক। অঙ্কে ছাত্র ছাত্রী কম থাকে। অঙ্ক ক্লাসেই ওদের পরিচয় হয়। দুজনের দুজনাকে ভাল লাগে, পরে ভালবাসা হয়। সারওয়ার এসএসসি ও এইচএসসি দুটাতেই গ্রেড পাঁচ পেয়েছিল। সারওয়ার খুবই মেধাবী ছাত্র। তার হবি হল পড়াশোনা করা। গবেষণামনস্ক সারওয়ার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হল। সারওয়ার খুব একটা লম্বা না, একটু খাটই হবে। উচ্চতা পাঁচ ফুট দুই কি তিন ইঞ্চি হবে। গভীর আর তীক্ষ্ম চোখে পুরু লেন্সের চশমা। মুখটা গোলগাল। চেহারায় একটু মায়াবী আর ছেলেমানুষি ভাব আছে। শারীরিক গঠন একটু পাতলা। চুলটা কোঁকড়ান আর ছোট করে ছাঁটা। নাসিমা আর সারওয়ারের সম্পর্ক দুই বাসাতেই জানে, দুই বাসাতেই ওদের প্রেমে কোন আপত্তি নেই। ওরা দুজনে দুই বাসাতেই গ্রহণযোগ্য ছিল। সারওয়ার মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে নিজ ডিপার্টমেন্টে প্রভাষক হিসাবে যোগদান করল। সারওয়ার সেই বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব চাইতে মর্যাদাবান কালিনারায়ন বৃত্তি পেয়েছিল। নাসিমাও প্রথম শ্রেণি পেয়েছিল। নাসিমা বাংলাদেশ আনবিক শক্তি কমিশনে রিসার্চ অফিসার হিসাবে যোগদান করল। ছয় মাসের মাথায় ওদের বিয়ে হয়ে গেল। সারওয়ার উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে লেখালেখি শুরু করল। সারওয়ারের অসাধারণ রেজাল্টের জন্য খুব সহজেই ইতালির ট্রিস্টিতে অবস্থিত ট্রিস্টি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করবার সুযোগ লাভ করে। সারওয়ার নাসিমাকে নিয়ে ইটালি চলে যায়।  সারওয়ার পৃথিবী বিখ্যাত ইটালির ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স (আইএনএফএন)-এ গবেষক হিসাবে নিয়োগ পায়। যোগদানের আগে নাসিমা আর সারওয়ার দুই মাসের জন্য দেশে আসে।  

পাপ বেশিদিন চাপা থাকে না। মা কিভাবে যেন জেনে গেলেন। আমার হাত খরচ বন্ধ হয়ে গেল, সব সময়েই নজরদারির ভেতর থাকতে হচ্ছিল। ভবিষ্যতে বাবার ব্যবসার হাল ধরতে হবে তাই আব্বু উনার পরিচয় গোপন রেখে আমাকে বনগ্রাম রোডের এক শাড়ি কাপড়ের দোকানে চাকরিতে লাগিয়ে দিলেন। আমি শাড়ির দোকানের শিক্ষানবিস সেলসম্যান হিসাবে আমার জীবন শুরু করলাম। আমার এই শিক্ষানবিস কালটা আমার জীবন আমূল বদলে দিল। আমি একজন পাকা ব্যবসায়ী এবং সংসারী হয়ে উঠলাম। মাস ছয়েকের ভেতরেই আমি শাড়ি বিক্রির, দামাদামি করবার, বিশেষ করে মহিলাদের সাথে, সব রকমের প্যাঁচ শিখে ফেলেছিলাম। মালিক আমাকে পুরা দোকানের দায়িত্ব দিলেন। শাড়ি কোথা থেকে বা কার কাছ থেকে বা কি শর্তে কিনতে হয় সব শিখে ফেললাম। বছরখানেকের ভেতরে আমি শাড়ি ব্যবসার সব খুঁটিনাটি জেনে ফেলাতে আব্বু মনে করলেন যে আমার শিক্ষানবিসকাল শেষ হয়েছে। আমাকে প্রথমে মৌচাকের দোকানের দ্বিতীয় প্রধান হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হল। আমি সেলসম্যান এবং কিছুদিন পর থেকে মালিক হিসাবে আমার ব্যবসায়ী জীবন শুরু করলাম। 

আমি ব্যবসায়ী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হবার সাথে সাথে, আমি যাতে আবার বিপথে যেতে না পারি সেইজন্য আব্বু ও মা আমার বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। আমার মতামত চাইলে রবীন্দ্র নাথের ছোট গল্প ‘হৈমন্তী’ কয়েকটা লাইন আমার মনে এলো।

নরমাংসের স্বাদ পাইলে মানুষের সম্বন্ধে বাঘের যে দশা হয় স্ত্রী সম্বন্ধে তার ভাবটাও সেইরূপ হইয়া ওঠে। অবস্থা যেমনি ও বয়স যতই হোক, স্ত্রীর অভাব ঘটিবা মাত্রই তাহা পূরণ করিয়া লইবার তাহার কোন দ্বিধা থাকে না।’

আমার ক্ষেত্রে লাইনগুলো পরিবর্তিত হয়ে নিম্নরূপ হবে, 

নরমাংসের স্বাদ পাইলে মানুষের সম্বন্ধে বাঘের যে দশা হয়, নারীমাংস সম্বন্ধে তার ভাবটাও সেইরূপ হইয়া ওঠে। অবস্থা যেমনি ও বয়স যতই হোক, নারীমাংসের অভাব ঘটিবা মাত্রই তাহা পূরণ করিয়া লইবার তাহার কোন দ্বিধা থাকে না।’

