এই গল্পটি ১৯ শতকের কথা, যখন এই পৃথিবীতে যোগাযোগ ব্যবস্থা আজকের মত এতো আধুনিক ছিলো না, ছেলে মেয়েরা ও এতো আধুনিক ছিলো না। গল্পের নায়ক একজন ব্যবসায়ী, উনার নাম মনোজ, উনার ঘরে একজন সুন্দরী স্ত্রী আছে যার নাম জবা, আর ওদের একমাত্র ছেলে যার নাম অজয়। মনোজ সাহেবের বয়স এখন ৫১ ছুই ছুই, জবার বয়স ৩২, বিয়ে করেছিলেন একটু দেরিতে, কিন্তু মেয়ে ছিলো অল্প বয়সী। বিয়ের সময় জবার বয়স ছিলো ১৮ আর মনোজের ৩৭, প্রায় দিগুন বয়স। মা হতে দেরি করে নাই জবা।
অজয় চলে এলো ওর কোলে। বিয়ের পর থেকে মনোজের জীবনের ভাগ্য লক্ষ্মী যেন দূরে সড়ে যেতে লাগলো একটু একটু করে। একের পর এক ব্যবসায় লস হতে হতে, এক ব্যবসা ছেড়ে অন্য ব্যবসা, আবার লস, আবার ব্যবসা পরিবর্তন, এভাবেই চলছিলো মনোজ আর জবার জীবন। অসম্ভব রকম দৃঢ় মনোবলের মানুষ মনোজ, শরীরে ও অনেক শক্তি ধরে, মনের জোর ও তুলনাহীন, সাথে জেদ ও ভীষণ। কোনদিন জবাকে বকা বা গালাগালি দিতো না সে, ওর আচার আচরনে ভালবাসার প্রকাশ অতটা প্রকট না হলে ও জবা জানে, যে ওর কোন প্রকার অসুবিধা সইতে পারে না মনোজ। একটা মুখে না বলা ভালোবাসার টান ওদের মধ্যে ঠিকই ছিলো।
জবা ছিলো উচ্চ বংশের ভদ্র সচ্ছল ঘরের সন্তান, সুন্দরী, ভদ্র, অমায়িক আর আদরের সন্তান, জীবনে কোনদিন অভাব চোখে দেখে নাই। মনোজের সংসারে এসে ওকে হাড় ভাঙ্গা খাটুনীর সাথে সাথে টাকা পয়সার টানাটানি ও সয়ে নিতে হচ্ছে। শেষ ব্যবসায় ধরা খাবার পর মনোজ স্থির করলো যে, এই দেশে ওর পক্ষে ব্যবসা করা সম্ভব না। ওকে এই দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গিয়ে ব্যবসা করতে হবে। তাই সে অস্ট্রেলিয়া যাবার চিন্তা করলো, ওখানে কিছু লোক আছে যারা ওকে আশা দিলো যে ওকে, ওদেশে ব্যবসা দাড় করিয়ে দিতে সাহায্য করবে।
কিন্তু সেই সময়ের এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি জমানো আজকের দিনের মত সহজ ছিলো না, সমুদ্র পথেই প্রায় ৪ মাসের পথ অস্ট্রেলিয়া। আর সমুদ্র যাত্রা অনেক ভয়ঙ্কর, কখন যে কোন বিপদ চলে আসে, সেটার কোন আন্দাজ করা সম্ভব নয়। পুরোটাই অনিশ্চিত যাত্রা, সমুদ্র পথে। জবার পরিবার অনেক বুঝালো মনোজকে, কিন্তু আগেই বলেছি, অসম্ভব রকম জেদি এই লোকটা, ওর নিজের কথা থেকে ওকে কেউ সড়াতে পারবে না ও নিজে ছাড়া। বড় বড় ব্যবসায়ী, সাহসি লোক ছাড়া কেউ এই রকম দূর সমদ্রযাত্রা করতে পারতো না ওই সব দিনে। বিপদ নানা দিক থেকে আসতে পারে, আর আজকের দিনের মত রেডিও যোগা যোগ ও সম্ভব ছিলো না, মাঝ সমুদ্রে, বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসগরের ঢুকে গেলে পুরো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কখন ঝড় আসে, কখন সমুদ্র ফুলে উঠে, কখন দিক বিভ্রান্ত হয়ে যায়, তার কোন পুরবাভাস পাওয়ার কোন সুযোগ নেই।
