“ঠিক আছে, শাহাব তোমার দাওয়াত কবুল করলাম। তা কবে, কোথায় চা খাওয়াবে? আর শুধু চায়ে কিন্তু চলবে না। আমাদের কিন্তু সোবানবাগ মসজিদের পাশেই মেমোরি বেকারির গরম চিকেন প্যাটিস আর কোক খাওয়াতে হবে।”
শাহাব আর জনি কিছু বলার আগেই সারিকা বলে উঠল,
“ভাবী প্যাটিস আর কোকে আমার আগ্রহ নেই। বিএফসি (বেস্ট ফ্রাইড চিকেন) আর কোক খাওয়ালে আমি রজি। তাতে বিলটাও বেশ মোটা হয়ে যাবে। জনিকে একটু বাপের প্যাদানি খাওয়ানো যাবে।”
“ভাবী আপনাদের ডেট ও ভেনু জানাতে হলে তো আপনার ফোন নম্বরটা দরকার।”
নিশাত মনে মনে ভাবলো, ‘শাহাব, আসলে তো সারিকার ফোন নম্বরটা তোমার দরকার’। নিশাত ওর ফোন নম্বরটা দিয়ে বললো,
“এটা আমার নম্বর। আমি প্রায় সারাদিনই ফ্রি থাকি।”
এই ভাবে ভাবীর সহযোগীতায় শাহাব আর সারিকা কাছাকাছি হল। এই ভাবে ভাবীর মাধ্যমে ওদের ডেটিং করাটা কারো পছন্দ হচ্ছিল না। ওরা নিজেরা ঠিক করে নিল যে প্রতি শুক্রবার লাঞ্চের পর তিনটার দিকে সারিকা রাপা প্লাজায় আসবে। সেখান থেকে শুরু করে ওদের প্রেম অপ্রতিরোধ্যভাবে চলতে থাকল। ঢাকায় বান্ধবী নিয়ে প্রেম করবার জন্য প্রচুর শপিং সেন্টার, রেস্টুরেন্ট, কফিবার, আইসক্রিম পারলার আছে। এছাড়াও একান্ত সময় কাটাবর জন্যও আছে নানান সুযোগ। অনেক প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে সন্ধ্যায় রিক্সা করে রাস্তায় রাস্তায় উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ঘুরে ঘুরে প্রেমালাপ করাটা বেশি পছন্দের।
সন্ধ্যার পর রিক্সায় প্রিয়াকে একান্ত পাওয়া যায়। তাই শাহাব আর সারিকা রিক্সায় ঘুরে প্রেমালাপ করাটাই বেশি পছন্দ করত। প্রথম যেদিন ওরা রিক্সায় ঘুরছিল সেদিন সারিকা তার চুল একটা বিশাল খোপা করে বেঁধে এসেছিল। একটু নির্জন জায়গায় আসতেই শাহাব টান দিয়ে সারিকার খোপাটা খুলে দিয়ে ওর চুলের ভেতরে মাথাটা ডুবিয়ে দিল। সুগন্ধি শ্যাম্পু দ্বারা শ্যাম্পু করা সিল্কি চুলে সারিকা কোন রকম তেল লাগায় না। সারিকার চুলগুলো টেনে শাহাব কিছুক্ষণ ধরে নিজ মুখে ঘষে উম উম করে হালকা শব্দ করে নিজের ভাললাগাটা বুঝিয়ে দিল। সারিকা শাহাবের পছন্দটা মনে গেথে নিল। দ্বিতীয় অভিসারের দিন সারিকা শাহাবের পছন্দমত ওর চুল খোলা রেখে এসেছিল। রিক্সায় উঠেই বললো,
“শাহাব তোমার পছন্দমত আজ আমি এলো চুলে এসছি। তুমি খুশি হয়েছ?”
“আমি তোমার এলো চুলই বেশি পছন্দ করি সেটা ঠিক। তবে তুমি খোপা বেধে এসো। আমি নিজে তোমার খোপা খুলে তোমার চুলের ভেতরে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাই। তোমার চুলগুলো আমার মুখে ঘষে চুলের মসৃণতাটা আমি উপভোগ করতে চাই। দুঃখিত, আমি কবিতা লিখতে পারি না। নইলে তোমার চুল নিয়েই একটা কবিতার বই লিখে ফেলতাম। যাক ঘাবরার কিছু নেই। আমি কবি না হলেও চুলে উপরে কয়েকটা কবিতা পেয়েছি। সেগুলোর ভেতরে যেটা আমার কাছে সব চেয়ে ভাল লেগেছে সেটা আমি আবৃত্তি করছি। কবিতাটা কে লিখেছে সেটা অবশ্য আমি জানতে পারি নাই।
তোমার ওই চুলে দেখেছিলাম মায়ার কারুকাজ,
সেই মায়াতে বিভোর আমি, স্পন্দিত হয়ে আজ।
চুলের আলোয়, চুলের নেশায় মাতাও আমায় রোজ,
চুলের খেলায় ভোলাও আমায়, চুলেই তোমার খোঁজ।
ওই চুলেতে গোলাপ আমি বেঁধেছিলাম যবে,
আরো বাংলা চটি
হারিয়ে ছিলাম অপার মায়ায়, ছিলেম না এই ভবে।
তোমার চুলের গন্ধে আমি মাতোয়ারা রই,
বলতে পারবে ? চুলের রাণী থাকো তুমি কই ?
এর পরে অবশ্য আরো আট লাইন আছে। তবে সেগুলো আমার কাছে লাগসই মনে হয় নাই, তাই সেগুলো বাদ দিয়েছি। কবিতার মতই আমি তোমার চুলে বিভোর, স্পন্দিত আর তোমার চুলের নেশায় মাতোয়ারা। তবে তোমার চেহারাতে একটা জিনিষ মিসিং। আমি সেটারও ব্যবস্থা করেছি।” বলেই শাহাব পকেট থেকে এক পাতা টিপ বের করে, ওর ভেতর থেকে একটা ছোট্ট কালো টিপ সারিকার পাতলা অথচ ঘন কালো ভ্রূর ঠিক মাঝখানে পরিয়ে দিল। সেই ছোট্ট টিপে সারিকার চেহারাটা আরো সুন্দর, আরো আকর্ষণীয়, আরো মায়াবী হয়ে উঠল। সারিকা অভিভূত হলেও একটা ঠাট্টা করতে ভুলল না।
“শাহাব, সত্যি করে বলোতো তুমি আমার আগে আর কয়টা মেয়ের সাথে প্রেম করেছিলে।”
“সারিকা আমার মনে হয় প্রশ্নের উত্তরটা তোমার জানা আছে। তবুও বলছি, সারিকা তুমিই আমার প্রথম প্রেম আর আশা করি ওটাই আমার শেষ প্রেম হবে। তবে হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?”
