কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে রঞ্জনের।পুরো শৈশব তার এখানে কেটেছে।এখান থেকে ছ’ মাইল দূরে একটা টোটো পাড়া আছে।সেখানেই ফরেস্টের অফিস।রঞ্জনের পিতৃদেব সেখানেই চাকরী করতেন।এই এলাকায় কোনো স্কুল নেই।এই এলাকা মূলত জলদাপাড়া বনভূমির অংশ।রঞ্জন পড়ত মাদারিহাটের স্কুলে।ফরেস্টের গাড়ী করে স্কুল যেত।কাছে পিঠেই খয়েরবাড়ি, যেখানে পাহাড়ী তোর্সা নদী রয়েছে।সুছন্দাকে নিয়ে রঞ্জন ওখানে বেশ কয়েকবার গেছে।তখন তাদের বিয়ে হয়নি।সুছন্দা বাইরে বেরিয়ে এলো।ঘেমে নেয়ে একাকার সে।কোমরে আঁচলটা বেঁধে এতক্ষণ ঝাড়পোছ করছিল সে।বলল—শুনছ? একটা গ্যাসের ব্যবস্থা করতে হবে, নাহলে খাবে কি?বুড়ো বুটুকলাল বলল—বৌমনি, আমি মাদারিহাট যাবো এক্ষন, লিয়ে আসব।রঞ্জন বলল–বটু কাকা আপনি একা পারবেন না, আমি যাই।অর্ক বলল–আমিও যাবো।মাদারিহাটও অনেকখানি বদলে গেছে।রঞ্জন বলল—এই দেখ অর্ক এই স্কুলে আমি পড়তাম।বটুকলাল হেসে বলল—আর ছোটবাবু তখন কি দুস্টুমি করতেন! ইস্কুল যাবেনি বলে।—হ্যা মনে আছে বটুকাকা, আপনি আমাকে নলবাড়ী রাজার দুর্গে ঘুরতে নিয়ে যেতেন।—সেটা কোথায় বাপি?—চিলাপাতার জঙ্গলে।ওখানেই তোমার মায়ের দাদুর বাড়ী।—ওখানে এখন কে আছে মায়ের?বটুকলাল বলল—বৌমনির দাদু নামজাদা লোক ছিলেন গো…সে বাড়ী এখনো আছে।সাপ খোপ বাসা বেঁধেছে।—আমি যাবো তাহলে দেখতে! অর্ক বলল।–যাবি যাবি দাঁড়া।এখন ক’টা দিন রেস্ট নে।দুপুরে সুছন্দা রান্নায় লেগে পড়ল।রঞ্জন জঙ্গলটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিল অর্ককে।অর্ক কলকাতায় জন্ম।কলকাতায় বড় হয়েছে।কংক্রিটের ভিড় আর গাড়ীর আওয়াজই দেখেছে।ঘন সবুজ জঙ্গল, পাহাড় আর পাখির ডাক দেখে সে মোহিত হয়ে পড়ছে।
রাত গভীর হলে জঙ্গল যেন থমকে যায় এখানে।হাতির ডাক শুনতে পাওয়া যায় মাঝে মাঝে, কখনো শেয়াল ডেকে ওঠে।ঝিঁঝিঁর ডাক একনাগাড়ে শোনা যাচ্ছে।সুছন্দা বলল—বিয়ের পর ভেবেছিলাম আমরা এখানেই থেকে যাবো বলো।রঞ্জন সুছন্দার দিকে ঘুরে শুয়ে বলল—তখন কি ভেবেছিলাম কলকাতায় চাকরী করব।আমি সবসময় চাইতাম বাবার মত ফরেস্টের চাকরী করতে।সুছন্দা হেসে বলল—তাহলে ভালোই হত এখানেই আমরা থেকে যেতাম।রঞ্জন বলল—আজ বটু কাকা বলল তোমার দাদুর বাড়ী নাকি আগের মতই আছে।ওখানে নাকি এখন সাপ-খোপের বাস!—সত্যি? যাবে একদিন?—কালই চলো।অর্কও বলছিল, চিলাপাতার জঙ্গলটা ঘুরে আসা যাবে।পরদিন সকালেই বেরিয়ে পড়ল ওরা।সকালের জঙ্গল আরো অপরূপ।চিলাপাতার জঙ্গলের মেঠো রাস্তাটা ধরে ওরা পাহাড়ের ঢালে উঠল।একতলা দু কামরার বাড়িটা এখনো আছে।বাড়িটা সুছন্দার দাদু অনেকটা বনবাংলোর কায়দায় বানিয়েছিলেন।তার বেড়াগুলো ভেঙে গেছে।গাছ, লতাপাতা বেয়ে উঠেছে।সুছন্দা দেখল একটা তালা দিয়ে দরজা বন্ধ।রঞ্জন লতাপাতা সরিয়ে দরজার কাছে যেতেই একটা গিরগিটি সরে গেল।সুছন্দা বলল—তালা দেওয়া তো?