সমুদ্র যাত্রা, ঝড়, ও নির্জন দ্বীপে আশ্রয় নেয়া
চোখের জ্বলে আত্মীয়স্বজনকে বিদায় জানিয়ে জবা, ওর স্বামী আর ছেলেকে নিয়ে যেই জাহাজে উঠলো, সেটা বেশ বড় জাহাজই ছিলো, প্রথম মাস খানেক ওদের ভালই কাটলো জাহাজে, পথে একবার ম্যানিলা থামলো, একবার ইন্দোনেশিয়াতে থামলো জাহাজ।
ইন্দোনেশিয়া থেকে যেদিন ওরা প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেবার জন্যে রওনা দিলো, সেটাও বেশ রৌদ্রউজ্জ্বল দিন ছিলো। প্রশান্ত মহাসগরে ঢুকার পরে আর একটি সপ্তাহ চলে গেলো কোন রকম অঘটন ছাড়াই। এর পর দিন রাতে ওরা এক বিশাল টাইফুন ঝড়ের মুখে পড়ে গেলো।
মনোজ, জবা আর ওদের কিশোর ছেলে রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় শোবার পোশাক পাল্টে বিছানায় উঠতে যাওয়ার পরই, ঝড় শুরু হলো। এতো বড় জাহাজকে যেন খর কুটোর মত আছড়ে আছড়ে ভেঙ্গে ফেলতে চেষ্টা করলো সেই ঝড়, ওরা সবাই যেন তুলোর মত উড়ে যেতে লাগলো এদিক সেদিক, যখন জাহাজ ডুবতে শুরু করলো, তখন মনোজ ওর স্ত্রীকে নিয়ে লাইফবোট খুঁজতে লাগলো আর ভাগ্য ভালো থাকার কারনে একটা পেয়ে ও গেলো।
ওরা তিনজনে লাইফ বোটে উঠতে না উঠতেই আরেকটা বড় ঢেউ এসে ওদেরকে জাহাজ থেকে অনেক দূরে নিয়ে গেলো, দূর থেকেই ওরা জাহাজকে ঝড়ের আঘাতে খণ্ড বিখণ্ড হয়ে যেতে দেখলো। এদিকে ঝড়ের তখন সবে মাত্র শুরু, ওদের ক্ষুদ্র লাইফবোটকে প্রশান্ত মহাসাগরের টাইফুনের ঢেউ একবার যেন আকাশে তুলে ফেলে আবার এক ধাক্কায় যেন পানির নিচে তলিয়ে দেয়, নিজেদের শরীরকে দড়ির সাহায্যে লাইফবোটের সাথে বেঁধে ফেলেছিলো ওরা সবাই, তাই লাইফবোটের যা হবে, ওদের ও তাই হবে। ওদের পড়নে কাপড় বলতে রাত্রে শোওয়ার পোশাক যেটা ভিজে যাওয়ার কারনে শরীর ঢেকে রাখার কাজ না করে বরং আরও প্রকাশিত করে দিচ্ছে। সাড়া রাত্রি ঝড় চললো, আর সকালে যখন ঝড় থামলো তখন লাইফবোটেরর তলা কিছু অংশ খুলে গেছে, শুধু চার কিনারটা কোন রকমের ওদের শরীরকে আধা পানির নিচে আধা পানির উপরে ধরে রেখেছে।