“তোমার কার্যক্রমই আমার মনে এই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই যেমন মেয়েদের চুল নিয়ে তোমার এত আবেগ, এত উচ্ছ্বাস, মেয়েদের চুল নিয়ে কবিতা, আমাকে টিপ পরানো এই সবই অনুসন্ধেয়। শাহাব আমি তোমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি। আমি বিশ্বাস করি যে আমিই তোমার প্রথম প্রেম আর জেনে রাখ তুমিও আমার প্রথম প্রেম।”
বড় ভাই সাবের এখন বুয়েটে পূরকৌশল বিভাগে চতুর্থ বর্ষে পড়ছে, ভাই শাহাব বুয়েটে সুযোগ না পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কমার্স পড়ছে। সব চেয়ে বড় বোন সাবিহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্কে মাস্টার্স করছে আর চুটিয়ে সহপাঠীর সাথে প্রেম করছে। সাবিহা ছুটির দিন একেক ভাইকে নিয়ে মর্নিং শো দেখার নাম করে প্রেমিকের সাথে ডেট করত আর ভাইকে একটা করে মর্নিং শো’র টিকিট দিত। শাহাব খুব আগ্রহ নিয়ে তার সুযোগের অপেক্ষায় থাকত। শাহাব সেদিন বোনের কাছ থেকে টিকিট না নিয়ে টাকা নিত আর দুজনের টিকিট কেটে সারিকাকে নিয়ে হলে যেয়ে প্রেমালাপ করত। সাবিহার স্নাতকোত্তর করাবর পর পরই তার প্রেমিকের সাথে বিয়ে হয়ে যায়। শাহাব আর সারিকা প্রায় দু বছর হল প্রেম করছ। তবে কেউই পরস্পরের পরিবার সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে জানে না, কেউ কারো বাসায় যায় নাই। তারা নিজেদের ভেতর প্রেম করতে এতো ব্যস্ত ছিল যে তারা শুধু ক’ ভাই-বোন, বাপ মা কি করেন এইটুকু জেনেই সন্তুষ্ট ছিল। ইতিমধ্যে সারিকা আইএ পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সোসিওলজিতে অনার্স ভর্তি হযেছে। সুন্দরী সারিকার জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসা শুরু হয়েছে। সারিকার বিয়ে ঠেকাবার জন্য শাহাব আর সারিকা ঠিক করল যে ওরা ওদের প্রেমের বিষয়টা দুই বাসায় জানিয়ে দেবে। প্রেম করাটাকে আজকাল সবাই খুব স্বাভাবিক বলে মনে করে। তবে শাহাবের বাসায় অসুবিধা নেই। বাসার সবাই জানে যে শাহাবের একটা গার্লফ্রেন্ড আছে। তবে ভাবী নিশাত ছাড়া সারিকার প্রেমের ব্যাপারে ওর বাসার আর কেউ জানে না। সারিকা বাসায় তার প্রেমের ব্যাপারে কি রকমের প্রতিক্রিয়া হবে সেটা নিশ্চিন্ত নয় বলে সময় নিচ্ছিল। ওরা কেউই ধারণাও করতে পারে নাই যে ওরা সেই সুযোগটা আর পাবে না, আর তাদের জীবনটাও সম্পূর্ণ বদলে যাবে।
সাবের তার নায়কোচিত আর মেয়েলি চেহারার কল্যানে আর তার উপরে বুয়েটে পড়ছে, সেই সুবাদে খুব সহজেই মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করতে পারে। স্কুল ও কলেজে পড়বার সময়ে কোন কাজিন বোনই তার ফ্লার্ট থেকে রক্ষা পায় নাই। সবাই মনে করত সাবের তাকেই ভালবাসে। আসলে সাবের একজনের সাথে ফ্লার্ট করে কিছুদিন পর আর একজনকে ধরছিল। কথায় আছে চোরের দশদিন আর গৃহস্থের একদিন। সাবেরের সর্বশেষ বন্ধবী বদরুন্নেসা গার্লস কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ফিরোজা। সাবের বুয়েটে পড়ে, ভাল ছাত্র, দেখতে সুন্দর, অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে, তাই ফিরোজার বাড়িতে ওদের সম্পর্কে সম্মতিত ছিলই একন কি প্রছন্নভাবে উৎসাহও দেওয়া হত। সাবের আর ফিরোজার সর্ম্পকটা প্রায় ছয় মাস হতে চললো। সাবরের কাছে বান্ধবী পরিবর্তন করার সময় হয়ে এলো। সাবের, একই কলেজের প্রথম বর্ষের মাহফুজাকে পটিয়ে তার নতুন বান্ধবী বানিয়ে ফেললো। ফিরোজাকে বাদ দিয়ে সাবেরের নতুন বান্ধবী মাহফুজার কথা গোপন রইল না। ফিরোজা সাবেরের বিশ্বাসঘাতকতার কথা বাসায় জানিয়ে দিল। বাসার সবাই প্রচণ্ড রাগান্বিত হল। ফিরোজার ভাই সব চাইতে বেশি রাগান্বিত হল।
কয়েকদিন পরে এক বিকেলে সাবের স্লিং-এ ঝোলান প্লাস্টারে বাঁধা আর মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় বাসায় এলো। জিজ্ঞাসা করলে সাবের বাসায় জানাল যে রাস্তায় এক দুর্ঘটনায় সে আহত হয়ে এই অবস্থায় পরেছে। শাহাব খেয়াল করে সাবেরের শার্টের কলারে মুঠি করে ধরার স্পষ্ট ছাপ দেখতে পেল। ঘাপলাটা আন্দাজ করতে পেরেও চুপ করে থাকল। নিভৃতিতে পেয়ে শাহাব সাবেরকে চেপে ধরলে, শাহাব স্বীকার করল যে কয়েকটি মাস্তান টাইপের ছেলে তাকে পিটিয়েছে। তবে কেন পিটিয়েছে সেটা সে জানে না। শাহাব, ভাই সাবেরর ঘন ঘন গার্লফেন্ড বদলাবার অভ্যাসটা জানে। তাই শাহাবের ধারণা হল যে তার সদ্য প্রাক্তন হওয়া গার্লফ্রেন্ড ফিরোজাই এটা করিয়েছে। শাহাব গোপনে অনুসন্ধান শুরু করল। প্রথমেই আরম্ভ করল যে ক্লিনিককে সাবেরের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল সেখান থেকে। সেখান থেকে জানল যে সেদিন কয়েকটি ছেলে রাস্তায় দুর্ঘটনায় আহত এক ছেলে এনে চিকিৎসা করিয়েছিল। এক প্যাকেট বেনসন আর দুই ‘শ টাকার বিনিময়ে শাহাব এক এ্যাটেন্ডেটের কাছ থেকে সেই ছেলের নাম ও ঠিকান জেনে নিল। সেই ঠিকানায় শাহাব যেয়ে দেখে যে সেটা একটা চার ফিট দেয়াল দিয়ে ঘেরা একটা খালি আবাসিক প্লট। মানে ঠিকানাটা মিথ্যা ছিল। সাবেরের কাছ থেকে ফিরোজার ঠিকানা জেনে কয়েকদিন রেকি করে, এক বন্ধুর ক্যামেরায় ফিরোজার ভাই বশিরের-এর ছবি উঠিয়ে আনল। সাবের নিশ্চিন্ত করল যে এই ফিরোজার ভাই-এর নেতৃত্বেই তাকে পেটান হয়েছিল।