আমি আবার হঠাৎ করে একটা নারীমাংসের অভাব বোধ করতে লাগলাম। আমি কোন রকম চিন্তা ভাবনা না করে আমার মতের কথা জানিয়ে দিলাম।

ঠিক এই সময়েই নাসিমা আর সারওয়ার দুই মাসের জন্য দেশে আসল। আমার অনাপত্তি জানিয়ে দেওয়াতে আমার বোন নাসিমাই বেশি উৎসাহী হয়ে উঠল। নাসিমা আম্মুর সাথে আমার বিয়ের জন্য পাত্রী খোঁজা শুরু করল। এই পাত্রী খোঁজা খুঁজি বা দেখাদেখি আমি বিশেষ পছন্দ করি না। আমার কাছে কেন যেন মনে হয়, মেয়ে দেখা আর বাজারে যেয়ে দেখে শুনে পুতুল কেনা একই রকমের, পছন্দ হলে কিনলাম আর পছন্দ না হলে কিনলাম না। মেয়ে তো বাহ্যিকভাবে দেখা যায়, একদিনের দেখাতে আর কি বোঝা যাবে। চেহারা আর স্বাস্থ্য ছাড়া কিছুই বোঝা যায় না। আসল ব্যাপার হচ্ছে মেয়ের বা পাত্রীর স্বভাব চরিত্র কি রকমের হবে, বা আমাদের সংসারে মানিয়ে চলতে পারবে কিনা, আমার আব্বু, আম্মু আর বোনের সাথে মিলমিশ হবে কিনা। কিন্তু তাতেও আম্মু আর বোনের মেয়ে দেখার উৎসাহ কমে না। নাসিমা তার যত অবিবাহিতা বান্ধবী বা তাদের ছোট বোন আছে সাবাইকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল, দেখাল। আমার মত দেবার আগেই আম্মু ওদের সবাইকে নাকচ করে দিতেন। নাসিমা আর আমি দুজনাই টের পেলাম যে আম্মুর বিশেষ কোন একজনকে পছন্দ আছে। নাসিমা সব উৎসাহ হারিয়ে ফেললো। অবশেষে অনেক দেখেশুনে মোহাম্মপুরের ইকবাল রোডের আম্মু তার বান্ধবীর মেয়ে নাহিদা জামান (প্রীতি)-কেই আমার জন্য ঠিক করলেন।

মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের এক দোতলা বাসার মালিক মোস্তাফা জামান ও সুরাইয়া জামান। তাদের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে নাহিদা জামান ওরফে প্রীতি, এর পর মেয়ে স্মৃতি আর ছোট ছেলে রুবেল। জামান সাহেব তাঁর বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে এই দোতলা বাড়িটি পেয়েছিলেন। তিনি এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক। তাঁদের সংসারে অভাব নেই তবে প্রাচুর্য্যও নেই। প্রীতি আর স্মৃতি দুজনাই দেখতে সুন্দর, ফর্সা আর আবেদনময়ী শরীরের অধিকারী। দুই বোনের ভেতরে স্মৃতিই ছিল অপেক্ষাকৃতভাবে সুন্দরী। তিন ভাই বোনই উদয়ন স্কুলে পড়াশোনা করেছিল। প্রীতি আর স্মৃতি স্কুলে পড়া অবস্থাতেই তাদের পেছনে প্রচুর উৎসাহী যুবকের আনাগোনা হত। ওদের পরিবার ছিল কিছুটা উদার আর সেই সাথে কিছুটা রক্ষণশীল। তিন ভাই বোনই ছোটবেলায় কোরান শিক্ষা লাভ করে। ওরা বড় হবার সাথে সাথে নামাজে একটু অনিয়মিত হয়ে পড়ে। রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে বলেই হয়ত তাদের মনে ঐ সব ছেলেরা কোন দাগ কাটতে পারে নাই। দুই বোনের ভেতরে ছিল ভীষণ মিল। কারো কাছে কারো কোন কিছুই গোপন থাকত না। সর্বজনীনভাবে বাবা মোস্তফা জামান সাহেব মেয়েদের একটু বেশি ভালবাসতেন আর মা একটু বেশি ভালবাসতেন ছেলে রুবেলকে। 

বেশ কিছুদিন আগে জামান সাহেবের স্ত্রী, মেয়েরা একটু বড় হতেই ওদের রান্নাবান্না শেখার জন্য বললেন,

“তোরা কি রান্নাবান্না কিছুই শিখবি না। সংসার করতে গেলে তো তখন শাশুড়ির কথা শুনবি।”

এই কথার প্রেক্ষিতে দুই বোনে একটু রান্নাঘরের দিকে যাওয়া শুরু করেছিল। প্রথম প্রথম মায়ের আশেপাশে ঘুরঘুর করত। একদিন প্রীতি একটু সাহস করে রান্না করল। রান্নায় কিছুই পরিমাণ মত হয় নি। ভাত গিয়েছিল গলে, ডালে লবণ একদমই দেওয়া হয় নাই আর হয়েছিল ছোবড়া ছোবড়া। শখ করে মুরগি রেঁধেছিল। মুরগিতে লবণ অত্যধিক বেশি দিয়েছিল, হলুদ আর মরিচের আধিক্যে মুরগি আর মুখে দেওয়া যায় নাই। সেদিন বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে খেতে হয়েছিল। জামান সাহেব হেসে বলেছিলেন,

“থাক মা, তোদের আর রান্নাঘরে যেতে হবে না। বিয়ের পর তো সংসারের হাল ধরতে হবে, তখন আর মজা করবার সময় পাবি না। যতদিন বাপের বাড়ি আছিস একটু আরাম করে নে।”