লাইফবোটের ভিতরে থাকা সামান্য কিছু জিনিষ এখন ও আছে, দেখে মনোজ বোটের ভিতর থেকে পানি সেচে ফেলার কাজ শুরু করলো, কিন্তু জবা ওকে বাধা দিলো, যেখানে বোটের তলা অর্ধেক খুলে গেছে, সেখানে পানি সেচে কি কমানো সম্ভব? সকালে সমুদ্র এখন শান্ত, মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে, কিন্তু ওদের মনে আর শরীরে এক ফোঁটা শক্তি ও আর অবশিষ্ট রেখে যায় নি কাল রাতের সর্বনাশা ঝড়। মনোজ আর জবার অবস্থা তো খারাপই, কিন্তু বেশি খারাপ হচ্ছে অজয়ের অবস্থা। ওর চোখ দুটি ভয়ে কাঁপছে, সমুদ্রের ঠাণ্ডা পানিতে শরীর কাঁপছে, “মা, আমরা কি মারা যাবো এখন?”-ওর মুখ দিয়ে প্রথম কথা এটাই বের হলো কাল রাতের পর।
জবা ছেলের মাথায় হাত রেখে সান্তনা দিলো, “কিছু হবে না বাবা…আশেপাশ দিয়ে অনেক জাহাজ যাবে এখানে, ওরা আমাদের কে খুঁজতে বের হবে, খুব শীঘ্রই আমরা উদ্ধার পেয়ে যাবো…”-যদি ও জানে এটা শুধু বলার জন্যেই বলা, ওদের ভাগ্যে যে সামনে কি আছে, সেটা নিশ্চিত করে বলা, এখন আর কারো পক্ষে সম্ভব না।
আসলে ঝড়ের কারনে ওরা মুল জাহাজের পথ থেকে, যেখান দিয়ে জাহাজ চলাচল করে সাধারণত, সেখান থেকে প্রায় ১৫০ কিমি দূরে সড়ে এসেছে, যেখান থেকে ওদেরকে খুঁজে বের করা সত্যিই অসম্ভব, অবশ্য যদি কেউ খোঁজ করে থাকে আদোই।
তাই আশাহত মনে আশার সঞ্চারর জন্যেই জবা এই কথাটা ছেলেকে বললো, কিন্তু ওদের একমাত্র অবলম্বন বোটটা ও যে ডুবে যেতে বসেছে, এটাকে বাচাতে হলে এটাকে ছেড়ে সমুদ্রে নেমে যেতে হবে ওদেরকে এখনই। ওদের বিপদের শেষ হয়ে ও যেন হচ্ছে না। এই গভীর সমুদ্রে ওরা পানির মধ্যে কতক্ষন বোটের কিনার ধরে ভেসে থাকতে চেষ্টা করতে পারবে, ওরা জানে না, কাছাকাছি কোন দ্বীপ বা বসতি আছে কি ওরা জানে না, ওদের সঙ্গে সম্বল বলে জীবন ধারনের একটি উপকরন ও নেই, এই লাইফবোটের ভিতরে যদি কিছু থাকে, তাহলে হয়ত বেচে থাকার সংগ্রাম করা সম্ভব হবে ওদের। চারদিকে শুধু পানি আর পানি স্বচ্ছ জলরাশি ওদের জন্যে সৌন্দর্য নয় বরং যেন মৃত্যুরই নামান্তর মাত্র।
মনোজ চারদিকে তাকিয়ে শুধু কি যেন খুঁজছে, কিন্তু কিছুর দেখা কি পেলো? বোটটাকে বাচানোর জন্যে ওদেরকে পানিতে নেমে যেতে হলো, ওরা এখন বোটের কিনার ধরে পানিতে শরীর ডুবিয়ে ভেসে আছে। কাল রাতের মত দড়ি দিয়ে নিজেদেরকে বোটের সাথে বেঁধে রেখেছে, কিন্তু শরীরের ভার ওটার উপর দেয়া সম্ভব না।
চোখের দৃষ্টি অজয়ের কচি মুখের উপর পড়তেই মনোজ বুঝতে পারলো যে অজয় ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে, ছেলের দৃষ্টি অনুসরন করে জবার দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো যে ঝড়ের তাণ্ডবের কারনে জবার পড়নের উপরে কামিজের সামনের দিকে সবগুলি বোতাম ছিঁড়ে গেছে, শুতে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলো জবা, তাই ওর পড়নের ব্রা নেই এখন, ওর উম্মুক্ত বুক দুটির উপরে ছেলের দৃষ্টি, সেটা বুঝতে পেরে একটু গলা পরিষ্কার করার মত করে শব্দ করলো মনোজ, জবা ওর দিকে তাকাতেই ইঙ্গিতে জবার বুকের দিকে দেখিয়ে দিলো মনোজ।