রঞ্জন বলল–ভেঙে ফেলা যায়, কিন্তু লাগাবে পরে কি?—এর চাবি কার কাছে আছে?ফরেস্টের গাড়ীতেই এসছে রঞ্জন– সুছন্দারা।যদিও সুছন্দার দাদুর এই বন বাংলো রঞ্জনের পৈত্রিক বাড়ী থেকে মাত্র দশ মিনিট জঙ্গলের হাঁটা পথে।সে পথেই আগে আসত রঞ্জন সুছন্দার সাথে দেখা করতে।কিন্তু পিচ রাস্তা দিয়ে গেলে সেই পথই দশ মিনিট গাড়িতে লেগে যায়।গাড়ীর ড্রাইভার ছেলেটা বেশ মিশুকে।ওর বাড়ী এখানে নয়।মালবাজার।ও ফরেস্টের গাড়ী চালায়।গাড়ীর ড্রাইভার বলল—স্যার এ ঘরের চাবি আপনি একজনের কাছে পাবেন?রঞ্জন জিজ্ঞেস করল—কে?—নাম জানি না স্যার, কে একজন এখানে থাকে।আপনাদের বাড়ীর কেয়ারটেকার বটুকলাল তাকে চেনে।সুছন্দা বলল—তবে যে বটুকাকা বলল এ বাড়ী এখনো দখল করেনি কেউ?চিলাপাতার জঙ্গল ঘুরে নল রাজার বাড়ী হয়ে রঞ্জনরা যখন ফিরল তখন সন্ধ্যে হয়েছে।খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে।রঞ্জন বলল—সুছন্দা তুমি ভাতে ভাত করে নিও জলদি।সুছন্দা শাড়ি বদলে রান্না ঘরে ঢুকে গেল।বটুকলাল এসে বলল—ছোটবাবু ঘুরে আইলেন?—আচ্ছা বটু কাকা আপনি যে বললেন ওই বাড়ী দখল হয়নি তবে? ওখানে নাকি অন্য কে থাকে ড্রাইভার বলল।বটুকলাল হেসে বলল—বৌমনির দাদু খুব ভালো লোক ছিলেন, জানতেন এই বাড়ীর লগে আর কেউ আসবেনি।বৌমনির মা’ও আসতেন কম।একটা ভবঘুরে আইসে জুটল।তার আস্তানা ছিল আশপাশ।দয়ালু মানুষ মরবার আগে থাকতে দিয়ে গেলেন।—-তার মানে ওই বাড়ীর চাবি আর মিলবে না?—মিলবে না কেন?—সে ভবঘুরে পাগলা সারাদিন জঙ্গলে ঘুইরে বেড়ায়, রাতে এসে আস্তানা গাড়ে।নিজের খেয়ালে থাকে, ভোর হবার আগেই চম্পট দেয়।তার কাছ থেকে চাবি এনে রাখব।সুছন্দা ডাক দিলো—খাবে এসো।খেতে বসে রঞ্জন বলল—কে এক ভবঘুরে পাগলকে থাকতে দিয়েছে তোমার দাদু ওই বাড়ী, বটুকাকা বললেন চাবি এনে দেবেন আজ রাতে।সুছন্দা বলল—কাল তাহলে হেঁটে যাবো।চিলাপাতা এখান থেকে বেশি দূরে নয়।রঞ্জন বহুবার হেঁটে গেছে।ভোর বেলা বটুকাকা চাবি এনে দিল।অর্কর খুব ইচ্ছা হাতির পিঠে চড়বে।বটুকলাল বলল–তবে আমি দাদুভাইকে লিয়ে যাচ্ছি ছোট বাবু, আপনি না হয় বৌমনিকে লিয়ে চিলাপাতা হয়ে আসুন।রঞ্জন একটা ট্রাউজার আর টিশার্ট পরেছে, পায়ে স্নিকার্স।সুছন্দা হাল্কা নীলচে শাড়ি আর ছাপা ব্লাউজ।বাড়িটার উঠোনের লতাপাতা গুলো সরিয়ে দরজার তালা খুলতে লাগল রঞ্জন।বেশ জং পড়েছে।ভবঘুরে বোধ হয় এ বাড়ীতে অনেকদিন আসেনি তাই তালার অবস্থা এই।রঞ্জন দরজা খুলতেই ফাঁদের সম্মুখীন হল।ভীষন অন্ধকার, গুমোট ভাব।রঞ্জন মোবাইলের আলোটা জ্বাললো।সুছন্দা তার দাদুর বাড়ীর ঘরগুলো ভালো করে চেনে।শাড়ীটা গোড়ালির উপরে তুলে ও হাঁটতে লাগল।প্রথম ঘরটার লাগোয়া দরজা দ্বিতীয় ঘরটা।পাশে ছোট রান্না ঘর, পেছন দিকেও বারান্দা আছে।প্রথম ঘরে ঢুকে রঞ্জন আর সুছন্দা চমকে গেল মোবাইলের আলোয় তারা দেখছে এ কার ছবি!!!
