ভূমিকা: রসের নন্দনতত্ত্ব ও কামনার মনস্তত্ত্ব
ভারতীয় নন্দনতত্ত্বে ভরত মুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’ থেকে শুরু করে আনন্দবর্ধনের ‘ধ্বন্যালোক’ পর্যন্ত সর্বত্রই ‘নবরস’-এর মধ্যে ‘শৃঙ্গার’ বা আদিরসকে ‘রসরাজ’ বা শ্রেষ্ঠ রসের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মানবজীবনের সবচেয়ে আদিম, অকৃত্রিম এবং শক্তিশালী প্রবৃত্তি হলো নর-নারীর পারস্পরিক আকর্ষণ ও দৈহিক বাসনা। ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণ তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের অবচেতন মনের গভীরে প্রোথিত ‘লিবিডো’ বা যৌনাকাঙ্ক্ষাই তার সমস্ত সৃজনশীলতার অন্যতম চালিকাশক্তি। সাহিত্য যেহেতু সমাজ ও মানব-মনস্তত্ত্বের দর্পণ, তাই হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও এই কামনার বিবর্তন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। যা আধুনিক সমাজের তথাকথিত ‘ভদ্রলোকী’ মানদণ্ডে অনেক ক্ষেত্রে ‘ট্যাবু’ বা গোপন বিষয় বলে গণ্য হয়, প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যে তা অত্যন্ত শৈল্পিক, খোলামেলা এবং আধ্যাত্মিকতার মোড়কে উদযাপিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে এই আদিরস বা শৃঙ্গার রসের বিবর্তন কেবল শরীরী বর্ণনার ইতিহাস নয়, বরং এটি ধর্ম, সমাজতন্ত্র ও মনস্তত্ত্ব বদলের এক অনবদ্য দলিল।

১. প্রাচীন যুগ: চর্যাপদের সন্ধ্যাভাষায় রূপক ও কামনার উদ্যাপন
বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’-এ (খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী) মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের সাধনভজনের নিগূঢ় তত্ত্বের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই সাধনার রূপক হিসেবে তারা ব্যবহার করেছেন নর-নারীর দৈহিক মিলনের চিত্র। চর্যাপদের ভাষা ‘সন্ধ্যাভাষা’ বা আলো-আঁধারি ভাষা—যার বাইরের অর্থ এক, ভেতরের অর্থ আরেক।
কাহ্নপাদের একটি চর্যায় ডোম্বী ও কাপালিকের মিলনের রূপকে জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনের কথা বলা হলেও, এর বাহ্যিক অর্থে তীব্র শরীরী কামনারই প্রকাশ ঘটে:
“টালত মোর ঘর নাহি পড়বেশী / হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী”
এখানে নর-নারীর উদ্দাম যৌন মিলনকে ‘মহাসুখ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। প্রাচীন বাংলায় দৈহিক কামনাকে পাপ বা নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে না দেখে, বরং পার্থিব আনন্দ ও আধ্যাত্মিক উত্তরণের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হতো।
২. মধ্যযুগ: দেবত্বের আড়ালে মানবিক কামনা ও শরীরী প্রেম
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ছিল মূলত দেব-দেবী নির্ভর। কিন্তু ধর্ম ও ভক্তির আবরণের নিচেই লুকিয়ে ছিল তৎকালীন বাঙালির প্রবল রোমান্টিকতা ও কামজ বাসনা।
ক. শ্রীকৃষ্ণকীর্তন: কামার্ত দেবতা ও মানবিক রাধা
চতুর্দশ শতাব্দীতে বড়ু চণ্ডীদাসের রচিত ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের যে রূপ ফুটে উঠেছে, তা একেবারেই লৌকিক, মানবিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে রূঢ়। এখানে কৃষ্ণ কোনো ঈশ্বর নন, বরং এক কামার্ত, জেদী যুবক; এবং রাধা এক অনভিজ্ঞা, সমাজভীতা কিশোরী। কাব্যের ‘তাম্বূল খণ্ড’, ‘দান খণ্ড’ বা ‘বাণ খণ্ড’-এ কৃষ্ণের যে যৌন-আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ দেখা যায়, তা আধুনিক সাহিত্যকেও হার মানায়। বড়ু চণ্ডীদাস অত্যন্ত খোলামেলা ভাষায় রাধার বয়ঃসন্ধির শারীরিক পরিবর্তন এবং কৃষ্ণের আগ্রাসী কামনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন।