জবা এতক্ষন বুঝতে পারলো যে ওর বুকের কাছটা পুরো খুলে গেছে আর ওর বড় বড় মাই দুটি এখন পুরো উম্মুক্ত, সেদিকেই অজয় চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে আছে। জবা ছেলের দিকে তাকাতেই অজয় লজ্জা পেয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে চোখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলো। কিন্তু হাতের কিছু নেই যে জবা ওর বুকের উপর দিয়ে নিজের লজ্জা সংবরণ করবে। তাই বাধ্য হয়ে জবা ওর পড়নের কামিজের নিচের অংশ মাঝমাঝি ভাজ করে নিজের বুকের দিকে উঠিয়ে নিয়ে বুক ঢাকলো। জীবনের চরম বিপদের দিনে ও নিজের লজ্জাস্থান ঢেকে রাখার শিক্ষা ভুলে যায় নি সে।
বোটের কিনার ধরে ওর ভেসে চললো পানির স্রোতের টানে, লক্ষ্যহীনভাবে, খাদ্য, পানি, কাপড় ছাড়া।
দিনটা পার হতেই যেন ওদের শরীরের শক্তি একদম নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে কতদিন কাটাবে ওরা, জানে না, মনে মনে অজয় ওর আব্বুর উপর বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে ছিলো, উনার জিদের কারনেই ওদেরকে দেশ ছেড়ে জাহাজে উঠতে হয়েছে, আর এখন ওদের এই অবস্থা। ওরা কি উদ্ধার পাবে আদোই, নাকি এভাবে ভেসে ভেসে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়বে।
একটা মাছ শিকার করে খাওয়ার মত শক্তি ও যেন নেই ওদের কারো শরীরে, অবশ্য কোন হাতিয়ার ও নেই। জবা ছিল অতন্ত ভদ্র আর বিনয়ী একজন মহিলা, খাদ্যের চেয়ে ও নিজের শরীর পুরো ঢেকে রাখার মত কাপড় ও যে নেই ওর কাছে এটাই যেন ওকে বেশি বিড়ম্বনা আর অস্থিরতা দিচ্ছিলো। রাতের আধার নেমে এলে সেই বিব্রত অবস্থা যেন কিছুটা কমে এলো, যদি ও কাল রাতের পর থেকে কারো পেটে কোন দানা পানি না পড়াতে ওদের অবস্থা আরও সঙ্গিন হয়ে পড়তে লাগলো সময়ের সাথে সাথে।
এভাবেই পরের দিনটি ও কেটে গেলো, অনেকবার ওদের মনে হয়েছে যেন, সামনে কিছু একটা দেখা যাচ্ছে, সেটা মনে হয় একটা দ্বীপ, ওদের শরীরের মনে একটা আশার সঞ্চার হয়ে যায়, কিছু পরেই সেটা মিলিয়ে যেতেই আবার নিরাশার চোরা বালি ওদেরকে ঘিরে ধরে। ঝড়ের রাতের পড়ে এভাবেই তিনটি দিন ও রাত কেটে গেলো, ওদের শরীর যেন আর পানির উপরে ও নিজের ভার ধরে রাখতে পারছিলো না। অধিকাংশ সময় চোখে বুজে নির্জীব হয়ে পড়ে ছিলো ওরা। লাইফবোটে কোন খাবার না থাকাতে ওদের জীবনী শক্তি ধীরে ধীরে নিঃশেষ হতে শুরু করেছে, ঠিক এমন সময়েই চতুর্থ দিন সকালে মনোজের চোখে পড়লো দূরে একটা বিন্দু, সে মাথা সোজা করে ওদিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো, আর জবাকে ডাক দিলো, “দেখো ওটা মনে হয় একটা দ্বীপ, জবা উঠো…”