একদিন সুযোগমত পেয়ে শাহাব বশিরকে পেটাতে শুরু করলে, বশিরের দুই বন্ধু বশিরের পক্ষে যোগ দেয়। শাহাবের ভাগ্য খারাপ ওদের একজন আবার শাহাবকে চিনত। শাহাব একাই ওদের তিনজনকে সামলিয়ে বশিরকে আহত করতে পেরেছিল। ওরাও প্রতিশোধ নেবার জন্য সুযোগে থাকল। একদিন সুযোগ পেয়েও গেল। বশির শাহাবকে পেছন থেকে জাপটে ধরলে, ওদের একজন একটা ছুরি বের করে একটা কোপ দিলে শাহাব একটু সাইডে সরে গেলে, ছুরিটা শাহাবের কাধ ছুঁয়ে বাশিরের বুকে বিধে যায়। শাহাবকে ছুরি মারার কোন ইচ্ছা বা পরিকল্পনাই বশিরের ছিল না। কেন শাহাবকে ছুরি মারা হল সেটা বশিরের বোধগম্য ছিল না। ঘটনা যখন ঘটে গিয়েছে, তখন সেটা শাহাবের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবার সিদ্ধান্ত হল। ঘটনাটা সাজান হল যেভাবে সেটা হল, শাহাব ছিনতাই-র জন্য আক্রমন করলে বশির বাধা দিলে শাহাব বশিরকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। শাহাবের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা হল। শাহাব গ্রেফতার হয়ে জেলে গেল। এক খুনের আসামীকে কেউই বিশ্বাস করে না, কেউই ভাল চোখে দেখে না। ছেলে হত্যাচেষ্টার আসামী হওয়াতে দুই সম্মানিত শিক্ষক সামাজিক ভাবে এবং কর্মক্ষেত্রে ভীষণ অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পরলেন। মা ভীষণভাাবে ভেঙ্গে পরলেন। ছেলে হত্যাচেষ্টার আসামী এই শোক তিনি সইতে না পেরে একদিন ঘুমের ভেতরেই হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করলেন। শাহাবের বাবা স্ত্রীর মৃত্যুও শাহাবের কর্মফল বলে বিবেচনা করতে শুরু করলেন। তবে তিনি শাহাবকে পরিত্যাগ না করলেও কোন রকম সহায়তা করলেন না। এখন সালেহ সাহেবের নারী বিবর্জিত সংসারে শুধু মাত্র বড় ছেলে সাবের।
সারিকা ভীষণভাবে শোকাহত হয়ে মুর্ষে পড়ল। এতদিন একজন খুনির সাথে প্রেম করেছিল বলে সারিকার মনে অনুশোচনার অন্ত রইল না। সারিকার মনে শাহাবের প্রতি এক তীব্র ঘৃণার জন্ম নিল আর শাহাবের সাথে সব রকমের সম্পর্ক ছেদ করে দিল। মানষিক অশান্তির জন্য সারিকা মোটামুটি প্রস্তুতি ছাড়াই ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিল। তবে পরীক্ষায় ফেল করল না কোনমতে টেনেটুনে পাশ করল। সারিকার আর পড়াশোনা করবার ইচ্ছা ছিল না। সারিকার এই দুঃসময়ে ভাবী নিশাত সব সময়েই তার পাশে ছিল, উৎসাহ যুগিয়েছিল, সাহস দিয়েছিল। শাহাবের পুরা ঘটনাটাই বশিরের চিন্তারও বাইরে ছিল, তাই সে একটু অনুতপ্ত ছিল। কিন্তু সত্য প্রকাশ করে দিলে নিজেরাই ফেসে যাবে সেই জন্য সেও চুপ করে থাকল। মামলার জন্য বাদি পক্ষ বা বিবাদি পক্ষ, কোন পক্ষ থেকেই কোন রকম তদবির না থাকাতে, পুলিশও মামলা তদন্তে কোন রকম আগ্রহ দেখাল না। মামলাটি ঝুলে থাকল। পুলিশের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত রিপোর্ট বা কোন রকম অভিযোগ পত্র না দেয়াতে আদালতও কোন রকম সিদ্ধান্ত দিত পারছিল না। মিথ্যা হত্যাচেষ্টার আসামী হয়ে শাহাব জেল খাটতে থাকল। ওদিকে সারিকাকে একটু স্বাভাবিক হবার জন্য নিশাতের সুপারিশে সারিকার বিয়ে চিন্তাটা আপাতত স্থগিত রাখা হল। শাহাবের ঘটনার পর থেকে সাবের একদম পরিবর্তীত হয়ে যায়। আর কোন মেয়ের সাথে ফ্লার্টতো দূরের কথা ভাল করে মিশতই না। পড়াশোনায় ভাল সাবের তার সবটুকু মনোযোগ পড়াশোনায় দিল্। সাবের প্রথম শ্রেণিতে পঞ্চম হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে গেল। স্নাতক হয়েই এক জাপানি কন্সট্রাকশন কোম্পানিতে খুবই উচ্চ বেতনে চাকরি পেল। দু বছর হল শাহাব জেলে আছে। আদালতে একের পর এক কেসের তারিখ পরছে। আর সাবেরও এক বছর হল চাকরি হবার পর থেকেই সাবেরের বাবা, তাঁর নারী বিবর্জিত সংসারে শৃঙ্খলা আনার জন্য সাবেরের বিয়ের জন্য চিন্তা ভাবনা শুরু করে দিলেন।
সালেহ সাহেব পরিচিতদের সন্ধান দেওয়া কয়েকটি মেয়ের ছবিসহ বায়োডাটা বাপ-বেটায় দেখলেন, বিবেচনা করলেন। কোনটা বাপের পছন্দ হয়তো ছেলের পছন্দ হয় না আবার ঠিক উল্টা হয়। অবশেষে আর এক আত্মীয় এক মেয়ের সন্ধান দিলেন। পাত্র আর পাত্রীর ছবিসহ বায়োডাটা অদল বদল হল।
পাত্রী : সারিকা হারুন।
পিতা : হারুনুর রশিদ।
পেশা : চক বাজারে পাইকারি ব্যবসা।
মাতা : সাদিয়া হারুন। গৃহিণি।
ভাই : আমিনুর রশিদ, আনাম। বাপের সাথে ব্যবসা করে।
ভাবী : ডাক্তার। স্থানীয় ভাবে প্রাক্টিস করেন। সিসিএস ক্যাডার মনোনিত হয়েছিলেন তবে ঢাকার বাইরে যাবেন না বলে ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দেয় নাই।
ঠিকানা : ধনামন্ডি, ৩ নং রোডে নিজেদের বাড়ি।
পাত্রী পড়াশোনায় ভালই তবে এবারে কোন এক পারবারিক অশান্তির কারণে কোন মতে ইন্টামিডিয়েট পীক্ষায় পাশ কওে এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সোসিওলজিতে পড়ছে।
পাত্র : সাবের আহমেদ। বড় ছেলে।
পিতা : সালেহ আহমেদ।
পেশা : শিক্ষকতা।
মাতা : সায়রা আহমেদ (মৃত)।
ভাই : দুই ভাই। ছোট ভাই নিরুদ্দেশ।
বোন : সাবিহা। এমএসসি। স্বামীর সাথে প্রবাসী। ঠিকানা। মগবাজার দিলু রোডে নিজেদের বাড়ি। পাত্র সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, এক জাপানি কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে চাকুরিরত।