জামান সাহেবের কথা শুনে উনার স্ত্রী বললেন,

“তুমি ওদের মাথায় উঠিয়ে রাখছ। পরে তো ওদের শাশুড়ি ‘মেয়েকে কিছু শেখান নাই’ বলে আমাকেই কথা শোনাবে।”

“আরে রাখ তোমার এই সব বস্তা পচা পুরান কথা। আজকাল মেয়েরা চাকরি বাকরি করছে। বেশির ভাগ মেয়েই রান্না জানে না। সবাই রান্নার বুয়াদের উপর নির্ভর করে সংসার করছে।”

“মেয়েদের চাকরি করা আমার দেখা আছে। আমার বোনও তো চাকরি করছে। লাভ কি হয়েছে। অফিস থেকে এসে দুলাভাই হাতমুখ ধুয়ে খবরের কাগজ নিয়ে বসবে আর পরে টেলিভিশনে খেলা দেখবে। আর আপা অফিস থেকে এসে সোজা রান্না ঘরে ঢুকবে। সকালে সবার আগে ঘুম থেকে উঠে, সবার নাস্তা রেডি করবে, বাচ্চাদের স্কুলের জন্য রেডি করলে দুলাভাই ওদের স্কুলে দিয়ে আসবে। এরপর আপা রান্নাঘরে ঢুকে দিনের রান্নাবান্না শেষ করে নিজে রেডি হবে তারপর দুজনে অফিসে যাবে। এটা কোন জীবন হল।”

“তুমি কি চাও যে ওরা চাকরিবাকরি করবে না। মেয়েদের কাজ কি শুধু বাচ্চা পয়দা করা, মানুষ করা, ঘরদোর সামলান আর রান্নাবান্না করা।”

“আমি তো করছি। আমার তো কোন আপসোস নেই। আমি তো সুখেই আছি।”

“নাজমা, এখন আর সেই দিন নেই। স্ত্রী চাকরি করবে কিনা তা ওরা স্বামী-স্ত্রী মিলে ঠিক করবে। আর আজকাল সুখের ডেফিনিশনও বদলে গেছে। তুমি যেটাকে সুখ বলছ, আজকালকার মেয়েরা সেটাকে সমানাধিকার পরিপন্থি বলে, নারী স্বাধীনতাহরণ বলে। আমিও ওদের সাথে একমত।”    

“একটা কথা আছে ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুনে’। আমি সেটাতেই বিশ্বাসী। তুমি কি খেয়াল করেছ যে মেয়েরা দুজনেই ওদের ঘরসহ সারা বাড়ি ফিটফাট রাখে আর আজকাল বেশ ভালই রান্নাও করে। আমি ওদের এমনভাবে তৈরি করে রাখতে চাই যাতে ওরা যেন কোন দিনই কোন অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে না পড়ে। তাই আমি চাচ্ছিলাম যে ওরা রান্নায় আরো পারদর্শী হয়ে উঠুক, দেশি বিদেশি রান্নাও শিখুক। শেখা থাকলেতো কোন অসুবিধা নেই।”

“হ্যাঁ সেটা আমি খেয়াল করেছি। আর সেইসাথে আরো খেয়াল করেছি যে রুবেলকে কিছুই করতে হয় না। ওকে ঘর দোর ঠিক রাখা বা কাপড় ইস্ত্রি করা শেখাও না কেন? ওর ঘর তো সব সময়েই ওর বোনেরা ঠিক করে রাখে।”

“ওগুলো তো আর ওকে করতে হবে না। ওগুলো ওর বৌ করবে।”

“তুমি দেখি একেবারে সেকেলে রয়ে গেলে।”

“হ্যাঁ আমি এখনও সেকেলে। তাতে তোমার আপত্তি আছে বলে তো মনে হয় না। আর তুমি তো সেটা মেনে নিয়ে সুখেই আছ।”

বাপের আস্কারা পেয়ে দুই বোন কিছু দিন আর রান্নাঘর মুখি হয় নি। তবে আবার কিছুদিন পর থেকে দুই বোনই রান্নাঘরমুখি হল। তবে স্মৃতির রান্না শেখার আগ্রহ বেশি ছিল। আস্তে আস্তে দুই বোনেরাই মায়ের সাথে থেকে থেকে ভাল ভাল সব রান্না শিখে নিল। তবে প্রীতি একটু ফাঁকিবাজ ছিল তাই প্রীতির আগ্রহ ছিল ফ্রুট সালাদ, চটপটি, ফালুদা এই সমস্ত আইটেম অর্থাৎ যে সব রান্না করতে হয় না সেই সব আইটেম বানাবার। আজকাল বাসায় কোন রকম অনুষ্ঠান হলে দুই বোনই সব রান্না করে তবে প্রীতি সালাদ ফালুদা এই সব বানায়। আস্তে আস্তে প্রীতি ও স্মৃতি দুই বোনই পাকা রাঁধুনি হয়ে উঠল।