সুছন্দার ছবি দেওয়ালে আঁকা।খুব দক্ষ হাতেই আঁকা।সুছন্দা বলল—এটা কে আঁকল?রঞ্জন বলল—আগে ছিল না?—না তো?রঞ্জন এবার দেখল পাশে টেবিলে কাগজের গোছা।প্রত্যেকটা কাগজে সুছন্দার ছবি আঁকা!তবে কোনো ছবিটাই এই বয়সের নয়।অল্প বয়সের।সুছন্দাও হতবাক হল! রঞ্জন পাশে রাখা একটা ছোট কার্ডবোর্ডের বাক্স পেল।তাতে কিছু টুকরো টাকরা চিঠি।সুছন্দা বলল—কি আছে ওতে?—চিঠি!প্রথম চিঠিটা এরকম–সুছন্দা,আমার বুকে আছড়ে পড়ছ না কেন? আমার বুকে তোমাকে রেখে দেবার মত অনেকখানি জায়গা আছে।সুছন্দা, প্রিয়তমা আমার, একটিবার জবাব দাও।তুমি একটিও চিঠির প্রত্যুত্তর দিচ্ছ না।আর এদিকে আমি উতলা হচ্ছি! তোমাকে না পেলে মরে যাবো লক্ষীটি।তোমার অন্ধকারের প্রেমিক সুখেন!সুছন্দা বলল—কে সুখেন?পরের চিঠি খুলল রঞ্জন।সুছন্দা,আমাকে হত্যা করছ কেন বারবার? একটাও চিঠির উত্তর দিচ্ছ না।আমি পাগল হয়ে যাবো।তোমাকে আমি চাই, চাই, চাই।সুখেনতারপর অসংখ্য কবিতা!বাকি চিঠিগুলো আর পড়া হল না।সুছন্দা বলল—কে সুখেন? কখনো তো শুনিনি?রঞ্জন হেসে বলল—সুন্দরীদের এরকম পাগল প্রেমিক থেকেই থাকে, মনে করে দেখো কে হয়ত এমন ছিল, যাকে তুমি খেয়ালই করোনি।সুছন্দা বলল—ধ্যাৎ, কি একটা পাগল! চলো।সুছন্দা বেরিয়ে যাবার সময় আটকে গেল।বলল—ছবিগুলো কি সুন্দর এঁকেছে দেখো।আমি কিন্তু মোটেই এত সুন্দর ছিলাম না।রঞ্জন বলল—ছিলে গো ছিলে তাই না লোকে এমন পাগলামী করে, আর এখনো আছো…পুরো মিলফ!সুছন্দা কপট রাগ দেখিয়ে বলল—এই নোংরা কথাটা তোমাকে আগেও বলতে না বলেছি।সুছন্দা ছবিগুলো দেখছিল।রঞ্জন বাকি চিঠিগুলো পড়বার লোভ সামলাতে পারল না।আস্তে করে পকেটে ঢুকিয়ে নিল।সুছন্দা একটা ছবি হাতে নিয়ে বলল—এটা আমি বাড়ী নিয়ে যাবো।রঞ্জন ঠাট্টা করে বলল—নিতে পারো।তবে তার আগে তোমার পাগল প্রেমিকের কাছে একটা অটোগ্রাফ নিয়ে নিও।সুছন্দা অন্য ঘরের দরজার কাছে এসে বলল—এর চাবি কই?রঞ্জন বলল—এটা তালাবন্ধ? কই দেয়নিতো।রঞ্জন পেছনের দিক থেকে খেয়াল করল আলো আসছে।পেছনে গিয়ে দেখল এধার দিয়ে কেউ যাতায়াত করে।ঝোপ ঝাড়ের মাঝে বারান্দায় সরু রাস্তা তৈরি হয়েছে।