খ. বৈষ্ণব পদাবলী ও বিদ্যাপতির শৃঙ্গার
পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম আরও মার্জিত, আধ্যাত্মিক ও পরিশীলিত হলেও সেখানে শৃঙ্গার রসের কোনো অভাব ছিল না। বিশেষ করে মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির লেখায় রাধার ‘বয়ঃসন্ধি’ বা যৌবনাগমের বর্ণনা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইরোটিক কাব্য হিসেবে স্বীকৃত। বাল্য ও যৌবনের সন্ধিক্ষণে এক কিশোরীর শারীরিক ও মানসিক রূপান্তরের এমন নিখুঁত ও আবেদনময় বর্ণনা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। এছাড়া গোবিন্দদাসের ‘অভিসার’ পর্যায়ের পদগুলোতেও নিষিদ্ধ প্রেমের তীব্র শারীরিক ও মানসিক টান পরিলক্ষিত হয়।
গ. মৈমনসিংহ গীতিকা: মাটির কাছাকাছি প্রেম
মধ্যযুগের প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যের বাইরে পূর্ববঙ্গের লোকসাহিত্য ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’য় (যেমন: মহুয়া, মলুয়া, চন্দ্রাবতী) আমরা কোনো দেব-দেবী নয়, বরং রক্তমাংসের সাধারণ মানুষের প্রেমের দেখা পাই। সেখানে নর-নারীর কামনা অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত, বন্য এবং মাটির কাছাকাছি।
৩. অষ্টাদশ শতাব্দী: নাগরিক কবি ভারতচন্দ্র ও রাজসভার আদিরস
মধ্যযুগের শেষভাগে, বিশেষ করে নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় বাংলা সাহিত্য ধর্ম থেকে বেরিয়ে মানুষের কথা বলতে শুরু করে। এই যুগের শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের অমর সৃষ্টি ‘বিদ্যাসুন্দর’ (অন্নদামঙ্গল কাব্যের অংশ)।
বর্ধমান রাজকুমারী বিদ্যা এবং কাঞ্চীপুরের রাজপুত্র সুন্দরের গোপন প্রেমের এই কাব্যে ভারতচন্দ্র শৃঙ্গার রসের চূড়ান্ত উৎকর্ষ সাধন করেছেন। সুড়ঙ্গপথে সুন্দরের বিদ্যার ঘরে প্রবেশ এবং তাদের গোপন দৈহিক মিলনের প্রতিটি মুহূর্ত ভারতচন্দ্র অত্যন্ত নিপুণ, সংস্কৃত অলংকারমণ্ডিত এবং খোলামেলা ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তৎকালীন রাজসভায় এবং সমাজে এই ধরনের আদিরসাত্মক কাব্য অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল, যা প্রমাণ করে সেই সমাজের কামনাবাসনা প্রকাশের পরিধি অনেক বেশি উন্মুক্ত ছিল।
৪. ঊনবিংশ শতাব্দী: রেনেসাঁস, অবদমন এবং বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ
ইংরেজদের আগমনের পর ভিক্টোরিয়ান নীতিবোধ (Victorian Morality) বাঙালি সমাজকে আচ্ছন্ন করে। সাহিত্যে প্রেম অনেক বেশি মানসিক, আদর্শিক ও ‘ভদ্র’ রূপ লাভ করে। শারীরিক কামনাকে অনেক ক্ষেত্রে পাপ বা নিষিদ্ধ হিসেবে দেখা শুরু হয়।
তবুও, এই অবদমনের মাঝেই লেখকরা মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার আশ্রয় নেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসে কুন্দনন্দিনী বা ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এ রোহিণীর অবদমিত কামনা তৎকালীন সমাজকাঠামোর ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দিয়েছিল। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে বিধবা বিনোদিনীর তীব্র নারীত্ব ও শারীরিক আকাঙ্ক্ষা বাংলা সাহিত্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যেখানে প্রথমবারের মতো একজন বিধবা নারীর মনস্তাত্ত্বিক ও যৌন ইচ্ছাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
৫. বিংশ শতাব্দী: কল্লোল গোষ্ঠী এবং রূঢ় বাস্তবতার নগ্ন রূপ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণ তত্ত্ব এবং কার্ল মার্কসের শ্রেণিদ্বন্দ্বের প্রভাবে বাংলা সাহিত্যে এক বিরাট পরিবর্তন আসে। সাহিত্যে আগমন ঘটে ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর (১৯২৩)।