আমার আপত্তি সত্ত্বেও আম্মুকে নিয়ে কোন রকমের জানান না দিয়ে আমি গাড়ি চালিয়ে আম্মুকে বান্ধবীর মোহাম্মদপুরের বাসায় নিয়ে এলাম। বাসাটা বেশ বড় আর অনেক পুরান। আমার আন্দাজ মত বাড়িটা পাঁচ কাঠার উপরে, সামনে বাগান করবার জন্য একটু জায়গা খালি রেখে দোতলা বাড়ি। দোতলা বাড়িটা পুরান হলেও একটু আধুনিক ডিজাইনে করা। প্রথমেই গ্রিল দিয়ে ঘেরা এক চিলতে মোজাইক করা বারান্দা। এরপরেই একটা ড্রইংকাম ডাইনিং রুম। এরপর রান্নাঘর, বাথরুমসহ কাজের বুয়ার ঘর। এছাড়াও আছে গেস্টদের ব্যবহারের জন্য একটা ওয়াসরুম। দোতলায় সিড়ির জায়গা বাদে একটা লিভিং রুম, মাস্টার বেডরুমসহ আরো তিনটা বেডরুম। ওদের বাড়িটা একটা কর্ণার প্লটে। কোনার রুমটা মাস্টার বেডরুম। মাস্টার বেডরুম সংলগ্ন দুটা বেডরুমে দুই বোন থাকে। আর অন্যটাতে থাকে ছেলে। সব বেডরুমেই বেশ বড়সড় জানালা, সবরুমেই সংযুক্ত বাথরুম আছে। তবে কোন বাথরুমেই বাথটাব নেই। পুরানকালের বাড়িতে আগে সব স্যানিটারি পাইপিং ও ইলেকট্রিক লাইন সব দেয়ালের ওপর দিয়ে করা ছিল। প্রীতির আব্বা দেয়াল খোদাই করে সব পাইপিং ও ওয়ারিং কনসিল্ড করে নিয়েছিলেন। আগেকার আমলের টয়লেটের সব প্যান বদলিয়ে কমোড সিস্টেম করে নিয়েছেন। আগে প্রত্যেক রুমে ছোটছোট দুটা করে জানালা ছিল। প্রতিটি জানালার পাল্লা আবার দুইভাগ করা। ওগুলো ভেঙ্গে আরো একটু বড় করে একটা করে জানালা করা হয়েছে। সবগুলো জানালায় এ্যালুমিনিয়ামের ফ্রেমে টিন্টেড ফ্লোট গ্লাসের দশ মিলিমিটার পুরু কাঁচ ফিট করা । এই রকম আরো কিছু সংস্কার করার ফলে বাড়িটাকে এখন একটু আধুনিক মনে হয়।

আম্মু এমন একটা ভাব দেখালেন যে আম্মু যেন একা একা কোথাও যেতে পারেন না, তাই আমাকে উনার সাথে আসতে হয়েছে। উনারা বসবার ঘরে বসলেন। আম্মুর বান্ধবী নাজমা আন্টি আম্মুকে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। তাদের দুজনার ভেতরে অবশ্য প্রায়ই লম্বা সময় ধরে টেলিফোনে কথা হয়। দুজনেই ঢাকায় থাকেন অথচ দেখা সাক্ষাত হয় না বলে দুজন দুজনকে সহাস্য দোষারোপ করলেন। 

“নাজমা আমি একটা কাজে আমার ছেলের সাথে শ্যামলী যাচ্ছিলাম। এদিক তো খুব একটা আসা হয় না তাই ভাবলাম দোস্তোর সাথে দেখা করে যাই।”

“ভালই করেছিস। এইভাবে না আসলে তো আর দেখা হত না। অতো দূর থেকে তুই কি ভাবে আসলি।”

“ছেলের সাথে এসেছি।”

“তোর ছেলেকে দেখছি না। ও কোথায়?”

“আমি বান্ধবীর বাসায় এসে চুটিয়ে আড্ডা দেব আর ওকে চুপচাপ বসে থাকতে হবে তাই আর ও উপরে এলো না। গাড়িতে বসে গান শুনছে আর স্মার্ট ফোন থাকলে তো আর ওর কিছু দরকার হয় না। অবসর সময়ে হেড ফোনে গান শুনবে আর গেম খেলবে।”

“তোর কি কোন কাণ্ডজ্ঞান আছে? ছেলেটাকে গাড়িতে ড্রাইভারের মত বসিয়ে রেখেছিস। ফোন করে ওকে চলে আসতে বল। গান এখানেও শোনা যাবে। আন্টির বাসায় আসতে এতো সঙ্কোচ কেন।”

মনে হয় সবই আম্মুর আশামত হচ্ছিল। আম্মুও চাচ্ছিলেন যে আন্টিই আমাকে উপরে আসতে বলবেন। ফোন পেয়ে আমি উপরে এসে আন্টিকে ছালাম দিলাম। আমাকে দেখে আন্টি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন।

“তোর ছেলেটা তো বেশ বড় হয়ে গেছে, মাশাল্লাহ দেখতেও শুনতেও ভালই হয়েছে। বাবা এখন কি করছ।”

“ও মাস্টার্স শেষ করে ওর বাবার সাথে ব্যবসায় লেগে গেছে। বাপ ব্যাটায় ব্যবসা সামলাচ্ছে।” 

আম্মুরা উনাদের গল্পে মেতে থাকলেন। আমি আর কি করব কানে এয়ারবাড লাগিয়ে এফএম রেডিও শুনতে থাকলাম আর মোবাইলে ওয়ার্ড সার্চ গেমস খেলতে থাকলাম। কিছুক্ষণ পরই আম্মুর আশামত আন্টি উনার মেয়েকে ডেকে আমাদের চা আর নাস্তা দিতে বললেন। আমিও উৎসাহ আর আগ্রহ নিয়ে আড় চোখে তাকিয়ে রইলাম। 

