অন্তর্দ্বন্দ্ব

প্রকাশিত: মে 28, 2026
28 জন পড়ছেন

শাহাব সারাদিন বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বিকম-এ ভর্তির চেষ্টা করছিল। ইন্টারমিডিয়েটে রেজাল্ট মোটামুটি ভাল থাকায় সব জায়গায়তেই শহাবকে ভর্তি সুযোগ দেয়া যেতে পার বলে মত দেয়। তবে যখনই চার বছরের গ্যাপের কারণ জানতে চাইলে শাহাব সব জায়গাতেই সত্যি কথাই বলে। একজন হত্যাপ্রচেষ্টার খালাস প্রাপ্ত আসামীকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভর্তি করতে অপারগতা প্রকাশ করে। অবশেষে একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ভর্তি হতে পেরেছিল। কিন্তু তার সাহপাঠীর অবিভাবকগণ খালাসপ্রাপ্ত আসামী জেনে সবাই একযোগে আপত্তি জানিয়ে বলে যে অন্যথায় তারা তাদের সন্তানদের অন্য কলেজে নিয়ে যাবেন। কলেজ কর্তৃপক্ষ কলেজের ক্ষতি হবে জেনে শাহাবকে অন্য কলেজে চলে যেতে বলেন। শাহাবের পড়াশোনা চালিয়ে যাবার চেষ্টা ওখানেই শেষ হয়ে যায়। শাহাব যে কেন সারাদিন বাসায় থাকে না সেটা সারিকা ঠিকই আন্দাজ করতে পারে। সারিকা এই ব্যাপারে শাহাবের সাথে একান্তে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেয়। সুযোগের অপেক্ষায় থাকে এবং সুযোগও এসে যায়। এক রাতে সাবের সারিকাকে বুকে নিয়ে বললো, 

“সারি, পরশু আমাদের অফিসের বার্ষিক ডিনার।”

“ঠিক আজে, তুমি ডিনরে যেও।” 

“ডিনার তো সস্ত্রীক। প্রতি বছরই তুমি আমার সাথে যাও। এবারেও যাবে।” 

“এবারে তুমি একাই যাবে। আমি রিমিকে একা রেখে যেতে পারব না। রিমি আধা ঘণ্টা, সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে। কিন্তু তোমার অফিসের ডিনার তো তিন চার ঘণ্টার ব্যাপার। তুমি তোমার বসকে আমার ক্ষমা প্রর্থনার কথা জানাবে। আমাদের বাচ্চার কথা বললে উনি নিশ্চয়ই কিছু মনে করবেন না।”

“ঠিক আছে, আমার প্রিন্সেসের অসুবিধা হলে তোমার যাওয়া দরকার নেই। তোমার অনুপস্থিতি আমি ম্যানেজ করে নিতে পারব।” 

সারিকা এই সুযোগটা নেবে বলে ঠিক করল। সাবেরের ডিনারের কথা শাহাবকে জানাল না।

ডিনারের রাতে শাহাব সাবেরকে টেবিলে না দেখে খুবই অস্বস্তিতে পারে গেল। খানা শেষে আব্বার ঘরে যাবার সাথে সাথে শাহাবও টিভি না দেখে সোজা তার রুমে চলে এলো। টেবিল উঠিয়ে অন্যান্য সব কাজ শেষ করে সারিকা শাহাবের রুমে এসে বলালো, 

“শাহাব, তোমার সাথে কথা আছে।” 

“ঠিক আছে ভাবী। তবে এই রুমে না।” 

“তবে আমাদের রুমে চল।” 

“না কোন রুমে না। ডাইনিং টেবিলে অথবা ড্রইং রুমে চল।” 

“রুমে অসুবিধা কি?” 

“আমি বিশ্বাস করি না যে অসুবিধাটা কোথায় তা তুমি বোঝ না। আমি জানি না বন্ধ রুমে আমি আমাকে সংযত রাখতে পারব কি না। আর আমার মনে হয় তোমারও একই অবস্থা। তাই কোন অঘটন যাতে না ঘটে তাই খোলা জায়গায় কথা বলা যায়। অন্যথায় আমি দুঃখিত।” 

“শাহাব তোমার কথাই ঠিক। চল ডাইনিং টেবিলেই কথা বলি।” 

ডাইনিং টেবিলে দুজন দুই দিকে বসলো। 

“শাহাব তুমি সারা দিন বাসায় থাক না কেন?” 