জগদীশ গুপ্ত, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসুর মতো লেখকরা সাহিত্যের দেবালয় থেকে মানুষকে নামিয়ে আনেন বস্তির অন্ধকারে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে কুবের ও কপিলার প্রেম কিংবা ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’-য় কুসুমের অবদমিত কামনা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন রিয়েলিজম বা বাস্তবতার জন্ম দেয়। তারা দেখালেন, প্রেম কেবল জ্যোৎস্নারাতে হয় না; বরং ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং রূঢ় বাস্তবতার মাঝেও মানুষের আদিম যৌনাকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত তীব্রভাবে কাজ করে। বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’ উপন্যাসটি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক এবং নারী-মনস্তত্ত্বের শারীরিক কামনার এমন এক অকৃত্রিম দলিল, যার কারণে এটি দীর্ঘদিন আইনি নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়েছিল।
৬. ষাটের দশক: হাংরি জেনারেশন ও প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা
ষাটের দশকে বাংলা সাহিত্য জগতে এক তুমুল বিস্ফোরণ ঘটায় ‘হাংরি জেনারেশন’ (Hungryalist Movement) বা শ্রুতি ক্ষুধার্ত প্রজন্ম। মলয় রায়চৌধুরী, সমীর রায়চৌধুরী, সুবিমল বসাক, ফাল্গুনী রায়-রা সাহিত্যের সমস্ত প্রচলিত ভণ্ডামি ও নিয়ম ভেঙে চুরমার করে দেন। তারা সমাজের অন্ধকার দিক, বেশ্যালয়, মানুষের আদিম কামজ প্রবৃত্তি এবং স্ল্যাং বা গালিগালাজ সরাসরি সাহিত্যে নিয়ে আসেন।
মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার জন্য তার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার দায়ে মামলা হয়। এই আন্দোলন প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রবৃত্তি বা কামনাকে ভদ্রতার চাদরে ঢেকে রাখা যায় না, তা কবিতার লাইনে বারুদ হয়ে ফেটে পড়ে।
৭. আধুনিক ও সমসাময়িক কাল: সমরেশ বসু থেকে নবারুণ
পরবর্তীতে প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক সমরেশ বসুর ‘বিবর’ এবং ‘প্রজাপতি’ উপন্যাস দুটিও অশ্লীলতার দায়ে কাঠগড়ায় ওঠে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিক রায় দেয় যে, সাহিত্যের খাতিরে এবং চরিত্রের প্রয়োজনে ব্যবহৃত কোনো বর্ণনা বা শব্দ অশ্লীল নয়।
পরবর্তীকালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এবং আরও পরে নবারুণ ভট্টাচার্যের লেখায় সাবল্টার্ন বা প্রান্তিক মানুষের ভাষা এবং যৌনতার অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, রাজনৈতিক এবং সরাসরি উপস্থাপন দেখা যায়।
উপসংহার: কামনার চিরায়ত সত্য
সাহিত্যের কাজ সমাজকে কেবল নীতিবাক্য শোনানো নয়, বরং মানুষের ভেতরের অকৃত্রিম সত্যকে তুলে ধরা। চর্যাপদের আধ্যাত্মিক রূপক থেকে শুরু করে হাংরি জেনারেশনের বিদ্রোহ—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এটি স্পষ্ট যে, মানুষের দৈহিক কামনা, যৌনতা এবং আদিরস কখনোই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। যুগের পরিবর্তনে, সমাজকাঠামোর চাপে এর প্রকাশের ভাষা বদলেছে মাত্র। শরীরী প্রেম বা ইরোটিক সাহিত্যকে কেবল ‘অশ্লীলতা’র তকমা দিয়ে দূরে সরিয়ে রাখলে, মানব-মনস্তত্ত্বের একটি বিশাল এবং ধ্রুব সত্যকে অস্বীকার করা হয়। বাংলা সাহিত্যের এই বিবর্তনের ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে—কামনা ও প্রেম মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ; আর এই দুইয়ের সৎ, সাহসী এবং শৈল্পিক প্রকাশেই সৃষ্টি হয় কালজয়ী সাহিত্য।
প্রবন্ধকার: আবেশ মজুমদার (শিক্ষাবিদ ও সাহিত্য-গবেষক)