বুঝতে পারল তাই দরজাটার তালায় মরচে পড়েছে।একটু এগোতেই পায়ে কিছু একটা লেগে গড়িয়ে গেল।রঞ্জন দেখল দেশী মদের বোতল।যত্রতত্র বিড়ির টুকরো।সামান্য গাঁজার গন্ধ।বেশি পুরোনো না।এখানে তবে কেউ বসে নেশা ভাঙ করে।এবার দেখল অনেকগুলো খালি দেশী মদের বোতল।একটু ঝোপের দিকে গিয়ে দেখল ফাটা দেওয়ালে কেউ ইট দিয়ে লিখেছে ”সুছন্দা তোমার স্তনে জায়গা দাও/আমি আজীবন শিশু হয়ে যাবো/সুছন্দা তোমার যোনি মেলে ধরো/আমি আজীবন যুবক হয়ে যাবো”!রঞ্জন আর এসব দেখালো না সুছন্দাকে।বাড়ী ফিরে এলো ওরা।অর্ক তখনও ফেরেনি।বটুক লাল অর্ককে নিয়ে বারোটা নাগাদ ফিরল।দুপুরে খেয়েদেয় সকলে বিশ্রাম করছিল।সুছন্দা পাশ ফিরে শুয়ে আছে।ঘুমে মগ্ন।অর্ক তার মায়ের পাশে শুয়ে মোবাইল হাতে গেম খেলে যাচ্ছে।রঞ্জন একটু পাহাড়ের দিক থেকে বেড়িয়ে এলো।রাতে সুছন্দা চিকেন করল।বটুকলাল অর্ককে নিয়ে ফিরবার সময় টোটো পাড়া থেকে মুরগী কাটিয়ে এনেছিল।খেয়ে দেয়ে শুল ওরা তাড়াতাড়ি।রঞ্জন পাশ ফিরে দেখল সুছন্দা ঘুমোয়নি।কিছু বলতে যাবার আগেই সুছন্দা বলল—সুখেন বলে আমার এখনও কাউকে মনে পড়ল না জানো!রঞ্জন হেসে বলল—পাগলটা তোমার মনে বেশ জাঁকিয়ে বসছে দেখছি।সুছন্দা রঞ্জনের বুকের কাছে মুখ নিয়ে বলল—তার চেয়ে তো বড় পাগল তুমি, যার সাথে সতেরো বছর ঘর করলাম।—তাও অত ভালো ছবি আঁকতে পারবো না কিন্তু….—সত্যি গো যে ই হোক ছবিগুলো কি সুন্দর এঁকেছে বলো।—ওই যে ছবিটা আনবে বললে, এনেছো?—আনলাম কই।ভুলেই গেলাম তো।একটু খানি থেমে রঞ্জন বলল—-ইচ্ছা করছে…সুছন্দা রঞ্জনের গালে চুমু দিয়ে বলল—আজ নয়, বেশ কোমরে ব্যথা, কাল।—মলমটা লাগাচ্ছো না কেন? বলেই রঞ্জন উঠে গিয়ে ব্যাগ হাতড়ে মলমটা বের করল।সুছন্দা শাড়ি পরেছে।রঞ্জন সুছন্দার ফর্সা কোমল অল্প মেদ যুক্ত কোমরে মালিশ করতে লাগল।সুছন্দা ঘুমিয়ে গেছে।রঞ্জনের মনে পড়ল চিঠি গুলোতো পড়া হয়নি।সন্তর্পণে উঠল রঞ্জন।ঘরের মধ্যে থেকে মোমবাতি দানীটা তুলে নিয়ে গেল পাশের ঘরে।ওখানে অর্ক ঘুমোচ্ছে।একদম শব্দ না করে চিঠির বান্ডিল নিয়ে বারান্দায় গেল।