বায়োডাটা দুই পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে হল। সারিকার ছবি দেখে সাবের নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতে শুরু করল। ইন্টারমিডিয়েটে রেজাল্ট খারাপ ছিল বা পড়াশোনা করবার আর আগ্রহ নেই এ সব সাবেরের কাছে ধর্তব্যই বলে মনে হল না। তবে সারিকার মা এক ভাই নিরুদ্দেশ কেন প্রশ্ন তুললেন। ঐ ভাই কি আইনের কাছ থেকে পলাতক, তাই নিরুদ্দেশ। মধ্যস্থকারীকে জিজ্ঞাসা (অবশ্য তিনি নিজেও ভাল করে জানেন না) করলে তিনি জানালেন যে ঐ ছেলে একটু বহেমিয়ান টাইপের, তাই নিরুদ্দেশ। তবে বাবা হারুন সাহেবের এই নিয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই। ছেলে ভাল, ভাল চাকরি করে, বাবা সম্মানিত শিক্ষক, নিজেদের বাড়ি আছে, তাই তিনি আর দ্বিমত করলেন না। সারিকার কোন রকম ইচ্ছা বা অনিচ্ছা কিছুই নেই। সারিকা ছেলের ছবিও দেখতে চাইল না। ওর কথা বাবা মা যা ঠিক করবেন আমার তাতে কোন আপত্তি নেই। বাবা মা কোন দিনই ছেলেমেয়েদের খারাপ চাইবেন না। ভাবী নিশাত অনেকটা জোড় করে সাবেরের ছবি দেখালেন। নায়োচিত সাবেরকে অপছন্দ করবার কিছু নেই। ছ্যাকা খাওয়া সারিকা সাবেরকে পছন্দ করে ফেললো। মনে মনে ভাবল, ভাগ্যিস শাহাবের সাথে ছাড়ছাড়ি হয়ে গিয়েছে, নইলে এই নায়ককে পেতাম না। খুব সাদামাটা ভাবেই সাবের আর সারিকার বিয়ে হয়ে গেল। সালেহ সাহেবের এক মেয়ে দুই ছেলে। মেয়ে সাবিহা বড়। সাবিহা স্বামীর সাথে প্রবাসী। ছোট ছেলে নিরুদ্দেশ। সালেহ সাহেব একা, তাই কিছু সামাজিকতা বাদ দিয়ে সবদিক সামলিয়ে সাবেরের বিয়ে দিলেন। সাবেরের গায়ে হলুদের কোন অনুষ্ঠান হল না। তবে সারিকার গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান ঠিকই হয়েছিল। সালেহ সাহেব অনেক সামাজিকতায়, অনেক লৌকিকতায় ভুল করেছিলেন। তবে স্ত্রী ও অন্য ছেলে আর মেয়ের অনুপস্থিতির জন্য সবাই উনার এইসব ত্রুটিগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে এড়িয়ে গিয়েছিল। বৌ বরণের অনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই সারিকা শ্বশুরবাড়ি এলো।
একজন ছেলে বা মেয়ের জীবনের সব চাইতে কাঙ্ক্ষিত বাসর রাত এলো। সারিকা লাল বেনারশী শাড়ি পরে বৌ সেজে খাটে দুরুদুরু বুকে অনেক রকমের আশা, স্বপ্ন ও ফ্যান্টাসি নিয়ে জীবনের প্রথম এক পুরুষের, স্বামীর ভালবসার আন্তরঙ্গ ছোয়া অথবা একটা কামনা বা ললসার আক্রমনের আশঙ্কা করছিল। সাবের এবং সারিকা দুজনেই এই প্রথম সবার সামনে ঘরের দরজা বন্ধ করে একত্রে রাত কাটাবে, তাই দুজনেই বেশ উত্তেজিত ছিল। সাবেরের সাথে সারিকার আগে দেখা হয় নাই, কথা হয় নাই, তাই সম্পূর্ণ এক অপরিচিত পুরুষ সাবেরকে ঘরে ঢুকতে দেখে সারিকার মনে একটা আক্রমণের আশঙ্কা চলে এলো। সারিকা ভয়ে দুই চোখ বন্ধ করে আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করছিল। বিয়ে ঠিক হবার পর থেকেই ভাবী নিশাত তার ননদকে বিবাহিত জীবনের অনেক অধ্যায় সম্পর্কে যতদূর সম্ভব রেখেঢেকে জ্ঞান দান করেছিলো। তবে নিশাতের সাথে তার বাসর রাতের কোন সাদৃশ্য নেই। ভাইয়া আর ভাবী বিয়ের অনেক আগ থেকেই পরস্পরকে চিনত, জানত, বুঝত। তাদের বাসর রাতে কোন রকমের আক্রমণের ভয় ছিল না। তাদের বাসর রাত নিশ্চয়ই মধুর ছিল। আর এখন যে লোকটা দরজা বন্ধ করছে, সে তার সম্পূর্ণ অপরিচিত। সে কি রকম ব্যবহার করবে সে সম্বন্ধে তার কোন ধারণাই নেই। তবুও সারিকা একটা পাশবিক আক্রমণের জন্য মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে রাখল। বাসর রাতের সাবেরের ব্যবহার, কথাবর্তা সবই ছিল সারিকার আশঙ্কার সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রথম রাত থেকেই সারিকা সাবেরের প্রেমে পরে গিয়েছিল। সাবের বিছানায় এসে হালকা করে সারিকাকে জড়িয়ে ধরে হালকা করে ঠোঁটে একটা চুমু খেয়ে বললো, “সারিকা, চোখ খোল। তোমার স্বামীকে আর কতক্ষণ না দেখে থাকতে পারবে। এখন তো তুমি আমার বৌ। আমি তোমাকে এখন অনকে কিছু করতে পারি, কেউ কিছু মনে করবে না আর সেটাই স্বাভাবিক বলে ধরে নেবে। কিন্তু আমি তোমাকে নিশ্চিত করে বলছি যে আমি তোমার অমতে বা তোমার আগ্রহ ছাড়া কিছু করব না। আমি শুধু তোমার দেহটাই চাই না আমি তোমার মন এবং দেহ দুটা একসাথে চাই।”
সেই কথা শুনে এক ঝলক শাহাবের কথা সারিকার মনে চলে এসেছিল। সারিকা তখনও জানে না যে তার দেবরই তার এক্স। শাহাবকেও সারিকা মন দিয়েছিল। শাহাব চাইলে সে তাকে দেহটাও দিতে প্রস্তুত ছিল। তবে কোন এক অজানা কারণে শাহাব সেই সুযোগটা নেই নাই। সারিকা এখন শাহাবকে মনে প্রাণে ঘৃণা করে তবে নিজের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও শাহাব শারীরিক সম্পর্ক না করবার জন্য সমান্যতম হলেও শাহাবের প্রতি সে কৃতজ্ঞ। তবে সাবেরের পরের কথাগুলোতে সারিকার মন থেকে শাহাবকে একদম ভুলিয়ে দিল।
“সারিকা, আমি চাই তুমি স্ত্রী-র অধিকার নিয়ে আমার সাথে সমান ভাবে কথা বলবে।”
“আমি আপনার কথা মত চলতে চেষ্টা করব, আর আপনাকে কি ভাবে ডাকব।”
“উহু, সারিকা আপনি নয় তুমি। তুমি আমাকে নাম ধরে ডাকবে, তমি করে বলবে।”
“ঠিক আছে, সাবের তাই হবে। তুমি কি এখন আমার ওপরে তোমার স্বামীর অধিকার খাটাতে চাও?”
“উহু, এখনও নয়। আমি যখন বুঝব যে তোমারও আগ্রহ আছে তখনই আমরা আমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমেই শুরু করব।”
এরপর সাবের সারিকাকে বুকের ভেতরে নিয়ে জড়িয়ে ধরে শুয়ে শুয়ে ভালবাসার কথা বলে সারা রাত কাটিয়ে দিল। অবশ্য সাবের সারিকার গায়ে ভালই দাগ ফেলে দিয়েছিল। সকালে সব নব বিবাহিতা বৌ-র মত সারিকাও ভাল করে দাগগুলো ঢেকে ঘর থেকে বেরিয়েছিল।