“ভাবী, আব্বা অসুস্থ। সারাদিন উনি উনার ঘরে থাকেন। আমি একা একা তোমার সম্মুখীন হতে ভয় পাই, হয়ত নিজেকে সংযত রাখতে পারব না। আমি তোমার সাথে একই বাসায় থাকাটা আর নিরাপদ মনে করছি না। প্রতি রাতে তুমি আমার চোখের সামনে দিয়ে আমারই বড় ভাই-এর বিছানায় যাও সেটাও আমাকে সহ্য করতে হয়। তাই আমাদের দুজনেরই ভালর জন্যই আমাকে যত শীঘ্রই সম্ভব বাসা থেকে চলে যেতে হবে।” 

“শাহাব আমাকে একবার টিয়া বলে ডাকবে?” 

“সেটা সম্ভব না। এই দেখ, শুধু আমরা দুজন হলেই তুমিও দুর্বল হয়ে পর আর আমাকেও দুর্বল করে দাও।” 

“শাহাব তোমার কথাই ঠিক। আমাদের দুজনার একই বাসায় থাকাটা খুবই ঝুকিপূর্ণ। তুমি কি করবে, কি ভাবে কি করতে চাচ্ছ? যাই কর, আমাকে জানাবে। আর কোন রকম সহযোগিতা লাগলে আমাকে বলবে, সম্ভব হলে আমি সেটা পূরণ করতে চেষ্টা করব।”

দিন দুয়েক পরে একদিন বেলা এগারটারদিকে সারিকা রিমিকে কোলে নিয়ে কাজের ঠিকা মেয়েটাকে নিয়ে রান্নাঘরে রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সেই সময়ে শাহাব এসে দরজায় দাঁড়িয়ে বললো, 

“ভাবী দুই কাপ চা নিয়ে ডাইনিং টেবিলে একটু এসো। তোমার সাথে কথা আছে।” 

শাহাব এ পর্যন্ত কোনদিনই সারিকাকে নিজ থেকে ডাকে নাই বা কথাও আরম্ভ করে নাই আর আজ নিজ থেকে কথা বলতে চাইছে। নিশ্চয়ই কোন গুরুস্বপূর্ণ কথা আছে। সারিকা তাড়াতাড়ি কিছু চানাচুর আর কাজু বাদাম নিয়ে আর দুই কাপ চা নিয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে দেখে যে শাহাব আগেই এসে বসে আছে। দুজন টেবিলের দুদিকে বসে নিঃশব্দে চা আর বাদাম শেষ করল। শাহাব তবুও কিছু কলছে না দেখে সারিকাই আরম্ভ করল, 

“শাহাব, কিছু বলবে বলে ডাকলে অথচ কিছুই বলছ না কেন?” 

“ভাবী আমি পরশু দিন চলে যাচ্ছি।”

”শাহাব, তুমি পালাচ্ছ?” 

“হ্যাঁ ভাবী আমি তোমার কাছ থেকে পালাচ্ছি, আর কেন পালাচ্ছি সেটা তো তোমার অজানা নয়।”
“হ্যঁ সেটা জানি। আমরা দুজনে মিলেই ঠিক করেছিলাম যে আমার জন্য, তোমার জন্য, তোমার ভাইয়ার জন্য, তোমার ভাতিজির জন্য, আব্বার জন্য, সবার ভালর জন্য তুমি চলে যাবে। ঠিক আছে যাও, বাধা দেব না আর সেই অধিকারও এখন আমার আর নেই। কোথায় যাচ্ছ? কবে যাচ্ছ ? সবই তো আমাকে বলে যাবার কথা ছিল।” 

“ভাবী, পরশুদিন বুধবার আমি দুবাই যাচ্ছি। ওখানে আমার এক বন্ধু আছে, সেই সব ব্যবস্থা করেছে।” 

“শাহাব, দুবাই তো অনেক দূর। টিকিটের দামও তো অনেক। অত টাকা তুমি কোথায় পেলে? আমি তোমাক সহযোগিতা করতে চেয়েছিলাম আর তাতে তুমি রাজিও হয়েছিল। আমকে এড়িয়ে গেল কেন ? তোমার এক্সের কাছ থেকে টাকা নিতে কি তোমার ইগোতে বেধেছিল? ” 

বলেই সারিকা নিশব্দে চোখের পানি ছেড়ে দিল। সারিকার চোখের পানি দেখে শাহাব আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। সারিকার একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে বললো, 