বাইরে ছমছমে অন্ধকার।শৈশবে এই অন্ধকারেই বড় হয়েছে ফরেস্ট অফিসার বিমল মৈত্রের ছেলে রঞ্জন মৈত্র।তাই এই জঙ্গলে তার তেমন ভয় করে না।তৃতীয় ও চতুর্থ চিঠিটা আবার সেই রোমান্টিক ও সুদীর্ঘ।তবে প্রথম দুটির মত সাধারণ নয়।অত্যধিক পান্ডিত্য না থাকলে এমন চিঠি লেখা যায় না।পড়ে বোঝা গেল এক অজানা যুবক সুছন্দার প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খেত, বেচারাকে সুছন্দাই জানতে পারল না।মনে মনে রঞ্জন ভাবল, ভালোই হয়েছে সুছন্দার হাতে এই যুবকের চিঠি আসেনি।এই চিঠির কাব্যিকগুন আর তার রোমান্টিকতায় যে কোনো নারীই প্রেমে পড়ে যাবে।সুছন্দাও নিশ্চই ব্যতিক্রম হত না।তবু চিঠিগুলো পড়ে রঞ্জনের জানতে ইচ্ছে করল এই হতভাগা প্রেমিকটি কে?প্রত্যেকটা চিঠি পড়েই বোঝা যায় সুছন্দা কোনো উত্তর দেয়নি।চিঠিগুলো সুছন্দার হাতে পৌঁছায়নি।রঞ্জন বুঝল কেউ ইচ্ছে করেই চিঠিগুলো লুকিয়েছে সুছন্দার হাতে যাতে না এসে পৌঁছায়।পঞ্চম চিঠিতে আটকে গেল রঞ্জনের চোখ।সুছন্দার একটি নগ্ন ছবি আঁকা আছে।বিয়ের প্রথম দিকের সুছন্দা।ভাল করে রঞ্জন দেখল, সুছন্দার মুখটা সে সময়কার সঙ্গে পারফেক্ট হলেও স্তন, নাভি যোনিতে ত্রুটি আছে আঁকায়।রঞ্জন জানে সুছন্দার বাম স্তনে একটা লালচে তিল আছে।রঞ্জন নিজে যদি সুছন্দার নগ্ন পোট্রেট আঁকে তবে সেটি ভুলে যেত না।সুছন্দার স্তনের আকারেও ত্রুটি আছে আঁকায়।শিল্পী কল্পনাতেই এঁকেছে যে তার ফল এটি।পরের ছবিটা অদ্ভুত! সেখানে সুছন্দা পেছন দিক করে ঘাড় ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কোমরে কাপড় তোলা।উদ্ধত পাছা।সুছন্দার পশ্চাৎদেশের স্বাভাবিক আকারের চেয়েও অস্বাভাবিক রকম বড় করে এঁকেছে! মনে হচ্ছে এইটা আঁকার সময় প্রেমিক শিল্পীর মনে ঘৃণা জন্মে ছিল সুছন্দার প্রতি।পরের ছবিতে আরো একটি বিচিত্র চিত্র।এখানে সুছন্দা স্তন দান করছে।কোলে একটি শিশু।শিশুটির রঙ কালো।শেষ ছবি নর্তকী বেশে সুছন্দা।সম্পুর্ন নগ্ন, গহনা পরিহিতা।রঞ্জন বুঝতে পারল লোকটা শুধু পাগল প্রেমিক নয়, পারভার্টও।তবে লোকটা সুদক্ষ শিল্পীও বটে।কিন্তু লোকটা কে?