বিয়ের পর পরই সাবের সারিকাকে নিয়ে এক সপ্তাহের জন্য কক্সবাজার, ইনানী ও টেকনাফে মধুচদ্রিমায় ঘুরে এসেছিল। ঢাকা থেকে কক্সবাজার আকাশ পথে, রেল পথে বা সড়ক পথে কক্সবাজার যাওয়া যায়। কক্সবাজার বাংলাদেশের সবচাইতে জনপ্রিয় এবং সব চাইতে বড় পর্যটন কেন্দ্র। বর্তমানে কক্সবাজারে ১২০টিরও অধিক হোটেল, মোটেল (এর ভেতরে আবার কয়েকটি ৪/৫/৩ তারকা হোটেলও আছে) ছাড়া প্রচুর প্রাইভেট কটেজ আছে। ওরা আকাশ পথে কক্সবাজার এসে হোটেলের গাড়িতে হোটেলে এসে চেক ইন করে। সাবের ঢাকা থেকেই কক্সবাজারের সবচাইতে পুরাতন ও ঐতিহ্যবাহী হোটেল সাইমনে ওদের জন্য একটা হানিমুন স্যুট বুক করে রেখেছিল। হোটেল সাইমন ১৯৬৪ সাল যাত্রা শুরু করবার সময়ে এটি ছিল তখনকার একমাত্র চার তারকা মানের হোটেল। পরবর্তীতে এই হোটেলটি স্থানান্তরিত হয়ে নতুন জায়গায় প্রায় সোয়া একর জায়গায় একটি প্রাইভেট বিচ নিয়ে আন্তর্জাতিক মানে দশ তলা পাঁচ তারাকা হোটেল হিসাবে দেশি বিদেশি অতিথিদের অত্যন্ত সন্তুষ্টির সাথে সেবা দিয়ে আসছে। এই হোটেলেই, প্রধানত সারিকার আগ্রহে সাবের তার স্বামীর অধিকার খাটালো। দুজনা দুজনার কুমারীত্ব হারাল। তখন পর্যটনের জন্য খড়া মৌসুম চলছিল তাই খুব একটা পর্যটক ছিল না। এছাড়া হোটেলের প্রাইভেট সমুদ্র সৈকতটি মোটামুটি নিরিবিলিই থাকত। তারা কিছুটা সময় সৈকতে একান্ত সময় কাটাবার জন্য, ঘন হয়ে নিরিব সান্নিদ্ধে সূর্যাস্ত দেখবার জন্য একটু দূরে যেয়ে বালুকাবেলায় বসল। সারিকার হাটু ভেঙ্গে সমুদ্রতটে একদম, পানির কাছে বসলে, সমুদ্রের ঢেউ এসে ওকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। সাবের এসে সারিকার হাটু খুলে দিয়ে দুই পায়ের মাঝে বসে সারিকার বুকে মাথা হেলিয়ে দিল। সারিকা পরম মমতায়, পরম ভালবাসায় সাবেরকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে মাথাটা ওর বুকে জোরে চেপে ধরল। সারিকা একটু ঝুকে ওর থুতনিটা সাবেরের মাথায় ঠেকিয়ে দিলে বাতাসে ওর সিল্কি আর নরম চুলগুলো সাবেরের মুখে দোলা দিতে থাকল। সাবের সারিকার চুলগুলো নিজের মুখে আর ঠোঁটে বুলাতে থাকল।
“সারি তোমার চুলের স্পর্শ, চুলের গন্ধ আমাকে পাগল করে তুলেছে। তুমি সব সময়েই তোমার চুল খোলা রাখবে। আমি সুযোগ পেলেই তোমার চুলের ভেতরে হারিয়ে যাব।”
সারিকার চুল নিয়ে সারিকার এক্সও ঠিক এই রকম কথাই বলেছিল। এক্সের কথা এক ঝলক সারিকার মনে এসেও মিলিয়ে গেল।
“সাবের তুমি আমাক সারি বলে ডাকলে। নামটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমাকে সারি বলেই ডেকো।”
সেই থেকে সারিকা সাবেরের ‘সারি’ হয়ে গেল। সাবের আর সারিকা হোটেলে গাড়ি নিয়ে দিনে দিনে টেকনাফ ঘুরে এলো। ওরা একদিন ইনানী নিচও ঘুরে এলো। দুজনে কোন রকম দায়িত্ব ছাড়া, কোন রকম রাখঢাক ছাড়াই, ইচ্ছামত ঘুরেফিরে স্বপ্নেরমত এক সপ্তাহ কাটিয়ে ঢাকায় ফিরে এলো। সম্পূর্ণ তৃপ্ত সারিকা কর্ত্রীবিহিন সংসারের দায়িত্ব নিয়ে নতুন জীবন শুরু করল। বিয়ের আগে সারিকা জীবনে কোনদিন রান্নাঘরে যায় নাই, দৈনন্দিন রান্নাবান্নার কোন খোঁজ রাখে নাই বা রাখতে হয় নাই। সেই সারিকাকেই এখন দৈনিক কি রান্না হবে, কি কি বাজার করতে হবে, সকালের নাস্তা, দুপুরের খানা বা রাতের খানার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। প্রথম প্রথম একটু আধটু ভুল হলেও শ্বশুর স্বামী আর মা’র সহযোগিতায় সেগুলো শীঘ্রই কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল। এক মাসের ভেতরে সারিকা পাকা গিন্নি হয়ে উঠল। বিপত্নীক শ্বশুরকে নিজের বাবার মত শ্রদ্ধা করতে বা যত্ন নিতে কোন রকম ভুল করল না। সাবের সারিকাকে শারীরিক ও মানষিক উভয় দিক দিয়েই সম্পূর্ণভাবে সুখি রাখে। সারিকা সুখি, ভীষণ সুখি।
সারিকা আর সাবেরের চার বছর আগে কোন সন্তান নেবার ইচ্ছা ছিল না। তবে ওদের অসাবধানতার কারণে তৃতীয় বছরের মাথায় সারিকা গর্ভবতী হয়ে পরে। বিয়ের তিন বছর পরে ওদের ঘর আলো করে এক কন্যা সন্তান এলো। সন্তান জন্ম দেবার আগে স্বামী-স্ত্রীর ভেতরে কথা হচ্ছিল।
“সারি, আমি চাই আমাদের প্রথম সন্তান মেয়ে হোক। মেয়ে হলে ওর নাম রাখব ‘রিমি’।”
রিমি শুনেই সারিকা হঠাৎ এক রকম চিৎকার করে বলে উঠল,
“রিমি নাম রাখা যাবে না। অন্য কোন নামের কথা চিন্তা কর।”
রিমি শুনে সারিকার প্রতিক্রিয়ায় সাবের ভীষণভাবে চমকে উঠে জিজ্ঞাসা করল,
“রিমি নামে অসুবিধা কোথায়?”
সারিকার মনে পরে গেল সেই দিনের কথা।
ঢাকাতে প্রেমিক-প্রেমিকাদের একান্তে বসে প্রেম করবার প্রচুর জায়গা আছে। তবে শাহাব আর সারিকার কাছে সব চেয়ে আদর্শ স্থান ছিল ধানমন্ডি লেকপাড়। লেকপাড়টা বিকেলে দিকে মোটামুটি নিরিবিলি থাকে, চা, সিগারেট বা বাদাম বিক্রেতারাও কমই আসত। কোন এক বিকেলে ওরা লেকপাড়ে প্রেম করছিল, সে দিন শাহাব সারিকাকে কথাচ্ছলে বলেছিল,
“সারিকা, আমাদের মেয়ে হলে নাম রাখবে রিমি। তাই তোমার নাম দিলাম ‘রিমির মা’। আর ছেলে হলে রিমির সাথে মিলিয়ে নাম দেব রিমন।”
“ইস সাহেবের শখ কত। আগে বিয়ে হোক, তার পাঁচ বছর পর বাচ্চার কথা চিন্তা করো। গাছে কাঠাল গোঁফে তেল। ওসব রিমির মা’টা চলবে না।”
“ঠিক আছে, তোমার যখন আপত্তি আছে তখন তুমি আমার ‘টিয়া পাখি’। না, টিয়া পাখি নামটা একটু বড় হয়ে গেল, তুমি আমার শুধু ‘টিয়া’। আশা করি টিয়াতে নামের তোমার আপত্তি নেই।” সারিকা আরো ঘন হয়ে বসে, মাথাটা শাহাবের কাধে হেলিয়ে দিয়ে আহ্লাদি কন্ঠে বললো,
“শাহাব, আমি সারা জীবন তোমার টিয়া হয়েই থাকতে চাই।”
শাহাব সারিকাকে ‘টিয়া’ বলে ডাকত, অন্যদিকে সাবের সারিকাকে ‘সারি’ বলে ডাকে। সারিকা সারা জীবন আর এক জনের ‘টিয়া’ হয়ে থাক চেয়েছিল। কিন্তু অদৃষ্টের কি পরিহাস সারিকা সেই একজনের ‘টিয়া’ হতে পারল না হল আর একজনের ‘সারি’। সাবের কোন কথা না বলে সারিকার রিমিতে আপত্তি সরাসরি নাকচ করে দিল। সাবের রিমি নামে আপত্তি কোথায় জিজ্ঞাসা করায় সারিকা একটা অস্বস্তিতে পরে গেল। নিজেকে সামলিয়ে কোন মতে বললো,
“স্কুলে আমরা তখন ক্লাস টেনে পড়ি, আমাদের ক্লাসে রিমি বলে একটা মেয়ে ছিল। মেয়েটা ছিল একটা ‘গোল্ড ডিগার’ তাই ঐ নামে আমার আপত্তি আছে।”