“সারিকা, কেদো না, তুমি কাঁদলে আমারও যে কান্না আসে। এটা ঠিক যে তুমি সহযোগিতা করতে চেয়েছিলে আর আমিও সেটা নিতে রাজি ছিলাম। আর টাকাটা তো ভাইয়ার কাছ থেকে তোমাকে চাইতে হত। আমি জানি ভাইয়া তোমাকে অনেক ভালবাসেন আর তুমিও ভাইয়াকে অ..নে..ক ভালবাস। বাস না? ভাইয়া কোন প্রশ্ন না করেই তোমাকে টাকাটা দিয়ে দিতেন। কিন্তু উনার মনে একটা একটা প্রচ্ছন্ন প্রশ্নের জন্ম হত।” 

প্রায় ছয় বছর পরে শাহাব আবার সারিকা বলে ডাকলে সারিকা এবারে একটু শব্দ করেই কেদে উঠল। ‘তুমিও ভাইয়াকে অ..নে..ক ভালবাস। বাস না ?’ কথাটা শতভাগ সত্যি বলেই এখন শাহাবের সামনে সারিকা ভীষণ একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পরে গেল। একটা অবর্ণনীয় অন্তর্দ্বন্দে ভূগতে থাকল। নিজেকে কোন মতে সামলে ভেজা গলায় বললো, 

“শাহাব আমাকে আবার সারিকা বলে ডাকলে, তাহলে টিয়া বলে ডাকতে অসুবিধা কোথায়, আর একবার ডাকবে?” 

“ভাবীকে নাম ধরে ডাকতে অসুবিধা হয় না। টিয়া বলে ডাকার অধিকার আমি চার বছর আগেই হারিয়ে ফেলেছি।” 

“শাহাব, তুমি তো জান যে আমার আব্বা শুধু সচ্ছ্বলই ছিলেন না তিনি ছিলেন বিত্তবান। বিয়ের আগ পর্যন্ত আব্বা প্রতি মাসে আমাকে বেশ ভাল পারিমানে হাতখরচ দিতেন, যার প্রায় সবটুকুই বেচে যেত আর সেটা আমি আমার ব্যাঙ্ক হিসাবে জমা রাখতাম। আমার সেই এ্যাকাউন্টে প্রচুর টাকা পরে আছে। তোমার ভাইয়ার কাছ থেকে চাইতে হত না। শাহাব আমার কেন যেন মনে হচ্ছে তুমি আমার কাছ থেকে কোন রকমের সহযোগিতা নিতে অনিচ্ছুক।” 

শাহাব সারিকার শেষের কথাটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে বললো, 

“টাকাটা আমি আব্বার কাছ থেকে নিয়েছি।” 

“তুমি আব্বার কাছ থেকে টাকা নিয়েছ, তার মানে তুমি যে দুবাই যাচ্ছ সেটা উনি জানেন। তোমার ভাইয়াকে বলেছ?” 

“আব্বু জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমি বলেছিলাম যে আমি তো এই কয়েক মাস সারা দিন বাইরে বাইরে ঘুরে কিছু একটা করবার চেষ্টা করেছিলাম। কিছুই করতে পারি নাই। দুবাই যেয়ে দেখি কিছু করতে পারি নাকি। ভাইয়াকে বলি নাই, কেন বলি নাই সেটা যাবার আগে তোমাকে বলে যাব। তুমিও ভাইয়াকে কিছু বলো না। পরশু দিন রাতে আমার ফ্লাইট। আমি বিকেল চারটার আগেই, ভাইয়া বাসায় আসবার আগেই তোমার হাতের এক কাপ চা খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাব।”

এই দুই দিন সারিকা সারা দিনই অন্যমনস্ক ছিল। বিছানায় সাবেরর কাছেও ছিল শীতল। সাবেরের ডাকে, আগে যেমন উৎসাহ নিয়ে, আগ্রহ নিয়ে সাড়া দিতে এই দুদিন ছিল এদকম ঠাণ্ডা। সাবেরর প্রশ্নে মাসিকের কথা বলে এড়িয়ে গিয়েছিল। অবশেষে এলো সেই বুধবার। সকাল থেকেই সারিকার মন খারাপ তবে সাবেরকে কিছুই বুঝতে দেয় নাই। আজ শাহাব আর বাইরে য্য়া নাই। সকালের নাস্তা ছিল শাহাবের প্রিয় খাস্তা পরাটা আর মুগ ডাল দিলে মুরগির ভূনা। বেলা এগরাটার দিকে সারিকা নিজ হাতে কিছু লুচি ভেজে আর দুই কাপ চা নিয়ে টেবিলে এসে আশামত শাহাবকে পেল না। ওর ঘরে যেয়ে দেখে যে শাহাব উদাস মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। সারিকা শাহাবের মনের ব্যথা টের পেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে বললো, 

“শাহাব, টেবিলে এসো। চা খাবে।” 

