স্বর্গের নীচে সুখ


এই লোকটির কাছে আচমকা আতিথেয়তা স্বীকার করিয়ে খানিকটা জুলুম করে নেওয়া হচ্ছে।তার ওপর আবার এতটা পথ ভেঙে নদীতে রাতে জল আনতে পাঠালে—সে নিজের কাছে ছোট হয়ে যাবে।ভাস্বতীও তার দিকে তাকাবে নিচু চোখে।
সে দৃঢ়ভাবে বলল আপনি একা যাবেন কেন?আমিও যাচ্ছি আপনার সঙ্গে।
—-তার দরকার নেই।শুধু শুধু ব্যস্ত হচ্ছেন।
—-না তা হয় না।
রঞ্জন টর্চটা নিয়ে লোকটির কাছে গিয়ে বলল চলুন।
লোকটি ভুরু কুঁচকে ভাস্বতীর দিকে তাকিয়ে বলল উনি একা থাকবেন?
রঞ্জন সমানভাবে ভ্রু কুঁচকে বলল তাতে কোনো ভয় আছে?
—-এমনিতে কোনো ভয় নেই।আবার জোর করে সেসব বলা যায় না তো।অনেকে বিনা কারনে ভয় পায়।
ভাস্বতী বলল আমি ঠিক থাকতে পারবো।
লোকটি বলল সেটা কিন্তু রিস্ক হয়ে যাবে।যার নির্জন জায়গায় একা থাকার অভ্যেস নেই তার পক্ষে একা থাকা ঠিক নয়।বিশেষত যে জায়গা কুসংস্কার দিয়ে ঘেরা সে জায়গা মেয়েদের পক্ষে বিপজ্জনক।
ভাস্বতী বলল আপনি মেয়েদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন মনে হচ্ছে?
লোকটি লজ্জা পেয়ে বলল না, তা জানি না।আমি মেয়েদের কখনো কাছ থেকে দেখিইনি।আপনি সত্যিই ভয় পাবেন না?
ভাস্বতী লঘুভাবে হেসে বলল এখানে ভূত টূত নেই তো?
—-তা কি করে জানবো তবে এখানে কয়েকজন লোক মরেছে।
—-ঠিক আছে।কিচ্ছু হবে না।
—-তা হয় না।লোকটি নির্দেশ দেওয়ার মত করে রঞ্জনকে বলল আপনি ওর কাছে থাকুন।আমি চট করে জল নিয়ে আসছি।
রঞ্জনের কাছে কথাটা চ্যালেঞ্জের মত মনে হল।দুজন পুরুষের মধ্যে পারঙ্গতার প্রশ্নে এইভাব এসে পড়ে।সে পাহাড় পছন্দ করে না।কিন্তু সে কাপুরুষ নয়।সে গম্ভীর ভাবে বলল আপনি থাকুন এখানে আমি জল নিয়ে আসছি।
—-আপনি পারবেন না।
—-কেন পারবো না।রাস্তাতো একটাই।পথ হারানোর ভয় নেই।
—-ভাস্বতী বলল এখনো একটা পাইথন কিন্তু আছে।
রঞ্জন বলল পাইথন কখনো তেড়ে আসে বলে শুনিনি।দেখা গেলে পাশ কাটিয়ে চলে আসবো।
বালতিটার দিকে হাত বাড়িয়ে সে বলল দিন।
লোকটি রঞ্জনের পৌরুষে আঘাত করতে চায় না।বিনা বাক্যব্যয়ে বালতিটা রঞ্জনের হাতে তুলে দিল।
ভাস্বতী প্রগাঢ় চোখে তাকালো রঞ্জনের দিকে।এক নির্জন পাহাড়ী রাত্রে একজন অজ্ঞাতকুলশীল ব্যক্তির কাছে নিজের স্ত্রী’কে রেখে যাওয়ার মধ্যে একটা মনোবেদনা থাকে।
আবার,স্বার্থপরের মতন সে তার স্ত্রী’কে পাহারা দেবে।তাদের এক উপকারী লোকটি ভৃত্যের মতন খাটবে—এতেও সে ছোট হয়ে যাবে।
আর কোনো কথা না বলে রঞ্জন রাস্তা ধরে নামতে থাকলো।তার সামনে সামনে একটা আলোর বৃত্ত।
লোকটি তাকালো ভাস্বতীর দিকে।তার অবিন্যস্ত চুলগুলো উড়ে পড়ছে কপালে।হ্যাজাকের আলোয় ভাস্বতী যেন শিল্পীর তুলিতে অরণ্যবাসনা।গেঞ্জির আধারে উদ্ধত স্তন উঁচিয়ে আছে।অতিরিক্তমাংসহীন ৩২ বর্ষিয় এই মানবীর শরীরে কোথাও মেদ নেই।
রঞ্জনের আসতে অন্তত দেড় ঘন্টা লাগবে।
লোকটি একদৃষ্টে চেয়ে আছে ভাস্বতীর দিকে।তার শুধু চোখের আরাম নয়।তার দৃষ্টি শুয়ে আছে ভাস্বতীর শরীরে।
ভাস্বতী লোকটির দিকে তর্জনী তুলে রানীর মত অহংকারী গলায় হুকুম করলো আপনি যান ওর সাথে। আমি একা থাকতে পারবো।
লোকটি বলল আমিতো অনেকবার বলেছিলাম।
ভাস্বতী বলল আপনি জেনেশুনে আমার স্বামীকে বিপদের মুখে পাঠাচ্ছেন
লোকটি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল।ভাস্বতী ক্রীতদাসের মুখ্ থেকে কোনো কৈফিয়ত শুনতে চায় না।ফের হুকুম করলো, যান!
দাস বিদ্রোহের নেতার মতন লোকটি উদ্ধত ভাবে হাসলো।
ভাস্বতীর পায়ের পাতা থেকে কপাল পর্যন্ত চোখ বোলালো।হাসলো আপনমনে।তারপরে দ্রুত বেরিয়ে গিয়ে রঞ্জনের হাত থেকে বালতি কেড়ে নিয়ে বলল আপনি আপনার স্ত্রী’র কাছে থাকুন।উনি ভয় পেয়েছেন !