“গোল্ড ডিগার আবার কি।”
“যে সমস্ত মেয়ে তাদের রূপ ও শরীর দিয়ে টাকা কামায় তাদের গোল্ড ডিগার বলে।”
“তোমার বান্ধবী যাই করুক না কেন তাতে আমাদের কি? আমাদের মেয়ের নাম হবে রিমি। ছেলে হলে তোমার পছন্দমত নাম দিও। আমি আপত্তি করব না।”
সাবের নিজের অজান্তেই, শাহাবের দেওয়া নামটা সারিকার আপত্তি সত্ত্বেও ঠিক করে ফেললো। সাবেরের আশামত ওদের প্রথম সন্তান মেয়ে হল আর নাম হল ‘রিমি’।
আজ প্রায় চার বছর হল শাহাব বিনা বিচারে জেল খাটছে। শাহাবের কেস আদালতে উঠলেই পুলিশ তদন্ত শেষ করতে পারে নাই বলে সময় নিচ্ছিল। প্রতি কেসের সময়েই সালেহ সাহেব আদালতে উপস্থিত থাকেন। ছেলের সাথে কথা হয়। বাসার সব খবরই তাঁর মারফত শাহাব জানতে পারে। বাবার কাছ থেকে সাবেরর সাথে সারিকার বিয়ের কথা শুনে শাহাব প্রচণ্ডভাবে মানষিক আঘাত পেলেও, চেহারাটা স্বাভাবিক রেখে নিজেকে সামলে নিল। সালেহ সাহেব কিছুই টের পেলেন না। এবারেও আদালতে কেস উঠলে পুলিশ আবার সময় চাইলে, আদালত বিরক্ত হয়ে কেসটা পিবিআই হাতে হস্তান্তর করে তদন্ত শেষ করতে ছয় মাস সময় বেধে দিলেন। চৌকশ পিবিআই-র গোয়েন্দারা নির্ধারিত সময়ের ভেতরেই তাদের তদন্ত শেষ করে প্রকৃত ঘটনাটা বের করে আদালতে তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করলো। আদালত শাহাবকে বেকসুর খালাস দিয়ে, মিথ্যা অভিযোগ দেবার জন্য বাদির বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে, শাহাব কোন অভিযোগ নেই বলে মত দিল। দুর্ভাগ্যবশত এবারেই প্রথম সালেহ সাহেব তাঁর শারীরিক অসুস্থার জন্য আদালতে হাজির ছিলেন না। বেকসুর খালাসের রায় বাসার কেউই জানতে পারল না। জেলের সব নিয়ম কানুন শেষ করে শাহাব পরের দিন জেল থেকে ছাড়া পেল। শাহাব জেলে উপার্জিত টাকা দিয়ে ফুটপাথ থেকে একটা বাসন্তী রং-এ পলো-শার্ট আর একটা জিন্স কাটিং-এর গ্যাবার্ডিনের প্যান্ট কিনল। পাশের এক শপিং কমপ্লেক্সের টয়লেটে যেয়ে পোশাক চেঞ্জ করে ওগুলো পরে নিল। ফুটপাত থেকে এক জোড়া চাইনিজ কেডস কিনে পায়ে পরে নিল। সেলুনে যেয়ে চুল কাটিয়ে আর শেভ করে করিয়ে নিল। শাহাবকে আবার আগের মত স্মার্ট আর সুগঠিত দেখাচ্ছিল।
আজ রিমির প্রথম জন্মদিন। বাসায় অনেক গেস্ট, সারিকার একটুও অবসর নেই। বাচ্চাদের জন্য ম্যাজিক শোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সারিকা আর আগের মত নেই, বিয়ের পর মানানসইভাবে একটু মুটিয়ে গেছে, বুক আর নিতম্ব একটু ভারি হয়েছে। তবে এক বাচ্চার মা সারিকা আরো সুন্দর হয়েছে। কেক কাটা হয়ে গিয়েছে। এখন ম্যাজিক শো চলছে। সারিকা রিমিকে কোলে নিয়ে অন্যন্য বাচ্চদের সাথে ম্যাজিক দেখছিল। সারিকার ভাবী নিশাত অন্যদিক সামলাচ্ছে। কেউই শাহাবকে খেয়াল করে নাই। শাহাব কারো সাথে কথা না বলে সোজা সারিকার সামনে চলে এলো।
“ভাবী, আমি শাহাব, তোমার দেবর।”
বিস্ময়াভিভূত সারিকা তার পূর্ব প্রেমিককে তার দেবর হিসাবে দেখে নিজেকে সামলাতে পরল না। বাকরুদ্ধ সারিকা রিমিকে কোলে নিয়েই ওখানে বসে পরল, কারো কোন কথা সারিকার কানে আসছিল না। শাহাব কোন রকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে, ওখানেই সারিকার উপস্থিতিতে সাবেরকে ডেকে বললো,
“ভাইয়া, ভাবী বোধ হয় আমার উপস্থিতি সহ্য করতে পারছেন না। তুই ভাবীকে সামলা। ভাবীকে বল আদালত আমাকে বেকসুর খালাস দিয়েছে। অর্থাৎ আদালতে প্রমানিত হয়েছে যে আমি খুন করি নাই বা খুনের চেষ্টাও করি নাই। আব্বা কোথায়?”
শাহাব যে নির্দোষ সেটা সারিকাকে কেন বলতে হবে কথাটা সাবেরের কাছে একটু খটকা লাগলেও আপাতত কিছু না বলে, বললো
“আব্বার শরীরটা খারাপ। উনি উনার ঘরে শুয়ে আছেন।”
“আব্বুর শরীর খারাপ? এই জন্য বোধ হয় গতকাল উনি আমার কেসের সময় উপস্থিত থাকতে পারনে নাই।”
“আব্বা কি..?”
“হ্যাঁ উনি আমার প্রতি কেসের ডেটেই আদালতে উপস্থিত থাকতেন। আমি উনার কাছ থেকে সব খরবই পেতাম। মায়ের মৃত্যু, তোর বিয়ে, রিমির জন্মসহ সব খবরই পেতাম।”
“দেখ ভাই আমাদেরও ইচ্ছা ছিল তোর সাথে দেখা করবার। কিন্তু নানান কারণে হয়ে ওঠে নাই। কিছু মনে করিস না ভাই।”
ইতিমধ্যে সারিকা নিজেকে সামলিয়ে নিয়েছে।
“না, ভাইয়া আমি কিছু মনে করি নাই। সবাই একজন খুনের আসামীকে এড়িয়ে চলতে চায়। আমার গার্লফ্রেন্ডও তো আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আমি জেলখাটা পোড় খাওয়া আসামী, এখন এসব আর আমাকে প্রভাবিত করতে পারে না। যাই আব্বুর সাথে দেখা করে আসি।”
‘আমার গার্লফ্রেন্ডও তো আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল’ কথাটা শুনে সারিকার চেহারাতে একটা করুন ও অস্বত্তিকর ভাব ফুটে উঠেছিল সেটা শাহাব বা সাবের কেউই খেয়াল করতে পারল না। শাহাবের উপস্থিতি সত্যিই সারিকাকে একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। বিয়ের আগে স্বামীর ছোট ভাইয়ের সাথে তার দুই বছরের একটা রিলেশনশিপ ছিল এই সত্যটাই এখন তাকে ভীষণভাবে পীড়া দিচ্ছে। সাবের শাহাবকে নিয়ে আব্বার ঘরে এলো। শাহাব সারিকাকে চুম্বকের মত টানছে। সেই টানেই সারিকা ওদের পিছে পিছে এলো তবে ঘরে না ঢুকে দরজাতেই দাঁড়িয়ে রইল। সালেহ সাহেব জেলের বাইরে ছেলেকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে দুর্বল শরীর নিয়ে বিছানা থেকে উঠতে চেষ্টা করলে, শাহাব উনাকে আবার শুইয়ে দিলো। কান্না মিশ্রিত কন্ঠে সালেহ সাহেব শাহাবকে খুটিয়ে খুটিয়ে জিজ্ঞাসা করতে থাকলেন,
“বাবা শুনেছি যে জেলে কয়েদিদের ভীষণ রকম অত্যাচার করে, তোমাকে জেলে কোন করম অত্যাচার করত ?”