কারো মুখে কোন কথা নেই। দুজনেই চুপচাপ চা শেষ করল। 

“শাহাব একটা কথা রাখবে? মাঝে মাঝে আমাকে ফোন দেবে। তুমি তো জান কখন আমি ফ্রি থাকি।” 

“ভাবী কেন আবার আমাকে জড়াচ্ছ। আমি কোন দিনই তোমাকে ফোন করব না। আমি ভাইয়ার স্ত্রীকে কেন ফোন করব।” 

“শাহাব এককালে আমরা পরস্পরকে ভালবাসতাম। আমি জনি বা বুঝতে পারি যে তোমার মনে সেই ভালবাসাটা সুপ্ত হলেও এখনও রয়ে গিয়েছে। আর তোমার কথামত শিল-পাটা ভেতরে পরে আমার অবস্থা সেই মসল্লার মত।” 

“ভাবী ও সব অতীত। অতীত ভুলে যাও। সবার ভালর জন্য ভুলে যাও। বর্তমানটাই এখন বিবেচ্য। তুমি ভাইয়াকে ভালবাস, তোমাদের ভালবাসার একটা ফসলও আছ। আর তোমার কথাও ঠিক। আমার মনে হয় তোমার প্রতি আমার ভালবাসা কোনদিনই যাবে না। তাই কোন অঘটন ঘটার আগেই আমি পালাচ্ছি।” 

দুজনে আবার চুপচাপ। সারিকার চোখ পানিতে ভরে গেলে ও রিমিকে কোলে চেপে ধরে টেবিল থেকে উঠে গেল।

দুপুরেও ছিল শাহাবের প্রিয় ভূনা খিচুরি, বেগুন ভাজা, প্রচুর পেয়াজ আর মসল্লা দিয়ে ডিমের ভূনা, আর কাচকি মাছের চচ্চরি। 

“ভাবী আজ দেখি সবই আমার প্রিয় খাবারগুলো রেধেছ।” 

“হ্যাঁ আমি আমার প্রিয় দেবরের জন্য নিজ হাতে রেধেছি। জানি না আবার কবে তোমার দেখা পাব, তোমাকে খাওয়াতে পারব।” 

খানা শেষে আব্বা উঠে গেলে সারিকাও উঠে যেতে চাইলে শাহাব বললো, 

“ভাবী আমি তো আর কিছুক্ষণ পর চলে যাব। সারিকা এই সময়টুকু আমাকে দেবে। বস একটু কথা বলি না হয় একটু চুপচাপ আমার সাথে বসে থাক।” 

“শাহাব আমি তো এখন আর তোমার সারিকা নই এখন আমি তোমার ভাইয়ার সারিকা, তোমার ভাইয়ার বাচ্চার মা। ঠিক আছে তবুও আমি এই সময়টুকু তোমাকে দেব।” 

দুজনে আরো ঘণ্টাখানেক ঐ টেবিলে বসেই কথা বললো। কথা বেশি হল না তবে চুপচাপ দুজন দুজনার সান্নিধ্য উপলব্ধি করতে থাকল। 

“সরিকা.. না তুমি তো এখন আমার ভাবী, তুমি চা বানিয়ে টেবিলে এসো আমি যাই আব্বুর সাথে দেখা করে আমার মালসামান নিয়ে আসি।”

“আব্বু আমি আসি।” 

“ঠিক আছে বাবা এসো। পৌঁছে খবর দিও। তোমার ডলার, টিকেট, পাসপোর্ট সব ঠিক মত নিয়েছ?” “হ্যাঁ আব্বু আমি সবই নিয়েছি। আব্বু আপনি রেস্ট করেন আপনাকে উঠতে হবে না।” 

শাহাব আব্বুর সাথে দেখা করে টেবিলে এসে দেখে যে সারিকা চা আর কিছু বিস্কিট নিয়ে অপেক্ষা করছে। সারিকার হাতের চা খেয়ে শাহাব রওয়ানা দিলে সারিকাও ওর সাথে দরজা পর্যন্ত এলো। শাহাব আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। সারিকার একটা হাত আলতো করে ধরে বললো, 

“টিয়া, আসি। আমাকে ভুলে যেও। আব্বু, ভাইয়া, রিমি আর তোমার যত্ন নিও।” 

টিয়া শুনে সারিকা কেদে দিয়ে বললো, 

“শাহাব সেই তো টিয়া বলে ডাকলেই আর তার সাথে আমকেও কাঁদিয়ে গেলে। যাবার আগে তোমাকে একটা ছোট্ট উপহার দেই।” 