আম্মুরা গল্প করতে থাকলে প্রীতি এসে আমাদের চা নাস্তা দিল। প্রীতি একদম ঘরোয়া কাপড়ে, সালোয়ার কামিজ পরে, কোন রকমের সাজগোঁজ ছাড়াই এসে আম্মুকে ছালাম দিয়ে বসে আম্মুর সাথে আলাপ করতে থাকল। প্রীতি আমাকে কোন রকম পাত্তাই দিল না। আমি যে একটা জলজ্যান্ত মানুষ বসে আছি সেটা সে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করল। আমি একটু হলেও মনঃক্ষুণ্ন হলাম। তবুও আমি চোখ দিয়ে প্রীতিকে গিলছিলাম। একদম ঘরোয়া সাজে প্রীতিকে দেখে আমার ভালই লাগল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযে বাংলায় মাস্টার্স করছে, ফাইনাল ইয়ারে আছে। মেয়েটা দেখতে বেশ সুন্দরী, গায়ের রং ভীষণ ফর্সা। শারীরিক গঠন আর দশটা বাঙালি মেয়েদের মত হলেও মোটাও না আবার শুকনাও না। প্রীতির আঁটোশাটো শরীরে যৌবন উছলে পড়ছিল। আমার বিকৃত মনে একটা বিকৃত কামনা জেগে উঠল। প্রীতির সুন্দর গোল আর ফোলা ফোলা গোলাপি গাল, ওর বেশ খাড়া নাক, ঘন কালো জোড়া ভ্রূ, একটু ভারী ঠোঁট, ঘন লম্বা কুচকুচে কালো চুল, বড় বড় গভীর কালো চোখ এসব কিছুতেই আমার কোন রকমের আকর্ষণ ছিল না। আমার দৃষ্টি ছিল ওর সুগঠিত আঁটোসাটো শরীরের দিকে। আমি প্রীতির বুক আর নিতম্ব দেখার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকলাম। প্রীতি যেহেতু ঘরোয়া পোশাকে ছিল, ওর ওড়নাটা এলামেলো ভাবে বুকে দেওয়া ছিল। আমি খুব সহজেই এক সাইড দিয়ে ওর বুকের আভাষ পেলাম। সুগঠিত সুডৌল বুক দেখে আমি খুশি হলাম। নিতম্ব সব সময়েই দৃশ্যমান ছিল। ওর সুডৌল আর ভারী নিতম্ব আমাকে খুবই আকৃষ্ট করল। আমি মনে মনে প্রীতিকে বিছানায় কল্পনা করতে থাকলাম। বিছানায় প্রীতি খুব ভাল হবে মনে করে পুলকিত হয়ে উঠলাম। আমি মনে মনে প্রীতিকে বিয়ে করবার জন্য রাজি হয়ে গেলাম। শুধু মনে হচ্ছিল আম্মু কখন উঠবেন, কখন বাসায় যাবেন কখন আমার মত জিজ্ঞাসা করবেন আর আমি প্রীতিকে আমার বিয়ে করবার সম্মতি জানাব। অবশেষে আম্মুর গল্প শেষ হল। আমরা বাসার দিকে রওয়ানা হলাম, আমি আর ধৈর্য্য রাখতে পারছিলাম না। আমি রাস্তাতেই আমার মতামত জানিয়ে দিলাম।

সুন্দরী প্রীতির সাথে সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী যুবকের অভাব ছিল না। কাজিনরাই সব চাইতে সহজ লভ্য প্রেমিক, তাই স্কুলে থাকতেই প্রীতির বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া খালাত ভাইয়ের সাথে একটু সম্পর্ক গড়ে উঠছিল। প্রীতির তরফ থেকে প্রেম ছিল সম্পূর্ণরূপে স্বর্গীয়, কোন রকমের শারীরিক আকর্ষণ ছিল না। যদিও শারীরিক সম্পর্ক সম্বন্ধে প্রীতির একটা অস্পষ্ট ধারণা ছিল, তার বিবাহিতা বান্ধবীদের কাছ থেকে অনেক কিছু জেনেছিল। তবে মনে করত যে শারীরিক সম্পর্ক শুধু মাত্র স্বামী-স্ত্রী বা বৈধ কোন সম্পর্কের ভেতরেই হতে পারে। কিন্তু বয়সে বেশ বড়, আর একটু পেকে যাওয়া ওর খালাত ভাই-এর প্রেম ঠিকই ছিল তবে তার সাথে ছিল একটু শারীরিক আকর্ষণ। এই আকর্ষণ আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। একদিন সুযোগ পেয়ে ঐ খালাত ভাই প্রীতির শরীরের গোপন ও স্পর্শকাতর জায়গা নিষ্ঠুর ভাবে, নির্দয়ভাবে নিষ্পেষণ করে আর প্রীতিকে রেপ করবার চেষ্টা করেছিল। সেখান থেকেই প্রীতির ছেলেদের প্রতি একটা ভীতির জন্ম নেয়। প্রীতি কারো সাথে কোন রকম সম্পর্ক গড়তে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তবে ইদানিং ওর এক ক্লাসফ্রেন্ডকে ওর ভাল লাগতে শুরু করেছিল। ঠিক এই সময়েই আমাদের তরফ থেকে আমার সাথে প্রীতির বিয়ের প্রস্তাব যায়। বান্ধবীর ছেলে বলেই মায়ের আগ্রহে প্রীতি আমাদের প্রস্তাবে ওর সম্মতি জানায়। প্রীতির ক্লাসফ্রেন্ডকে ভাললাগাটা ভালবাসায় পরিণত হবার আগেই, ভাললাগাটার মৃত্যু হয়। ইতিমধ্যে সারওয়ারের কর্মক্ষেত্রে যোগদানের সময় হয়ে এলে, নাসিমাকে রেখে সারওয়ার ইটালি চলে গেল। 