সকালে রঞ্জন আর অর্ক সামনের দুটো শাল গাছে জাল টাঙিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলল।খেলা শেষে অর্ক বলল—-বাপি, ওই পাহাড়ে নিয়ে যাবে যে?—যাবি? চল তাহলে বিকেলে।খাওয়া দাওয়া সেরেই অর্ক আর রঞ্জন বেরিয়ে পড়ল।পাহাড়ের চড়াই উতরাই ঢাল বেয়ে অনেকটা হাঁটতে হয়।এই পাহাড়টা যাবার পথ আবিষ্কার করেছিল কানু দা।কানু দা ছিল বটু কাকার ছেলে।খুব সাহসী ছিল কানু দা।তখন রঞ্জন দশ বারো বছর।কানু দা রঞ্জনের থেকে বছর ছয়েক বড়।সতেরো-আঠারো হবে তখন।কানু দা’র যেমন দুস্টুমি ছিল তেমন ছিল বুদ্ধি।রঞ্জনের মনে আছে একবার হাতির পালের মুখে পড়েছিল তারা।কানু দা’ তখন বটুকাকার বিড়ি চুরি করত।পকেটে দেশলাই রাখত।শুকনো পাতায় আগুন ধরিয়ে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল হাতির পালকে।কানু দা দুষ্টমি করলেও পড়াশোনায় ভালো ছিল।তাই রঞ্জনের বাবা তাকে ভালোবাসতেন এবং সব পড়ার খরচ বহন করবেন বলেছিলেন।হঠাৎ অনেক দিন পর কানু দা’র কথা মনে এলো রঞ্জনের।রঞ্জন তখন সবে ফাইভে পড়ে।কানু দা’র টেন হবে।হঠাৎ হই হই করে উঠল সকালবেলা বাড়ীর পরিবেশ।রঞ্জনের মনে আছে সেদিনটা।সকলে বলছিল রেঞ্জার অফিস থেকে নাকি চুরি গেছে টাকা।কানু দা চুরি করেছে।সেদিন রঞ্জনের বাবাও কানু দা’কে খুব মেরেছিলেন।রঞ্জন পরে জেনেছিল কানু দা’কে হোস্টেলে রেখে দিয়ে আসা হয়েছে।অর্ক বলল—বাপি ওই দেখো?রঞ্জনের হুশ ফিরল।দেখল একটা শেয়াল পাথরের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে।তারপর পালালো।বাড়ী ফিরল সন্ধ্যের মুখে।অর্ক এসে—মা মা হাঁক ডাক করল।সুছন্দাকে দেখতে পাওয়া গেল না।বটু কাকা বললেন—বৌমনি তার দাদুর বাড়ীর দিকে গেছে।রঞ্জন বলল–এখন?রঞ্জন দেখল সুছন্দা আসছে।হাতে রোল করা কাগজ!রঞ্জন বলল—এখন তুমি গেছিলে কেন?সুছন্দা বলল—ছবিটা আনতে।রঞ্জন বলল—সন্ধ্যের দিকে ওদিকে কেউ যায়? বলতেই পারতে আমরা না হয় ওদিক দিয়েই ঘুরে আসতাম।সুছন্দা বলল—কি করব, তোমরা আমাকে না বলে চলে গেলে, একা একা কি করব…ভাবলাম একটু ঘুরে আসি।সুছন্দার পেটে মাথা রেখে শুয়ে ছিল রঞ্জন।সুছন্দা বলল—আমরা যদি সব কিছু ছেড়ে পাকাপাকি থেকে যাই?—-বা রে! তারপর তোমার চাকরী, আমার চাকরী, অর্কের স্কুল?—ট্রান্সফার নিয়ে নেব।রঞ্জন হেসে সুছন্দার দিকে ঘুরল।একটু আগেই তারা মিলিত হয়েছে।সুছন্দার ব্লাউজের একটা হুক তখনও খোলা।রঞ্জন আঁচল সরিয়ে স্তনের দিকে হাত বাড়াতেই সুছন্দা হাতটা সরিয়ে হুকটা লাগিয়ে নিল।রঞ্জন বলল—এখানে একটা পোস্ট অফিস আছে।তোমার বদলি হয়ে যাবে, কিন্তু আমার? এখন তো ট্রান্সফারটি স্টেটের বাইরে নিতেই হচ্ছে।একবছর পরে ভাবা যেতে পারে।তবে মাদারিহাটেও কোনো শাখা আমার ব্যাঙ্কের নেই।আছে সেই জলপাইগুড়িতে…সেখান থেকে এখানে যাতায়াত করার চেয়ে কলকাতা টু অলিপুরদুুয়ার একই ব্যাপার।সুছন্দার বুকের গভীরে মাথা গুঁজে শুয়ে পড়ল রঞ্জন।