রঞ্জনকে সে কথা বলারও সুযোগ দিল না।তরতরিয়ে নীচে নেমে গেল।টর্চও সে নেয়নি।মিলিয়ে গেল অবিলম্বে অন্ধকারে।
রঞ্জন অপ্রসন্ন মুখে ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলো তুমি ভয় পেয়েছ?
কিসে?তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে ভাস্বতী বলল ভয় পাইনি তো?এই সাপগুলোর কাছে থাকতে বেশ বিচ্ছিরি লাগছিল।
রঞ্জন দেখলো ভাস্বতীর পীনোন্নত স্তনদ্বয় ঘন শ্বাস-প্রশ্বাসে উঠছে নামছে।ভাস্বতী উত্তেজিত।
উত্তেজিত তো সে হবেই কোনো নারী যখন কোনো পুরুষকে হুকুম করে তখন সে একটা গভীর ঝুঁকি নেয়।হুকুম মানলে সেই পুরুষ তার অহংকারকে সন্তুষ্ট করে।আর যদি হুকুম অগ্রাহ্য করে,তবে আত্মসম্মানটুকু ধূলিসাৎ হয়ে যায়—তখন সে নারী থাকে না।একটা অসহায় প্রাণী,নিছক শারীরিক শক্তিতে দুর্বল।
লোকটি তার কথায় বাধ্য হয়েছে।এখন ভাস্বতীর করুণার ছিটেফোঁটা সে পেলেও পেতে পারে।
রঞ্জনের কিন্তু ব্যক্তিত্ব ক্ষুণ্ন হয়েছে।সে উদারতা দেখাবার একটুও সুযোগ পায়নি।
সে অপ্ৰসন্ন ভাবটা বজায় রেখে ভাস্বতীকে বলল তুমি পাশের ঘরে শুয়ে থাকলে পারতে।লোকটাকে একা একা পাঠানো ঠিক হল না।
ভাস্বতী অবহেলার সঙ্গে বলল ও নিশ্চই প্রতিদিন যায়।ওর অসুবিধা হবে না।
—-তা হোক আমাদের ওকে এত খাটানো উচিত নয়।
—-মানুষ মানুষের জন্য এরকম একটু করবেই।এতে নতুন কি?
—-আমার অনর্থক কারোর কাছে উপকার নিতে ভালো লাগে না।কারুর কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে থাকা ভালো লাগে না।
এই কথা বলে রঞ্জন অপ্রসন্নতা কাটিয়ে হাসলো।
তারপর বললো অবশ্য মেয়েদের কথা আলাদা।মেয়েরা এমনি এমনিই অনেক কিছু পেতে অভ্যস্ত।সেবার তরফদার ইউ.কে থেকে ফেরার পর তোমার জন্য পারফিউম আনলো।তুমি এমন ভাবে নিলে যেন সেটা তোমার প্রাপ্য ছিল।
—-আমি অনেকবার আপত্তি করেছিলাম।
—-সেটা এমন ভাবে বলেছিলে বোঝাই যাচ্ছিল তোমার নেবার ইচ্ছে ছিল।ওনার বোনের চেয়ে তোমাকে নিয়ে উনি বেশি আগ্রহী।
—-কিন্তু সত্যি সত্যিই আমি নিতে চাইনি।আমি কি নিয়ে কিছু ভুল করেছি বলো?
—রঞ্জন বুঝতে পারছিল ভাস্বতী রঞ্জনের এমন অকারণ রসিকতায় বিরক্ত।হেসে বলল না না,আমি এমনিই মজা করছিলাম।তরফদার আমার বন্ধু।বন্ধুপত্নীর জন্য উপহার দিতেই পারে।
তরফদারদের মত লোকেদের ভাস্বতীর ভালো লাগে না।রঞ্জনের অফিসের পার্টিতে ভাস্বতী বেশ কয়েকবার গেছে রঞ্জনের ইচ্ছায়।অবশ্য রঞ্জন জোরাজুরি করেনি।ভাস্বতীর ভালো লাগেনি রঞ্জনের কলিগদের,তাদের স্ত্রীদের।হয়তো এজন্য অনেকেই ভাবে ভাস্বতী একজন নাকউচু মহিলা।ভাস্বতীর মত বুদ্ধিমতী সুন্দরী নারীকে অহংকারী মানায়—যদিও সে অহংকারী নয়।
রঞ্জন বলল ভাতটা হয়ে গেছে বোধ হয়,নামিয়ে ফেলো।
ভাস্বতীর নিজের সংসার রাঁধুনি ও চাকরের হাতে।কদাচিৎ সে রান্না ঘরে ঢোকে।রান্নার পরীক্ষা নিয়ে সময় কাটাবার বদলে সে রবীন্দ্র সংগীতে মেডেল পায়, আবৃত্তিতেও সে ভালো।আগে ক্লাবে গিয়ে ব্যাটমিন্টনও খেলতো এখন আর হয়না।
তথাপি সে এখন ভাতটা নামিয়ে ফ্যান গেলে এলো।ডেকচি টা কয়েকবার নেড়ে সে ঢাকনাটা খুলে দেখলো ভাত ঝরঝরে হয়েছে।
রঞ্জন বলল লোকটা কতক্ষনে ফিরবে কে জানে?
স্টোভ নিভিয়ে দিয়ে ভাস্বতী উঠে দাঁড়িয়ে বলল লোকটা বোধ হয় পাগল–এই রকম জায়গায় কেউ একা একা থাকে।মনেতো হয় কিছু লেখাপড়া জানে।একটা কোথাও চাকরি পেতে পারতো না? তা না করে এই বিদঘুটে কাজ!
রঞ্জন উদারভাবে বলল আমার অফিসেই একটা চাকরি দেওয়া যায়।ওকে বলে দেখবো একবার।কথাটা বলেই রঞ্জন ভীষন তৃপ্তি পায়।বাধ্য হয়ে যার কাছে আশ্রয় নিয়েছে—যে এখন উপকারীর ভূমিকায়–তাকে অধঃস্তন কর্মচারী করে ফেলতে পারলে ভালো হয়।প্রতিনিয়ত প্রতিদানের কথাটা বোঝানো যায় অদৃশ্য ভাবে।
—-না তোমাকে বলতে হবে না।লোককে ডেকে ডেকে চাকরি দিতে হবে না।দেশে কি বেকারের অভাব পড়েছে?
ভাস্বতী মুখে একরকম কথা বললেও মনোভাব অন্যরকম।
আর যাইহোক এই লোকটিকে সে রঞ্জনের অফিসের কেরানি হিসেবে দেখতে চায় না।যদি কোনোদিন তা হয়,–লোকটিকে যদি সমতল ভূমিতে কেরানি হিসেবে দেখে তবে এই লোকটি যে একদিন পাহাড়ে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিল—তা দেখে ভাস্বতীর গা জ্বলে যাবে।জঙ্গলের স্বর্গ দুয়ারের অতন্দ্র প্রহরী জঙ্গলেই থাকুক রাজা হয়ে—বন্যরা বনে সুন্দর।
ভাস্বতী ভিজে পোশাকগুলো হাতে নিয়ে দেখলো।শুকোবার কোনো লক্ষণ নেই।কিন্তু ব্রেসিয়ার ছাড়া রীতিমত অস্বস্তি লাগছে তার।রাত্রে বিছানায় ছাড়া সবসময় ব্রেসিয়ার পরে থাকা তার দীর্ঘদিনের অভ্যেস।ব্রা এখনো ভিজে থাকলেও সে পরে ফেলার মনস্থ করে ফেলল।রঞ্জন মৃদু আপত্তি তুললেও সে কানে তোলে না।
রঞ্জনের দিকে পেছন ফিরে ভাস্বতী গেঞ্জিটা খুলল।তার ফর্সা পিঠ হ্যাজাকের আলোয় আলোকিত।কোথাও মালিন্য নেই,এইসব নারীর ঘাড়ে কখনো ময়লা জমে না।এইসব সৌন্দর্য্য প্রয়োজনের চেয়েও অতিরিক্ত মনে হয়-পাথরের মুর্তি হিসেবেই যেন বেশি মানায়।কেননা পাথরের মূর্তির নাম,শিল্প–তখন তা বহুজনের দৃষ্টিগ্রাহ্য।যতক্ষন তা রক্তমাংসের ততক্ষন তা সীমিত।এবং জ্যান্ত সৌন্দর্য্য যতই তীব্র হোক,একজনের অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতায় তা নষ্ট হয়ে যাবেই।যেমন রঞ্জন আপাতত এই অর্ধনগ্ন নারীমুর্তির দিকে তাকিয়ে নেই।এই সুন্দরী নারী তার কাছে পুরোনো-স্ত্রী।সে অন্যদিকে তাকিয়ে সিগারেট ধরিয়েছে ও একটু অন্যমনস্ক।
ভাস্বতীর মুখ সাপের দিকে,ফণা তুলে দুলছে বড় সাপটা।ওদের মাথা দোলানোই নাকি ওদের ভাষা।
—-হুকটা আটকে দাও তো।
রঞ্জন উঠে ভাস্বতীর ব্রেসিয়ারের হুকটা পেছন দিক দিয়ে আটকে দেবার সময় অভ্যেসবশত তার ঘাড়ে একটা চুমু খেল।তারপর কাঁধ ধরে তার নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল তুমি এভাবেই থাকবে নাকি?উপরে গেঞ্জিটা পরবে না?
—-পরতে হবে?
—-তোমাকে এখন মজার দেখাচ্ছে।কার মতন দেখাচ্ছে বলতো?
—-কার মতন?
—-এসমেরান্ডার মতন।
ভাস্বতী হাসলো কৌতুকে।তার সেই কোঁচকানো পাজামা আর কালো ব্রা পরা শরীরটা দোলালো একবার।অন্তর্বাসে ঢাকা ভারী স্তনদুটো দুলে উঠলো।নারীর শরীরে অতিরিক্ত মাংস কেবল বক্ষেই মানায়–ঠিক যতটা প্রয়োজন ভাস্বতীর বুকে আছে।মাথার ওপর হাত দুটো তুলে বলল নাচবো এসমেরান্ডার মতন?তাহলে তো একটা পোষা ছাগল দরকার।
—-ছাগলটা কল্পনা করে নাও।
ভাস্বতী দু পায়ে ছন্দ তুলে নাচলো।এখন আর কোনো দুশ্চিন্তা নেই।যেন ওরা পাঁচ-ছয় হাজার বছর পেরিয়ে পাহাড়ী জীবনে ফিরে এসেছে।যেন ওরা শরীরের আব্রু সম্পর্কে অসচেতন-মুক্ত গুহামানব।
কিন্ত মন আর সেরকম সরল হবে না।
ভাস্বতীর কথ্যক নাচ শেখা আছে।যেহেতু ঘরটায় জায়গা কম,একমাত্র দর্শক স্বামী,সামনে অন্ধকার,পেছনে সাপ তাই দু-একটি মাত্র নাচের বোল তুলে থেমে গেল।
এ অবস্থায় স্তুতি ছাড়া জীবনে কিছু থাকে না।রঞ্জন তাই খানিকটা ঠাট্টা আর খানিকটা সত্যি মিশিয়ে বলল, সতী তুমি চিরযৌবনা।তুমি সারাজীবন একইরকম থাকবে।
ভাস্বতীর মুখ খানা করুন হয়ে গেল।অযাচিত মৃদু হাসি হাসলো। বলল আমি কিন্তু এখনই ৩২।একদৃষ্টে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকলো।
রঞ্জন বলল ধ্যাৎ, ৩২ আবার বয়স নাকি?তোমাকে এখনো একই দেখায়–বিয়ের আগের মতো।যেন তোমার বিয়েই হয়নি।
—-কি হবে?
—-তার মানে?
—-ভাস্বতী বুকের উপর আড়াআড়ি ভাবে হাত দুটি রেখে কাতর ভাবে বলল আমি সন্তান চাই।তাকে আমার বুকের ওপর চেপে ধরবো।ভীষণ ইচ্ছে করে।
—-সতী আমারতো কোনো দোষ নেই।
—-তবে কি আমার দোষ?
—-সে কথা বলছি না।
—-তাহলে কেন? কেন?
—-সতী তুমি আবার এই নিয়ে মন খারাপ করছো।কথা ছিল আমরা এই নিয়ে কখনো মন খারাপ করবো না।
—-আমি যখন খুব ছোট্ট মেয়ে তখন থেকেই আমি ভাবতাম একদিন আমার একটি ছেলে হবে–আমি তাকে ভীষন,ভীষণ আদর করবো।সে খুব দুষ্টু হবে।আমাকেও জ্বালাতন করবে।
—-আজ হঠাৎ এসব কথা ভেবে মন খারাপ করছো কেন?
ভাস্বতী হাত দুটো নামিয়ে আনলো নীচে।রিক্তার মতন বলল মন খারাপ করিনি।তুমি রাগ করো না।
—-তোমাকে তো কতবার বলেছি অনাথ আশ্রম থেকে একটা বাচ্চা এনে মানুষ করতে।বিদেশেতো এরকম হরদম হয়।আজকাল এদেশেও এরকম হচ্ছে।
—-না থাক, আর বলবো না।
রঞ্জন ভাস্বতীর সিংহিনীর মত কোমরটা জড়িয়ে ধরে বলল পৃথিবীতে উত্তরাধিকার রেখে যাবার মত আগ্রহ আমার তেমন নেই।একি!তোমার শরীরটা কাঁপছে কেন?
—-কই? না তো।
—-চলো ও ঘরে গিয়ে একটু বসি।
ক্যাম্প খাটে পা ঝুলিয়ে বসা খুব মুশকিল।পশ্চাৎদেশ নিম্নাভিমুখী হয়ে যায়।সেই অবস্থাতেই বসে।ওদের কৌতুকবোধ খানিকটা ফিরে এসেছে।
ভাস্বতী বলল এখন কিন্তু জায়গাটা বেশ ভালো লাগছে।ওই লোকটার যদি কোনো আপত্তি না থাকে তাহলে আমরা দু-তিনদিন তো থেকে গেলেও পারি?
—-রঞ্জন বলে যদি আবার বৃষ্টি নামে তবে আমাদের বাধ্য হয়েই থেকে যেতে হবে।
তারপর মনে পড়া গলায় রঞ্জন বলল ভাগ্যিস গাড়িটা আনিনি।না হলে গাড়ীটা নদীর ওপারে পড়ে থাকতো।
ভাস্বতী বলল এরপরে আমরা ওই লেকটা দেখতে যাবো।যেখানে খুব পাখি আসে।
—-রাজা বাবুকেও আমরা ইনভাইট করতে পারি।যদি তিনি রাজি হন।
ভাস্বতী একটু চিন্তা করে বলল না,ওকে আর বলতে হবে না।সেখানে শুধু আমরা দুজনে মিলে বেড়াবো।এই পাহাড়টাতেও যদি শুধু আমরা দুজনে থাকতাম,তাহলে আরো ভালো হত।
একসঙ্গে রাত্রি বাসের পর নারী পুরুষ আর নিরালা খোঁজে না।তবু যেন মনে হয় এখনো কোনো ফাঁকা জায়গায় একটা আলাদা রহস্য আছে।
রঞ্জন বলল লোকটা একলা গেল টর্চও সঙ্গে নিয়ে গেল না।বেশি বেশি বীরত্ব দেখাতে চায়।
ভাস্বতী খুক খুক করে হেসে বলল যখন ভাতটা চড়ালো তখনও জল নেই মনে পড়লো না।তখনও একটু আলো ছিল।
রঞ্জন বলল যাইহোক লোকটা খারাপ নয়,মনে হচ্ছে।অমন দীর্ঘ তামাটে চেহারার লোককে দস্যু বলে ভেবে বসেছিলাম।আমরা না জেনে শুনে চলে এসেছিলাম,বদমাশ লোকেরও পাল্লায় পড়তে পারতাম।
তখন নদীতে স্রোতের মধ্যে বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিলাম।ও সাহায্য না করলে বেশ মুশকিল হত।
একটু থেমে রঞ্জন বলল আমি কি তোমাকে ওর কাছে রেখে জল আনতে গিয়ে ভুল করছিলাম?
ভাস্বতী রঞ্জনের গলা দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে উঁহু।রঞ্জন ভাস্বতীর ঘাড়ের কাছে চুমু খেয়ে লালচে করে দেয়।
ভাস্বতী রঞ্জনের বুকে নিজের বুক জোরালো ভাবে চেপে ধরে।
এর মধ্যে কোনো বাসনার তীব্রতা নেই।পরক্ষনেই ওরা পরস্পরকে ছেড়ে অন্যকাজে ব্যাপৃত হয়।রঞ্জন সিগারেট ধরায়, ভাস্বতী কালো ব্যাগ থেকে চিরুনি বার করে ভিজে চুল আঁচড়াতে আরম্ভ করে।
ভাস্বতী ভাবে লোকটি অন্ধকারে তার কোমরে হাত দিয়েছিল,একথা কি রঞ্জনকে জানানো দরকার? স্বামী-স্ত্রী শুদ্ধতার জন্য পরস্পরের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ।যা পরে প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে তা গোপন করবার কথা নয়।কিন্তু এই ঘটনাটা বলে কি কোনো লাভ আছে?তাতে শুধু শুধু রঞ্জনের মন বিষিয়ে যাবে—এ রাত্রে তো তারা অন্য কোথাও চলে যেতে পারবে না।বলার দরকার নেই।লোকটি দুর্বৃত্ত নয়,লোভী।
কিন্তু ভাস্বতী তার স্বামীকে কিছু জানাচ্ছে না—এতে যদি লোকটা প্রশ্রয় পেয়ে যায়।যদি সে পাগল হয়ে ওঠে?পুরুষদের এরকম পাগল হতে ভাস্বতী কলেজ জীবনে অনেক দেখেছে।ভাস্বতীর একটু মন খারাপ হয়ে ওঠে।এই রোমাঞ্চকর রাত্রি,এই স্তব্ধতা এর মধ্যেও কি তাকে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে? ভাস্বতীর কাছে নিয়ম নীতি তুচ্ছ।কিন্তু সে রঞ্জনের মনে কোনো আঘাত দিতে চায় না।
লোকটির রূপ,মন ও ইচ্ছায় একটা বন্যতা আছে–এই জঙ্গলের মতন।ভাস্বতীর হয়তো লোকটিকে রঞ্জনের অফিসের বিরক্তিকর কলিগের মত লাগেনি।আর পাঁচটা সৌখিন পুরুষদের মতও নয়।এরকম পুরুষ ভাস্বতীর কাছে একটু আলাদা জায়গা করে নেবে-এ কথা ভাস্বতী বোঝে।হাজার হাজার বছর আগে আদিম জঙ্গলে কোনো মানুষের দেখা পেলে হয়তো সে এরকম গুহামানবের সাক্ষাৎ পেত।
সভ্য মানুষেরা এরকম হয় কখনো কোনো কিছু পছন্দ হলেও তা আপন করে নেয় না,তার সাথে তার পৃথকীকরণ করতে পারে নিজেকে।ভাস্বতী কলকাতার নগর জীবনের সভ্য কিন্তু লোকটি?বন্যরা যে লোভী–কেড়ে নিতে চায়।
ভাস্বতী সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে বসে থাকা রঞ্জনের দিকে তাকালো।
রঞ্জন ভাস্বতীকে দেখে একটু উষ্ণতা অনুভব করলো।ভাস্বতীর পাজামার দড়ি একটু তলপেটের নীচের দিকে নেমে গেছে।মেদহীন কোমল পেটে ছোট্ট নাভি।কোমরের খাঁজ যেন মাখনের ওপর ছুরি বসিয়ে তৈরী করা।কালো ব্রেসিয়ারের মধ্যে গিরি চূড়ার মত দুই স্তন।কণ্ঠার হাড় সামান্য জেগে আছে,গলায় একটা সরু সোনার হার চিকচিক করছে,কানেও দুটো ছোট দুল।একটা হাত উচু করে চুলের গোছা ধরে থাকা,অন্য হাতে চিরুনি।শুধু তার চোখের দৃষ্টিই অন্যমনস্ক।ভাস্বতীর শরীরের ফর্সা অনাবৃত অংশে চামড়ার মসৃণতাই বেশি আকর্ষণ করে।
রঞ্জন দুহাত বাড়িয়ে বলল এসো আর একবার কাছে এসো।
এমন সময় বাইরে একটা শব্দ হল।তেমন চমকায়নি ওরা,কেননা লোকটির তখন আসবার কথা।
অথচ শব্দটা ঠিক মানুষের পায়ে চলার মত নয়।
রঞ্জন ভাস্বতীকে বলল গায়ে কিছু একটা জড়িয়ে নাও।তারপর সে সাবধানে দরজার কাছে দাঁড়ালো।রঞ্জন সাহসী,লাইসেন্স পিস্তল আছে তার।সহজে বিচলিত হয় না সে।
টর্চের আলো ফেলে দেখলো আর কেউ নয়– দীর্ঘকায় লোকটিকে দেখে চিনতে ভুল হল না।কিন্তু তার হাঁটার ভঙ্গিটা অন্যরকম।জলের বালতিটা দুহাতে ধরা,মাথাটা সামান্য ঝুঁকে পড়েছে সামনের দিকে।পা ঘষটে ঘষটে হাঁটছে।দুই হাতে ভারী জিনিস নিয়ে চড়াই উৎরাই পাহাড়ে ওঠা যথেষ্ট কষ্টকর।এমন মজবুত বাঁধনের লোকের পক্ষেই সম্ভব।তবু সে ঝুঁকে হাঁটছে,কারন তার পায়ে রক্ত।
রঞ্জন দৌড়ে গেল লোকটির কাছে,সাহায্য করতে।জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে?
লোকটির থুতনির কাছে অনেকটা কাটা।সেখান থেকেই রক্ত ঝরছে।গায়ে এবং প্যান্টে লেগে রয়েছে।
বালতি নামিয়ে রেখে সে বলল কিছু না,পড়ে গিয়েছিলাম।বৃষ্টির জন্য পাথর খুব পিচ্ছিল হয়ে গেছিল।
—-আপনাকে বললাম,আমি যাই।
—-আপনি গেলে আরো মুশকিলে পড়তেন।রাত্তিরে পাহাড়ী রাস্তায় হাঁটা ডেঞ্জারাস।আমার অভ্যেস আছে।ফেরবার সময় একটা শর্টকার্ট রাস্তা নিয়ে ফেলেছিলাম।সেই সময় হঠাৎ পড়ে গিয়েছিলাম।এরকম ভাবে আগে কখনো পিছলে পড়িনি।জলটা পড়ে গেছিল সব।তখন আবার যেতে হল।
—-দুবার গিয়েছিলেন?
—-উপায় কি?
—-আপনি টর্চটা পর্যন্ত নিয়ে গেলেন না।আচ্ছা লোক তো!
লোকটি এবার গভীর ভাবে ভাস্বতীর দিকে তাকালো।বলল ওর জন্য উনিই দায়ী।উনি যেরকম ভাবে আমাকে হুকুম করলেন আমি আর ভাবার সময় পেলাম না।
ভাস্বতী দেখল লোকটা তখন ওরকম দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।পাথরে খোদাই করা মুখে রক্ত লেগে আছে।শক্ত বাঁধনের লোকের চোখে মুখে কোনো যন্ত্রণার ছাপ নেই।
লোকটি এবার কথাটাকে মোলায়েম করবার জন্য হাসলো।
রঞ্জন তাকালো ভাস্বতীর দিকে।
ভাস্বতী এবার একটুও লজ্জা না পেয়ে ধমকের সুরে বলল পাহাড়ী রাস্তায় কোথায় অসুবিধে সুবিধে সেটা আপনি বুঝবেন।সে কি আপনাকে আমি বলে দেব।নিন রক্ত ধুয়ে নিন।
—-বেশি জল খরচ করা যাবে না।
—-তুলো টুলো কিছু আছে?
লোকটি কাঠের বাক্স থেকে তুলো,স্টিকিং প্লাস্টার বার করলো।
রঞ্জন বলল একটু গরম জলে ধুয়ে নিলে হত না?
—-দরকার নেই।ব্র্যান্ডি আছে লাগিয়ে নিলে হবে।
একটা পাথরের কণা নিশ্চই ঢুকে গেছিল থুতনিতে–গর্ত হয়ে গেছে।যন্ত্রনা হবার কথা,লোকটির কোনো বিকার নেই।
ভাস্বতী বলল আর কোথায় লেগেছে।
—-হাঁটুতে লেগেছে।এমন কিছু নয়।খানিকটা গড়িয়ে পড়েছিলাম তো—
ভাস্বতী ক্ষতস্থানটা ভালো করে পরিষ্কার করে তুলো চেপে ধরলো,যাতে রক্ত বন্ধ হয়।
প্রসেনজিৎ থুতনি উচু করে দাঁড়িয়ে।
একজন আহত পুরুষের কাছাকাছি কোন নারী থাকলে সেই পরিচর্যা করবে-এই তো জগৎ সংসারের নিয়ম।এছাড়া নারীকে মানায় না।রঞ্জন একপাশে দাঁড়িয়ে দেখছে,ভাস্বতী মন ও হাতের সেবায় রত।এই অবস্থাতেও আলতো ভাবে ভাস্বতীর পিঠের ওপর একটা হাত এসে পড়ে।ভাস্বতী কি করবে লোকটিকে ধাক্কা দেবে?তার স্বামী এতো কাছে দাঁড়ানো, তবু লোকটির দুঃসাহস!সে কি রঞ্জনকে এখন বলবে এই স্পর্ধিত পুরুষকে শাস্তি দাও?
তারপর যদি রঞ্জন ও লোকটির মধ্যে মারামারি শুরু হয়,তখন কি মনে হবে না এক খন্ড মাংসের জন্য দুটি কুকুরের ঝগড়া?সে কি শুধু একখন্ড মাংস?
ভাস্বতী গোপনে চোখ গরম করে লোকটির দিকে তাকায়।
তবু লোকটি হাত সরিয়ে নেয় না।তার ঠোঁটে সুক্ষ,অতি সুক্ষ একটা হাসির আভাস।
ভাস্বতীর হাতের স্পর্শ পাবার জন্যই কি লোকটি থুতনি কেটে এসেছে?কেবল তার হাতের স্পর্শ প্রাপ্তির জন্যই পুরুষ যন্ত্রনা সইতে পারে? এই হাসি কি লোকটির সফলতার হাসি?
ভাস্বতী তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলতে চাইছিল।তুলো গুঁজে তুলে নিতে গেলে ক্ষতস্থানে একটু ধাক্কা লেগে যায়।লোকটি শব্দ করে ওঠে আঃ!
ভাস্বতী কোমল হাতের যত্নে আর একটু সাবধান হয়।
স্টিকিং প্লাস্টার লাগানোর পর ভাস্বতী দেখে হাতে রক্ত লেগেছে।জল খরচের কথা মনে না রেখে ভালো করে হাত ধোয় সে।
খাঁচার বড় সাপটা ফোঁস ফোঁস করে উঠতেই লোকটি চেঁচিয়ে উঠলো চোপ! বড্ড জ্বালাচ্ছিস! এবার দেবো এক ঘা!
রঞ্জন বলল ওরা কি খায়?বোধ হয় ক্ষিদে পেয়েছে?
—-সাপের ব্যাবসায় এই একটা সুবিধে–ওরা অনেকদিন না খেয়ে থাকতে পারে?আমার কিন্তু ক্ষিদে পেয়েছে?আপনার পায়নি?
রঞ্জন বলল একা একা থাকেন এরকম চোট পেলে কি হবে?
—-চোট? নির্লিপ্ত হাসিতে লোকটি পরক্ষনেই বলে উঠলো আমার একটি পুরোনো জিপ আছে।অবশ্য সেটি আমার নয়।ফরেস্টের পরিত্যাক্ত গাড়ি–আমি ওটা সারিয়ে প্রয়োজনে চালাই।অসুবিধে হলে পাঁচ-ছয় মাইল দূরেই আদিবাসী গাঁয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র।
—-জিপ? কোথায়?
—-আগের রেঞ্জার অফিসার আমার বন্ধু।বন্ধু বলতে রাম তার প্রিয় পানীয়।এ অঞ্চলে কালেভদ্রে আসতেন।তাঁর রিটায়ার্ড হবার আগে আমাকে পুরোনো জিপটা দেন।
আপনারা বোধ হয় দেখেননি ওটা নদীর ওপারে আছে।
-নদীর ওপারে?কেউ তো পার্টস চুরি করে–
—-পার্টস চুরি হতে পারে কিন্তু বেচবে কোথায়? জঙ্গলের মানুষ সহজ সরল হয়।ওরা হাড়িয়া খবর জন্য প্রচুর পরিশ্রম করতে পারে তবু চুরি করবে না।
দুটি চিনে মাটির প্লেট আর গেলাস।আর কোনো পাত্র নেই।
তিনজন একসঙ্গে খেতে বসবে কি করে?