আমি, আব্বু, আম্মু, নাসিমা আর কয়েকজন নিকট আত্মীয় সমেত, প্রায় কেজি দশেক মিষ্টি নিয়ে আমরা প্রীতিদের বাসায় আনুষ্ঠিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলাম। দুই পক্ষের লোকজন কম ছিল বলে আমাদের সবাইকে দোতলার লিভিংরুমে বসাবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দেনমোহর, বিয়ের, হলুদের তারিখ সব ঠিক হল। যথারীতি আমাদের মিষ্টিসহ চা দিয়ে আপ্যায়ন করা হল। আজকালকার রীতি অনুযায়ী একান্তভাবে আলাপ করবার জন্য আমাকে আর প্রীতিকে কিছু সময়ের জন্য ছাদে পাঠিয়ে দেওয়া হল। আমরা আধা ঘণ্টারমত ছাদে কথাবার্তা বললাম।

“প্রীতি, তুমি তো জান যে আমরা দুজনে আমাদের মুরুব্বিদের সম্মতিতেই আজ এখানে একান্তে কথা বলছি। আমি আমার তরফের কিছু সত্য তোমাকে জানাব, তুমি সেসব নিয়ে দুই একদিন চিন্তা করবে। ইতিপূর্বে আমার দুটা মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। প্রথম মেয়েটার সাথে সম্পর্কটাকে আমি সিরিয়াসলি নিয়েছিলাম। কিন্তু মেয়েটা আমারই এক বড়লোক বন্ধুর টাকা দেখে ওর সাথে সম্পর্ক করে। মেয়েটা আমার ঐ বন্ধুকেও ছেড়ে তার চেয়ে বয়সে বেশ বড়, ভীষণ বড়লোক আমেরিকা প্রবাসী এক ডাক্তারকে বিয়ে করে আমেরিকায় চলে যায়। আমার দ্বিতীয় যে মেয়েটার সাথে সম্পর্ক হয় সে ছিল এক অতিধনী পরিবারের বখে যাওয়া মেয়ে। তার কাছে পোশাক বদল করা আর বয়ফ্রেন্ড বদল করা একই ছিল। সেও আমাকে বদল করে আর একজনের সাথে সম্পর্ক গড়ে। তার পর থেকে মেয়েদের প্রতি একটু হলেও আমার ভীতির সঞ্চার হয়েছিল। আমি জানি না আমি তোমার ভেতর কি দেখলাম। আমি জানি না কেন আজ তোমাকে দেখে আমার সেই ভীতিটা এক লহমায় উড়ে গেল। চরিদিকে ধু ধু বালিময় মরুভূমির ভেতরে তোমাকে এক খণ্ড শান্ত স্নিগ্ধ মরুদ্যানের মত লাগল। মনে হল যে তোমার স্নিগ্ধ ছায়াতলে আমি শান্তি পাব।”

কথায় বলে দুষ্টের ছলের অভাব হয় না। আমারও হল না। আমি স্মার্টলি আমার কলঙ্কময় অতীত চেপে যেয়ে কথার মায়াজালে প্রীতিকে মুগ্ধ করতে পেরেছিলাম। এর উপরে তো আমার মেয়েদের আকর্ষণ করবার জন্য শারীরিক গঠন আর চেহারা আছেই। 

“আপনার মত আমারও একটা অতীত ছিল। তবে আপনার মত আমি সে রকম সিরিয়াস ছিলাম না। আর আপনার মত আমিও ধোকা খেয়েছিলাম। আপনি আমাকে মরুভূমিতে মরুদ্যানের মত মনে করেছেন বলে আমি একটু হলেও গর্ববোধ করছি। আমি অভিভূত।”

“প্রীতি আমার মনে হয় আমাদের ভেতরে একটু পার্থক্য হয়ে আছে। আমি তোমাকে ‘তুমি’ ‘তুমি’ করে বলছি আর তুমি আমাকে ‘আপনি’ ‘আপনি’ করে কথা বলছ। এটা কি ঠিক হল। আমি আশা করছি আমাদের ভেতরে একটা স্থায়ী সম্পর্ক হবে। আমার অতীত জানার পর যদি তুমি সম্পর্কটা স্থায়ী করতে না চাও তবে আমি কিছুটা আশাহত হলেও কিছুই মনে করব না। তখন আমরা বন্ধু থাকব।“  

“নাসিম আমি তোমার সাথে একমত। তোমার আর আমার গল্প যখন একই, তখন তোমার নিরাশ হবার আমি কোন কারণ দেখি না। আমি আমাদের সম্পর্কটা স্থায়ী করতে আগ্রহী। আর আমার বাবা মা নিশ্চয়ই তোমার সম্বন্ধে খোঁজখবর নিয়ে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন বলেই তাঁরা এতদূর এগিয়েছেন। পরে সময় করে আমরা নিশ্চই পরস্পরের প্রেমের গল্পগুলো বিস্তারিতভাবে শুনব। চল এখন যাওয়া যাক। আমরা বেশ অনেক সময় ধরে কথা বলছি। মুরুব্বিরা হয়ত চিন্তিত হয়ে পড়তে পারেন।”

আমার দুজনে হাসি মুখে ফিরে এলে, সবাই একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। প্রীতির মা বললেন,

“মা প্রীতি, তুই নাসিমকে নিয়ে তোর ঘরে বসে গল্প কর, আমরা বিয়ের অন্যান্য আলোচনা সেরে ফেলি।”