আজ শেষ দিন।কালই ফিরবে তারা।রঞ্জন বটুকাকার সাথে গল্প করছিল।কথায় কথায় রঞ্জন বলল—বটুকাকা আচ্ছা কানু দা কোথায়?নামটা শুনে বটুকলাল গম্ভীর হয়ে গেলেন।এড়িয়ে গিয়ে বললেন—ছোটবাবু আবার কবে আইসবে? দাদুভাইর তো ভালো লেগে গেছে জায়গাটা?রঞ্জন একটু অবাক হল।সত্যি সেই কবে ক্লাস সিক্সে কানু দা’কে শেষ দেখে ছিল।চুরির দায়ে অভিযুক্ত হবার পর আর কোনো দিন কানুদার কথা সে না বাবা-মা, না বটুকাকা; কারোর মুখে শোনেনি।ব্যাগ গোছাচ্ছিল সুছন্দা।বটুকাকা ফরেস্টের গাড়ী ডাকতে গেছে।রঞ্জন বটুকাকার ঘরটার কাছে এসে বারান্দায় বসল।বটুকাকার ঘরের দেওয়ালে একটা পট আঁকা আছে।প্রচন্ড শিল্পীসত্বা না নিয়ে জন্মালে এমন আঁকা যায় না।রঞ্জন দেখল একটা জায়গায় ছোট করে ইংরেজিতে লেখা আছে ‘Sukhen’।চমকে গেল রঞ্জন।ভাবল সুছন্দাকে ডেকে দেখাবে।তারপর ভাবল না থাক।যে প্রেমিককে সুছন্দা কখনো দেখেনি, এতদিন পর তাকে চিনিয়ে লাভ নেই।সুখেনকে চিন্তে পেরেছে রঞ্জন।কানু দা’ই সুখেন।এটা চিনতে তার বাকি নেই।******রঞ্জন ইংরেজি কবিতার বইটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে।তার মানে সুছন্দা সুখেনকে অর্থাৎ কানু দা’কে চিনতো!!! আসলে চিঠি গুলো সবই পড়ত সুছন্দা।কিন্তু সুছন্দা কোনো প্রত্যুত্তর দিত না কেন?কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল রঞ্জনের!সুছন্দা যদি চিনতো তবে রঞ্জনের কাছে চেপে গেল কেন? কেন সেদিন বলেছিল—“কে সুখেন?”আলিপুদুয়ার থেকে ঘুরে আসার পর রঞ্জন ভুলেই গেছিল কানু’ দা’র কথা।কিন্তু আজ যেন নতুন করে তার অনুসন্ধিৎসা জাগিয়ে তুলল।অর্ক ফিরেই বলল—বাপি আজ মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স আর চেন্নাই সুপার কিংসের খেলা আছে।রঞ্জন অন্যমনস্ক ছিল।নিজের স্ত্রীর এই হতভাগা প্রেমিককে জানার রহস্য তাকে পেয়ে বসেছে।বলল—কাল আলিপুরদুয়ার যাবি?–কাল? অর্কের চোখ চকচক করে উঠল।—হ্যা, তোর মাকে রাজি করাতে হবে।সুছন্দা অফিস থেকে আজ তাড়াতাড়িই ফিরল।রঞ্জন অর্ককে ইশারা করল।অর্ক বলল—মা,কাল আমরা আলিপুরদুয়ার যাচ্ছি।—-মানে??—হ্যা সুছন্দা, তুমিও চলো।তুমি না গেলে বাপ-ছেলেতেই যাবো।এই ছুটিগুলো নষ্ট করা যাবে না।অর্ক ভেবেছিল মা রাজি হবে না।রঞ্জনও তাই ভেবেছিল।সুছন্দা একটু নারাজ হয়ে বলল—আমি একা একা থাকব?—কেন তুমিও চলো।—আমার একদম এখন হবে না।ঠিক আছে তোমরা যাও।কিন্তু সাবধানে তোমরা দুজনেই যে কি করে বসো কখন।রঞ্জন হেসে বলল—তাহলে কাল আমরা যাচ্ছি?অর্কও খুব খুশি।*******মাত্র ছ’মাস আগে আলিপুরদুয়ার ঘুরে গেছে তারা।অর্কর কাছে তবুও জায়গাটা নতুন।জলদাপাড়া পৌঁছল যখন ওরা বটুকলাল খুশি হয়ে বলল—ছোট বাবু আপনি?—-হ্যা বটু কাকা, তিন চারদিন কাটিয়েই যাবো।—-বৌমনি কোথায়?—ও আসেনি ওর অফিস আছে।—ঠিক আছে ছোটবাবু আমি ঘর খুলে দিচ্ছি।টোটোপাড়ার ঘনার বউকে বলে দিচ্ছি।রেঁধে দিয়ে যাবে।সুছন্দা যেভাবে ঘর গুছিয়ে দিয়ে গেছিল ঠিক একই রকম আছে ঘরটা।অর্ক বলল—বাবা তোমার ছোটবেলাটা বেশ কেটেছে, আমার তো এখানে থেকে যেতেই ইচ্ছে করে।