শাহাব ছিল খুনের অভিযুক্ত আসামী তাই তাকে জেলের সব চাইতে ভয়ঙ্কর ও সব চাইতে নিষ্ঠুর সব কয়েদিদের সাথে রাখা হত। সদ্য রংরুট এক আসামীকে পেয়ে ওরা মনে সুখে শাহাবের উপর অত্যাচার করত। এ সব শুনলে আব্বা কষ্ট পাবেন তাই শাহাব একটু সহজ করে বললো,
“আব্বা, নতুনদের সব জায়গাতেই একটু বুলি করে, একটু র্যাগ দেয়। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে এগুলো তো হরদমই হচ্ছে, অনেক সময়ে একটু বেশিই হয়, আবার অনেক সময়ে মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। সেই ভাবে প্রথম দিকে আমাকেও একটু আধটু র্যাগের শিকার হতে হয়েছিল। আমার সুগঠিত শরীর আর খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত আসামী হিসাবে সাধারণ কয়েদিরা আমাকে সমিহ করে চলত, আমাকে এড়িয়ে চলত। আর কঠিন সব অপরাধী, যেমন শীর্ষ সন্ত্রাসী, খুনি, ডাকাত, জঙ্গি, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সদস্য, ধর্ষণ, অপহরণ, চাঁদাবাজি ইত্যাদি সব কঠিন সব অভিযোগে অভিযুক্তরা আমাকে তাদের সমগোত্রীয় মনে করত।
“বাবা, তোমাকে কি রকম কাজ করতে হতো, কি রকম খাবার দিত।”
“আব্বা যেহেতু আমি খুনের আসামী ছিলাম তাই জেলাররা আমার প্রতি নির্দয় ছিল। আমাকে সব সময়ে কঠিন কঠিন কাজ দেওয়া হত। তবে আমার শারীরিক সক্ষমতার জন্য আমাকে কোন কিছুই কাবু করতে পারত না। দেশে যত রকম নিকৃষ্টমানের খাবার আছে আমাদের সেইগুলোই দিত। প্রথম প্রথম আসুবিধা হত, পরে ওগুলো সহ্য হয়ে গিয়েছিল।”
“বাবা, এখন তোমার প্ল্যান কি? কি করবে?”
“আব্ব কি করব এখনও কিছু ঠিক করি নাই। তবে পড়াশোনাটা শেষ করবার ইচ্ছা আছে। তবে আমাদের দেশে কারাগার সিস্টেম যে রকম তাতে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে বা ভাল কলেজে ভর্তি হতে পারব কি না জানি না।”
“তুমি তো বেকসুর খালাস পেয়েছ, আদালত তোমাকে নির্দোষ বলে ঘোষনা করেছে। মানে তুমি তো খুনি নও।”
“আব্বা সব দেশেই অপরাধীদের কারারুদ্ধ করবার অনেকগুলো স্বীকৃত কারণ রয়েছে। তাদের মধ্যে একটি হল, যাদের অপরাধ করবার সম্ভাবনা আছে, তাদের অপরাধ থেকে বিরত রাখা আর যারা সাজা ভোগ করেছে তারা যেন আবার অপরাধে জড়িয়ে পরতে না পারে, সেটা থেকে বিরত রাখা। আর একটি হল যাদের কারাগারে পাঠান হয়, তাদের ব্যক্তিগত সংস্কারের মাধ্যমে সমাজে পুনপ্রতিষ্ঠিত করা। অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যারা বারংবার অপরাধে জড়িয়ে পরে, জনসাধারণদের তাদের হাত থেকে রক্ষার জন্য ঐ সব অপরাধীদের কারারুদ্ধ রাখার প্রয়োজ হয়ে পরে। ভিন্ন ক্ষেত্রে ও ভিন্ন কারণে কারারুদ্ধ করার পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে। অপরাধীকে সংশোধনের সুযোগ দেবার ধারণাটা ক্রমবর্দ্ধমান গুরুত্ব কারাগারগুলো সংশোধনমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়েছে। তবে এই ধারণাটা আমাদের দেশে তথা তৃতীয় বিশ্বে প্রযোজ্য নয়। কেননা আমরা কারাব্যবস্থাটা পেয়েছিলম ঔপনিবেশকদের কাছ থেকে। তাদের কারা ব্যবস্থাছিল মূলত দেশপ্রেমিক বিপ্লবীদের কঠোর হস্তে, নিষ্ঠুর অত্যাচার দ্বারা দমন করা। উত্তরাধীকাসূত্রে প্রাপ্ত ঔপনিবেশক কারা ব্যবস্থা ও কাঠামোগুলো প্রতিস্থাপন সহজসাধ্য ছিল না। তাই অপরাধীদের সংশোধন দ্বারা শালীন ও মানবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় নাই। অপরাধীরা সাজা ভোগ শেষেও সামাজে গ্রহণযোগ্য হয় না। কোথাও চাকরি পায় না, ব্যবসা করতে পারে না তাই বেচে থাকবার জন্য, জীবিকার জন্য তারা আবার অপরাধ জগতে ফিরে যায়। নিরাপরাধ বা অপরাধী সাজাপ্রাপ্তদের আবার অপরাধ জগতে ফিরে যাবার সম্ভাবনাটাই আমার মত দন্ডপ্রাপ্তদের সুস্থ জীবনে ফিরে আসাটা কঠিন হয়ে যায়।”
“আমি তোমাকে তবুও চেষ্টা করে দেখতে বলছি। হয়ত কোন কলেজে সুযোগ পেতেও পার।”
“হ্যাঁ, আব্বা আমি সেই চেষ্টা করব। আমি নিশ্চিত নই যে আমি কোন রকম একটা সুযোগ পাব। আব্বা তোমরা তো জানতে না যে একটা মেয়ের সাথে আমার দুই বছরের রিলেশন ছিল। বান্ধবীটি আমাকে দুই বছর ধরে জানত। আমি মিথ্যা খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত হলে, বান্ধবীটি আমাদের দুই বছরের রিলেশনশিপ থাকা সত্ত্বেও আমাকে বিশ্বাস করতে পারে নাই। সেখানে নতুনরা আমাকে বিশ্বাস করবে কেন। আব্বা আমি কিন্তু আশাবাদি নই।”
‘আমাদের দুই বছরের রিলেশনশিপ থাকা সত্ত্বেও আমাকে বিশ্বাস করতে পারে নাই’ কথাটা শোনার পর সারিকা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। কোন মতে শব্দ দমন করে, রিমিকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওখান থেকে পালিয়ে এলো। বান্ধবীর নাম না বলাতে সারিকা শাহাবের মহত্বে অভিভূত হয়ে গেল। মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠান সারিকা ঠিকমত উপভোগ করতে পারছিল না। ওর কাজে একটু ছন্দপতন হলেও ভাবী নিশাতের কল্যানে কেউই সেটা বুঝতে পেরেছিল না। গৃহকর্ত্রী হিসাবে সারিকা, নিজের মনের ভেতরের ঝড়, দ্বন্দ্ব জোড় করে চেপে রেখে, মুখে একটা মেকি হাসি ফুটিয়ে সবার সাথে কথাবার্তা বলেছিল, মেহমানদের ভাল মন্দের তদারকি করেছিল। অনুষ্ঠান শেষে, মেহমানরা সবাই চলে গেলে, সারিকা আর নিশাত মিলে ডেকোরেটারের প্লেট, গ্লাস, পিরিচ, চামিচ ইত্যাদ হিসাব করে উঠিয়ে রেখে, বেচে যাওয়া খাবারগুলো কনটেইনারে ভরে ফ্রিজে উঠিয়ে যার যার ঘরে শুতে গেল। শাহাব ভঙ্গহৃদয়ে দেখল তার এককালের প্রেমিকা তারই বড় ভাইয়ের বেডরুমে যেয়ে দরজা বন্ধ করছে। দরজা বন্ধ করবার সময়ে সারিকা শাহাবকে বিধ্বস্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। দুজন দুজনার দিকে স্তব্ধভাবে তাকিয়ে রইল। শাহাব তার ভাইয়ের অধৈর্য কন্ঠের কথা শুনল।
“কই সারি, কি হল, দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি?”