প্রীতি একটু ইতস্তত করছিল দেখে নাসিমা বলে উঠল,

“আরে ভাবী লজ্জা পাচ্ছ কেন। কয়েকদিন পর তো ঘরটা আর তোমার একার থাকবে না। তোমাদের দুজনের হয়ে যাবে।”

বিয়ের আগেই একবারেই ভাবী বলাতে প্রীতি আরো লজ্জা পেল। মুরুব্বিরাও একটু হলেও অসন্তুষ্ট  হলেন। আমরা দুজনে প্রীতির ঘরে যেয়ে গল্প করতে থাকলাম। প্রীতির ঘরটা সুন্দর করে গোছান। ঘরের এককোনায় একটা সেমি ডবল খাট। খাটে হালকা নীল কালারের উপরে সুন্দর প্রিন্টের একটা বেডসিট বিছান। আগেকার দিনের বাড়ি, তাই জামান সাহেব অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা একদম বদলিয়ে একটু আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছিলেন। আগে ঘরে কোন ওয়াল কেবিনেট ছিল না তাই তিনি জানালার সীলের সমান উচ্চতায় এবং লম্বায় জানালার সমান একটা ওয়ার্ডোব বানান। জানালার দুইদিকের ফাঁকা জায়গায়, জানালার উচ্চতার সমান দুটা কেবিনেট বানান। জানালার উপরে ওয়াল টু ওয়াল একটা লম্বা বক্স কেবিনেট বানান। মনে হয় ওয়াল টু ওয়াল, সিলিং টু সিলিং এইসব কেবিনেট কেটে জানালাটা ভেতরে বসান। আর এক দিকে ১৮ ইঞ্চি চওড়া ওয়াল টু ওয়াল টেবিল বানান। এই টেবিলের এক কোনায় পড়াশোনা করবার জন্য পা রাখবার জন্য তিন ফিটের মতন জায়গা ফাঁকা রেখে বাকি সব জায়গায় ড্রয়ার বা কেবিনেট বানান। পড়বার জায়গায় একটা লেনোভোর ল্যাপটপ খোলা অবস্থায় রাখা আছে, তার পাশে আছে একটা আর্কিটেক্টস টেবিল ল্যাম্প। ঠিক তার নিচেই একটা এফএম রেডিওসহ অত্যাধুনিক বড় অক্ষরের ডিজিটাল ঘড়ি শোভা পাচ্ছিল। ডিজিটগুলো হালকা আর সুন্দর নীল রংয়ের। টেবিলের ওপর দেড় ফিট ছেড়ে নয় ইঞ্চি ডিপের একটা বুক শেল্ফ বানান আছ। বইপত্র সব টেবিলের শেল্ফে সাজিয়ে রাখা। বাথরুমের পাশের ওয়ালে একটা তিন ফিট বাই ছয় ফিট থাইল্যান্ডের আয়না ফিট করা। আয়নার পাশের ওয়ালে একই ইউডথের বিভিন্ন উচ্চতার তাক বিশিষ্ট একটা কেবিনেট ফিট করা আছে। এই কেবিনেটে প্রীতির সব পারফিউম, কসমেটিক্স ও টয়লেট্রিজ থাকে থাকে সাজান আছে। ঘরটা খুবই হালকা নীল রংয়ের প্লাস্টিক পেইন্ট দেওয়া। পুরা ঘরটা টিপটপ করে গোছান। কোথাও কোন রকমের ময়লা নেই। ঘরে যেয়ে আমি বসলাম প্রীতির পড়াবার টেবিলে আর প্রীতি বসল ওর খাটের এক কিনারায়। ঘরে শুধু আমি আর প্রীতি। প্রীতি ওর বিছানায়। আমার বিকৃত মনে অনেক রকমের বিকৃতির জন্ম নিয়েছিল। তবে সেটা শুধু মনে মনে রয়ে গিয়েছিল। দুজনে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। অবশেষে আমিই নীরবতা ভাঙ্গলাম। 

প্রীতি তোমার ভবিষৎ পরিকল্পনা কি, আরো পাড়াশোনা করবার ইচ্ছা কি আছে?”

“আমার স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়াশোনা করবার ইচ্ছা আছে বা সম্ভব হলে আরো উচ্চ শিক্ষা নিতে। পড়াশোনায় আমি বেশ ভালই। অনার্সে প্রথম শ্রেণি পেয়েছিলাম আর মাস্টার্সেও পাব বলে আশা রাখি। তবে ভবিষ্যতে কি হবে তা আমি এখন বলতে পারছি না।”

আমি মনে মনে বললাম যে প্রীতি তুমি আমার বৌ হলে, আমি নিশ্চয়ই তোমাকে পড়াশোনার সুযোগ দেব। বললাম,

“প্রীতি আমি চাইব যে তোমার মত সম্ভাবনাময় মেয়েরা যেন তাদের পরিকল্পনা মত পড়াশোনার সুযোগ পায়। আমি তোমার উজ্জল ভবিষৎ কামনা করি। আমার শুভ কামনা রইল।”

প্রীতিও মনে মনে ভাবল, যাক তুমি আমাকে একটু নিশ্চিত করলে। বলল,

“নাসিম আমাকে শুভ কামনা করবার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।”

আর কোন কথা না পেয়ে আমি আরম্ভ করলাম,

“প্রীতি তোমাদের বাড়িটা অনেক পুরান হলেও ভেতরের সাজসজ্জা বেশ সুন্দর আর আধুনিক। অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা নিশ্চয়ই এই রকম ছিল না, বদলান হয়েছে। কে এই সব ডিজাইন করেছে? যেই করুক, বেশ রুচিসম্মত, আধুনিক আর সুন্দর হয়েছে। তোমার কি এর ভেতর কোন হাত ছিল?”