জবা চোখ মেলে স্বামীকে অনুসুরন করে দেখল একটা বিন্দু দেখা যাচ্ছে, কিন্তু ওটা কি দ্বীপ নাকি গত তিন দিনের মত কোন এক আলেয়া সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলো না। তবু ও আশার বালিতে ঘর বেঁধে জবা ডেকে তুললো অজয়কে, “বাবা, উঠ, দেখ, ওটা মনে হয় একটা দ্বীপ, জোরে জরে সাতার কাট, বাবা, আমাদেরকে ওখানে যেতে হবে…”।
মায়ের মুখের কথা ছেলে কি অবিশ্বাস করতে পারে, কিন্তু শরীরে যে শক্তি নেই, তারপর ও জবার কথায় ওরা তিনজনেই ঝাপিয়ে পরলো দ্রুত সাতার কেটে ওদিকে যাওয়ার জন্যে। উপরওয়ালা এই বার ওদের সাথে আর কোন দুষ্টমি না করে সত্যি সত্যি ওদেরকে একটা দ্বিপে এনে পৌছালো। বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে সাতরে ওরা পায়ের নিচে বালির আস্তর টের পেলো। “আমরা পেরেছি…ওহঃ খোদাঃ…আমরা পেরেছি…”-জবা বেশি খুশি ছিলো এই আশার বালি দ্বীপে পৌঁছতে পেরে, ওর ভিতরে এখন ও অনেক উচ্ছ্বাস যেন উপচে পড়ছে, যদি ও ওদের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে তৃষ্ণার জলের জন্যে। জবা ওর স্বামীর দিকে তাকালো, অজয়কে বেশি খুশি মনে হচ্ছে না।
“বেশি খুশি হতে পারছি না, জবা, আমরা কাছে কোন বসতীর থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে আছি, আর এই দ্বীপটা দেখে মনে হচ্ছে, এখানে কেউ নেই, আমাদের উদ্ধার পাবার আশা খুব কম…”-মনোজ মন খারাপ করে চারদিকে চোখ বুলাতে বুলাতে বললো।
“কিন্তু এই দ্বীপে আমরা খাদ্য আর পানির ব্যবস্থা হয়ত করতে পারবো, তাই না?”-জবা জানতে চাইলো।
“হয়ত, দেখি আমাকে আগে খাবার পানির কোন উৎস খুঁজে বের করতে হবে, যদি পানি সত্যিই থেকে থাকে এই দ্বীপে। তোমরা দুজনে রোদ থেকে সড়ে ছায়ায় এসে বসো, আমি একটু চারদিকে ঘুরে দেখি কোথায় কি পাওয়া যায়”-এই বলে মনোজ চলে গেলো দ্বিপের ভিতর দিকটাতে।
অজয় আর ওর মা আগে ওদের ভাঙ্গা বোট ও ওখানে থাকা অবশিষ্ট সামান্য কিছু মালপত্র তীরে নিরাপদ দুরত্তে টেনে আনলো, এরপরে ছায়ায় বসে চারদিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলো যে এই দ্বীপে কি আছে? এখানে ওরা বেচে থাকতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন ঘুরছে দুজনের মনেই। কিন্তু অনেকদিন পরে বিধাতা ওদের প্রতি সত্যিই সুপ্রসন্ন ছিলো, তাই মনোজ অল্প কিছু দূরে যেতেই একটা মিষ্টি পানির ঝর্না দেখতে পেলো, সেখান থেকে পানি খেয়ে শরীরে শক্তি করে নিলো, আর মনে মনে চিন্তা করলো যে এই ঝর্নার কাছেই ওদের একটা বাসস্থান তৈরি করার জন্যে উপযুক্ত জায়গা।