বলেই সারিকা ওর পায়ের আঙ্গুলের উপর ভর দিয়ে একটু উচু হয়ে দুই হাত দিয়ে শাহাবের গলা পেঁচিয়ে ধরে ঠোঁটে চুমু খেল। সারিকার এই অনভিপ্রেত আচরণের শাহাব কিছুক্ষণের জন্য হলেও একটু অপ্রস্তুত হয়ে স্থির হয়ে ছিল। পরে আর নিজেকে সংযত করতে না পেরে শাহাবও সারিকাকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে প্রচণ্ডভাবে চুমুর প্রতিউত্তর দিতে থাকল। এইভাবে প্রায় মিনিটখানেক ওরা পরস্পরকে জড়িয়ে ছিল। অবশেষে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে শাহাব সারিকাকে ছেড়ে দিয়ে কোমল ও একটু ভেঁজা স্বরে বললো, 

“টিয়া, আমাকে ছাড়, আমাকে যেতে দাও।” 

সারিকা শাহাবকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরে কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বললো, 

“শাহাব, আমি অপারগ। আমাকে ক্ষমা করো।” 

“টিয়া আমরা এখন যে পরিস্থিতির ভেতরে আছি, সেটাতে তোমার কোন হাত ছিল না। তুমি পরিস্থিতির শিকার। পরিস্থিতিটা উল্টা হলে, কে জানে আমিও হয়ত তোমাকে ছেড়ে যেতাম। তাই ক্ষমার কোন প্রশ্নই আসছে না।” 

“শাহাব তুমি তোমার ভাইয়াকে তোমার চলে যাওয়টা বলো নাই কেন সেটা যাবার আগে বলে যাবে বলেছিলে।” 

“দেখ টিয়া, এখানেও ভাইয়া পরিস্থিতির শিকার। উনি তোমাকে জোড় করে বিয়ে করেন নাই, রীতিমত প্রস্তাব পাঠিয়ে, সব রকম সামজিক আচার মেনে তোমাকে বিয়ে করে ঘরে এনেছিলেন। তোমরা পরস্পরকে ভালবেসেছিলে। ভাইয়া তোমার আমার সম্পর্কটার কিছুই জানতেন না। তবু আমি আমার অবচেতন মনে ভাইয়াকে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করি।” 

এবারে শাহাব তার দুই হাত দিয়ে সারিকার মুখটা ধরে ঠোঁটে হালকা করে চুমু দিয়ে বেরিয়ে গেল। শাহাবকে যতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল সারিকা ততক্ষণই দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল।

এদিকে বাবা ছেলেটাকে বিদায় যানাবার জন্য উঠে এসেছিলেন। উনি বিস্ময়ের সাথে ছোটছেলে আর বড় বৌ-কে চুম্বনরত অবস্থায় দেখে বজ্রাহতের মত ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি ওদের ভেতরে কি কথা হচ্ছিল তা শুনতেও পান নাই। তবে ভাবী আর দেবরের ভেতরে একটা অনৈতিক সম্পর্কের ধারণা করে নিলেন এবং ওদের ভেতরে এতদিন ধরে নিশ্চয়ই পরকিয়াও চলছিল বলে তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করলেন। শাহাব আর সারিকার এই বেদনাদায়ক বিদায় পর্বের পুরাটাই তিনি স্থানুরমত দেখলেন। তিনি প্রচণ্ড মানষিক আঘাত পেয়ে চুপ করে ঘরে যেয়ে শুয়ে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে দিলেন। তিনি দুদিন কারো সাথে কোন কথা বললেন না। যেটুকু না খেলেই নয় শুধু সেটুকুই খেতেন। সাবের আর সারিকা মনে করেছিল যে শাহাব অনির্দিষ্টকালের জন্য চলে যাওয়াতে তিনি হয়ত দুঃখ পেয়ে চুপ করে গেছেন। শাহাব আর সারিকার ভেতরে একটা অনৈতিক সম্পর্কের ধারণা নিয়ে তিনি মনঃকষ্টে ভুগতে ভুগতে এক রাতে ঘুমের ভেতরে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করলেন।

শাহাব আর কোন দিনই দেশে আসে নাই, ফোনও করে নাই। শাহাব বিয়েও করে নাই। শাহাব যাবার তিন বছর পর সাবের আর সারিকার এক ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। সারিকা ছেলের নাম দিয়েছিল ‘রিমন’। সারিকার ছেলে মেয়ে দুজনার নামই শাহাবের দেওয়া।

~~•°•~~

লেখিকা – শিহোম

“অন্তর্দ্বন্দ্ব”-এ 2-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন