তারপর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় দুজনের।পরস্পরের দিকে উজ্জ্বল দৃষ্টিতে তাকায় দুজনে।অঝোর বৃষ্টির ধারা ওদের দু’জনের মাথা গড়িয়ে পড়ছে।কড়কড় শব্দে হঠাৎ প্রচন্ড বজ্রপাত হয়।
রঞ্জন বলল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বোধ হয় ঠিক নয়।দাম্পত্যের রোমান্সে এই বজ্রপাত যেন হিংস্রতার ছাপ রাখে–তৃতীয় অনাকাঙ্খিত ব্যক্তির মত।
রঞ্জন এদিক ওদিক তাকাতে থাকলো।গাছের তলা ছেড়ে বা কোথায়ই যাবে!
গাছগুলো থেকে ঝরে পড়ছিল প্রচুর শুকনো পাতা।কোথাও গাছের ডাল মড়মড় করে ভেঙে পড়ার শব্দ হচ্ছে।যে কোনো গাছ ভেঙে পড়বার সম্ভাবনা আছে কিংবা বজ্রপাত।
রঞ্জন ভাস্বতীর হাতটা ধরে বলল চলো,এখানে আর দাঁড়ানো যাবে না।
ছুটে গিয়ে দাঁড়ালো বড় একটা পাথরের কাছে।এখানে বেশি ভিজতে হবে কিন্তু গাছ ভেঙে পড়বার ভয় থাকবে না।
বৃষ্টি একটুও কমেনি।বরং বেড়েই চলেছে।
ভাস্বতী ক্ষুণ্ন গলায় বলল আমরা যাতে পাহাড়টায় না উঠতে পারি তার জন্য একটার পর একটা বাধা আসছে।লোকেরা এইজন্যই আমাদের এখানে আসতে বারণ করেছিল।
রঞ্জন ভাস্বতীর গালে টোকা মারলো।এসব কি বলছো কি?
—-যাইহোক না কেন আমরা ওই পাহাড়ে উঠবোই।
রঞ্জন বলল নিশ্চই উঠবো।তবে আজ বোধ হয় ফিরে যেতে হবে।সাড়ে চারটে বেজে গেল।আর বেশি দেরি করলে ফেরার উপায় থাকবে না।কাল আবার না হয় আসা যাবে।
ভাস্বতী তীক্ষ্ণ ভাবে জিজ্ঞেস করলো কাল ঠিক আসবে?
—-কেন আসবো না।এবার রেনকোট আনা হয়নি।এই যা মুশকিল।
একটা রোমান্টিক অভিলাষ ছিল।এই ঝড় বৃষ্টি কাদায় তা পুরোপুরি উবে গেছে।তবে কাল আবার ফিরে আসতে হবে।একবার যখন সে এই পাহাড়ের চূড়ায় উঠবে ঠিক করেছে,সে উঠবেই।দরকার হলে বারবার ফিরে আসবে।
বৃষ্টি থামবার কোনো লক্ষণ নেই।ব্যাঙের সম্মিলিত ডাক শুরু হয়েছে।
রঞ্জন তক্ষুনি ফেরার পথ ধরতে চায়।এই বৃষ্টিতে পাথরগুলো অত্যন্ত পিচ্ছিল।সেগুলিকে ভয়ঙ্কর বলা যেতে পারে।তবু সে ভাস্বতীর হাত ধরে বলল সাবধানে নামতে পারবে?
—-সে ম্লান গলায় বলল পারবো, ফিরে চলো।
কয়েক পা এগিয়েই রঞ্জন বুঝতে পারলো এটা হঠকারিতা।এরকম প্রকৃতির ভয়ঙ্কর রূপের সাথে প্রতিযোগীতা করার কোন মানে হয় না।
এত ঝড়বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ী ঢালু রাস্তায় কেউ পথ হাঁটে না।স্থানীয় আদিবাসীরা তো বৃষ্টিতে বনাঞ্চলে পা’ই বাড়ায় না।
হঠাৎই রঞ্জনের মনে হল পাশে একটা সরু জিনিস নড়াচড়া করছে।কেঁচো হতে পারে।কিংবা জোঁকও হতে পারে।রঞ্জন বুঝতে পারে বৃষ্টির সময় অরণ্যের এই সব প্রাণী দেখা মেলা নিশ্চিত।তারওপরে গোখরোর উপদ্রব পাহাড়ে বেশিই।
রঞ্জনের জুতোর মধ্যে ভিজে মোজা পরে হাঁটতে অস্বস্তি হচ্ছিল।জুতোখুলে মোজা খুলে নিল সে।ভাস্বতী নীচের দিকে শাড়ি,সায়া খানিকটা চিপড়ে নিল।ওরা এত ভিজেছে গা,মাথা মোছার কোনো মানে হয় না।
বৃষ্টিতে অরণ্য আরো বেশি নিঃঝুম হয়ে পড়েছে।ফেরার জন্য ওরা তৈরী হয়েছে এমন সময় সোনা গেল মনুষ্যকন্ঠ।একটা গানের মত আওয়াজ কথা শোনা যায় না,শুধু সুর—কণ্ঠস্বর খুব সুরেলা নয়—বেসুরোরা যেভাবে গান গায়,সেরকমই।
ওরা দু’জনে চোখ চাওয়াচাওয়ি করলো।কিন্তু কোনো কথা বলল না।
সুরটা শোনা যাচ্ছে।ক্রমশ পাহাড় থেকে এগিয়ে আসছে।জঙ্গল ভেদ করে।
একটু বাদেই পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো একটা মনুষ্য মুর্তি।
ক্রমাগত বৃষ্টির মধ্য দিয়ে এগিয়ে আসছে বিরাট লম্বা চওড়া লোকটা।
লোকটার পরনে হাঁটুর নীচ অবধি ধুসর কালচে রেইনকোট।মাথায় টুপি কপাল পর্যন্ত ঢাকা,পায়ে ভারী গামবুট।তার হাতে একটা লম্বা লোহার জিনিস,দেখলে মনে হয় একটা খুব বড় সাইজের চিমটে,সেটা দিয়ে সে ঝোপঝাড়ে আঘাত করতে করতে আসছে।আর আপনমনে গান গাইছে।কথা না বোঝা গেলেও গানের সুরটা চিনতে পারলো ভাস্বতী।এই পরিবেশে এরকম গান শোনা যায়!—‘যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিল ভারতবর্ষ/সেদিন বিশ্বে সে কি কলরব,সেকি হর্ষ,সে কি মা ভক্তি…’
লোকটি প্রথমে দেখতে পায়নি ওদের।তারপর চোখ তুলে তাকালো।এগিয়ে আসলো ওদের দিকে।আপাদমস্তক ভালো করে দেখলো গম্ভীর ভাবে।ভাস্বতীর দিকেই তার বেশিক্ষণ দৃষ্টি,বলাই বাহুল্য।
লোকটির এমন ভাব,যেন সে অরণ্যের অধিপতি।যেন তার এলাকায় আগুন্তুক এসেছে।গম্ভীর ভাবে খুঁটিয়ে দেখছে সে।
গম্ভীর ভাবে বলল বাঙালি?
রঞ্জন বলল হ্যাঁ
—-বৃষ্টিতে আটকে পড়েছেন?
—-হ্যাঁ
—-ফিরে যাবেন?
—-তাই ভাবছি।
কথা বলার সময় লোকটি মাটিতে লোহার চিমটেটা ঠুকছিল।শব্দ হচ্ছিল কর্কশ ভাবে ঠন ঠন ঠন।
রঞ্জনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল বছরের এই সময়টা খুবই খারাপ।
ভাস্বতীর দিকে তাকিয়ে বলল আপনি নিশ্চই উপরের মন্দিরটায় যেতে চাইছিলেন?
ভাস্বতীর বদলে রঞ্জনই উত্তর দিল সেরকমই ইচ্ছে ছিল।এখন আর হবে না।
লোকটি হাসলো যেন সে হঠাৎ কোনো পুরোনো ঘটনা মনে করে ফেলেছে।
বৃষ্টি থেমে গেলেও আকাশের রং ময়লা।অন্ধকার হয়ে রয়েছে চারপাশ।এইটুকু বোঝা যাচ্ছে যে আজ আর বিকেলের আলো ফুটবে না।
মাথার টুপিটা খুলতেই লোকটির মুখ এতক্ষনে দেখা গেল।বয়স অনুমান করা মুস্কিল চল্লিশের বেশি হলেও হতে পারে আবার পঞ্চাশও হতে পারে।একমাথা ঝাঁকড়া চুল,অবিন্যস্ত।খাড়া নাক,রোদে পোড়া তামাটে রঙ।তীক্ষ্ণ ঝাঁঝালো চোখ।কথা বলার ধরণও ভারিক্কি ধরণের।
—-আপনারা কোথা থেকে আসছেন?
—-কলকাতা থেকে।
লোকটি আবার হাসলো।যেন মনে হয় মুখে একরকম কথা বলে মনে অন্যকিছু ভাবে।
বলল কলকাতা অনেক দূর।এখন কোথা থেকে আসছেন?
রঞ্জন ডাকবাংলোটার নাম বলল।
লোকটাকে এবার চিন্তিত দেখালো।মাটিতে চিমটেটা গেঁথে দিয়ে টুপিটা পরিয়ে দিল।
ভাস্বতী এই প্রথম কথা বলল আপনি কোথায় থাকেন? কাছাকাছি?
লোকটি যেন চমকে উঠলো ভাস্বতীর গলার আওয়াজ শুনে।ভাস্বতীর মুখ ও ভিজে শরীরের দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে বলল এই পাহাড়েই আমার ঘর।
রঞ্জন আর ভাস্বতী দু’জনেই অবাক হল।এই পাহাড়েই ঘর মানে!মন্দিরের পুরোহিত?না তো দেখে তো মনে হয় না।পরনের পোষাক ও রূপে এক বন্য আদিমতার ছাপ আছে।কিন্তু পাহাড়ে যারা থাকা তাদের পাহাড়ী বলে একে কি বলা যায়?
লোকটি পকেট থেকে সিগারেট বের করলো।কি মনে করে নিজে ধরানোর পর রঞ্জনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল চলবে?
রঞ্জনের সিগারেটের প্যাকেট বৃষ্টিতে ভিজে গেছে।সিগারেট পেয়ে সে কৃতজ্ঞতা বোধ করলো।বলল ধন্যবাদ।আমাদের সাড়ে সাতটার মধ্যে বাস ধরতে হবে।
—-তার আগে নদী পার হতে হবে।
—-হ্যাঁ আচ্ছা চলি।
—-কোথায় যাবেন?
—-নদীর দিকে।
রঞ্জন চামড়ার ব্যাগটা তুলে নিয়ে ভাস্বতীকে বলল চলো।
লোকটির সাথে তাদের পরিচয় হয়নি,নাম জানাজানি হয়নি।তাই আনুষ্ঠানিক বিদায় নেবার প্রশ্ন ওঠে না।অনেক দূরে বাঙালি দেখা হলে যে উচ্ছাস দেখানোর রীতি আছে তা রঞ্জন আর ভাস্বতী মানে না।তবে লোকটির কাছ থেকে রঞ্জন সিগারেট নিয়েছে বলে বলল আচ্ছা চলি তা হলে।
ভাস্বতীও লোকটির দিকে তাকায়।লোকটি ভাস্বতীর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।যেন ভাস্বতীর রূপের ছটাকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।এতে ভাস্বতী বিরক্ত হয় না।একজন সুন্দরী নারীর এই বিষয়ে অভ্যেস আছে।
লোকটি হাত তুলে বলল আপনাদের আজ ফেরা হবে না।
রঞ্জন লোকটির দিকে তাকালো বলল কেন?
—-ঐ নদী পেরুতে পারবেন না।
—-আসবার সময় পেরিয়ে এসেছি।
লোকটি এবার শব্দ করে হাসলো।সেই হাসির শব্দ জঙ্গলে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো।ভরাট গলার গমগম করতে থাকা হাসিটা মোটেই ভাস্বতীর ভালো লাগলো না।
লোকটি বলল আসা আর যাওয়া কি এক কথা?এসেই কি যাওয়া যায় সবসময়?
রঞ্জন সোজা কথার মানুষ।এই ধরণের হেঁয়ালি সে ঘৃণা করে।কোনো উত্তর না দিয়ে সে ভাস্বতীকে বলল চলো।
ভাস্বতী লোকটির কাছ থেকে পুনশ্চ বিদায় নেবার জন্য ভদ্রতাসূচকভাবে বলল আমরা আবার কাল কি পরশু আসবো।
রঞ্জন বলল ঠিক নেই।যদি সুযোগ সুবিধে হয়—
লোকটি বলল কালকের কথা কালকে।আজকের কথা ভাবুন।একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছেন।
একটু কান পাতলেই ওরা শুনতে পেল ঝড়ো কলকল জলের শব্দ।
ভাস্বতী বলল এদিকে কি কোথাও জলপ্রপাত আছে?
—-নদীর শব্দ।আসবার সময় এরকম শব্দ শুনেছি।
রঞ্জনের কথার জবাবে একটু উগ্র ভাবেই লোকটি বলল না আসবার সময় এরকম শব্দ শুনতে পাননি।এতদূর থেকে নদীর শব্দ পাননি।
রঞ্জন বুঝতে পারে সত্যটা।
—-এরকম পাহাড়ী নদী বৃষ্টিতে ভরে যায়।কিন্তু এমন শব্দ!
লোকটা ভারিক্কি গলায় বলে ওঠে ও নদী এখন পার হতে পারবেন না।
রঞ্জন সাঁতার চ্যাম্পিয়ন।সে জলকে ভয় পায় না।ভাস্বতী সাঁতার জানে না সেকথা তখন তার মনে পড়ে না।একটু অবজ্ঞার সুরে বলে উঠল ও জল যতই বাড়ুক কিন্তু পার হওয়া যাবে না কেন?লোকে কি ভাবে পার হয়?
—-লোকে পার হয় না।
—-এখন দু’তিন দিন কেউ পার হতে পারবে না।এসব নদীতে নৌকাও চলে না।
রঞ্জন কিছু বলতে যাচ্ছিল, লোকটি বাধা দিয়ে বলল সাঁতার জানলে কিছু হবে না।স্রোতের টানে তিন চার মাইল দূরে গিয়ে উঠবেন।যদি পাথরে ঘা না লেগে মাথা না ফাটে।
—-গিয়েই দেখা যাক।
লোকটার কথা ভদ্র লোকের মত হলেও চেহারার বন্যতার মত সবসময় একটা আদিম ঔদ্ধত্য আছে।
একটু যেন নরম হল লোকটা।বলল আমি এ জায়গায় অনেকদিন আছি তো তাই আমি জানি।তাছাড়া আপনি ওই নদীটার নাম জানেন?
—-খাবারের দোকান দার বলেছিল বটে নামটা। কি যেন জিরে না কি যেন।নাম দিয়ে কি হবে?
—-নদীর নাম সবসময়ে জেনে রাখা জরুরী।
—কেন?
—-স্থানীয়র এই নদীর নামটাকে জিরুয়া বলে।আসল নাম জিরা।
—-জিরা অতি সাধারণ বাঙালি মশলা।কিন্তু জিরা ঝাঁঝালো হয়।জিরা নদী একবার পেরোলে কি আর ফেরা যায়?
নিজের রসিকিতায় লোকটি আবার হাসলো লঘু ভাবে।ভাস্বতীর ঠোঁটেও একটা হাসির রেখা দেখা গেল।এই অদ্ভুত ধরনের লোকটাকে তার খারাপ লাগছে না।সাধারণত অচেনা লোকদের পছন্দ করে না সে।সকলেরই কথা একঘেয়েমি বস্তাপচা হয়।সত্যিই এর নাম জিরা নাকি লোকেরা নদীটার নাম জিরা দিয়েছে নাকি এই বন্য’টার বানানো?
—-আপনি কে?
—-আমি জিরার ওপারের হলেও একজন সাধারণ মানুষ।
এই কথাটা বলার সময় তার মুখে একটা সুক্ষ হাসি ফুটে ওঠে।যেন সে এই সাধারণ মানুষ কথা দুটোতে বেশি জোর দিচ্ছে—এবং সে যেন দু’জন অসাধারন মানুষের সাথে কথা বলছে।
রঞ্জন ভ্রু কুঞ্চিত করলো।লোকটি বেশি বেশি হেঁয়ালি করছে।বৃষ্টির পরে এরকম বিপদসংকুল পরিস্থিতিতে হাসির কথা মানায় না।
ভাস্বতী জিজ্ঞেস করলো আপনি এখানে থাকেন বললেন, আপনি এখানে কি করেন?
লোকটি সংক্ষিপ্তভাবে বলল ব্যবসা করি।
তারপর ও আরো বিস্তারিত ভাবে বলল দেখুন না এই পাহাড়,জঙ্গলে আপনার মত কোনো মহিলার গলার আওয়াজ শোনা যায়নি।এই গাছগুলো,পাথরগুলো পর্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে আপনার কথা শুনছে।
ভাস্বতী গাছপালাগুলোর দিকে তাকালো।যেন সে ভক্তদের দেখছে।তার ভালো লাগে।
রঞ্জন বিরক্ত বোধ করলো।আজেবাজে কথা শুনে সে সময় নষ্ট করতে চায় না।লোকটির কাছে আরো কিছু জেনে নেওয়ার পর বলল নদী যদি পার না হওয়া যায় তবে এদিকে আর কোথাও থাকবার জায়গা নেই?
লোকটি সবজান্তার মত হাসলো।
—-খোঁজ খবর না করে আপনাদের আশা ঠিক হয়নি।বৃষ্টির সময়ে এদিকে কেউ আসেনা।আদিবাসীদের গ্রাম এখান থেকে ছয়-সাত মাইল দূরে।সেও নদী পেরিয়ে যেতে হয়।
—-কেউ কেউ আমাদের আসতে বারণ করেছিল।
—-কিন্তু আপনারা বিশ্বাস করেননি কেন? অশিক্ষিত গেঁয়ো লোকের কথা বিশ্বাস করা যায়না?কিন্তু তারাই প্রকৃতিকে সবচেয়ে বেশি জানে।
রঞ্জন বলল একটা ছোট নদী পার হওয়া তেমন কিছু কঠিন কাজ নয়।
—-কিন্তু এই বিশেষ নদীটি পার হওয়া শক্ত।
ভাস্বতী একটু রেগে গিয়ে বলল তাহলে কি এই নদী বৃষ্টিতে কেউ পারাপার করে না?
—-ভারতবর্ষে ক’টা নদীতে ব্রিজ আছে বলুন?
—-কোনো খেয়া পারাপার?
—-এরকম পাহাড়ী নদীতে খেয়াপারাপার করা যায় না।তাছড়া এই পাহাড়টিতে লোকে আসতে চায় না।
রঞ্জনকে চিন্তিত দেখাচ্ছিল।ভাস্বতী বলল ওপরের মন্দিরটায় লোকজন আছে?
—-কেউ নেই।
—-তাহলে মন্দিরটা আছে কেন?
—-এরকম থাকে
—-তাহলে আপনি কোথায় থাকেন?
—-মন্দিরে থাকি না।
ভাস্বতী রঞ্জনের দিকে তাকিয়ে বলল মন্দিরটা যদি খালি থাকে তাহলে আমরা রাত্তিরটা ওখানে কাটাতে পারি।
ভাস্বতীর মনে এডভেঞ্চার স্পৃহা জেগে উঠেছে।বাথরুমের ব্যাপার মনে নেই, কিন্তু জোঁক! তারা কি এত উপরে উঠবে।
রঞ্জন বলল এখানে জোঁক কিলবিল করছে।
লোকটি বলল এগুলো জোঁক নয়,কেঁচো।তবে সাপ প্রচুর আছে।
তবে সাপের নাম শুনলে অন্য কোনো মহিলা লাফিয়ে উঠতো।কিন্তু ভাস্বতীর মনে হল পাহাড়ী জঙ্গলে সাপ থাকবে তাতে আর আশ্চর্য্য কি!
—-চলো আমরা মন্দিরের দিকে যাই।
লোকটি বলল মন্দিরে এসময় ওঠা সম্ভব নয়।বৃষ্টির পর পাথর পিচ্ছল হয়ে আছে।
ভাস্বতী বলল ওঠা যায়নাতো ওপরে মন্দির বানালো কি করে?
—-ওঠা যায় না তো বলিনি।এমনিতেই শক্ত, এই বৃষ্টিতে একেবারেই ওঠা যায় না।
রঞ্জন মাঝপথে ওদের কথা থামিয়ে বলল সতী চলো তো আমরা ঠিক নদী পার হতে পারবো।
রঞ্জন হাঁটতে শুরু করলো।ভাস্বতী চলে এলো তার পাশাপাশি।লোকটিকে কিছু না বলা হলেও পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো।মাথায় টুপিটা পরে নিয়ে চিমটে দিয়ে ঝোপঝাড়ে পেটাতে থাকলো।এমন ভাবে চলছে সে যেন তার নিজের কাজেই চলছে।
রঞ্জন একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো।চেহারাটা ভীষণ দীর্ঘ—লোকটির কোনো বদ মতলব নেই তো?এই পাহাড়ে একা একা একটি বাঙালি লোকের থাকা কেন?কিসের ব্যবসা?অবশ্য চেহারায় যা হোক ওর কথাবার্তায় একটা ভদ্রতার স্পর্শ আছে।
টগবগে ছল ছল করছে নদীর জল।কে বলবে এই নদী সেই–যে নদী একটু আগে রঞ্জন আর ভাস্বতী পার হয়ে এসেছে!অন্ধকার নেমে এসেছে,কোনো জনপ্রাণীর চিহ্ন নেই।
ভাস্বতী রঞ্জনের বাহু আঁকড়ে আছে।
রঞ্জন বলল তুমি আমাকে শক্ত করে ধরে আঁকড়ে থাকতে পারো।রিস্ক নিতে পারবে তো?
ভাস্বতী নিজে ঝুঁকি স্বভাবের মেয়ে।এডভেঞ্চার তাকে আকর্ষণ করে।ভয় পাওয়া তার চরিত্রে মানায় না।কিন্তু সাঁতার জানে না।তার রক্ত মাংস চামড়ার মত ভয় বাস্তব।এই ভয়ের কাছে সবাই একা।অতন্ত্য প্রিয়জনের পাশে থাকাও—সান্ত্বনা দেয় না।
লোকটি অল্প দূরে দাঁড়িয়ে আছে।তার মুখে অল্প অল্প হাসি।সম্প্রতি সে একটা গাছের ডাল ভেঙে নিল।ডালাপালা সমেত ছুড়ে দিল জলে।
মুহূর্তেই নদীটা গ্রাস করে নিল সেটাকে।আবার কিছুক্ষন পরে অনেকদূরে ভেসে উঠলো সেটা।স্রোতের টানে চলে যাচ্ছে দিশাহীন ভাবে।তারপর আর সেটাকে দেখা গেল না।ভাস্বতী এবার শিউরে উঠলো।
রঞ্জন হাতের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে এক এক করে পোষাক খুলে ভাস্বতীর হাতে দিয়ে জাঙ্গিয়া পরা অবস্থায় নেমে পড়লো জলে।
কোমর জল পর্যন্ত নেমেই রঞ্জনের দুঃসাহস ডালটার মত অবস্থায় পরিণত হল।
ভাস্বতী চেঁচিয়ে উঠলো,এই—-।
লোকটি ক্ষিপ্র পায়ে দৌড়ে গেল।চিমটেটা বাড়িয়ে দিল।ধমকের সুরে বলে উঠলো করছেন কি—পাগলের মতন।
অনেক চেষ্টার পর চিমটেটা ধরে রঞ্জন উঠতে পারলো।বিপদে পড়লেও রঞ্জন ভয় পায়নি।কিছু দূর গিয়ে সে ভেসে উঠতোই।
ভাস্বতীর মুখখানা রক্তিম।মনে মনে সে অসহায় হয়ে পড়েছিল।অল্পক্ষনের জন্য রঞ্জন যেন মৃত হয়ে গেছিল তার কাছে।সে নিজেকে অপরাধী ভাবছিল।
লোকটি বিনম্র ভাবে এগিয়ে এসে বলল আজ রাত্তিরে আপনারা আমার অতিথি।আমার নাম রাজা সেন।
রঞ্জন বলল আমি রঞ্জন সরকার।আমার স্ত্রী ভাস্বতী গাঙ্গুলি সরকার।
তিনজনেই হাতজোড় করে নমস্কার বিনিময় করলো।তারপরে আর একবার পেছন ফিরে তারা তাকালো নদীটির দিকে।নদীর চরিত্র বড় দুর্বোধ্য।
ওরা এগিয়ে গেল পাহাড়ের সরু পথ বেয়ে।বড় পাথরটার আড়ালে লোকটার ঘর।
ফেরা পথটুকু দীর্ঘক্ষণ মনে হয়।রঞ্জন লোকটির সাথে কথা বলছে ভাস্বতী একা একা হাঁটছে আগে আগে।বৃষ্টি থেমে গেলেও এদিক ওদিক জল ঝরার শব্দ।পাহাড়ে নিস্তব্ধ আঁধারে কয়েকটা শালিখ পাখি কিচিরমিচির করে ফিরে যাচ্ছে।
এ পাহাড়ে বিশেষ কোনো ফুলের সমারোহ নেই।তবে একধরনের সাদা পাহাড়ী ফুলের পরগাছা মাঝে মাঝে ঝিলিক দিয়ে ওঠে।রাত্রে যখন এখানে থাকতেই হবে—এ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় ভাস্বতীর মনে কোন জড়তা নেই।
—আপনি এখানে কতদিন আছেন?
—অনেক সময়।এই ধরুন দশ বছর।
—-দশ বছর! কি করেন আপনি?
—-আমি সাপ ধরার ব্যবসা করি।
পাহাড়ে এমনভাবে বাড়ী বানিয়ে থাকা অসম্ভব কিছু নয়।বিদেশের ছেলেমেয়েরা অনেকেই থাকে–রঞ্জন দেখেছে।হয়তো এদেশেও অনেকে রয়েছে,সে খবর রাখেনি।কিন্তু সম্পূর্ণ একা একা?
—আপনি কি কলকাতার?
লোকটি কি একটা যেন ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল।বলল উঁহু ত্রিপুরা।
বাড়ীটা তাঁবু ও কুঁড়েঘরের মাঝামাঝি।কাঠের ফ্রেমে তিনপাশে ত্রিপল লাগানো।শক্তপোক্ত কিছু গাছের কাঠ দিয়ে ঘেরা।পাহাড়ই একদিকের দেওয়াল।ওপরে টিন।ভাস্বতী এরকমই এক কুঁড়ে ঘরে হয়তো থেকে যাওয়ার বাসনা করেছিল।
ভিতরে দুটি কামরা।একটিতে দুটি ক্যাম্প খাট পাতা,টুকিটাকি জিনিসপত্র,একটি রাইফেল।পাশের ঘরে শুধু অনেকগুলি খাঁচা।
ঘরে ঢুকে লোকটি রেইনকোটটা খুলে ফেলার পর দেখা গেল,তার লম্বা দীর্ঘ চেহারা।তবে তা মেদহীন পেটানো ধাতুর মত শক্ত।মুখের মধ্যে সুশ্রী একটা ভাব হয়তো অনেক আগে ছিল।পাহাড়ে থাকতে থাকতে তা যেন রুক্ষ হয়ে গেছে।রেনকোটের তলায় সে শুধু পরেছিল ফুলপ্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি।জামা-টামার বালাই নেই।হাতের বাইসেপ্স গুলো স্পষ্টতই দৃঢ় লোহার মত।
—-আপনাদের জামা কাপড়তো সব ভিজে গেছে।সঙ্গে আর কিছু আছে?
—-রাত কাটাবার প্ল্যান ছিল না।তাই সঙ্গে কিছু আনা হয়নি।
—-ভিজে পোশাক পরে তো থাকতে পারবেন না।আর আমার কাছে তো ধুতি-টুতিও কিছু নেই।কয়েকটা পাজামা আছে অবশ্য-তার দুটো পরে নিয়ে জামাকাপড়গুলো মেলে দিন, শুকিয়ে যাবে।
—-থাক না,তার আর দরকার নেই।
লোকটি বিছানার তলা থেকে দুটো পাজামা আর গেঞ্জি বার করে রঞ্জনের হাতে দিল।
বলল ইস্ত্রি না করা থাকলেও কাচা আছে ব্যাবহার করার কোনো অসুবিধে নেই।
—-আপনাকে খুবই অসুবিধেয় ফেললাম।
লোকটি পর্যায়ক্রমে দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসলো।তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
লোকটি ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর ওরা দুজনে চুপচাপ হয়ে রইলো।ভিজে শরীরে কাঁপুনি দিচ্ছিল।দুজনে পরস্পরের অতি চেনা মানুষ,দু-এক মুহূর্ত যেন কথা খুঁজে পায় না।চোখ সরিয়ে নেয়।
ভাস্বতী বা রঞ্জন দুজনের কেউই অন্যের পোষাক পরা পছন্দ করে না।অথচ উপায় তো নেই।
ভাস্বতী একটু হালকা হেসে বলল আমি কি সারারাত এই পাজামা পরে থাকবো।
—-ভিজে শাড়ি পরে সারারাত থাকতে পারবে না।ঘন্টাখানেকের জন্য একটু মেলে দাও।যদি অল্প শুকিয়ে যায় পরে নিও।
ঘরের একটা দরজা আছে দরজাটা আলগা।পাশে রাখা আছে।রঞ্জন ওটা সরিয়ে এনে লাগিয়ে দিল।প্যান্ট,শার্ট,জাঙ্গিয়া,গেঞ্জি খুলে সেই পাজামা আর গেঞ্জি পরলো বিনা বাক্যব্যয়ে।চুপচাপ দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখার পর ভাস্বতী শাড়িটা ছেড়ে ফেলল।সিল্কের শাড়ি জলে ভিজে বেজায় ভারী।মেলে দিলে শুকোতে বেশিক্ষন সময় লাগবে না।ব্লাউজটা খুলে ফেলার পর কালো সায়া আর কালো ব্রাতে ফর্সা শরীরটা মোহময় হয়ে উঠলো।যেন সে প্রাচীন মিশরের দেবদাসী।
ঘরের ভেতরটা আবছা অন্ধকার।ভাস্বতী রঞ্জনের কাছে এসে তার কাঁধের উপর দুই হাত রেখে বলল, তুমি রাগ করেছ?
-উই বিহেভড এজ ফুলস।কিছু না জেনেশুনে আমাদের এরকম আসা ঠিক হয়নি।
ভাস্বতী রঞ্জনের থুতনিটায় চুমু দিয়ে বলল এখন আর চিন্তা করে কি হবে।একটা তো থাকার জায়গা পাওয়া গেছে।
—-অচেনা লোকের কাছে থাকতে আমার ভালো লাগে না।
—-কত অচেনা জায়গায় তো আমরা থাকি।
—-সেখানে আমরা টাকা দিয়ে থাকি,হুকুম করি।সে জায়গা আর এ জায়গা কি এক?
ভাস্বতী ম্লান গলায় বলল এখন থেকে তুমি কি আমার ওপর সবসময় রাগ করে থাকবে?
—-তোমার ওপর রাগ করবো কেন?
—-হ্যাঁ করেছ তো।
রঞ্জন ভাস্বতীকে আলিঙ্গন করে বলল তুমি একদম কথা শুনলে না।আসবার জন্য যেভাবে জেদ ধরলে।
—-আমর কিন্তু বেশ ভালো লাগছে।
রঞ্জন ভাস্বতীর ঠোঁটে ঠোঁট জেঁকে দিল।ভাস্বতীর শরীরটা উষ্ণ।একটু-আধটু বিপদের গন্ধ পেলেই তার শরীরী চাঞ্চল্য বাড়ে।সে নিজের ঠোঁট রঞ্জনের ঠোঁটে পিষে দিতে লাগলো।
ব্রা পরিহিত কোমল রূপসী স্ত্রীকে আলিঙ্গন করে চুম্বন খেলা দীর্ঘক্ষণ করবার ইচ্ছে হলেও রঞ্জন করলো না।নিজের উষ্ণ স্ত্রীর কাছে একটু বিরতি পেয়ে বলল তাড়াতাড়ি করে নাও।ভদ্রলোক বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।
ভাস্বতী তার অন্তর্বাসের বাঁধন খুলতেই আবছা আলোতে নগ্ন বক্ষদেশ দেখা গেল।সে সম্পুর্ন রকমের সুবিধাভোগীনি কারণ সে একটা নিখুঁত রকমের শরীর পেয়েছে।ভাস্বতীর উজ্জ্বল নগ্ন স্তনের আভায় উদ্বেলিত হচ্ছিল তার শরীর।সুন্দরী, বুদ্ধিমতী, দুঃসাহসী নারীর উদ্ধত বক্ষ হলে তা সম্পুর্ন নিখুঁতই বলা যায়।ভাস্বতী তেমনই উন্নত কোমল স্তনের অধিকারিণী।গোপন ব্লাউজের অন্তরালে তার হৃদয়স্পন্দন স্তনদ্বয়ের সাথে একাত্ম হয়ে থাকে।
সম্পুর্ন শরীরটা এগিয়ে গেল খাটের দিকে।এক এক করে পাজামা গেঞ্জি তুলে নিল,পরলো।
রঞ্জন চামড়ার ব্যাগ থেকে টর্চটা বেরকরে ভাস্বতীর গায়ে ফেলে বলল তোমাকে মজার দেখাচ্ছে।
টর্চের আলোর আভা পেয়ে লোকটি বাইর থেকে বলল ভেতরে একটা হ্যাজাক আছে জ্বেলে নিতে পারেন।
ভাস্বতী বলল আমি এইরকম ভাবে বেরুবো?
রঞ্জন বলল কি আর করা যাবে?গেঞ্জিটাও ফুটোফুটো।
ভাস্বতী ওদের বড় তোয়ালেটা গায়ে জড়িয়ে নিল।তার মুখে লজ্জার চিহ্ন নেই,রয়েছে কৌতুক।নিজের শরীরটা নিয়ে সে বিব্রত বোধ করে না কখনো।কিন্তু তার একটু ঠান্ডা লেগে গেছে এর মধ্যে—নাক সুলসুল করছে।
রঞ্জন দরজাটা খুলতে গিয়েও থেমে গেল–কি ভেবে রিভলবার সমেত কোমরে বেল্টটা জড়িয়ে নিল।তারপর দরজা খুলে বাইরে এলো।
লোকটা বাইরে বসে একটা স্টোভ জ্বালানোর চেষ্টা করছে।ভাস্বতী তাকে জিজ্ঞেস করলো আপনার কাছে অ্যাসপিরিন জাতীয় কিছু আছে?
মুখ না ফিরিয়ে সে বলল না।
তারপর ওদের পোশাক দেখে বলল কি আর হবে একটা রাত কষ্ট করে কাটিয়ে দেন।
—-কাল নদীর জল কমবে?
—-যদি বৃষ্টি না হয়।
—-আপনি এখানে একা থাকেন?
—-এখনো দ্বিতীয়জনকে কি দেখতে পেয়েছেন এই জঙ্গলে?আমার সাথে তবে থাকবেই বা কে?
ভাস্বতী জিজ্ঞেস করলো আপনার একা একা থাকতে খারাপ লাগে না?
লোকটা স্টোভটা জ্বেলে সেটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো।ভাস্বতীর মুখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল আমাকে টারজান ভাববেন না।এ জঙ্গলের ছ মাইল দূরে আদিবাসী গ্রাম আছে ওরা আমায় চেনে।একশো তিরিশ কিমি দূরে ফরেস্টের অফিস।ওরা আমায় চেনে,জানে।আমার সাপ ধরার লাইসেন্স আছে।তাহলে আর একা কোথায়?
স্টোভটা নিয়ে ও দ্বিতীয় ঘরটাতে ঢুকে গেল।পেছন পেছন ওরাও এলো।একপাশে কতগুলো খাঁচা আর একটু রান্নার ব্যবস্থা।
—-ভাত চাপিয়ে দিচ্ছি।বিশেষ কিছু আতিথ্য করতে পারবো না,এজন্য দুঃখিত।
রঞ্জন বলল আমাদের কাছে পাউরুটি আর জেলি আছে।ভুলেই গেছিলাম।
ওগুলো এখন খেয়ে নিতে পারেন।রাতে ভাত, আলুসেদ্ধ আর পেয়াজ।ঘি আছে টাটকা।ডিম ছিল–ফুরিয়ে গেছে।
ভাস্বতী বলল ঘি আর গরম ভাত তো চমৎকার।
—-প্রত্যেকদিন খাবারের পক্ষে একঘেয়ে।তাছাড়া আর যখন কিছু নেই,তখন ভালো লাগুক আর খারাপ লাগুক—
—-আমাদের ভালো লাগবে।আমি কি আপনাকে রান্নায় সাহায্য করতে পারি?
—-সাহায্য করার কিছু নেই।আমি একসঙ্গেই ভাত আর আলু সেদ্ধ চাপিয়ে দেব–
হিসহিস শব্দ শুনে রঞ্জন চমকে গিয়ে বলল খাঁচা গুলোর মধ্যে কি সাপ আছে নাকি?
—-গোটা তিনেক আছে।ভয়ের কিছু নেই।খাঁচা ভালো করে বন্ধ আছে।দেখবেন?
টর্চের আলোয় দেখা গেল।দুটি সাপ নির্জীব হয়ে পড়ে থাকলেও একটি ফণা তুলে দাপাদাপি করছে।সেটা অন্তত হাত চারেক লম্বা,মাথার ওপর প্রবাদ মতন পায়ের ছাপ আঁকা।
—-এগুলো আপনি ধরেছেন?
—-হ্যাঁ
—-ভাস্বতী বকুনির স্বরে বলে উঠলো, এগুলো নিজে ধরেন কেন?সাপুড়ে কিংবা বেদেদের দিয়ে ধরতে পারেন না?
লোকটি বলল সাপুড়েরাই কেবল সাপ ধরতে পারে এটা পুরোনো ধারণা।কতগুলো টেকনিক আছে শিখে নিলেই হল।ধরবেন নাকি সাপ?
লোকটির শেষের কথাটির মধ্যে যেন একটা স্পর্ধার আদি রসিকতা আছে।ভাস্বতীর তবু খারাপ লাগলো না।মাঝপথে রঞ্জন বলে উঠলো কারা কেনে সাপ?
—-বোম্বের হপকিনস ইনস্টিটিউট।তাছাড়া দেশে বিদেশে নানা গবেষণাকেন্দ্র,চিড়িয়াখানা কেনে।
—-আপনি কি নিজেই যান ওদের কাছে।
—-না সরাসরি আমি বিক্রেতা নই।আসলে আমি সে অর্থে ব্যাবসায়ী নই।ভাস্বতীর দিকে তাকিয়ে বলল আমি একজন সাপুড়ে সে অর্থে বেদে।আমার কাজই সাপ ধরা।আমি চালান করি ভুবনেশ্বরে।সেখানকার কেন্দ্রের মাধম্যে বিক্রি হয়।
কিছুক্ষন থামবার পর লোকটি বলল তবে এগুলো বাজে সাপ।ভালো দাম পাওয়া যায় পাইথনের।এই পাহাড় থেকেই তিনটে ধরেছি।আর একটা আছে সেটা খালি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
রঞ্জন বলল, এ পাহাড়ে এখনো একটা আছে?
—-হু সেটাকে দেখেছি দু-একবার।তবে ধরা যায়নি।এই বর্ষার মধ্যেই ধরে ফেলতে হবে।শীত পড়লে আর পাওয়া যাবে না।
—-এই যে একা একা থাকেন,সাপ ধরেন আপনার ভয় করে না?
—-জীবিকার জন্য অনেক কিছু করতে হয়।শহরে ব্লাস্ট ফার্নেসে যে শ্রমিক কাজ করে তার ভয় করে না?
—-আমরা বোকার মত এখানে চলে এসেছি।আপনি না থাকলে আমরা ভীষন বিপদে পড়তাম।
লোকটি ভাস্বতীর দিকে তাকিয়ে বলল আপনার ভিজে কাপড়গুলি এ ঘরে মেলে দিন,গরম আছে।
রঞ্জন বলল এরকম অভিজ্ঞতা আপনার আগে হয়েছে?আর কেউ এ পাহাড়ে এসে আটকা পড়েছে?
—-না।
ভাস্বতী উঠে গেল পাশের ঘরে।রঞ্জনের শার্ট ও নিজের শাড়ি তুলে নিল।তার সায়া,ব্রা,রঞ্জনের জাঙ্গিয়া নিতে ইতস্তত করলো একটু।অচেনা মানুষের সামনে এসব প্রদর্শন করা সহবত নয়।কিন্তু অচেনা মানুষের সামনে সে কবে পাজামা,গেঞ্জি,তোয়ালে গায়ে বেরিয়েছে?
অন্তর্বাসগুলো এ ঘরেই মেলে দিয়ে বাকিগুলো নিয়ে খাঁচার ঘরে চলে এলো।
লোকটি একটা ডেকচিতে আলু পেয়াজ সমেত চাল ধুয়ে বসিয়ে দিল স্টোভে।
তারপর একটা বাক্স এনে একটা ব্র্যান্ডির বোতল ও দুটো গেলাস বার করলো।রঞ্জনকে জিজ্ঞেস করলো আপনার চলবে তো?
—-রঞ্জন বলল না থাক।
—-আপত্তি আছে?
—-আপত্তি ঠিক নয়।আমি ওসব জিনিস একটু খেলে তারপর বেশি না খেয়ে থাকতে পারি না।আপনার জিনিসে আমি ভাগ বসাতে চাই না।আপনার ফুরিয়ে যাবে—আবার কবে আনতে পারবেন আপনি ঠিক নেই।
—-লোকটি মৃদু হেসে অন্য একটি বোতল বের করে বলল আমার কাছে রাম আছে চলে যাবে।সপ্তাহ পরে শহর যাবো।যেটুকু আছে ব্র্যান্ডিটা এখন খাওয়া যেতে পারে।আমি আগামীর কথা চিন্তা করি না।
—-না থাক।
লোকটি আর রঞ্জনকে পীড়াপীড়ি করলো না।ভাস্বতীর দিকে তাকিয়ে বলল আপনি?
–ভাস্বতী বলল আমি একটু চা খাবো।
লোকটি বলল দুঃখিত আপনাদের চায়ের কথা বলা উচিত ছিল।দাঁড়ান আমি বানিয়ে দিচ্ছি।
ভাস্বতী বলল আপনি বসুন না।আমি করছি কোথায় কি আছে বলুন?
লোকটি বলল দু’কাপ।আমার জন্য করবার দরকার নেই।
অন্ধকারের মধ্যে চা বানিয়ে নিয়ে এলো ভাস্বতী।রঞ্জন এতো আরাম করে কখনো চা খায়নি।বৃষ্টিতে ভেজার পর গরম চা অপূর্ব লাগছে।
চা খাবার পর রাজার কাছে সিগারেট চেয়ে নিল রঞ্জন।
ভাস্বতী চায়ে চুমুক দিতে দিতে লোকটিকে দেখছিল।লোকটির নাম রাজা—এই জঙ্গলের নির্জন সাম্রাজ্যে কোনো রাজার প্রয়োজন নেই।তবু লোকটির হাবভাব যেন রাজার মত।স্টোভের আলোতে রাজার মুখখানা দেখা যাচ্ছে।তামাটে পাথরে খোদাই করা মুখ।বয়স যতটা মনে হচ্ছিল এখন মনে হচ্ছে বয়স খুব বেশি নয়।মেরেকেটে চল্লিশ হবে হয়তো।
ঠান্ডা লাগায় দুবার হেঁচে ফেলল ভাস্বতী।যতবার হাঁচি চাপতে যায়।ততবার তার হাঁচি পেয়ে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে সে।
রঞ্জন বলল সতী তুমি বরং একটু ব্র্যান্ডি খেয়ে নাও।তোমার ঠান্ডা লেগেছে উপকার হবে।
বিয়ের পর রঞ্জনের সাথে ভাস্বতী কয়েকবার অল্প ভদকা পান করেছে।কিন্তু তা একান্ত নিজস্ব লোকের সাথে,নিজের ঘরে–অপরিচিতের সামনে কখনই নয়।
লোকটি কোন কিছু জিজ্ঞাসা না করে আর একটা গেলাসে ব্র্যান্ডি ঢেলে ভাস্বতীকে দেয়।
ভাস্বতী হাত বাড়িয়ে গেলাসটা নিল।ঠোঁটে চুমুক দিয়ে বলল ভালোই লাগছে।
রঞ্জন লোকটিকে বলল আপনার সিগারেটে ভাগ বসাতে হবে।আমার সিগারেটগুলো নষ্ট হয়ে গেছে।
ভাস্বতী বলল চামড়ার কালো ব্যাগে আরো তো সিগারেট আছে দেখলাম।
—-তাই তো!
রঞ্জন লাফ দিয়ে চলে গেল পাশের ঘরে সিগারেট আনতে।সেইসময় খাঁচার সাপটা ফণা তুলে হিসহিস করে উঠলো।
ভাস্বতী চোখ তুলে দেখলো লোকটি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার শরীরের দিকে।পুরুষের এই ধরনের দৃষ্টি তার গায়ে বেঁধে না–গা সওয়া।এসব তার রূপের নৈবেদ্য সে জানে।
লোকটি কোনো কথা বলছে না।ভাস্বতীও কি বলবে বুঝতে পারছে না।অথচ এইরকম দুইজনে পাশাপাশি বসে কথা না বলার মধ্যে একটা অস্বস্তি আছে।
ভাস্বতী নিম্নস্বরে বলল,আমরা এসে পড়ে আপনাকে অনেক অসুবিধায় ফেললাম–
লোকটি বলল এই কথা বলতে হয় বলেই বারবার বলছেন।আমার কিন্তু আজ ভালো সময় কাটছে আপনাদের জন্য।এই গাছপালা,এই পাহাড় দেখতে একঘেয়ে লাগে।
রঞ্জন দু প্যাকেট সিগারেট এনে বলল ব্যাগে যে সিগারেট ছিল খেয়াল করিনি।আপনি এক প্যাকেট রাখুন।
লোকটি অবহেলায় এক প্যাকেট রেখে দিল এক পাশে।ধন্যবাদ জানালো না।
ওরা বাইরে বেরিয়ে এলো।এইসব পাহাড়ী রাতে জোৎস্না ফুটলে ভালো হত।কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তারাদল সহ নিশাপতি অবলুপ্ত।এখনো মেঘ থমথমে হয়ে রয়েছে।
সিগারেট ধরিয়ে রঞ্জন বলল এ পাহাড়ে কোন বন্যপ্রাণী মেলে না?
—-গেলাস থেকে মুখ সরিয়ে লোকটি বলল খরগোশ আছে।কদাচিৎ দু-একটা মেলে।বনমোরগও আছে।তবে হিংস্র জন্তুটন্তু আর নেই।হাতির পাল আর এদিকে আসে না।শেষবার নদীর ওপারে বছর দুই আগে দেখা গেছিল।
—-আপনার কাছে রাইফেল আছে দেখলাম?
—-ওটা রেখেছি লোকজনদের ভয় দেখাবার জন্য।
—-সে রকম কোনো ঘটনা ঘটেছে?
—-না।স্থানীয়দের ধারণা আমি মন্ত্র পড়ে সাপেদের বশ করি।তাই তারা অতিরিক্ত শ্রদ্ধা করে।চোরটোর আসে না,কারণ তারা আমার কাছে কিছু পাবে না জানে।
ভাস্বতী বলল জায়গাটা ভীষন নির্জন।ওখানেতো রাস্তা রয়েছে তবুও লোকজন আসে না?
—-স্থানীয় লোকজন এ পাহাড়টাতে আসতে চায় না পারতপক্ষে।
—-কেন আসতে চায়না?
—-তার প্রধান কারন সাপের ভয়।মন্দিরটা যখন প্রথম হয়েছিল তখন পরপর দুজন পুরুত সাপের কামড়ে মারা যায়।সেই থেকে আর কোনো পুরুত থাকে না।তাছাড়া আর একটা সুসংস্কার রয়েছে।লোকের ধারণা এই পাহাড়টার ওপরে গেলে কেউ আর ফিরে আসতে পারবে না।কারন ওই মন্দিরটার কাছেই স্বর্গ।
—-স্বর্গ?
—-কেন আপনারা শোনেননি এ কথা?
—-না তো।
—-শুনেছেন ঠিকই,বুঝতে পারেননি।লোকে বলেছে ওই পাহাড়টার ওপরেই হারাবুরু।বলে নি?
—-হ্যাঁ,ঐরকম কথা শুনেছি।
—-হারাবুরু মানেই স্বর্গ।এবং এটা খুবই নতুন কথা নয়।হিন্দুদের যেমন হিমালয়ের উপরে উঠলে স্বর্গ,কেউ বলে কৈলাশ পাহাড়,কেউ বলে মহেন্দ্র,তেমন যারা হিমালয় চোখে দ্যাখেনি,দূরত্ব কখনো কল্পনা করতে পারে না তারা কাছাকাছি কোনো পাহাড় দেখলেই স্বর্গ কল্পনা করে।
এই পাহাড়টা আদিবাসীদের নিজস্ব স্বর্গ।একবার স্বর্গে গেলে যেমন কেউ ফিরে আসতে পারে না।তেমন তাদেরও বিশ্বাস এখান থেকে কেউ ফিরতে পারবে না।
—-আপনি এর উপরে যাননি?
—-অন্তত দশ-বারো বার গেছি।তাই সেই হিসেবে দশ-বারো বার স্বর্গফেরত বলতে পারেন।ওখান থেকেই একটা পাইথন ধরেছি।
রঞ্জন চকিতে পেছন ফিরে তাকালো।হঠাৎ মনে হল চতুর্থ পাইথনটা কাছাকাছি কোথাও আছে।থাকা অসম্ভব তো নয়।গা শিরশির করে ওঠে।
এখন আর পোশাকের অস্বস্তি নেই ভাস্বতীর।নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে একে অপরের মুখ দেখা যায়না।শুধু সিগারেটের আগুন।একবার সে তোয়ালেটা সরিয়ে ফেলেছিল বুক থেকে।আবার অভ্যেসবশত আঁচলের মত জড়িয়ে নেয়।
লোকটি আবার বলতে শুরু করলো শীতকালে কিছু তীর্থযাত্রী আসে।
—-শুধু শীতকালে আসে কেন?
—-কুসংস্কারের সাথে বাস্তবজ্ঞান মেশানো।শীতকালে নদীটা শুকিয়ে যায়।সাপেরা গর্তে ঢুকে যায়।ওদের শাস্ত্রমতে ওটাই ওদের তীর্থের সময়।
—-তখন মন্দিরে ওঠে।
—-না।সে সাহস কে দেখাবে? স্বর্গে যেতে কে বা চায়।তাহলে যে আর ফিরবে না।মন্দিরের অনেক নীচ থেকে পুজো দেয়।মুরগীর গলা কেটে ছুঁড়ে দেয়।বিশেষ করে বাঁজা মেয়েরা বেশি আসে।এখানে পুজো দিলে নাকি ওদের সন্তান হয়,–এই ওদের বিশ্বাস।
একটুক্ষণ চুপ থেকে লোকটি ভাস্বতীকে জিজ্ঞেস করলো আপনিও তো সেইজন্যই এসেছেন?আসেন নি?আপনারও নিশ্চই সন্তান হয়নি?
লোকটির কণ্ঠস্বর একটু রুক্ষ মনে হল।পুরুষমানুষের এরকম কণ্ঠস্বর শোনার অভ্যেস নেই ভাস্বতীর।সে কড়ে আঙুলের নখের ডগা ঠেকিয়ে এরকম পুরুষকে অবহেলা করতে পারে।
শান্ত গাম্ভীর্যের সঙ্গে ভাস্বতী বলল আমি সেরকম কোনো বিশ্বাস নিয়ে আসিনি।এমনি কৌতূহলে এসেছি।
—-সন্তান না হলে অনেক মেয়েরই মাথা খারাপ হয়ে যায়।আমি জানি।
—-আপনি ভুল জানেন।
সঙ্গে সঙ্গে লোকটি গলা নরম করে বলল আপনাকে আর একটু ব্র্যান্ডি দেব?
ভাস্বতী স্বামীর অনুমতি না নিয়েই বলল দিন।
অন্ধকারে গেলাসে ঠোকাঠুকি হল।ভাস্বতী দেখলো তখন তার গেলাস ধরে আছে লোকটির আঙ্গুল।ছোঁয়া লাগলেও লোকটি হাত সরিয়ে নিল না।
ভাস্বতী সামান্য হেসে গেলাসটা তুলে নিল।বড় চুমুক দিল একটা।গলায় অপ্রিয় তরল আগুনের স্বাদ।
তোয়ালেটা বুক থেকে খুলে সে পাশে রেখে দিল এবার।যার ঠান্ডা লেগেছে সে কেন অন্ধকারে আব্রু রক্ষার হাস্যকর চেষ্টায় বুকে ভিজে তোয়ালে জড়িয়ে আছে এতক্ষন?নিছক সমতল জীবনের অভ্যেস।
—-রঞ্জন বলল তাহলে বোঝা যাচ্ছে আদিবাসীদের কাছে এটা পবিত্র জায়গা।আপনি যে এখানে থাকেন কেউ আপত্তি করে না?
—-আমার ওড়িশা সরকারের লাইসেন্স আছে।ওড়িয়াদের মত ওড়িয়া ট্রাইবরাও ধর্মভীরু।এ পাহাড়ে একা একা থাকায় ও সাপ ধরে ওদের উপকার করায় ওদের কাছে সমীহ আদায় করে নিয়েছি।এই বনাঞ্চলের এদিকটায় কাঠ কাটতেও তেমন ওরা আসে না।
—-কিন্তু এ কাজে আপনার জীবনের আশঙ্কা আছে।
—-কোথায় নেই?জীবন দেওয়া-নেওয়া বন্যপ্রাণীদের নিজস্ব ব্যাপার।এ জঙ্গলে এক সময় বাঘ থাকত—এসব স্থানীয়দের কাছে শোনা।এখন আমি একা আছি।স্বর্গের দায়িত্বশীল প্রহরীর মত।
—তিনজনেই হঠাৎ চুপ করে যায়।যেন তিনজনেই উৎকর্ণ হয়ে কোন শব্দ শুনছে।নদীর শব্দ ছাড়া আর কোথাও কিছু শোনবার মত নেই।কথা বলতে বলতে এমন হয় যখন সকলে একসঙ্গে চুপকরে যায়।স্তব্ধতা তখন গর্ভবতী।
একটু পরে ছোট্ট হেসে লোকটি বলল এখন আমাকে একবার ওই নদীর কাছে যেতে হবে।
ভাস্বতী সেই মুহূর্তে তার কোমরের কাছে একটা হাতের স্পর্শ পেল।হাতখানা তার কোমরে উপর স্থির হয়ে রইলো।অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না—কিন্তু পুরুষের স্পর্শ চিনতে দেরি হয়না মেয়েদের।এ স্পর্শ তার স্বামীর নয়।রুক্ষ,শক্ত হাতের স্পর্শ।অথচ এখন শান্ত।
ভাস্বতী সহজে বিচলিত হয় না।যেকোন অবস্থায় তার মনে হয় দেখাই যাক না এরপর কি হয়।তাই সে শরীর কোঁকড়ালো না।
কিন্তু একটু বিচলিত হয়ে সে ভাবলো এই লোকটি কি নিছকই অসভ্য,বদ।না অন্য কিছু।লোকটি নদীতে যাবার নাম করে হঠাৎ তাকে স্পর্শ করলো কেন?
রঞ্জন বলল কেন?
—-লোকটি বলল জল আনতে ভুলে গেছি।
—-তা বলে এই অন্ধকারে জল আনতে যেতে হবে?
ভাস্বতী কোমরে আগুন্তুকের হাতের উপর নিজের হাতখানি রাখলো।যেন সে অবাধ্য শিশুকে শাস্তি দিচ্ছে।এই ভাবে আঙ্গুল তুলে মুচড়ে দিল।হাতখানা সরে গেল।
লোকটি বলল সারারাত কি তৃষ্ণা নিয়ে থাকা যায়?ব্র্যান্ডি খেয়েছিতো এখন আমার ভীষণ জলতেষ্টা পাবে। আপনাদেরও পাবে নিশ্চই?
ভাস্বতী জিজ্ঞেস করলো আপনি ঐ নদীর জল খান?
—-আর কোথায় জল পাবো বলুন?নদীর জলই তো সম্বল।কখনো কখনো বৃষ্টির সময় পাত্র পেতে রাখি।আজ বালতি পাততে ভুলে গেছি।
—তখন আমরা নদীর ধারে গেলাম।
—-তখন তো আপনারা চলে যাবেন ঠিক করে ছিলেন।দাঁড়ান দেখে আসি ভাত সেদ্ধ হয়েছে কিনা?
লোকটি হ্যাজাকটা জালালো।হ্যাজাক বললে ভুল হবে হ্যাজাকের মত উজ্জ্বল আলো নয়।বরং মিনমিনে হ্যারিকেন বলা ভালো।
খাঁচার সাপ তিনটেই এখন জেগে আছে।অসহিষ্ণু ভাবে নাড়াচাড়া করছে।মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসছে লকলকে জিভ।সেদিকে তাকাতে ইচ্ছে করছে না রঞ্জন ও ভাস্বতীর,তবু সেদিকেই চোখ চলে যায়।
লোকটি ভ্রূক্ষেপ করে না।ডেকচি নামিয়ে ভাত টিপে দ্যাখে।এখনো সেদ্ধ হয়নি।
—-আপনারা দেখুন আমি জল নিয়ে আসছি।
একটা বড় প্লাস্টিকের বালতি তুলে নিয়ে সে বেরিয়ে যাচ্ছিল।রঞ্জন বলল দাঁড়ান।
লোকটি বলল কি হল?
—-আমি যাচ্ছি আপনার সঙ্গে।
—-তার কোনো দরকার নেই।
ভাস্বতী বলল একটা রাত জল ছাড়া চলবে না?এখন আনতেই হবে?
—-তাতে কি হয়েছে মরুভূমিতে তো মানুষ দিনের পর দিন না খেয়ে কাটাতে পারে।
—-কিন্তু কাছাকাছি জল আছে জানলে মানুষ জীবন তুচ্ছ করেও আনতে যায়।এ পাহাড় আমার চেনা এলাকা আপনারা বসুন না,আমার বেশিক্ষণ লাগবে না।
রঞ্জন উদ্বেল হয়ে উঠে,তার শোভনতার কারনে একটা কাঁটা ফুটছে।