কাছেই অল্প কিছু ফল গাছ ও পেয়ে গেলো মনোজ, সেখান থেকে সে দ্রুত চলে এলো ওর স্ত্রী আর ছেলেকে সুসংবাদ দেয়ার জন্যে। সবাই মিলে পানি আর ফল খাওয়ার পর এখন চিন্তা এই দ্বীপে কি আছে, কোন মানুষ বা জনপ্রানী আছে কি না? বা এখান থেকে ওদের উদ্ধার পাওয়ার ব্যবস্থা কিভাবে হবে? পায়ের নিচে মাটির অস্তিত্ব পাওয়ার পর এখন পরবর্তী জীবনের সন্ধান। মনোজ স্থির করলো যে আগে ওকে দেখতে হবে এই দ্বীপটাকে ভাল করে, এখানে জীবন ধারন খুব কঠিন হয়ে যাবে ওদের সবার জন্যে। কিন্তু সেই কঠিনের মাপকাঠি ঠিক করার জন্যে আগে পুরো দ্বীপটাকে ঘুরে দেখতে হবে।
ওদের দুজনকে বিশ্রাম করতে রেখে মনোজ হাঁটতে শুরু করলো, দেখতে পেলো যে পুরো দ্বীপটা বেশ ঘন জঙ্গলে ভর্তি, ওখানে অনেক পশু পাখি আছে, কিন্তু ক্ষতিকর বা ভীতিকর কোন কিছু ওর নজরে এলো না, পুরো দ্বীপটা লম্বায় ৪ কিলোমিটার এর মত হবে আর চওড়ায় ও প্রায় সমান চওড়া। দ্বীপের মাঝামাঝি জায়গায় আরও একটা বড় ঝর্না দেখতে পেলো মনোজ।
ঝর্নার সামনে অনেকটা পুকুরের মত পানি জমে আছে আর চারপাশে অনেক পাথর দেখতে পেলো। দ্বিপের মাঝে বেশ কয়েকটি পাহাড় আছে, এর মধ্যে দুটি ছোট ছোট, আর বাকি গুলি বেশ বড় বড়, কিন্তু মানুষ উঠার মত অনুকুল জায়গা। পাহাড় দেখে মনোজের মনে আশার সঞ্চার হলো যে, এখান থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাবে আর ওদের কাছাকাছি দিয়ে কোন জাহাজ এলে তাকে এই পাহাড় চূড়া থেকে সঙ্কেত পাঠানো যাবে।
মনোজ একটা বড় পাহাড়ে উঠতে শুরু করলো, যেন উঁচু জায়গা থেকে পুরো দ্বীপটাকে আরও ভালো করে দেখে নেয়া যায়। পাহাড়ের চুড়ায় এসে মনোজ একটু বিশ্রাম নিলো, চারদিকে তাকিয়ে দেখে বুঝতে পারলো যে এই দ্বীপে ওদের জীবন ধারণের জন্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, জীববৈচিত্র ও এখানে বিদ্যমান।
ও যেই দিকে ওর স্ত্রী আর ছেলেকে রেখে এসেছে, সেই দিক থেকে বিপরীত দিকে তাকিয়ে দ্বীপের অন্য একটা খোলা কিনার, বালুতট দেখা যায়, সেখানে কিছু বিক্ষিপ্ত কাঠের মত কিছু জিনিষ দেখতে পেলো। মনোজের মন খুশিতে দুলে উঠলো। সে ওই কালো রেখার মত জিনিষগুলি কি সেটা বুঝার জন্যে দ্রুত পাহাড় থেকে নেমে ওই দিকে অগ্রসর হলো।