ভাস্বতী আধুনিক সমাজের অন্তর্গত হলেও সে বাঙালি নারী।সে বলল আপনাদের দুজনকে আগে দিই,তারপর আমি খেয়ে নেব।
লোকটি কথাটা উড়িয়ে দিল।না তা কি করে হয়? আপনারা বসুন আমি পরিবেশন করছি।
রঞ্জনের ভাস্বতীর প্রস্তাবটাই ঠিক মনে হল।সে বলল ঠিক আছে ওই দিক না।চলুন আমরা বসি।
—-দেখুন আমি পাহাড়ী মানুষ।অতিথি সৎকারটুকু করতে পারবো না?
রঞ্জন শুকনো ভাবে হেসে বলল অতিথি?আমরা তো জোর করে আপনার কাছে–আর কোনো উপায় ছিল না।
দুটি চটের থলি বিছানো আসনে ভাস্বতী আর রঞ্জনকে বসতে হল।
—-আরে না না আপনি বসুন।
এক কাজ করি আপনারা প্লেটে খান।আমি বরং ডেকচিতে খেয়ে নিই।
—-ভাস্বতী বলল আমি বরং ডেকচিতে খেয়ে নিচ্ছি।
—-কালকেও যদি থেকে যেতে হয়–কালকে আপনি ডেকচি—
রঞ্জন চমকে উঠে বলল কালকেও থাকতে হবে নাকি?
লোকটি মৃদু হেসে বলল এরমধ্যেই বিরক্ত হয়ে উঠছেন? নদীর জল কমা না কমা তো আমার হাতে নেই।যাই হোক কাল যদি যেতেই হয় আমি ব্যাবস্থা করে দেব।সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লে নদী পেরিয়ে পাঁচ ছয় মাইল দূরে গ্রামটা।সেখানে একটু বিশ্রাম নিয়ে আড়াই মাইল দূরে পাকা রাস্তা, বাস পেয়ে যাবেন।
রঞ্জন ফেরা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়ে বলল দেখা যাক।যদি ভালো লাগে কালকেও থেকে যেতে পারি।
আপনার এই অরণ্য জীবন আর পাহাড় কিন্তু চমৎকার লাগছে।
রঞ্জন থেমে আবার বলল শহরের জীবন আমাদেরও একঘেয়ে লাগে।মাঝে মাঝে যদি এরকম জায়গায় এসে থাকা যায়।বিদেশের ছেলে মেয়েরা তো প্রায়ই যায়–একটা তাঁবু সামান্য নিয়ে আর কিছু জিনিস পত্র।–কিন্তু এই পাহাড়টাতে যে সাপ আছেন বলছেন–
—-আর বেশি নেই।আমি প্রায় ধরে ফেলেছি।আর পাহাড়, জঙ্গলে সাপতো থাকবেই–
ভাস্বতী হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো আপনার বাড়ীতে কে কে আছেন?
লোকটি না শোনার ভান করে মাথা নিচু করে খেতে থাকলো।লম্বা চওড়া কাঁধ- স্যান্ডোর ফাঁক দিয়ে হাতের স্ফীত পেশী দেখা দিচ্ছে।যেন মনে হচ্ছে লোকটা নিজেকে কঠোর করে রেখেছে।
ভাস্বতী উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে রয়েছে।জিম করা পর্দার নায়কদের মত নয়–শরীরের বাঁধন যেন তার খানিকটা জন্মগত খানিকটা পাহাড়ে ওঠা নামার ফসল।এরকম পুরুষের গায়ের রং তামাটেই মানায়।
লোকটি বোধ হয় বুঝতে পারলো ভাস্বতী এখনো অপেক্ষা করছে তার উত্তরের জন্য।
—-এখন আর কেউ নেই।বাবা ছিলেন মারা গেছেন।
—-মা?
—-এক বছর বয়সে মারা গেছেন।
—-এরকম আর কতদিন থাকবেন?
—-কোনো পরিকল্পনা নেই–যতদিন চলে—
ভাস্বতী লোকটির চোখ খোঁজার চেষ্টা করে।
মাত্র একবছরে মা হারানোর কথা এত নিষ্প্রাণ গলায় বলে কি করে?মাতৃস্নেহে বঞ্চিত পুরুষরাই কি এরকম নির্জন পাহাড়ে সাপ ধরার কাজে নিযুক্ত থাকতে পারে।
রঞ্জন তাকিয়ে বলল ওটা কি সতী!
একটা পাহাড়ী ব্যাঙ।মেটে রঙের তেলতেলে।
লোকটা বলল এবার মজা দেখুন–খাঁচায় সাপ আছে জেনেও ব্যাঙটি সেদিকে যাবে।
ব্যাঙটা সত্যি সত্যিই খাঁচার দিকে লাফিয়ে গেল।অমনি বড় সাপটা ফণা উঁচিয়ে ফোঁস করে উঠলো।
ব্যাঙটা লাফিয়ে উঠলো।লোকটা একটা লাঠি দিয়ে ব্যাঙটা খাঁচায় ছুড়ে দিল।সাপটা ধরতে পারলো না,কিন্তু ছোঁবল দিল।ব্যাঙটা উল্টে উৎপটাং হয়ে পড়লো।লোকটি হেসে উঠলো।লাঠি দিয়ে আবার ছুঁড়ে দিতে যেতেই ভাস্বতী বলল করছেন কি?
—-লোকটি শুনলো না।খাঁচার মধ্যে ব্যাঙটিকে চেপে ধরতে যায়।
ভাস্বতী লোকটির হাত চেপে কাঠিটা সরিয়ে দিয়ে বলল কি হচ্ছে কি? ছেড়ে দিন?আপনার কি একটু ইয়ে নেই?
সামান্য একটু অবসর পেয়েই ব্যাঙটি লাফাতে শুরু করলো।লোকটি পা দিয়ে সেটাকে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে বলল যাঃ!
ভাস্বতীর দিকে তাকিয়ে বলল আপনি বেচারা সাপটাকে খেতে দিলেন না।এমন বিচলিত হচ্ছিলেন কেন?এটাই জীবজগতের নিয়ম!