রঞ্জন বলল–এখানে কিন্তু আইপিএল দেখতে পাবি না, ইলেকট্রিক নেই।—জানি তো।সেজন্যই ভালো লাগে।রঞ্জন খুশি হল।তার ছেলেটা কলকাতায় মানুষ হয়েও যা হোক নাকউঁচু হয়নি।টোটো পাড়ার একটা আদিবাসী বউ এসে রেঁধে দিয়ে গেল।এধার ওধার রঞ্জন আর অর্ক ঘুরে এলো।মাঝে সুছন্দা ফোন করে জেনে নিল তারা ঠিকঠাক পৌঁছেছে কিনা।রাতে অর্ক ঘুমিয়ে পড়তে রঞ্জন বাইরে বেরোলো।জঙ্গলের রাতটা তার বড় ভালো লাগে।বটুকলাল দাওয়ায় বসে আছে।রঞ্জন এগিয়ে গেল।বটুকলাল দাওয়ায় মাদুর পেতে দিল।বলল—বসেন ছোটবাবু।—বটু কাকা এখানে একা একা থাকেন কখনো কোনো বিপদ হয়না?—সে আর কি বিপদ ছোটবাবু…এখন কি আর আগের মত পশু পাখি আছে।তবে এক আধবার চিতা ধরা পড়ে বৈকি।তোমার মনে আছে ছোটবাবু বড় সাহেব একবার বাঘের বাচ্চা ধরে…রঞ্জন কথা শেষ না করতে দিয়েই বলল—কানু দা কোথায়?বটুকলাল আবার এড়িয়ে গিয়ে বলল—কাল হাতির পাল ঢুকে পড়েছিল…—-কাকা কানু দা এখন কোথায় থাকে?বটুকলাল আর এড়াতে পারলেন না।বললেন—কে কানু?—আপনি নিজের ছেলে ভুলে গেলেন বটু কাকা?বটুক গম্ভীর হয়ে গেল।বলল—সে কি আমাকে কখনো বাপ মনে করছে?—সে এখন কোথায়?—আসে মাঝে মধ্যে।দিন চার পাঁচ থাকে।পাহাড় জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় তারপর আবার কোথায় চলে যায়।নির্লিপ্ত ভাবে বটুকলাল বলল।—সুছন্দার দাদুর বাড়ীতে কানু দা থাকে না?বটুকলাল চমকে উঠল—তুমি কি কইরে জানলে ছোটবাবু?—আমি জানি বটুকাকা, কানু দা’কে আমার বেশ মনে আছে, পাহাড়ে চড়া, গাছে চড়া সব কিছুতেই ওস্তাদ ছিল।তারপর সেই ফরেস্ট অফিসে চুরি…বটুকের চোখ ভিজে গেল বলল—তোমার মনে আছে ছোটবাবু? তুমি তখন দশ বারো।বটু তোমার চেয়ে অনেক উঁচু কেলাসে পড়ত।চুরি করল, বড়সাহেব মারলেন।স্কুলে পাঠালুম তারপরও বড় সাহেবের কথা শুনে।বড় সাহেব বড় ভালোবাসত তাকে।বাসবেই না কেন? কানু পড়াশুনা, খেলাধুলা সবেতেই পরথম হত যে!—তারপর?—ইস্কুলে সবাই খ্যাপাতে লাগল,’চোর চোর’ বলে।ছোট বাচ্চারও ছাড়ত না তাকে।কেষ্ট বলে একটা ছেলে পড়ত কানুর সাথে।কানুকে খ্যাপালো।কানুর গতর সবসময়ই বেশি।একদিন বেদম মারল ছেলেটাকে।বড় সাহেবের কাছে কমপিলেন আইল।বড় সাহেব পাঠিয়ে দিল হোস্টেলে, দিনাজপুর।
অসাধারণ একটা গল্প। এই গল্পের দ্বিতীয় পর্ব লিখুন, দয়া করে। অর্ক তার মায়ের লিখা একটি ডাইরি পাবে। যেখানে, সুছন্দা নিজেই নিজের প্রথম ধর্ষনের পুরো বর্ননা দিবে। তার ধর্ষনের অনুভূতি, পরের বার আবার স্বেচ্ছায় যাওয়া, অর্ক দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষার সময়, ভিতরের পুর্ন যৌন কর্মের রগরগে বর্ননা থাকবে। অর্কের প্রথমবার ধরা পড়ে যাবার পর এক ঘন্টা দেরিতে বাড়ি যাবার আগের ঘটনার পুর্ন এবং হার্ড সেক্সের বর্ননা থাকবে।
অবশ্যই দয়া করে লিখবেন। ভালো থাকবেন।
আপনার মত একজন মনোযোগী পাঠককে পেয়ে আমরা গর্বিত। আমাদের পাশে থাকার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ 💛