আগেই বলেছিলাম যে বিধাতা কেন জানি ওদের উপর এই মুহূর্তে খুব সন্তুষ্ট, তাই তিনি যেন ওদের এই নির্জন দ্বীপে জীবন কাটানোর কিছু উপকরন নিজ হাতে এনে দিয়েছে। কাছে যেতেই মনোজ বুঝতে পারলো যে এইগুলি ওদের জাহাজেরই কিছু ভাঙ্গা অংশ, যার সাথে বেশ কিছু হাড়ি পাতিল, অল্প কাপড়, আর জীবন ধারণের কিছু টুকিটাকি কিন্তু অতি প্রয়োজনীয় জিনিষ।
বিশেষ করে অল্প সামান্য কিছু কাপড় পেয়ে মন খুশিতে ভরে উঠলো, যদি ও এই দুর্গম পরিবেশে বেচে থাকার জন্যে কাপড়ের পরিমাণ অতি সামান্য, কিন্তু একদম উলঙ্গ হয়ে থাকার চেয়ে এই অল্প কিছু কাপড় দিয়ে ওদের নিজেদের লজ্জাস্থান টুকু অন্তত পক্ষে ঢাকা যাবে এটা ভেবে মনোজ খুশি হলো।
মনোজ মাটিতে বসে পরলো খুশিতে, উপরে আকাসের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে নিজের মন থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলো। এই অল্প কিছু জিনিষ ওদের জন্যে যে কি মহামুল্যবান এই মুহূর্তে, সেটা মনে করে খুশিতে মনটা ভরে উঠলো, মনে আর শরীরে যেন নতুন করে বাঁচার লড়াইয়ে নামার একটা সাহস আর অনুপ্রেরনা পেলো সে।
জাহাজের যেই ভাঙ্গা অংশ পেয়েছে সে, সেগুলি ওদের থাকার জায়গার কাছে টেনে নিয়ে যেতে পারলে, কোন রকমের শোয়ার একটা জায়গা তৈরি করা সম্ভব হবে। মনোজ প্রথমেই সেই ভেসে আসা জিনিষগুলিকে দ্বীপের একটু উপরে যেখান থেকে সমুদ্রের ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না, সেখানে নিয়ে জড়ো করতে শুরু করলো।
একা একা এই কাজে অনেক সময় ব্যয় হয়ে গেলো ওর, এর পড়ে যেটুকু জিনিষ একেবারে হাতে করে নেয়া সম্ভব সেগুলি নিয়ে সে জবা আর অজয়ের কাছে রওনা দিলো। ওদেরকে গিয়ে সেই খুশির সংবাদ শুনালো সে। জবা আর অজয়ের সাহায্যে সে ধীরে ধীরে সব জিনিষ ওদের থাকার জায়গায় নিয়ে এলো।
পরের বেশ কিছুদিন ওদের প্রচণ্ড পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে কেটে গেলো। মনোজ এমনিতেই বেশ পরিশ্রমী মানুষ ছিলো, আর এখন এই প্রতিকুল পরিবেশে ওকে পরিশ্রমের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে হলো। নিজে যেন এক ৩০ বছরের যুবক এইভাবে সে ওদের নিজেদের জন্যে মাটির একটু উপরে কাঠ আর বাঁশ দিয়ে একটা মাচার মত ঘর আর উপরে একটা ছাউনি বানিয়ে ফেললো, মাচার সামনেই একটু নিচে আরও একটা ছোট মাচা বানাল যেন ওখানে অজয় শুতে পারে।
অজয়ের জন্যে শোবারর ব্যবস্থা একটু দূরে করতে চেয়েছিলো মনোজ কিন্তু অজানা নির্জন দ্বীপে ছেলেকে কাছছাড়া করতে চাইলো না জবা। ওদের দুজনের একমাত্র অবলম্বন যে এখন এই ছেলে, ওদের সমস্ত আশা ভরসা চিন্তা এখন অজয়কে ঘিরেই। যদি ও ওদের থাকার জায়গার চারপাশে কোন বেড়া দেয়া সম্ভব হলো না, যেটা ওদের দুজনের স্বামী-স্ত্রীর একান্ত জীবনের জন্যে প্রয়োজনীয় ছিলো কিন্তু তারপর ও জবা কোনভাবেই অজয়কে দূরে রাখতে চায় না।