—-তবু চোখের সামনে দেখতে ভালো লাগে না।
—-আপনারা শহরে থাকেন।আপনাদের এসব চোখে পড়ে না।ঘন জঙ্গলে এসব অহরহ হচ্ছে।
সুন্দর পাখিটাকে কে গাছ থেকে পেড়ে খাচ্ছে সাপ। আমি অপেক্ষা করলাম।সাপটা তক্ষুনি ধরলাম না।
—-আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন?
—-হ্যাঁ, এটাইতো নিয়ম।এরপর তো সাপটা কবে খেতে পাবে ঠিক নেই।শুনতে আপনার খারাপ লাগছে?
—-হ্যাঁ।
—-এসব তো আপনাদের শহরেও হয়।কিন্তু একটু আব্রু থাকে।সেখানেও তো একদল মানুষকে তিলতিল করে মেরে একদল মানুষ উপভোগ করে–তাই না? বিশেষত সর্বত্র সাপ আর ব্যাঙ এর ব্যাপারটা চলছে,, কিন্তু সেটা সহজে বুঝতে দেওয়া হয় না; বিশেষত মেয়েদের–
রঞ্জন বলল ঠিকই বলেছেন এরকম চলে আসছে।
খাওয়ার শেষে বলা স্বত্বেও লোকটি প্লেট গুলো ধুতে বাইরে চলে গেল।
রঞ্জন বলল আমরা এখানে পেট পুরে খেলাম।ওই সাপগুলো অনাহারে থাকলো।
ভাস্বতী বলল আমার এখানে আর একটুও থাকতে ইচ্ছে করছে না।
—-কেন?
—-আমার এক্ষুনি এখন থেকে চলে যেতে ইচ্ছা করছে।
—-একটা ব্যাঙ দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল?
—-চুপ করো তো একটু !
—-তুমি যে বলেছিলে এরকম একটা জঙ্গলে বাড়ী বানিয়ে থাকবে?
—-উনি বোধ হয় ভেবেছিলেন সব বনই তপোবনের মত শান্ত স্নিগ্ধ জায়গা।কিছুক্ষনের জন্য এলে তাই মনে হতে পারে—কিন্তু জঙ্গল মানেই হিংসার রাজত্ব।দেখলেন না একটা সামান্য নদী পর্যন্ত কতটা বিপজ্জনক হতে পারে!
সে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে গেল।অন্ধকারের মধ্যে এগিয়ে গেল বেশ খানিকটা।
রঞ্জন বলল এক্ষুণি কি শুয়ে পড়া হবে?
—-কি করবেন? চাইলে একটু ঘুরে আসতে পারেন।তবে না যাওয়াই ভালো।বৃষ্টিতে পথ পিচ্ছিল হয়ে আছে।আবার পড়ে গিয়ে হাত পা ভাঙতে পারে।
—-আপনি অন্যদিন এই সময় কি করেন?
—-কি করি? খাওয়া-দাওয়ার পর ঘুম।আলো থাকলে জঙ্গলের হিংস্রতাকে পর্যবেক্ষণ করি।কখনো চাঁদের আলোয় জঙ্গল দেখেছেন?
—-কিন্ত এখানে তো তেমন হিংস্র প্রাণী নেই।
—-নেই।তবে এই পাহাড়ের পিছনে একটা লাগোয়া পাহাড় আছে সেখানে কয়েকটা মহুয়া গাছ আছে,ভাল্লুকের এক আধবার যাতায়ত দেখেছি।
—-ভাল্লুক! তবে তারা তো এ পাহাড়েও আসতে পারে?
—-আসতে পারে।তবে কখনো এ পাহাড়ে আসতে দেখিনি।
ভাস্বতী বলল আপনি তো গান জানেন?
—-আমি?
—- হ্যাঁ ওই যে ‘যেদিন সুনীল জলধি হইতে…’
—হা হা।সে গান এই বোবা পাহাড় আর গাছপালা সহ্য করতে পারে কোনো সভ্য মানুষের কানে সহ্য হবে না।আপনি জানেন না?
ভাস্বতী রঞ্জনের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল—ইনি জানেন।
ভাস্বতী নিজে রবীন্দ্রসংগীতে পারদর্শী।কিন্তু রঞ্জনেরও গানের গলা খারাপ নয়।
রাত বাড়তে থাকে।লোকটি বলে এবার শোবার ব্যাবস্থা করা যাক।
দুটিমাত্র খাট—কিন্তু ফোল্ডিং খাট এমনই ছোট আর গড়ানে ধরনের হয় তাতে দুজনের শোয়া সম্ভব নয়।
রঞ্জন তবু সেই প্রস্তাব করলো এক খাটে আমরা দুজনে শুই অন্য খাটটা আপনি নিন।
লোকটি বলল একটি খাটে দুজন? এই একটি খাটে দুটো বাচ্চাও ঘুমাতে পারবে না।
—-সে আমরা ঠিক চালিয়ে নেব।
—-অবাস্তব কথা বলে লাভ নেই।তার চেয়ে না শোওয়া ভালো।আপনারা বরং একটি খাট নিন আমি রান্নার জায়গাটায় জায়গা করে শুয়ে যাবো।
রঞ্জনের উন্নত হৃদয় এই স্বার্থপর ব্যাবস্থায় কিছুতেই সম্মত হতে পারে না।
রঞ্জন বলে তারচেয়ে বরং এক কাজ করি আমরা তিনজনেই নিচে বিছানা করে শুতে পারি।
রঞ্জনের কথায় একটা আতিশয্যের সুর আছে।ভাস্বতী তাকালো রঞ্জনের দিকে।ওরকম ভাবে শুতে ভাস্বতীর আপত্তি নেই।সামাজিক রীতি সে গ্রাহ্য করে না।কিন্তু লোকটির হাত? ওই দুরন্ত হাতকে কে রুখবে?
রঞ্জনকে দুঃখ দেওয়া হবে তাতে।

Leave a Reply