“তুমি ঠিকই ধরেছ। বাড়িটা আসালেই বেশ পুরান। এর ডিজাইন আব্বুর এক স্থপতি বন্ধু এটা করে দিয়েছেন। ডিজাইনটা আমারও পছন্দ। আমাদের দুই বোনের ঘর দুটা একই ডিজাইনের। তবে ছোটুর, মানে রুবেলের ঘরটাতে সামান্য রদবদল করা হয়েছে। ওর ঘরে আমাদের মত ড্রেসিংটেবিল নেই। আছে একটা বড় আয়না আর একপাশে একটা ইলেক্ট্রিক ট্রেড মিল। ছোটু বাসায় নিয়মিতভাবে ট্রেডমিলিং করে আর নিয়মিতভাবে জিমে যায়। শরীরটাকে বেশ আকর্ষণীয় করে ফেলেছে। তোমার শারীরিক গঠন ও চেহারাটাও তো মেয়ে পটাবার জন্য উপযুক্ত। তুমি দুইজনের কাছ থেকে ছ্যাক খাবার পর আর মেয়ে পটাতে পারো নাই ?”

“আমি তো আগেই বলেছি যে সেই ঘটনার পর থেকে আমার ভেতরে এক রকমের ভীতির জন্ম হয়েছিল। আমি মেয়েদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চেষ্টা করতাম। তবে আমি বুঝতে পারতাম যে বেশ কিছু মেয়ে আমার দিকে একটু মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকায়। ওদের তাকাবার মানে আমি বুঝতে পারতাম। তোমার ছোটুর কি অবস্থা। কোন গার্লফ্রেন্ড হয়েছে নাকি? ওকে তো এখনও দেখলাম না।”

“কাল ওর গার্ল ফ্রেন্ড রুবার জন্মদিন ছিল। রুবাদের বাসায় অনুষ্ঠান ছিল বলে রুবাকে জন্মদিনে কাছে পায় নাই। তাই আজ ওকে নিয়ে একটু বাইরে গিয়েছে। শীঘ্রই চলে আসবে।”

“তার মানে রুবার সাথে রাসেলের এ্যাফেয়ার তোমরা জানতে। রুবাদের বাসায় জানে?”

“রুবা আর রাসেলের ব্যাপার শুধু আমরা দুই বোনই জানি। আব্বু আর আম্মু না জানলেও আম্মু বোধ হয় কিছুটা সন্দেহ করেন। আর রুবাদের বাসার কথা জানি না তবে বোধ হয় জানে না।”

“এইভাবে কতদিন আর চলবে। এক সময়ে সবাইতো জেনে যাবে।”

“রুবা কিন্তু দেখতে বেশ সুন্দরী, স্বাস্থ্যও ভাল। পড়াশোনাতেও ভাল। আব্বু আর আম্মু জানলে আমার মনে হয় সম্পর্কটা মেনে নেবেন। তবে রুবাদের বাসার ব্যাপার আমি বলতে পারব না। আর যখন সময় হবে তখন দেখা যাবে কি হয়।”

আমরা কথা বলার মাঝখানে আমাদের জন্য মিষ্টি আর কিছু ঝাল আইটেমের সাথে চা এসে গেল। আমরা দুজনে বেশ রসিয় রসিয়ে মিষ্টি আর চা খেলাম। প্রীতি ফ্রুট সালাদ আর চটপটি খেতে আমাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করলে আমি আগ্রহ নিয়েই খেলাম। ফ্রুট সালাদটা সত্যিই ভীষণ ভাল হয়েছিল। আমি সালাদটা দুইবার নিয়েছিলাম। পরে, তবে বিয়ের আগেই আমি জানতে পেরেছিলাম যে ঐ আইটেম দুটা প্রীতির করা। আমার বৌ একজন ভাল রাধুনী বলে আমি মনে মনে ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলাম। আমি আশাহত হই নাই। চা খেয়ে আমরা দুজনে যেয়ে সবার সাথে যোগ দিলাম। আমি অবশ্য এর আগেই প্রীতির ফোন নম্বরটা নিতে ভুল করি নাই। 

“প্রীতি তোমার ফোন নম্বরটা দাও।” 

প্রীতি মেকি আপত্তি জানিয়ে আর একটু লজ্জা মেশান কন্ঠে বলেছিল,

“আমার ফোন নম্বর নিয়ে কি করবে। ফোন করলে আমার কিন্তু লজ্জা করবে।”

“তাহলে আর কি করব। তোমার নম্বরটা একটা কাগজে লিখে তাবিজ বানিয়ে রাখব।”

“থাক তাবিজ বানাবার দরকার নেই। অনেক রাতে, যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়বে তখন ফোন করো।”

“ওটা তোমাকে বলতে হবে না। আমার বাসায় একটা জলজ্যন্ত বিপদ আছে, নাসিমা। সব সময়ে আমার পিছে লেগে থাকে। ওকে ফাঁকি দিতে হবে তাই আমি ফোন বেশ রাতেই করব। তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পার।”

আমরা দুজন যখন সবার সাথে যোগ দিলাম ততক্ষণে অবশ্য মুরুব্বীগণ কথাবার্তার প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিলেন। কথাবার্তা শেষ করে আমরা সবাই রাতের খাবার খেলাম। চলে আসার আগে আমি সবার অগোচরে প্রীতিকে চোখটিপ দিয়েছিলাম। সবার অগোচরে প্রীতিও আমাকে মুখ ভেংচি দিয়েছিল। সেই রাত থেকেই আমাদের ফোনে কথা বলা শুরু হল।  

মন্তব্য করুন