ওদের থাকার মাচার সামনে থেকে দ্বিপের কিনার পর্যন্ত জঙ্গল সাফ করে একটা রাস্তার মত বানানো হলো, যেন মাচাতে বসেই ওরা সমুদ্র দেখতে পায়। এক সময় জবার খুব শখ ছিলো সমুদ্র দেখার, এই বার যেন ওর সেই শখ ষোলআনা পূর্ণ করার ব্যবস্থা করে দিলেন উপরওয়ালা। ঘরের পাশেই একটা মাটির চুলা বানানো হলো, সেখানে কুড়িয়ে পাওয়া কিছু রান্নার জিনিস্পত্র দিয়ে প্রতিদিন এক বেলা রান্না করছে জবা।
জবা নিজে খুব ভালো রান্না পারে না, কিন্তু সে শিক্ষিত মেয়ে, জানে কিভাবে কোন খাবারের মাধ্যমে নিজেদের শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে হয়। মনোজের ধরে আনা মাছ আর জঙ্গল থেকে তুলে আনা সবজিই এখন ওদের প্রধান খাদ্য হয়ে গেলো। ওদের হাতে উপকরন খুব সামান্যই ছিলো কিন্তু সেটা দিয়েই মনোজ নিজের মেধা বুদ্ধি আর পরিশ্রম দ্বারা ওদের জীবন ধারণের জন্যে প্রয়োজনীয় যা কিছু দরকার সেগুলির ব্যবস্থা করতে লাগলো।
কয়েকদিনের মধ্যেই ওদের জীবন যাপন যেন একটা রুটিনের মধ্যে চলে এলো। সকালে মনোজ একদিকে আর অজয় অন্যদিকে বেরিয়ে পড়তো। কিছু মাছ আর কিছু সবজি যোগাড় করে আনতো, এর পরে জবা রান্না করতো, অজয় বসে বিশ্রাম নিতো আর মনোজ ওর বিভিন্ন কাজে আবার বেড়িয়ে পড়তো। দুপুরে এক কাট সবাই ঘুমাতো, এর পরে বিকালের দিকে মা ছেলে ঘুরতে বের হতো, দ্বীপটা বেশ সুন্দর ছিলো, বিকালে যখন ওরা ঘুরতে বের হতো, তখন সেটাকে ওদের একটা ছুটিতে কোন এক সুন্দর দ্বীপে বেড়াতে যাওয়ার মতই মনে হতো।
অজয়ের মনের অবসথা খুব খারাপ, এভাবে যে জীবন কাটানো যায়, ছোট বেলার বইতে পড়া আদিম মানুষের জীবনের মত, এই জিনিষটা ওকে কষ্ট দিচ্ছে। জনমানবহীন এই দ্বীপে কিভাবে সে সময় কাটাবে, কোথায় ওর খেলার সঙ্গী, কোথায় ওর লেখা পড়ার সরঞ্জাম, স্কুল? ওর বাকি জীবনটা কি এইভাবেই এই দ্বীপেই কাটাতে হবে?
এই প্রশ্নগুলি ওর মনকে কুরে কুরে খাচ্ছে। জবা কিছুটা বুঝতে পারছিলো অজয়ের এই মিইয়ে পড়া মানসিক অবসথা, ছেলেকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজে ও কেঁদে ফেলতো প্রতিদিনই। ওদের মা ছেলের মাঝে সম্পর্ক সব সময়ই খুব কাছের ছিলো, বাবার সাথে সব সময়ই একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলতো অজয়। ওর বাবা মনোজ ও একটু গম্ভীর প্রকৃতির রাসভারি জেদি মেজাজের লোক, ছেলেকে নিয়ে আদিখ্যেতা করার মানসিকতা বা সময় কোনটাই ছিলো না ওর কোন কালেই।