“আমি একটু কিচেনটা দেখে এখনই আসছি। তুমি শুয়ে পর।”
সারিকা কিচেনে যাবার পথে ইশারায় শাহাবকে ডাকল। দুজনে কিচেনে কিছুক্ষণ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল। সারিকাই নিস্তব্ধতা ভাঙ্গল।
“শাহাব, ঘরে যাও। আমি নিরুপায়, আমাকে ক্ষমা কর। তুমি কিন্তু আমাকে কাঁদাচ্ছ?”
“ভাবী, আমি কাদি তাই তোমাকেও কাদাই। আসলে আমরা দুজনাই নিরুপায়। ভাবী তুমি ঘরে যাও, ভাইয়া তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।”
“ভাবী? টিয়া না?”
“তুমি এখন পরস্ত্রী, আমার বড় ভাইয়ের স্ত্রী, তুমি আমার ভাবী। তোমাকে টিয়া বলার অধিকার আমি হারিয়ে ফেলেছি। যাও, ঘরে যাও। নইলে হয়ত ভাইয়া আবার তোমাকে খুঁজতে আসবেন।” ভারি মন নিয়ে ধীর পায়ে, সারিকা ঘরে এলো। মশারী উঠিয়ে উল্টাদিকে মুখ করে চুপ করে শুয়ে পরল। অন্য সব দিনই সারিকা বিছানায় এসেই স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে পুটুর পুটুর করে ভালবাসার কথা বলে। সাবের সারিকাকে টেনে নিজের দিকে এনে বুকে চেপে ধরলে, সারিকা একটু ধরা গলায় বললো,
“আজ সারা দিন আমার ভীষণ ধকল গেছে তার উপরে একটু মাথা ব্যথা করছে, আজ আমাকে একটু ঘুমাতে দাও, প্লিজ।”
সারিকার এহেন আচরণে সাবের একটু অবাক হয়ে গেল। অন্যান্য রাতে সারিকা বিছানায় এসেই সাবেরকে আহ্লাদি স্বরে নানান রকমের সম্বোধন করে। কোন দিন বাবু বা আমার বাবু বা আমার জান আর আজকে কোন রকম সম্বোধনই নেই, প্লিজও কোন দিন বলে নাই তার উপরে ওর স্বরটাও বেশ ভারি। আদালত শাহাবকে নির্দোষ বলে রায় দিয়েছে সেটা সারিকাকে কেন বলতে হবে প্রশ্নটা সাবেরের মনে আবার চলে এলো। তবে কি এ সবের ভেতরে কোন যোগসূত্র আছে ?
তখনই সাবেরের মনে পরে গেল বিয়ের কিছু দিন পরে সারিকা একটু সহজ হলে, এক রাতে সারিকা সাবেরের বুকের ভেতরে ঢুকে সোহাগী কন্ঠে বলেছিল,
“সাবের, আমি জানি না তুমি এটা কি ভাবে নেবে। তবুও আমি আমার একটা স্বীকারোক্তি দিচ্ছি। বিয়ের আগে আমার একটা এ্যাফেয়ার ছিল।”
“ছিল। এখন তো নেই?”
“ছিল। এখন আর নেই। আমার কোন অনুশোচনাও নেই। আমি অনুতপ্তও নই। নইলে কি আমি এই কয়েক দিনেই তোমাকে ভালবেসে তোমার বুকের ভেতরে এসে এত সহজ হয়ে তোমার আদার নিতে পারতাম? তোমাকে আদর করতে পারতাম?”
“হ্যাঁ, সেটা ঠিক। তবে আমি তোমার অতীত নিয়ে আগ্রহী নই। যা হবার তা তো হয়েই গিয়েছে, সেগুলো তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। বিয়ের আগে আমিও তো অনকে মেয়ের সাথে ফ্লার্ট করেছিলাম। তোমাকে নিঃশঙ্ক করে বলছি, অনেক মেয়ে আমার সাথে প্রেম করতে চাইত, তবে আমি ঐ ফ্লার্টেই বেশি আগ্রহী ছিলাম, এর বেশি অগ্রসর হই নাই।”
তবে শাহাবই কি সারিকার প্রাক্তন ? তাদের দুজনার আচরণে সে রকমের কিছু লক্ষণ ছিল না। তারা যে পূর্ব পরিচিতি সে রকমও মনে হয় নাই। আর সারিকাও তো খুব আগ্রহ নিয়েই সাবেরর ঔরসে গর্ভ ধারণ করেছিল। তবে শাহাবকে দেখে সারিকা একটু গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল, নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল ঠিকই। সেটা খুব সম্ভবত একজন খালাসপ্রাপ্ত হত্যা প্রচেষ্টায় অভিযুক্ত আসামীর উপস্থিতি সারিকা সহজ ভাবে নিতে পারে নাই। সেটা বুঝেই হয়ত শাহাব যে নির্দোষ কথাটা সারিকাকে বলতে বলেছিল। আর এটাও সত্য যে আজ সারিকার উপর দিয়ে অনেক ধকল গিয়েছে, তাই ওর ক্লান্ত থাকাটা মোটেই অস্বাভিক নয়। সাবের নিজের ব্যখ্যায় নিজেই সন্তুষ্ট হয়ে সারিকাকে বন্ধন মুক্ত করে দিল। সারিকা বন্ধনমুক্ত হয়ে আবার উল্টা দিকে ঘুরে শুয়ে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলতে থাকল। সাবের সারিকার গায়ে একটা পা আর একটা হাত উঠিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে গেল। সারিকা আল্লার কাছে বারেবারে একটাই ফরিয়াদ করছিল ‘আল্লাহ তুমি আমাকে কি রকম একটা কঠিন পরীক্ষায় ফেললে, একই বাসায় আমি আমার প্রাক্তনকে আর তারই বড়ভাই, আমার স্বামীকে নিয়ে কি ভাবে দিন কাটাব। সারিকা প্রায় নির্ঘুম রাত কাটিয়ে দিল।
শাহাব ঘরে এসে চুপচাপ শুয়ে শুয়ে আজকের দিনটাকে ভাবছিল। শাহাব বুঝতে পারছিল যে সারিকাকে দেখলেই সে দুর্বল হয়ে পরে। মনে হয় সারিকারও একই অবস্থা নইলে ওকে আবার টিয়া বলে সম্বোধন করতে বলতো না। এইভাবে চললে যে কোন দিন একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে। এর একটাই সমাধান, সারিকার সাথে, তার ভাবীর সাথে একই বাসায় থাকা যাবে না। শাহাবকেই বাসা থেকে চলে যেতে হবে। তবে যতদিন এক বাসায় থাকতে হবে ততদিন সারিকার কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে, একদম স্বাভাবিক থাকতে হবে। সকালের নাস্তা আর রাতের খাবার সবাই এক সাথে খায়। তাই শাহাব সকালের নাস্তা খেয়ে সাবের অফিসে যাবার সাথে সাথেই বেরিয়ে যায় আর বাসায় ফিরে আসে একেবারে রাতের খাবারের আগে। সাধারণত রাতের খাবারের পর, আব্বা উঠে তাঁর রুমে গেলে দুই ভাই ড্রইং রুমে টিভি দেখতে দেখতে কিছুক্ষণ গল্প করে। দুদিন গল্প শেষ করে সাবের উঠে নিজের বেড রুমে গেলেও শাহাব টিভি দেখার ভান করে ড্রইং রুমে বসে থাকত। সারিকা কাজ শেষ করে সাবেরের বেড রুমের দরজা বন্ধ করতে গেলে শাহাবের সাথে চোখাচোখি হত। শাহাব সারিকার চোখে স্পষ্ট বেদনার ছায়া দেখতে পেত। তারপর থেকে শাহাব আর অপেক্ষা করত না, সাবেরর সাথে সাথে সেও উঠে তার নিজের রুমে চলে যেত।
জসিম
গল্পটা পড়ে একদম ভালো লাগলো না। নতুন কিছু বড় ধরনের গল্প দিলে খুশি হতাম।